সাহিত্য

একা

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৮-২০১৯ ইং ০০:২৮:২৬ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

একা এক সময় একা ছিল না। বাবা ছিল, মা ছিল, ভাই ছিল, বোন ছিল। ওর পাড়া পড়শি ছিল, ছিল আত্মীয়-স্বজন। আজও ভরা যৌবনে সে প্রচন্ডভাবে একা বোধ করছে। যারা আজ কাছে থাকার কথা ছিল, ওরা কাছে নেই। আর যারা কাছে থাকার কথা নয় ওরা গায়ে পড়ে কাছাকাছি হতে চায়। সমাজ সংসার, ধর্ম সবই আকাশের মত উপুড় হয়ে ওকে লক্ষ্য করে। পরখ করে ওর গতিবিধি। ধর্ম বলে না এদিকে যেও না। সমাজ বলে না এদিকে যেও না। সংসার বলে- না আর এদিকে অগ্রসর হইও না। কী করবে সে একাকী?
একারা ছয় ভাই বোন। একা যখন যৌবনবতী তখনই হয় পিতৃহারা। এর ঠিক দুই বছর পর মাও চলে গেলেন চিরতরে। পরিবারে শুরু হলো ভাঙন। ভাগ্যিস বড় বোনের বিয়ে দিয়ে যেতে পেরেছিলেন বাবা-মা। ভাইয়েরা অনেক কষ্টে মেঝো বোনের বিয়ে দিয়েছিল। এরপর ভাইদের পালা। পৈতৃক সম্পত্তি খুব একটা ছিল না। ভিটেমাটি ছাড়া ছিল এককেদার জমি। দেখতে দেখতে সবই ভাগাভাগি হয়ে গেল। বড় ভাই-মেঝো ভাই বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেলেন। কারণ দিনমজুরি করে বউয়ের চাহিদা মেটানোই কষ্টকর। এর উপর এক ভাই এক বোনের বোঝা নিতান্ত কম নয়। অবহেলার পাত্র-পাত্রী হলো ওরা। বড় দুই ভাই কেউই ওদের দায়িত্ব নিল না। পনের বছরের নুনু আর বার বছরের একা। বড় ভাই একদিন খাওয়ালে মেঝো ভাই একদিন খায়াতো। এইভাবে পালাক্রমে চলল কিছুদিন। আত্মীয় স্বজনরা মাঝে-মধ্যে কিছু সাহায্যও করত। কিন্তু সময় সময় ওদের ভাতের উপরও হিসাবের খড়গ নেমে এলো। বড় ভাবী একদিন বলে- এই যে নবাবের বেটা-বেটি। একটু কম সম খাইও। যা আকাল পড়ছে। আশেপাশে নজর রাইখো। ভাত যা রান্ধি তাতো তোমরা দুজনেই সাবাড় কইরা লও। আমরা খাইলাম, না খাইলাম না তা কি চাইয়া দেহ? মেঝো ভাবীও কম যায় না- সেও একদিন ভাতের নামে খুটা দেয়। বলে- বেকার মাইনসের আবার খানি ছাড়া কি কাম আছে? শুধু খাই খাই... দেখ না- দুজনের চেহারা? তেল ফেইলা তেল তুলা যাইবো। কী নাদুস নুদুস। ওরাই তো দুর্ভিক্ষের কারণ আর আমরা হইলাম গিয়া দুর্ভিক্ষের স্বীকার। কাল থাইক্কা দুই বেলা খানা। সহালে আর রাইতে। দুপুর বেলা খাইতে আইসো না। ঘরে চাইল নাই। বুঝলা?
নানু আর একা কোন কথা বলল না। কোন প্রতিবাদও না। নীরবে ওদের ডেরায় ঢুকলো। কান্নায় বুক ফেটে যাচ্ছে। একা মা-বাপকে ডাকতে শুরু করল-
-ও বাবা ও মা তোমরা কোথায়? কেন জনম দিয়া আমাগোরে একলা থুইয়া হারাইয়া গেলা? ও আল্লাহ আমরা কী দোষ করছিলাম ও মা... ও আল্লাহ।
-নুনু নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলতে লাগলো। কোন কথা বের হচ্ছে না ওর মুখ দিয়ে। শুধু একার মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। অস্ফুট বলতে লাগলো- কাদিস নারে একা কাদিস না। এই দুনিয়ায় আমাদের কেউ নাই। আমরা বড়ই একা....। কাদিস না দেহি কী করা যায়?
-সেদিন মেঝো ভাবী রাতে খাবার খেতে ডাকলেও যায়নি ওরা দুজন। না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। ভোরে উঠে নুনু কোথায় যে চলে গেল- জেগে উঠে একা ওকে খুঁজে পেলো না। কিছু বলেও যায়নি ওকে। দৌড়ে গিয়ে পুকুর, লেট্রিন, পাশের ঘর সবই দেখল একা। না- কোথাও পাওয়া গেল না নুনুকে। ভাবীদের জিজ্ঞেস করলে ওরা মুখ ঝামটা মেরে প্রায় একই জবাব দিল- কি জানি বাপু... কোন মাইয়া লইয়া ভাগছে কে জানে? তুইও একটা নাগর দেখ। বয়সতো আর কম অইল না। যত্তসব ঝামেলা....
একা নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগলো। মনে মনে বলল- ছোট ভাইয়া তুই কোথায় চলে গেলি? আমাকে বড় একা করে দিলি? আমি এখন কই যামু কী খামু? কী করুম? কিছুই বুঝবার পারতাছি না। ছোট ভাইয়া.....।
একটু পরে মেঝো ভাবী একটি থালায় করে ডাল ভাত এনে পাশের ভাঙ্গা টেবিলে রেখে বলল- শাহজাদী খয়রুন ডাল ভাত খাইয়া লও। নিজে না খাইয়াও দিতাছি। আমি হারাই গেলে তখন বুঝবা? আমার মত্ত বেডি আর পাইবা না।
একা কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল নেই। জেগে দেখে প্রায় বিকাল হয়ে গেছে। পেট ক্ষিধায় ছু ছু করছে। হাত মুখ ধুয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডাল ভাত খেল। একা ভাবতে লাগল ছোট ভাইয়ার কথা। কোথায় গেছে? কি করবে সে? লেখা পড়া তেমন নেই। সেভেন পর্যন্ত পড়েছিল। কোন দিন কোন কাজ করেনি। এখন কি করবে সে? তারপরও সে পুরুষ মানুষ কিছু একটা হয়ত ঝুটিয়ে নিতে পারবে।
একার লেখাপড়া পাঠশালার গন্ডি পেরুতে পারেনি। ফাইভে উঠে ছিল কোন রকম। ওই পর্যন্তই। বাবা মা ইহলোক ত্যাগ করলে একার লেখাপড়াও থেমে যায়। সে অনেক মেধাবী ছাত্রী ছিল। কালের আবর্তে সে মেধা হারিয়ে গেল। গোলাপ কলি ফুটতে গিয়েও ফুটতে পারলো না। কোত্থেকে মাকড়সা এসে ওর মুখে জাল বেঁধে ওকে ফুটতে দেয়নি কিন্তু ওর রূপ। পরীকেও হার মানায়। লাল গোলাপী চেহারা, আয়ত চক্ষু, উন্নত নাক মরালের মত গ্রীবা। আর চুল? যেন সাক্ষাৎ মেঘমালা। বিধি যেন ওকে নিজ হাতে গড়েছেন। এই পরিবারে ওর জন্ম- কেউ না দেখলে বিশ্বাসই করবে না। গোবরে পদ্মফুল যেনো।
আজ একার আঠার বছর পূর্ণ হলো। ভাই-আর ভাবীদের সংসারে খেটে খুটে কোনরকম দু’মুঠো ভাতের সংস্থান হচ্ছে তার। সবচাইতে বড় ব্যাপার নিরাপত্তা। অবশ্য ভাইয়েরা পাশে থাকায় ওর জীবনে অবাঞ্ছিত কিছু ঘটেনি।
এ বছরটা একার জন্য বেশ সুখের। ওর দূর সম্পর্কীয় খালাতো ভাই লন্ডনে থাকে। শীতের ছুটিতে দেশে এসেছে। ওরা অনেক বড়লোক। ওরা রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় হলেও অবস্থা সম্পন্ন আত্মীয়রা অনেকটা এড়িয়েই চলেন। বিয়ে-শাদী, মৃত্যু সংবাদ এরকম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছাড়া ওদের খবর কেউ রাখে না। তবে শফিক এর ব্যতিক্রম। দীর্ঘ দশ বছর পর দেশে এসেছে বিয়ে করবে বলে। যাকে বিয়ে করবে নিশ্চিত সে ভাগ্যবতী। কারণ ও বিয়ে করা মানেই হচ্ছে একপা লন্ডনে রাখা।
এখন পর্যন্ত যে ক’জন পাত্রী দেখেছে তার কাউকেই পছন্দ হয়নি শফিকের। ছুটিও আর বেশিদিন নেই চার সপ্তাহের মধ্যে এক সপ্তাহ চলে গেছে। চলতি সপ্তাহে এ্যাংগেজমেন্ট না হলে বউ তুলে নেয়া কঠিন হতো। তাই কনে দেখার তোড়জোড় চলছে। দুজন ম্যাচমেকার নিয়ে একটা কারে করে যাচ্ছিল শফিক। সাথে ওর ছোট ভাই। হঠাৎ পথে একটা বাড়ি দেখিয়ে বলল- ভাইয়া ঐ যে বাড়িটা দেখছ এটি আমাদের খালার বাড়ি।
ঐ যে রোজিনা খালা ছিলেন- গত কয়েক বছর আগে মারা গেছেন- উনার বাড়ি এটি।
-তাই নাকি?
-চল্ এখানটা ঘুরে আসি।
-শফিক ড্রাইভারকে বলল- ভাই এই রাস্তা ধরে যান?
-কোথায়? আলীপুরে?
-হ্যাঁ।
ড্রাইভার কার ঘুরিয়ে আলীপুরের দিকে চলল। একাদের বাড়ির পাশে গাড়ি থামিয়ে শফিক এবং ওর ভাই রফিক হেঁটে চলল। গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চারা হঠাৎ কার দেখে ভীড় জমিয়ে ফেলল। উৎসুক দৃষ্টিতে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবাই কারটি দেখতে লাগলো। একা ঘরের বাতায়ন দিয়ে চেয়ে লোকদের চিনতে চেষ্টা করল। হ্যাঁ এতো শফিক ভাই ও রফিক ভাই। সে দৌড়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। ইতোমধ্যে ভাবীরাও যার যার দুয়ারে দাঁড়িয়ে বিষয়টি দেখছিল। ওরা এদের চিনতে পারেনি। কারণ বিয়ের সময় বা বিয়ের পরে এরা কেউ এখানে আসেনি।
একা ওর খালাতো ভাইদের পরিচয় দিলে দুই ভাবীই দুই দিকে টানাটানি শুরু করল। বড় ভাবী বলে- আয়েন আমাদের ঘরে আয়েন। অপর দিকে মেঝো ভাবী বলে- আরে আসেন আসেন না। অগত্যা শফিক বড় ভাবীর ঘরের দিকেই পা বাড়িয়ে বলল- আরে ভাবী আপনিও আসুন এ ঘরে বসি।
কথাবার্তার ফাঁকে শফিক একাকে দেখে। বাঃ খুব সুন্দরীই তো মনে হচ্ছে। ও এই পাড়া গায়ে থেকে এত সুন্দর হলো কী করে। মনে মনে আল্লাহর সৃষ্টির প্রশংসা করে সে। আর বলে- ইউরেকা আর খুঁজতে হবে না। আমি ওকেই চাই। ওকেই বিয়ে করবো। চা-নাস্তা খেতে খেতেই চলে আসলেন- একার বড় ভাই কুদ্দুছ আলী। ইতোমধ্যে ম্যাচমেকারদেরকে বাড়িতে ডাকা হলো। শফিক ওর পছন্দের বিষয়টি ভাবীদের জানালো। ওরা একটু ঈর্ষান্বিত হলেও কিছুই করার ছিল না। ম্যাচমেকাররা- একার ভাইকে সরাসরি বলতেই তৎক্ষণাৎ রাজী হয়ে গেলেন কুদ্দুছ ্অলী। আর রাজী হবেনই বা না কেন? লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেও যে দামান পাওয়া যায় না- সে দামান এখন একেবারে হাতের মুঠোয়। এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি আর কি।
এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে হয়ে গেল একার। ওকে নিয়ে এলো শহরের নিজস্ব বাসায়। এখানে একটা ফ্ল্যাট রেখে সবগুলোই ভাড়া দেয়া আছে। ওরা লন্ডন থেকে এলে ঐ ফ্ল্যাটেই থাকে। ধুমধামে ছুটির দিন শেষ হয়ে গেল শফিকের। ইতোমধ্যে ব্রিটিশ এম্বেসিতে এপ্লাই করলেও এত তাড়াতাড়ি ভিসা পাওয়া সম্ভব নয়। শফিকের বিদায়ের দিন উপস্থিত হলে একার আবারও একা হওয়া ঘনিয়ে এলো। শফিকের বিশাল বাড়িতে ওর নিজের আত্মীয় স্বজন কেউ নেই। মা-বাবা ভাই-বোন সবাই লন্ডনে। এখন একাকে নিয়েই ঘটল বিপত্তি। শফিক একাকে ওর পিত্রালয়ে রাখতে চাইল না টেকনিক্যাল কারণে। বাসায়ও রাখতে পারল না একাকীত্বের কারণে। কারণ একজন যুবতী সুন্দরী মেয়ে একটা বিশাল বাসায় একা কী করে থাকবে? তাই দূর সম্পর্কীয় এক আত্মীয়ার সাথে পেয়িং গেস্ট হিসাবে রেখে গেল ওকে।
যাবার ক্ষণ উপস্থিত হলে একার চক্ষুদ্বয় দুলদুল করে উঠল। এই সুখ স্বপ্ন এত জলদি ভেঙ্গে যাবে ভাবতেই ঢুকরে কেঁদে উঠল সে। শফিক সান্ত¦না দিয়ে বলল- কেঁদো না লক্ষ্মীটি। ভিসা পেতে বেশি দেরী হবে না। দু-একমাসের মধ্যেই ভিসা পেয়ে যাব। তখন আবার আমরা সেই স্বপনের লন্ডনের একত্রিত হব। দুজন হব দুজনার।
চলে গেল শফিক একাকে একা করে। চারিদিক যেখানে সুখে ভরে উঠে ছিল ক্ষণিকে আজ ক্ষণিকেই যেন সে সুখ বিলীন হয়ে গেল। একা হয়ে গেল আবারও একা।
বেশ ক’মাস শফিকের সাথে যোগাযোগ ছিল। খরচের টাকা পয়সাও বিকাশ মারফত দিয়েছিল। বাংলাদেশ সময় রাত তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত অনবরত কথা বলত ফোনে। কত আদর আহ্লাদের কথা শুনাতো। প্রকাশ করত কত উচ্ছ্বাস ওকে নিয়ে। একা ওর কথাগুলো আঁকড়ে ধরেই বেঁচে আছে। ওর স্মৃতি ওর ঘ্রাণ ওর ব্যক্তিত্ব সবই যেন পাগলের মত টানছে ওকে প্রতিনিয়ত। কবে আবারও দেখা হবে শফিকের সাথে.....
ছ’মাস পর। একটি চিঠি এল একার নামে। বুকে শত আগ্রহ নিয়ে খুলল চিঠিটি। ভেবেছিল এই চিঠিটিই হয়ত ওর ভাগ্য বিধাতা। এটি হয়ত ভাগ্য খোলার চিঠি। অপেক্ষার অন্তিম পর্যায়। কিন্তু চিঠি খুলে ‘থ’ হয়ে গেল একা। ডিভোর্স চিঠি এটি। সাথে দু’লক্ষ টাকার চেক। শফিক ওকে একা করে দিয়ে দু’লক্ষ টাকার চেক দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী যারা সেদিন একার মুখের দিকে তাকিয়েছিল ওরা বুঝতে পারেনি... সে কাঁদছে না হাসছে...

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT