পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪৯:২২ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত


একাত্তরের ১৩ই অক্টোবর ছাতক অঞ্চলে ৩৬ ঘন্টা ব্যাপী তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে পাক বাহিনীর প্রায় ৪০ জন সেনা খতম হয়েছিল বলে খবর পাওয়া গিয়েছিল এবং প্রায় শতাধিক পাকসেনা ও রাজাকার আহত হয়েছিল। এ যুদ্ধে আমাদের ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এ ছাড়া আরও কয়েকটি বড় বড় অভিযান ও আক্রমণ পরিচালনা করা হয়েছিল। যেমন আমবাড়ি আক্রমণ, লক্ষ্মিপুর যুদ্ধ, সুলতানপুরের যুদ্ধ, বেতুরা আক্রমণ, টেংরাটিলা আক্রমণ, মহব্বতপুর যুদ্ধ, বৃটিশ সড়কে যুদ্ধ, ডাবর ফেরি ধ্বংস, জাউয়া সেতু ধ্বংস, গোবিন্দগঞ্জ যুদ্ধ, কালারুকা যুদ্ধ, চেঙ্গেল খালের যুদ্ধ, আফজলাবাদ রেলস্টেশন অভিযান, ছাতক লালপুল ধ্বংসসহ ছাতকের বিভিন্ন স্থানে তুমুল আক্রমণ পরিচালনা করায় পাকবাহিনী পরাজিত হয়ে বুঝতে পারে তারা মুক্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে অক্ষম তাই পাকবাহিনী ধীরে ধীরে ছাতক, সুনামগঞ্জ অঞ্চল থেকে পিছু হটতে আরম্ভ করে। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ রাজাকার ও পাকবাহিনী সম্পূর্ণরূপে সুনামগঞ্জ, ছাতক হতে গোবিন্দগঞ্জ হয়ে সিলেট চলে যায় এবং ঐদিন সুনামগঞ্জ ছাতক মুক্ত হয়েছিল। এবং ১৬ ডিসেম্বর ঢাকাসহ সিলেট সদরে পাক হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর দীর্ঘ নয় মাস পাক হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর সালে আমরা বিজয় অর্জন করেছিলাম।
১৬ ডিসেম্বরের পর আমরা মফস্বল এলাকার ছাত্ররা পুনরায় গোবিন্দগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ও লজিং বাড়িতে ফিরে আসি। আমার লজিং অভিভাবক আমাকে দেখে খুশি হয়ে বলেছিলেন, ‘দীর্ঘ নয় মাস বীরদর্পে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে ফিরে এসেছ দেখে আমরা আনন্দিত। এখন তোমরা ভালোভাবে লেখাপড়া করে নিজের জীবন গড়ে তুলতে চেষ্টা কর, যাতে স্বাধীন বাংলাকে সত্যিকার সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়। সেক্ষেত্রে যতদিন তোমার প্রয়োজন ততদিন তুমি আমার বাড়িতে লজিং থাকতে পারবে।’ স্কুলে সকল সহপাঠিদের সাথে মেলামেশা শেষে শিক্ষকবৃন্দের সাথে ক্লাশে যোগ দিয়ে যথারীতি লেখাপড়া চলছিল। বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী আমাদেরকে ৫টি বিষয়ে ৩০০ মার্কের এস.এস.সি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য নির্দেশ জারি করেছিল। আমাদেরকে নবম শ্রেণি থেকে অটো প্রমোশন দিয়ে দশম শ্রেণিতে উন্নীত করে ১৯৭২ সালের নভেম্বরে আমাদের ফাইনাল পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল। আমরা কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে একমাত্র সিলেট সেন্টারে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। মধুবনের সাথের প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘দুর্গা কুমার পাঠশালায়’ আমার এস.এস.সি ফাইনাল পরীক্ষার সিট ছিল। আমাদের ৩০০ মার্কের মধ্যে সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে দ্রুত প্রস্তুতি শেষ করে সিলেট এসে একমাত্র সিলেট অঞ্চলের এস.এস.সি কেন্দ্র সিলেট কেন্দ্রে এসে পরীক্ষা দিয়েছিলাম এবং ফলাফল প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত লজিং-এ না থেকে নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিলাম।
১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাট্রিকুলেশন বা এস.এস.সির ফল প্রকাশিত হয়েছিল। ম্যাট্রিক বা এস.এস.সি পাশের সুসংবাদ আমাকে যতটুকু আনন্দ দিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি দুঃশ্চিন্তায় পড়েছিলাম পরবর্তীতে কিভাবে লেখাপড়া চালাবো, কোথায় ভর্তি হব, ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারব কিনা? আর্থিক সামর্থের মধ্যে লেখাপড়া চালানো সম্ভব হবে কিনা ইত্যাদি নানা সমস্যা নিয়ে ছিলাম অধিক চিন্তিত। স্কুল কলেজের সংখ্যা অপ্রতুল বা হাতে গোনা দুই/তিনটি হলেও এখনকার মতো কলেজে ভর্তি হতে ভর্তি যুদ্ধ বা ভর্তি পরীক্ষার প্রচলন ছিল না। যদিও নামে মাত্র মৌখিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হতো বরং বেশির ভাগ কলেজেই ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই ভর্তি করা হতো। মেডিক্যাল ও ইঞ্জনিয়ারিং কলেজগুলোতে নিজস্ব আঙ্গিকে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হতো। আমি পিতাকে যখন বল্লাম আমি সিলেটের মদনমোহন কলেজে ভর্তি হতে চাই, তখন তিনি বলেছিলেন, সিলেটে আমাকে হোস্টেলে রেখে তিনি পড়ার খরচ দিতে পারবেন না, তবে যদি সিলেট শহরের আশেপাশে লজিং পাই তাহলে সিলেটে লেখাপড়া করতে উনার কোন আপত্তি থাকবে না। শেষ পর্যন্ত পিতার অনুমতি নিয়েই সিলেটস্থ মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজেই ভর্তি হলাম কেননা তখনকার সময় বাণিজ্য বিভাগের ছাত্রদের জন্য সিলেটের উক্ত কলেজই সবচেয়ে উত্তম ছিল, সেই ঐতিহ্য এখনও বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু চেষ্টা তদবির করেও যখন লজিং পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন গোবিন্দগঞ্জের নোয়াপাড়া লজিং থেকেই রেলগাড়িযোগে সিলেট এসে ক্লাশ চালাচ্ছিলাম। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন ক্লাশমিটের সাথে পরিচয় হওয়ার পর তাদেরকে লজিং খোঁজে দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ ও তাগিদ দিচ্ছিলাম, তথাপি লজিং খুঁজে না পাওয়ায় ক্রমশ হতাশ হচ্ছিলাম।
একদিন সকালে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল তাই ছাতাটি হাতে নিয়ে গোবিন্দগঞ্জ লজিং থেকে কলেজের উদ্দেশ্যে আফজলাবাদ রেলওয়ে স্টেশন থেকে সিলেট যাওয়ার জন্য ট্রেনে উঠলাম। সিলেট রেল স্টেশনে এসে বৃষ্টি না থাকায়, ছাতাটি ট্রেনে রেখেই হাটতে থাকলাম। কিছুদূর গিয়ে মনে পড়লে ঘুরে এসে ছাতাটি পেলাম না কিন্তু ট্রেনের কামরায় বসে রইলাম। মন খরাপ করে ট্রেনে বসে থাকায় ট্রেন আমাকে নিয়ে ঢাকার দিকে ছুটতে লাগলো। এমতাবস্থায় এখন কি করব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ট্রেনেই বসে থাকলাম। ট্রেন কুলাউড়া স্টেশনে থামলে আমি সেখানেই নেমে পড়লাম। তখন পকেটে মাত্র ১০টি টাকা ছিল। তখন ১০ টাকায় অনেক কিছু করা যেতো, কেনা ও খাওয়া যেতো। কুলাউড়া বাজারের বিভিন্ন জায়গায় ও কলেজ এলাকায় ঘুরাঘুরি করে বিকালের গাড়িতে পুনরায় সিলেট হয়ে গোবিন্দগঞ্জ লজিং বাড়িতে চলে আসলাম। ঐদিন রাত্রে দুঃশ্চিন্তায় ঘুম হয়নি। লজিং না পাওয়ার কারণে ঠিকমত লেখাপড়া হচ্ছিল না, তাই সারারাত চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম সুনামগঞ্জ কলেজেই ভর্তি হব। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। পরদিন সুনামগঞ্জ চলে গেলাম। ঐদিনই সুনামগঞ্জবাজারের এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে লজিং পেয়ে গেলাম। লজিং বাড়িটি ছিল বর্তমান সুনামগঞ্জের ওয়েজখালী তেমুখী পয়েন্ট থেকে সামান্য দূরের গ্রামে। তখন এই রাস্তাটি ছিল কাঁচা রাস্তা এবং সুনামগঞ্জ শহর থেকে পায়ে হেঁটেই যেতে হতো। আমি যেদিন এই লজিং বাড়িতে গিয়েছিলাম তার পরদিন থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছিল। ইতিমধ্যেই সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তখন বাংলায় বর্ষাকাল চলছিল তাই চতুর্দিকে পানি আর পানি, যেদিকে চোখ যায়, চারদিকে শুধু পানি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। চতুর্দিকের পানি দেখে মনে হচ্ছিল সুনামগঞ্জ শহর বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপ বা একটি ভাসমান বন্দরনগরী। কাঁচা সড়ক দিয়ে লজিং বাড়ি থেকে কাদা পানির মধ্য দিয়ে সুনামগঞ্জ শহর ও কলেজে পায়ে হেঁটে যাওয়া আসা করতে হত। তাছাড়া সড়ক হতে নৌকা দিয়ে লজিং বাড়িতে যেতে হতো। লজিং বাড়িতে আমাকে যে ঘরে থাকতে দিয়েছিল, সে ঘর থেকে বাহির হলেই পানিতে পা রাখতে হতো তাই রাত্রি বেলাতে তো বটেই দিনের বেলাতেও আমার ভয় করছিল। অতিকষ্টে সপ্তাহ দিন উক্ত লজিং এ অবস্থান করে বিভিন্ন পরিস্থিতি ও পরিবেশ লক্ষ্য করে, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সুনামগঞ্জে থেকে লেখাপড়া সম্ভব নয় বা হবে না, তাই সুনামগঞ্জ লজিং থেকে চলে আসলাম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT