মহিলা সমাজ

কোম্পানীগঞ্জে নারী শিক্ষা

নাসরিন জাহান ফাতেমা প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৮-২০১৯ ইং ০১:৩৬:১০ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে ২১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তার মধ্যে তিনটি কলেজিয়েট হাই স্কুল রয়েছে। মাদরাসা রয়েছে ৪টি ও বালিকা বিদ্যালয় একটি, কলেজ একটি ও একটি কারিগরি কলেজ রয়েছে। কয়েকটি কওমি মাদরাসা রয়েছে। নারীদের জন্য পৃথক কোনো কলেজ নেই। একমাত্র কোম্পানীগঞ্জ থানা সদরে অবস্থিত বালিকা বিদ্যালয়টি ১৯৮৫ সালে প্রয়াত প্রের্সিডেন্ট এরশাদ কোম্পানীগঞ্জে আসলে বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন। উনার নির্দেশে জায়গা বরাদ্ধ ও বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ২৬ বছর পর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার প্রয়াত উপজেলা চেয়ারম্যান এম তৈয়বুর রহমান, তৎকালীন ইউএনও সাইফুল ইসলাম ২০১১ সালে স্কুলটির কার্যক্রম শুরু করেন। ৬ মাস যেতে না যেতেই অর্থাভাবে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। আবার ২০১৮ সালে পশ্চিম ইসলামপুর ইউপি চেয়ারম্যান ছোট ভাই শাহ জামাল উদ্দীন ও তৎকালীন ইউএনও আবুল লেইছের উদ্দ্যোগে স্কুলটি আবারও চালু করা হয়। আমিও এতে সহযোগিতা করি।
সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যন এম তৈয়বুর রহমান প্রয়াত প্রেসিডেন্ট এরশাদের কাছে জোর দাবি জানিয়ে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেরিতে হলেও তৈয়বুর ভাইর স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। বর্তমানে বালিকা বিদ্যালয়ে ১৯৪ জন ছাত্রী রয়েছে বলে জানান প্রধান শিক্ষক আমির হোসেন। তিনি জানান, এবার নবম শ্রেণি খোলা হয়েছে। ২০২১ সালে এই স্কুলের মেয়েরা এসএসসি পরীক্ষা দেবে। বিগত ৫ বছরের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিচে তুলে ধরলাম।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদিউজ্জামান ও অফিস সহকারি আবুল কালামের তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলো ৬৩২ জন, এরমধ্যে পাশ করেছে ৬০১ জন, পাশের হার ৯০ দশমিক ৬২ শতাংশ । জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩১ জন। ২০১৬ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিলো ৮৬০ জন, পাশ করেছে ৮৩৪ জন। পাশের হার ৯৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ জন। ২০১৭ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১০০৪ জন, পাশ করেছে ৯৪৫ জন। পাশের হার ৯৪ দশমিক ১২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ জন। ২০১৮ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১১০৮ জন। পাশ করেছে ৭৭১ জন। পাশের হার ৬৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ০২ জন। ২০১৯ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১২০৯ জন। পাশ করেছে ৬৫৪ জন। পাশের হার ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ২ জন।
২০১৫ সালে এইচএসসিতে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৩৫৭ জন। পাশ করেছে ৩৩০ জন। পাশের হার ৯২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন। ২০১৬ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৩৭২ জন। পাশের হার ৮৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ । তবে এ বছর কোন জিপিএ-৫ পায়নি কোন শিক্ষার্থী। ২০১৭ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৪৭৬ জন। পাশের হার ৫৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ জন। ২০১৮ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৬৩৭ জন। পাশ করেছে ২০৭ জন। পাশের হার ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ বছরও কোন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। ২০১৯ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৭৩০ জন। পাশ করেছে ৩৫৭ জন। পাশের হার ৪৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগেরবারের মতো এ সালেও উপজেলার কোন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি।
জানা গেছে, এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলে এবং মেয়ে প্রায় সমান সমান। কোন কোন সময় মেয়ে পরীক্ষার্থীদের সংখা ছেলেদের চেয়ে সামান্য বেশি থাকে। গত দুই বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট হতাশাজনক। তারপরও যে সমস্ত মেয়েরা এসএসসি এবং এইচএসসি পাশ করেছে। তাদের মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগ মেয়েরা ঝড়ে পড়ছে। ইচ্ছে থাকলেও তাদের আর উচ্চ শিক্ষা নেয়ার সুযোগ থাকেনা। কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, উপজেলায় কোন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ স্নাতক পর্যায়ে পড়াশুনার জন্য কলেজ না থাকায় অধিকাংশ মেয়েরা শহরে গিয়ে পড়তে পারেনা। কারণ তাদের পরিবারের সেই সামর্থ নেই। যাদের আছে, তাদের পরিবারও মেয়েদেরকে শহরে দিতে চান না। এছাড়াও আরেকটি বড় কারণ রয়েছে, মেয়েরা এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করার পর বিয়ে দেবার প্রবণতা অনেক পরিবারের মধ্যে রয়েছে। এই সমস্ত কারণে কোম্পানীগঞ্জের মেয়েরা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এ অবস্থার উন্নতি করতে হলে এলাকার লোকজনদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি এম সাইফুর রহমান কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স চালুসহ এলাকার সচেতন ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের উদ্দ্যোগে প্রতিটি ইউনিয়নে মহিলা কলেজ স্থাপন করতে হবে।
এখনো কোম্পানীগঞ্জের অনেক গ্রামে শিক্ষার আলো পৌঁছায় নি। এসব গ্রামের মানুষের মধ্যে নানা ধরনের কুসংস্কার রয়েছে। সামাজিক সচেতনার মাধ্যমে প্রচলিত কুসংস্কার দূর করে শিক্ষার আলো জ্বালাতে হবে। না হলে আমরা সারা জীবন শিক্ষার দিকে পিছিয়ে থাকবো। সচেতন মহল, অভিভাবক, শিক্ষিত জনগোষ্ঠি এগিয়ে না আসলে কোম্পানীগঞ্জের শিক্ষা ব্যবস্থা এভাবেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে। আমাদের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা একটা সম্ভাবনাময় উপজেলা। দেশের বৃহৎ পাথর কোয়ারি ভোলাগঞ্জ এই উপজেলায় অবস্থিত। এখানকার বালু-পাথর সারা বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া কোম্পানীগঞ্জে বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক নির্মাণ করছে। এই পার্কে প্রায় ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। একই সাথে কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন দর্শণীয় স্থানকে ঘিরে পুরো উপজেলায় রয়েছে দেশি-বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনা। এসব খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার নানা প্রকল্প গ্রহণ করছে। পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও এই উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এজন্য উপজেলাকে ঘিরে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প যেমন আমাদের আশান্বিত করছে, তেমন কোম্পানীগঞ্জের শিক্ষার সার্বিক অবস্থা আমাদের মর্মাহত করেছে।
আগামীর কোম্পানীগঞ্জকে ঢেলে সাজাতে দরকার দক্ষ জনবল। সেজন্য সর্বাগ্রে শিক্ষার প্রয়োজন। তাই শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই দেশের সাথে, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমার এলাকার ছেলে-মেয়েরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারবে। নিজেরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। আসুন আমরা সবাই মিলে কোম্পানীগঞ্জকে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের এগিয়ে নিয়ে যাই। অন্যথায় আগামীর প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT