ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৮-২০১৯ ইং ০০:২৭:৩০ | সংবাদটি ৯৯ বার পঠিত

নকশিকাঁথা শত বছরের পুরানো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা অংশ। কাঁথা শব্দটির কোনো উৎস, স্পষ্টভাবে বা সঠিকভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় কাঁথা শব্দটি পূর্বে উচ্চারিত হতো ‘খেতা বলে’। অন্যান্য লোক শিল্পের মতো কাঁথার উপর দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস আবহাওয়া পরিবেশ ও অর্থনৈতিক প্রভাব আছে।
সম্ভবতঃ প্রথম দিকে কাঁথা ছিলো জোড়াতালি দেওয়া কাপড়। পরবর্তীতে একটা থেকেই নকশিকাঁথার আবির্ভাব। নকশিকাঁথা সেলাইয়ের কোনো নির্দিষ্ট নকশা নেই। যিনি সেলাই করেন তার মনে যা আসে তাই তিনি সেলাই করে যান। সূর্য, চাঁদ, গাছ, পাখি, মাছ, ফল, মানুষ, ময়ূরসহ বিভিন্ন নকশা করা হয়। নকশিকাঁথায়। চলমান সেলাইয়ের কাঁথাই হলো মূল দেশীয় কাঁথা। এটিকে আবার নকশি ও পাড়তোলা দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
কাঁথা সাধারণত লেপের মতো মুড়ি দিয়ে ব্যবহার করা যায়। নকশিকাঁথার নকশাগুলোতে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে। বেশির ভাগ কাঁথার কেন্দ্র হলো পদ্ম ফুল এবং পদ্ম ফুলের আশে-পাশে নানা রকম আঁকা-বাঁকা লতার নকশা। কখনো কখনো শাড়ির পাড় দিয়ে সীমানা তৈরি করা হয়। বেশির ভাগ কাঁথার প্রাথমিক কিছু নকশা একই রকম হলেও দুইটি কাঁথা একই রকম হয় না। কাঁথা লোকশিল্প হিসাবে পরিচিত। কাঁথায় যদি নকশাদার কাজ থাকে তবে তাকে নকশিকাঁথা বলে। পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য নকশা কাজ করা বা না করা সব কাঁথাকেই কাঁথা বলে। যদিও ইদানিং নকশিকাঁথা শব্দের প্রচলন ঘটেছে।
সুজনীকাঁথা : এই কাঁথায় ঢেউ খেলানো ফুল ও লতাপাতার নকশা থাকে। কাঁথা বা খেতা সুজনী প্রধানত গ্রাম বাংলার (বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) হাতে সেলাইয়ের কাজ করা আচ্ছাদন বস্ত্র। এটি কম্বলের তুলনায় পাতলা। সাধারণতঃ একাধিক শাড়িতে পরত দিয়ে কাঁথা তৈরি করা হয়। ফলে কাঁথা হয় মোলায়েম। এ কারণে এ কাঁথা ছোট বাচ্চাদেরকে কাঁথায় জড়িয়ে রাখা হয়। এ কাঁথার ঢেউ খেলানো ফুল ও লতাপাতার নকশার প্রাধান্য থাকে।
লহরীকাঁথা : পারস্য শব্দ লহর থেকে লহরীকাঁথা নামের উদ্ভব। লহর মানে ঢেউ। রাজশাহী অঞ্চলে এই কাঁথা বিখ্যাত।
আনারসি : এ কাঁথা চাপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে পাওয়া যায়। এর প্রকারভেদ হলো আনারস টাইল, আনারস ঝুমকা ও আনারস লহরী।
বাঁকা সেলাই : এই কাঁথা সবার প্রথম তৈরি হয় ব্রিটিশ আমলে। সাধারণতঃ এই কাঁথা বাঁকা সেলাইয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। সাধারণতঃ কাঁথা কয়েক পাল্লা কাপড় কাঁথা ফোঁড়ে সেলাই করা হলেও এই ফোঁড় দেখার নৈপুণ্যের গুণে এতোই বিচিত্র বর্ণের নকশা বর্ণিল তরঙ্গঁ ও বরণভঙ্গির প্রকাশ ঘটে।
নকশার সাথে মানানোর জন্য বা নতুন নকশার জন্য কাঁথার ফোঁড় ছোট বা বড় করা হয়। অর্থাৎ, ফোঁড়ের দৈর্ঘ্য ছোট বড় করে বৈচিত্র্য আনা হয়। কাঁথা ফোঁড়ের বৈচিত্র্যর জন্য এর দুটি নাম পাটি বা চাটাই ফোঁড় এবং কাইত্যা ফোঁড়। বেশির ভাগ গ্রামের নারী এই শিল্পে দক্ষ। সাধারণতঃ গ্রামের মহিলারা তাদের অবসর সময় নকশিকাঁথা সেলাই করে থাকেন। এক একটি কাঁথা সেলাই করতে অনেক সময় এমনকি ১ বছরও সময় লেগে যায়। নতুন জামাইকে বা নাদ বউকে উপহার দেয়ার জন্য নানী-দাদীরা নকশিকাঁথা সেলাই করে থাকেন। এক একটি কাঁথা সেলাইয়ের পেছনে অনেক হাসি কান্নার কাহিনী থাকে। বিকেল বেলা রাতের খাবারের পর মহিলারা একসাথে গল্প করতে করতে এক একটি কাঁথা সেলাই করেন। তাই বলা হয় নকশিকাঁথা এক ধরণের মনের কথা বলে। এটি মূলত বর্ষাকালে সেলাই করা হয়। একটা প্রমান মাপের কাঁথা তৈরিতে ৫ থেকে ৭টা শাড়ি দরকার হয়।
আজকাল পুরানো সামগ্রীর বদলে সূতির কাপড় ব্যবহার করা হয়। তবে ইদানিং কাঁথা তৈরিতে পুরাতন কাপড়ের ব্যবহার কমে গেছে। কাঁথায় সাধারণতঃ মধ্যের অংশের নকশা আগে করা হয়। নকশা করার পূর্বে কোনো কিছু দিয়ে এঁকে নেওয়া হয়। তারপর সুই-সুতা দিলে ঐ আঁকা বরাবর সেলাই করা হয়। আগে কিছু কাঁথার নকশা আঁকানোর জন্য কাঠের ব্লক ব্যবহার করা হতো। এখন ট্রেসিং পেপার ব্যবহার করা হয়।
গ্রামাঞ্চলের নারীরা পাতলা কাপড় প্রধানতঃ পুরানো কাপড় স্তরে স্তরে সজ্জিত করে সেলাই করে কাঁথা তৈরি করে থাকেন। কাঁথা মিতব্যয়ীর একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে একাধিক পুরানো জিনিস একত্রিত করে নতুন একটি প্রয়োজনীয় কাঁথা তৈরি করা হয়। কাঁথা তৈরির কাজে পুরানো লুঙ্গি, শাড়ি, ধুতি ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়।
প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁথার পুরুত্ব কম বেশি হয়। পুরুত্ব অনুসারে তিন থেকে সাতটি শাড়ি স্তরে স্তরে সাজিয়ে নিয়ে স্তরগুলোকে সেলাইয়ের মাধ্যমে জুড়ে দিয়ে কাঁথা তৈরি করা হয়। বিভিন্ন রং এর পুরানো কাপড় স্তরীভূত করা থাকে বলে কাঁথাগুলো দেখতে বাহারি রং এর হয়। সাধারণ শাড়ির রঙিন পাড় থেকে তোলা সূতা দিয়ে কাঁথা সেলাই করা হয় এবং শাড়ির পাড়ের অনুকরণে কাঁথাতে নকশা করা হয়।
তবে কোন কোন অঞ্চলে (প্রধানত: চাপাই-নবাবগঞ্জ) এলাকার কাপড় বুনার সুতা দিয়ে ও কাঁথাতে নকশা করা হয়ে থাকে। উনিশ শতকের কিছু কাঁথার, কাঁথা ফোঁড়ের উদ্ভাবনী প্রয়োগকে কুশলতার সাথে ব্যবহার করার ফলে উজ্জল চিত্রযুক্ত নকশা দেখা যায়।
২০০৮ সালে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ রাজ্যে নকশিকাঁথার ভৌগলিক স্বীকৃতি পায়। কাঁথার ব্যবহার বহুবিদ। বিছানা হিসেবে এবং অল্প শীতে গায়ে দেবার চাদর হিসেবে কাঁথার ব্যবহার সর্বাধিক। এছাড়াও নবজাতক ও ছোট শিশুদেরকে শুইয়ে রাখার জন্য এবং তাদের শরীর পেঁচিয়ে বা জড়িয়ে রাখার জন্য নরম কাপড়ের তৈরি কাঁথা ব্যবহার করা হয়।
নকশিকাঁথা : সাধারণতঃ বিশেষ উপলক্ষে ব্যবহৃত। এই কাঁথাগুলোর নকশা নৈপুণ্যের সাথে কুশলী হাতে করা হয় এবং পুরুষানুক্রমিকভাবে এই খাতা সংরক্ষণ করা হয়। কবি জসিম উদ্দিনের কাব্যগ্রন্থ নকশিকাঁথার মাঠ (প্রথম প্রকাশ ১৯২৯) থেকে বাংলাদেশে এই নামকরণ হয়েছে।
তাই বাংলার প্রবাদে গল্প, গানে কিংবা কবিতায় অমর হয়ে আছে নকশিকাঁথা। নকশিকাঁথা চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার অন্যতম ঐতিহ্য।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আজিজপুর
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায়
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • Developed by: Sparkle IT