উপ সম্পাদকীয়

ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৮-২০১৯ ইং ০০:২৬:০৯ | সংবাদটি ৭২ বার পঠিত

একটা গানের কথা খুবই মনে পড়ছে। আর সেটি হলো-‘ওরে বৃন্দাবনের নন্দ দুলাল রাখাল রাজা রে, রাখালিয়ার সুরে সুরে বাঁশি বাজাওরে।’ ওরে গোপাল তোর বিহনে ফুটে না ফুল বৃন্দাবনে .... গানটির পরের কলিগুলো আর মনে পড়ছে না। তবে ‘ওরে গোপাল তোর বিহনে ফুটে না ফুল বৃন্দাবনে’ কলিটি কি জানি কেন আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় এবং প্রাসঙ্গিক বলেই মনে হচ্ছে। আর সেটি হলো ‘বৃন্দাবন’ শব্দটি নিয়ে। হিন্দু ধর্মীয় দিক দিয়ে বিচার করলে ‘বৃন্দাবন’ স্থানটি খুবই পবিত্র এবং শ্রদ্ধা-ঋদ্ধ একটি শব্দও বটে। বৃন্দাবন একটি শান্তির স্থান। পরম শান্তি যেখানে বিরাজ করে সেখানেই বৃন্দাবন মনে হয়।
সে হিসেবে স্ত্রীপুত্রকন্যা পিতামাতা ভাইবোন সবাইকে নিয়ে দেশের যেসব পরিবারে অনাবিল শান্তি বিরাজ করে সে সমস্ত পরিবারকে কখনো কখনো মিনি-বৃন্দাবন বলেই মনে হয়। সেই সমস্ত পরিবারের সব সদস্য সমান আয় উপার্জন করেন না। কেউ বেশি কেউ কম। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় পরিবারের একজনই পরিবারটির মূল চালিকা শক্তি হয়ে দেখা দেয়। সেই ব্যক্তিটি বৃন্দাবন নামক পরিবারটির ‘গোপাল’ হয়ে আবির্ভুত হন। কখনো তিনি দেখাদেন মহাভারতের পার্থ তথা অর্জুন রূপে। আর যখন তার নাম হয় পার্থ গোপাল তখন তো গুরুশিষ্য এক হয়ে যায়। আর এর সাথে ‘বণিক’ শব্দটির সংযোজন হলে হয়ে যায় পার্থ গোপাল বণিক। কথায় বলে ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’। কিন্তু বর্তমানে দেশে বহুল আলোচিত আমাদের সেই পার্থ গোপাল বণিক তো কোন ব্যবসা বাণিজ্য করেন না! আমাদের মহামান্য হাইকোর্টের ভাষ্য মোতাবেক তিনি তো একজন রাষ্ট্রের চাকর। রাষ্ট্রের একজন চাকরকে নিয়ে দৈনিক সিলেটের ডাক ৩০.০৭.২০১৯ তারিখে শিরোনাম লিখে-‘সিলেটের ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ কারাগারে, ‘৮০ লাখ টাকার বেশির ভাগই মা-শাশুড়ি’র।’ খবরে আরো বলা হয় কারাগারে থাকা পার্থ গোপাল বণিকের আইনজীবীরা বলেন, টাকাগুলো নাকি অবৈধ উপায়ে অর্জন করা নয়। এর মধ্যে ৩০ লাখ টাকা তার আয়কর বিবরণীতে নগদ হিসেবে প্রদর্শিত। বাকি টাকা ফ্ল্যাট কেনার জন্য তার মা ও শাশুড়ি দিয়েছেন। গত বছর তিনি এক লাখ ৯ হাজার টাকা আয়কর দিয়েছেন। তিনি চাকুরীর পাশাপাশি ব্যবসাও করেন। মামলার শুনানীর সময় বিচারক কাঠগড়ায় থাকা আসামি পার্থ গোপাল বণিকের কাছে তার মূল বেতন কত জানতে চান। উত্তরে তিনি বলেন ৩০ হাজার টাকা।
প্রজাতন্ত্রের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এ প্রসঙ্গে তো আমরা বলতে পারি, কোন সরকারি চাকুরীজীবী তো চাকরির পাশাপাশি কোন প্রকার ব্যবসা করতে পারেন না। এটা অবৈধ। তাই এভাবে অর্জিত টাকাগুলোও স্বাভাবিকভাবেই অবৈধ হয়ে যায়। আর তার মা-শাশুড়িই বা এতো বড় ধনকুবের কিভাবে হলেন! এটাও তদন্তের দাবি রাখে। ৮০ লাখ টাকা উদ্ধারের পর পার্থ গোপাল বণিক নাকি বলেছেন, ৫০ লাখ টাকা নাকি তার ১৮ বছরের চাকরী জীবনের সঞ্চয়। যে ব্যক্তির মূল বেতন ৩০ হাজার টাকা তিনি পরিবারের সকল প্রকার খরচ চালিয়ে ১৮ বছর চাকরী করে ৫০ লাখ সঞ্চয় করতে পারেন এটাও আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে। হায় বাংলাদেশ, এজন্যই কি আমরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধ করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ডাকে পাক বাহিনীর গুলির আঘাতে জীবন ছিন্নভিন্ন করেছিল লাখ লাখ বঙ্গ সন্তান! ওরে গোপাল তুমি কি জানো সারা জীবনে বঙ্গবন্ধু কত লাখ সঞ্চয় করেছিলেন? এমন কথা বলতে কি তোমাদের বিন্দুমাত্র লজ্জা-ঘৃণা-ভয় হয় না?
পার্থ গোপাল বাবু আমার তো মনে হয় তোমার স্বাভাবিক চাকরী জীবনটাই তুমিসহ তোমার পরিবারের সবার জন্যই সুখের ছিল।
তোমার পরিবার নামক বৃন্দাবনে নানা ধরনের ফুল তুমি ফুটিয়ে ছিলে ভাই! আজ তুমি কারাগারে, আজ কি তোমার ফেলে আসা ‘বৃন্দাবনে’ ফুল ফুটবে? “ওরে গোপাল তোর বিহনে ফুটে না ফুল বৃন্দাবনে” গানের কলিটি কি আশ্চর্যজনক ভাবেই না তোমার জীবনের সাথে মিলে গেল! এমনটি কি আজ তোমার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? পরিবার নামক বৃন্দাবনের মায়া ছেড়ে তোমার মতো কতজনই আজ শ্রীঘরে (লালঘর) অবস্থান করছেন! ফুল ফুটছেনা তাদের ‘বৃন্দাবনে’! কি দরকার ছিলো এতো কিছুর! এটাতো অস্বীকার করার উপায় নাই যে অর্থ ছাড়া জীবন অচল কিন্তু তোমাদের ক্ষেত্রেই বোধ হয় ‘অর্থই অনর্থের মূল’ কথাটি প্রযোজ্য! বাংলাদেশের কোটি কোটি গরীব মানুষের কথা ভাবলে কেউতো এমন কুকর্ম করতে পারেনা! যারা এসব কাজ করে ‘বিবেক’ নামক শব্দটি তাদের মনের অভিধান থেকে হারিয়ে যায়। ঘুষ নামক বিষ না খেয়ে যাতে একজন সরকারী কর্মচারী স্ত্রী পুত্র কন্যা তথা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সৎভাবে জীবন যাপন করতে পারেন সেই উদ্দেশ্য নিয়েই হয়তো বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারী কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি করেছিলেন। কিন্তু অনেকেই বলেন এর ফল হয়েছে উল্টো। বেতন বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে ঘুষের পরিমাণও নাকি বেড়ে গেছে। আজকাল দুদকের পাতা জালে যারা ধরা পড়ছেন তাদের ঘুষের পরিমাণ তো শ’ হাজার নয় লাখ লাখ কোটি কোটি। এটা কি ঘুষ বৃদ্ধির প্রমাণ নয়! ঘুষ নামক বিষ পান করেও অনেককে হয়তো কারাগারে যেতে হয়নি কিন্তু একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে ঘুষ প্রদানকারী অসহায় মানুষের অভিশাপে ঘুষখোরদের পরিবারটিই একেকটি কারাগার! নরকের অশান্তিতে তারা দিন কাটায়। চুনোপুঁটি থেকে রাঘব বোয়াল সবাই এ পথের পথিক। এ প্রসঙ্গে দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন ‘দুদকের ৭০ ভাগ মামলার আসামি ‘চুনোপুটিরা’ তবে আশার কথা তিনি এটাও বলেন, “চুনোপুঁটিদেরও আমরা ধরব, বড় মাছও ধরব।” কথাটা কিন্তু কথার কথা নয়। আজকাল কিছু কিছু বড় মাছও ধরা পড়ছে। তবে এটা ঠিক যে, বড় বড় মাছ বেশি বেশি ধরা পড়লে চুনোপুঁটিরাও ভয় পাবে। দেখা যাক কি হয়।
কথা হচ্ছিল ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ গোপাল বণিক প্রসঙ্গে। সে তো পুলিশ বিভাগেরই একটি অংশ। পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা সম্পর্কে লন্ডনের একটি প্রচলিত ঘটনার কথা একজনের মুখে শুনেছি। সেখানে নাকি কোন এলাকায় কোন পুলিশ কর্মকর্তা বসবাস করলেও সেই এলাকার মানুষজন তা নিয়ে গর্ববোধ করেন। তথা এলাকাটির মর্যাদা বৃদ্ধি পায় সামাজিকভাবে। এমনটিই তো স্বাভাবিক। কোন দেশের সামাজিক নিরাপত্তা তথা নিরাপত্তা বিষয়ে জনগণের শেষ ভরসার স্থল তো পুলিশই। ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিকরা, ডিআইজি মিজান সাহেবদের মতো পুলিশ কর্মকর্তারা যে সমস্ত এলাকায় বসবাস করেন সে সমস্ত এলাকার মানুষজনওতো লন্ডনবাসীদের মতোই গর্ববোধ করতে চান। সে আশায় বুক বেঁধে আমরাও প্রতীক্ষায় রইলাম! হাতে নাতে ধরা পড়া গোপাল বা মিজান ভাইয়েরা তো এই সমাজের বাইরের কেউ নন। উনাদের পরিবারে শান্তির ফুল প্রতিদিন ফুটার কথা। তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম কিন্তু তাদের পরিবারের লোকজনের মানসিক অবস্থাটাতো সহজেই অনুমেয়। এমন সব গোপাল-মিজানেরা দলে দলে সামাজিক রাষ্ট্রীক সুনাম বিনষ্ট করেই চলছে। সত্যিকার অর্থে সরকারী কর্মচারীগণ জনগণের সেবক প্রভু নন। এটা মানতে অনেকেই অনীহা প্রকাশ করে থাকেন। তাইতো এ সত্য কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বলেন, “ভিআইপি” শুধু রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বাকীরা রাষ্ট্রের চাকর।” রামকৃষ্ণ মিশন বেলুর মঠের প্রেসিডেন্ট স্বামী বঙ্গনাথানন্দ এর একটি মন্তব্য এ প্রসঙ্গে খুবই প্রাসঙ্গিক মনে করছি। সেটি হলো-As an executive you are a citizen of India. Before appointment you were a citizen of India and after retirement you will be also a citizen of India. That means you are always a citizen of India and you are to serve the nation.


এ মন্তব্যটি তো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
শুরু করেছিলাম পার্থ গোপাল বণিক আর তার পরিবার নামক বৃন্দাবনে শান্তির ফুল ফুটানো প্রসঙ্গ নিয়ে। শুধু হতভাগ্য গোপালই নয় সবার উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলি-ভোগে নয় ত্যাগেই পরম শান্তি। ত্যাগই শান্তির ফুল ফুটায় সবার মনের বৃন্দাবনে।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT