উপ সম্পাদকীয়

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৮-২০১৯ ইং ০১:২৭:৫৬ | সংবাদটি ৪২ বার পঠিত

সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে গত ৩০ জুলাই। ২০১৮ সালের এইদিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সরকারি দল আওয়ামীলীগের শাসনামলে আরিফের জয়লাভ তার জন্য স্মরণীয় ঘটনা। এই নিয়ে আরিফ দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হলেন।
দ্বিতীয়বার দায়িত্ব গ্রহণের পর আগের মেয়র আর নেই, অন্য আর এক মেয়রকে দেখছে নগরবাসী। তিনি কাজের খোঁজে আছেন, কাজে লেগে আছেন, ফান্ড যোগাড়ে অহর্নিশ ব্যস্ত রয়েছেন। তার ভাগ্য ভালো সরকারি দল আওয়ামী লীগের দিলখোলা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সুনজরে পড়েছিলেন। তিনি কাজের লোক। আলোকিত সিলেটের রূপকার তিনি। মেয়র আরিফ করিতকর্মা চৌকশ লোক। সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিতের ¯েœহদৃষ্টি পড়ে তার উপর। তিনি আরিফকে কাছে টানেন। আরিফের ফান্ডের দুঃশ্চিন্তা দূর হয়। ফান্ড আসতে শুরু করে। আরিফ কোমর বেধে মাঠে নামেন। শুরু হয় নগর উন্নয়ন কর্ম তৎপরতা। আরিফুল হক প্রথমেই হাতে নেন রাস্তা বা সড়ক প্রশস্তকরণ, সড়কের দুই পাশে ড্রেন খনন ও প্রশস্তকরণ। নগর জুড়ে ব্যস্ত এলাকা জিন্দাবাজার চৌহাট্টা, মিরবক্সটুলা, কুমারপাড়া, ধোপাদীঘিরপার, মীরাবাজার, সিলেট-তামাবিল রোডের খারপাড়া, দাদাপীর (র:) মাজার, সোনারপাড়া, ফরহাদপুর, শিবগঞ্জ, টিলাগড় প্রভৃতি এলাকায় প্রায় একই সঙ্গে খনন কাজ শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরোপুরি কাজ শেষ হয়নি। পূর্ব মীরাবাজারে কিশোরীমোহন প্রাইমারি স্কুলের কাছে যুগনীছড়ার উপরের ব্রিজটি ভেঙ্গে প্রশস্তকরণ ও পুননির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে বেশ পূর্বে। কিন্তু কাজের ফিনিশিং এখনো হয়নি। অবৈধভাবে অন্যের দখলে যাওয়া জায়গা উদ্ধার করেছে সিটি কর্পোরেশন। কাজির বাজার ও তোপখানা এলাকায় অনেক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে সিটি কর্পোরেশন। এসবের কারণে নগরে জলাবদ্ধতা কমেছে। মেয়র নগরের উপকণ্ঠ ও আশপাশের আনাচে কানাচে নালা-নর্দমায় গড়ে উঠা স্থাপনা অপসারণ করেছেন। নালা-নর্দমা-ছড়া পরিষ্কার হওয়ায় চারদিকের পরিবেশে সুস্থতার আমেজ পাওয়া যাচ্ছে।
সিলেট নগরের উত্তরদিক আম্বরখানা থেকে জিন্দাবাজার পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড বৈদ্যুতিক লাইন, টেলিফোন লাইন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ছোট ছোট গলির মুখ প্রশস্তকরণের চিন্তাভাবনা রয়েছে। যানজট পরিষ্কার ও অবৈধ হকার উচ্ছেদের কাজে মেয়র অনবরত লেগে আছেন। নগর উন্নয়নের স্বার্থে জনকল্যাণে মেয়রের পথচলা অব্যাহত চলছে। এসব উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নিতে স্থানে স্থানে মাটি-পাথর-আবর্জনা ছড়িয়ে আছে। নগরবাসী সাময়িক অসুবিধা বৃহত্তর স্বার্থে মেনে নিচ্ছে।
জনগণের সুবিধা অসুবিধার ব্যাপারে তিনি একটুও ছাড় দিতে নারাজ। তিনি বলেন, সাময়িক কিছু অসুবিধা হলেও পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। কেউ-ই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। দোষত্রুটি সবাইর আছে। মেয়র এইসব দোষ ত্রুটি পরিহার করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জানিয়ে বলেন, আমাকে সহযোগিতা করুন, আমি কাজ করতে চাই। মেয়র মনে করেন তিনি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার, তাই তিনি গর্বভরে উচ্চারণ করেন, আমি শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে নগরের উন্নয়নে আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কতটা সফল হলাম, সেটা নগরবাসীই বিবেচনা করবেন। কোনো একজন লোকের যেমন প্রশংসাকারী থাকে, নিন্দুকও থাকে। নিন্দুক সত্য-মিথ্যা বিবেচনা করে না। মেয়র আরিফুল হককে যারা পছন্দ করেন না, তারাই তার সমালোচনা করেন বেশি। সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে নগরীকে আরো সুন্দর করতে জনগণকে আরো বেশি সেবা দিতে মেয়র আরিফ অধিকতর তৎপর হবেন এমন প্রত্যাশা জনগণের।
করিতকর্মা মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। নগরের কয়েকটি সমস্যার প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সর্বাগ্রে পূর্ব-মীরাবাজারে অবস্থিত হযরত দাদাপীর (র:) মাজার সম্পর্কে। মাজারটি একেবারে রাস্তার উপরে পড়েছে। এটি সরিয়ে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। লোক চলাচলে খুব অসুবিধা হয়। খুব সতর্কভাবে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করতে হয়। হযরত দাদা পীর (র:) হযরত শাহজালাল (র:) এর অন্যতম সঙ্গী।
পরামর্শ
মাজারের চতুর্দিকের ওয়াল ভেঙ্গে ফেলতে হবে। মাজারের ভিতর কমপক্ষে দু’হাত প্রশস্ত করতে হবে। মজবুত করে ওয়াল নির্মাণ করতে হবে। চারকোণায় ঢালাই করে পিলার নির্মাণ করতে হবে, যাতে দুর্ঘটনায় বা গাড়ির ধাক্কায় মাজারের কোনো ক্ষতি না হয়। থাই নির্মিত প্রবেশ গেইট থাকবে। উন্নত মার্বেল পাথর বা মুজাইক দিয়ে সুন্দর কারুকার্য খচিত হবে মাজারের ভিতর বাহির।
মিরাবাজার ব্রিজের ফিনিসিং কাজ দ্রুত করতে হবে। ব্রিজ সংলগ্ন আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল লাইনের ত্রুটি দূর করতে হবে। ত্রুটির কারণে তিনশত টেলিফোন অকেজো হয়ে আছে।
ফরহাদ খাঁ ব্রিজ
এক সময় ফরহাদ খাঁ ব্রিজের চওড়া বৃদ্ধি করা হয়। এ সময় বর্ধিত অংশের নিচে প্রোটেকশনের জন্য দুইদিকে লোহার বিশেষ ধরনের পিলার লাগানো হয়। আসলে সমস্তটা একটা ফ্রেইম। এতে ব্রিজের মুখ সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি হলে ছড়া ভরে উঠে, পানি কাটে না। ফলে পানি জমে উল্টাদিকে মারে। এ কারণে উজানে দর্জিপাড়ার দিকে জনপথ পানিতে ডুবে যায়। এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য ব্রিজের নিচের পিলার বা ফ্রেইম সরানো দরকার। এই এলাকায় ড্রেনের উপরে কোনো কোনো জায়গায় স্লাব বা ঢাকনি নেই। ফলে রাতে অন্ধকারে দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা।
জামালপীর-কামালপীর
দর্জিপাড়ায় সার্ক স্কুল এন্ড কলেজের সামনে জামাল-কামালের মাজার অবস্থিত। আসলে মাজারের কোনো চিহ্ন নেই। এখানে ভিতর দর্জিপাড়ায় যাবার রাস্তা বাঁক নিয়েছে। বাঁক ঘেষে একটা পাকা পিলার দাঁড়িয়ে আছে। এই পিলার ছাড়া মাজার বা কবরের কোনো চিহ্ন বা আলামত নেই, অবশ্য খালি জায়গা আছে যেখানে কবর থাকতে পারে। এই জায়গাটা ওয়াল দিয়ে কবর হিসেবে আগলে রাখা প্রয়োজন। পরিচিতির জন্য একটা নামফলক থাকা আবশ্যক।
হাদামিয়া-মাদামিয়ার কবর
১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ কর্তৃক বাংলার স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হবার পর ১৭৮২ সালে সিলেট ইংরেজ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলো। সিলেটবাসী স্বাধীনতার আকাঙ্খায় ব্রিটিশ সেনাদলের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছিলো। ইতিহাসে এই যুদ্ধ হাদামিয়া-মাদামিয়ার বিদ্রোহ বলে খ্যাত। পবিত্র আশুরার (১০ মুহররম) সময় সংঘটিত এই বিদ্রোহে বিদ্রোহের নেতা হাদামিয়া-মাদা মিয়ার ভাই পীরজাদা ও হাদামিয়া-মাদামিয়া শাহাদত বরণ করেন। তাদের দাফন করা হয় নয়াসড়কস্থ খ্রিস্টান মিশনারিদের টিলার পশ্চিম-উত্তর প্রান্তে। কয়েক বছর আগেও কবরের পুরাতন ইটের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। টিলার পশ্চিম পাদদেশে কয়েক বছর পূর্বে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদ্রাসার বিল্ডিং নির্মাণ ও উন্নয়ন কর্মকান্ডের ডামাডোলে টিলার কবরের অংশ হারিয়ে গেছে।
হাদামিয়া-মাদামিয়ার বিদ্রোহ যেমন ঐতিহাসিক ঘটনা, তেমনি হাদামিয়া-মাদা মিয়ার কবরও ঐতিহাসিক স্থান। এ ইতিহাস সিলেটবাসীর ঐতিহ্য এবং বিশ্বের স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রেরণার উৎস। সিলেটবাসীর স্বার্থে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ইতিহাস সচেতনতার জন্য ঐতিহাসিক স্থানটির উপযুক্ত সংরক্ষণ অতীব প্রয়োজন।
ইতিহাস সচেতন মান্যবর মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পরিপূরক হাদামিয়া-মাদামিয়ার কবর সংরক্ষণ ও উন্নয়নে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে আসবেন, সিলেটবাসী সেই দিনের আশায় দিন গুনছেন।
নাইট স্কুল
সিলেটে একটি মাত্র নাইট স্কুল আছে। এটা ভোলানন্দ নৈশ উচ্চ বিদ্যালয়। সিলেট সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত ভোলানন্দ স্কুলে ক্লাস ঠও থেকে ক্লাস ঢ অর্থাৎ এস.এস.সি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ আছে। প্রথমে কুমিল্লাবোর্ড থেকে অনুমোদিত এবং পরে সিলেট বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এস.এস.সি পরীক্ষার ফলাফল খুবই আশাব্যঞ্জক। এখান থেকে পাশ করে ছাত্ররা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার সহিত চাকরি করছে। ভোলানন্দ নৈশ স্কুল একটি ঐতিহাসিক স্কুল কারণ এটি সমগ্র বাংলাদেশে একমাত্র অবৈতনিক নাইট স্কুল। এখানেও কিছু সমস্যা আছে। অতি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির সমস্যাগুলো দূরীকরণে স্কুলের অভিভাবক সিটি মেয়র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে গরিব ছাত্রদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখবেন।
মেয়র আরিফের মেয়াদকালের অনেক সময় বাকি রয়েছে। তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিশ্রুতির বাইরে অনেক দরকারি ও জরুরি কাজ আছে। এই কাজসমূহ বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট সময় আছে তার হাতে। আরিফ শুরুতে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সহায়তায় বড় অঢেল তহবিল পেয়েছিলেন। মন্ত্রী তার অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা শেয়ার করেছিলেন মেয়রের সঙ্গে। বৃষ্টির সময় শহরের জলাবদ্ধ পানিতে জনগণের অবস্থা দেখতে আরিফ-মুহিতকে রিকশায় চড়ে ঘুরতে দেখা গেছে। অর্থমন্ত্রী সিলেট-১ আসনের সাংসদ ছিলেন। এখন তিনি মন্ত্রীও নন, সাংসদও নন। এখন তার সহোদর ড. একে আব্দুল মোমেন ওই আসনের সংসদ সদস্য এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি এই শহরেরই সন্তান। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সিলেট শহরের উন্নয়নে সৌন্দর্য বর্ধনে তার আগ্রহ প্রশ্নাতীত। মেয়র আরিফ তার নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের সহায়তা চাইলে নিশ্চয়ই ফান্ডের জন্য তাকে আর ভাবতে হবে না।
জনগণ বান্ধব মেয়র আরিফ সব দুর্যোগে সুসময়ে জনগণের পাশে থাকেন। ঘাতক রোগ ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিনি মাঠে আছেন। নগর পরিচ্ছন্ন ও মশার বংশরোধে তিনি তৎপর আছেন। নবী (সা:)-এর বাণী, ‘তোমরা তোমাদের আঙ্গিনা পরিষ্কার রাখো’-এই বাণী নিয়ে তিনি এখন জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

 

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT