ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৮-২০১৯ ইং ০০:২৯:১৩ | সংবাদটি ২৬৭ বার পঠিত

ইংরেজ কর্তৃক অবাধে বাণিজ্য সূত্র ধরে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের গোড়াপত্তন ও বিস্তারের পিছনে আরো একটি কাহিনী রয়েছে। স¤্রাট আওরঙ্গজেব এর সহধোরা জাহানারা ছিলেন একজন কবি ও চিরকুমারী। যাকে আওরঙ্গজেব অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। একদিন জাহানারার খাস বাদীর বসনে হঠাৎ আগুন লেগে যায়। সেই আগুন নেভাতে গিয়ে শাহাজাদি জাহানারা স্বয়ং মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হন। রাজ্যের সকল হেকিমদের প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থতার পর্যভূষিত হলো স¤্রাট তখন বিচলিত হয়ে পড়েন। তখন চিকিৎসা সেবায় এগিয়ে আসেন গ্যাব্রিয়েল বাউটন নামে এক ইংরেজ চিকিৎসক। তার চিকিৎসায় জাহানারা আরোগ্য লাভ করেন। অতঃপর জাহানারার অনুরোধে গ্যাব্রিয়েল বাউটনকে তিনি যা চাইবেন তা দিতে চাইলেন। ইংরেজ বাউটন নিজের জন্য কিছু না চেয়ে চাইলেন কলকাতার দক্ষিণে বালাশুরে ইংরেজদের কুটির নির্মাণার্থে একখন্ড জমি ও বিনা শুল্কে জমির অধিকার। বাউটনের প্রার্থনা মঞ্জুর করা হলে এবং সেই সাথে গোড়াপত্তন হলো ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবিস্তার।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বৃহস্পতিবার বাঙালির ইতিহাসে একটি চিরস্মরণীয় দুঃখের দিন। ঐ দিন পলাশীর যুদ্ধে সীপাহসালার মীর জাফরের বেঈমানী ও বিশ্বাসঘাতকতায় নবাবের পরাজয় পতন ও শাহাদাত বরণে ্ উপমহাদেশীয় সমাজ, রাজনীতি ও ব্যক্তি জীবনে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। ইংরেজ বণিকের মানদন্ডে দেখা দিল রাজদন্ড রূপে পোহালে শরবরি। কোম্পানির কেরানী লর্ড ক্লাইভ হলো কর্নেল লর্ড অতঃপর ভারতশাসক। অপর দিকে বেঈমান মীর জাফরের নতুন নামকরণ হয় সুজাউল মুলুক। হিসাম-উদ্দৌলা মীর মুহাম্মদ জাফর আলী খাঁ মুহাম্মদ জৎক্রমশ ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ১৯০ বছর দেশ ভাগের কাজটা সদ্য গৃহিত বা একটি পুরোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রশাসনিক রূপায়ন ছিলো না। দুর্ভাগ্যতাড়িত ১৯৪৭ সাল এসে পৌঁছালো ভারতের রাজনীতি আকাশে দুই সম্প্রদায়। দুই প্রধান রাজনীতির সংগঠন ১. মুসলিম লীগ, ২. কংগ্রেস। উভয়ই পরস্পর বিরোধীতা এবং উভয়ই আক্রমণাত্মক কালোমেঘে আচ্ছন্ন।
রমেশচন্দ্র মজুমদার স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম বইতে লিখেছেন দলের নেতাদের কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে মাউন্ড ব্যাটান নিশ্চিত হলেন যে ক্যাভিনেট মিশন প্রধানের উপর ভিত্তি করে কোনো সর্বগ্রাহ্য সমাধানে পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনা নাই এবং সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভারত ভাগ অবসম্ভাবী। এই পটভূমিকায় ৩ জুন, ১৯৪৭ ভারত ভাগ ঘোষণা করল। এই পেন্ডেরেল মুন বলেন, পাকিস্তান একটা পোকায় কাটাদেরি নিশ্চিত সত্য হয়ে ওঠলো। তিনি আরো জুড়ে দেন। এতে জিন্নাহ অল্পতেই পরিতৃপ্তি হলো। পাকিস্তান জন্ম নিল ১৪ আগস্ট, ভারত জন্ম নিলা ১৫ আগস্ট।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানীদের বাঙালি জাতির উপর আধিপত্য করার ফলেই সৃষ্টি হলো নতুন করে উত্তেজনা। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ মুসলিম জাতির দুই ভাষাভাষির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করলো। ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের সাথে বাঙালি জাতির মুক্তি অন্যকথায় স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন মাত্রায় যাত্রা লাভ করে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ ছিলো বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের চুড়ান্ত অধ্যায়। পাকিস্তান শাসন পর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির জাতির মুক্তি বা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংলাপ এগিয়ে চললো। সেদিন বঙ্গবন্ধুর মতো বিচক্ষণ সাহসী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতা নিজের জীবন তুচ্ছ করে নেতৃত্ব না দিতেন তাহলে আজও আমরা পাক শাষকগোষ্ঠীর জাতাকালে পিষ্ঠ হতাম। আর এই অধ্যায়ের মহানায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাকে জাতি বিন¤্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করে।
১৫ আগস্ট আমাদের জাতিয় জীবনের এক শোকাবহ দিন। ১৫ আগস্টের ঘটনা বেদনার ও আত্মসমালোচনার। বেদনার কারণ হলো এ দিনে স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা। আর আত্মসমালোচনা হলো এই হত্যাকান্ডের নেতিবাচক প্রভাব সুদূর প্রসারি হলেও সেদিন অনেকেই উপলব্ধি করতে ব্যথ হয়েছিলেন। যারা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অনুসারী ছিলেন তাদের অনেকেই নিজেদের আত্মরক্ষার্থে মীর জাফরের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। আর বিরোধীরা কতিপয় অবাধ্য সামরিক জুনিয়র সেনা অফিসারের রক্তমাখা হাতে বঙ্গবন্ধুর রক্ত দেখে দারুণ হর্ষৎফুল্ল হয়েছিলেন। আবার বর্ণচোরারা বলে বেড়ান একদলীয় শাসনই ১৫ আগস্টের জন্ম দিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৫ আগস্টের রক্তপাত দেশের গণতন্ত্র সুশাসন কিছুই দিতে পারেনি। ১৫ আগস্টের কুশীলবরা স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্যে প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্যে ছিলো বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া। কুশীলবরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেও তার সরকারের সদস্যদেরকে নিয়ে নতুন সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধু সেনা, বেসামরিক প্রশাসন বহাল রাখেন। ১৫ আগস্টের ঘটনা আমাদের রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীদের একাংশের সুবিধাবাদিতা ও আদর্শহীনতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বাংলা ও বাঙালির সমাজে বিশ্বাসঘাতকতার আরেক নাম মীর জাফর। মীর জাফর এবং বিশ্বাসঘাতক সমার্থক। বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে লিখেছেন আমাদের বাঙালিদের মধ্যে দু’টি দিক আছে। একটি হলো আমরা মুসলমান আরেকটি হলো আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোনো ভাষায়ই পাওয়া যাবে না পরশ্রীকাতরতা পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয় তাকে পরশ্রীকাতরতা বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন। সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে। কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এজন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা সুফলা আমাদের সম্পদে ভরপুর এমন উর্বর জমি দুনিয়ার খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজেদের দোষে। নিজেদের এরা কেউ চেনে না। আর যতোদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততোদিন এদের মুক্তি আসবে না।
পরিশেষে বলবো স্বাধীন বাংলার মানবতার একই আওয়াজ আর নয় মীর জাফর। আর নয় মীর জাফরী, আর নয় পলাশীর।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • সিলেটে আরবি ভাষাচর্চা
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা
  • Developed by: Sparkle IT