উপ সম্পাদকীয়

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা

ড. ফোরকানউদ্দিন আহাম্মদ প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩০:৫২ | সংবাদটি ৪৬ বার পঠিত

একটি সভ্য ও বিকাশমান রাষ্ট্রে নিঃসন্দেহে পরিবহন খাত এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পৃথিবীর উন্নত ও ধনী দেশগুলোর দিকে তাকালে তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবহন খাতকে অবহেলিত করে রাখার অর্থ হচ্ছে একটি রাষ্ট্র ও জাতিকে গোটা বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। অবহেলিত ও অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে একটি জাতি ক্রমশ অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়ে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা একে অপরের পরিপূরক। একটির পূর্ণতায় অপরটি পরিপূর্ণতা লাভ করে। একটির অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে অন্যটির অকার্যকর হয়ে পড়ে। অপরদিকে সুন্দর যাতায়াত ও চলাচল রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে। যাত্রীদের সেবা প্রদান ও কল্যাণ নিশ্চিত করা একটি রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব এবং তা মানবিকও বটে।
সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটি চার স্তরে পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ তুলে ধরে একটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে। আশু, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা স্থান পেয়েছে এই প্রতিবেদনে। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে ‘সড়ক নিরাপত্তা’ কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ঐ খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। ২০২৪ সালের মধ্যে সবকিছু বাস্তবায়নের সময়সীমা উল্লেখ করে ১১১ দফা সুপারিশসহ এই প্রতিবেদন সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছে। তবে খসড়া চূড়ান্ত করার আগে কিছু পরিবর্তন আনারও ইঙ্গিত দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। অন্যদিকে প্রায় ১৯ লাখ অবৈধ চালকের বৈধতা দেয়ার সুপারিশ থাকছে সুপারিশে। সেই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তুলতে দেশব্যাপী কর্মসূচিও নেয়ার কথা জানিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।
এ কথা দিবালোকের মতো সত্য যে, পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছিলাম, শুধু সরকারি দলের সমর্থনপুষ্ট পরিবহন সংগঠনগুলোই চাঁদাবাজি করত। বর্তমানে এই সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরাও। ব্যাপক চাঁদাবাজির কারণে মালিক পক্ষের পাশাপাশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদেরও। দেখা গেছে, চাঁদাবাজির টাকা পুষিয়ে নিতে কন্ডাক্টররা নির্দিষ্ট ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া চার্জ করছে। এই নৈরাজ্য দিনের পর দিন চলতে পারে না। প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার কি সংঘবদ্ধ শক্তিকে ভয় পাচ্ছে? যদি তা না হয়, তাহলে পরিবহন চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেন? কী হতাশার কথা, দুর্ঘটনায় মৃত্যুসহ সব ধরনের অপরাধ থেকে দায়মুক্ত থাকছে পরিবহন খাতের শ্রমিক ও চাঁদাবাজরা! এই খাতকে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনা একটি অতীব জরুরি কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকার তথা সংশ্লিষ্ট সবার। এছাড়াও ট্রাফিক বিভাগের কার্যক্রম জবাবদিহিতার আওতায় আনা, চালকের হাতে দৈনিক জমাভিক্তিক বাস ইজারা দেয়া বন্ধ করা, বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা জনবান্ধব করা, আদালত পরিচালনার মাধ্যমে পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি বন্ধে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে, ট্রাফিক পুলিশের মামলার জরিমানা সরাসরি ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিধান নিশ্চিত করতে হবে, সড়কে চাঁদাবাজি, টোকেন বাণিজ্য, দখলবাজি, হকার ও অন্যান্যদের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, রুটপারমিট ইস্যু প্রক্রিয়ায় ঢাকা মেট্রো আরটিসিতে মালিক শ্রমিক নেতাদের পরিবর্তে পেশাদার ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোকজন নিয়ে পুনর্গঠন করতে হবে, ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি বন্ধে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে, পরিবহনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যাত্রী সাধারণের অভাব অভিযোগ তুলে ধরা ও মত প্রকাশের স্বার্থে যাত্রী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশিক্ষিত লোক দিয়ে দক্ষ চালক তৈরির জন্য দেশের সব জেলায় মানসম্মত ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে বলছে কমিটি। খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাফিক পুলিশকে সড়ক নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও দুর্ঘটনার তদন্ত ও ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিয়েও বেশকিছু সুপারিশ রয়েছে কমিটির খসড়া প্রতিবেদনে। নির্মাণের সময় সড়ক নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে কি না তা বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। কিছু কিছু রাস্তার সংযোগস্থল উঁচু করা এবং নতুন মহাসড়ক নির্মাণের সময় সার্ভিস রোডের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর ট্রমা সেন্টার ও ফায়ার স্টেশন স্থাপন করতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়কে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের জন্য সিসিটিভি বা স্পিড রাডারগান বা গাড়ির গতি ও ছবি সংরক্ষণ উপযোগী যন্ত্র স্থাপন করতে হবে। চলন্ত অবস্থায় চালকের মোবাইলে কথা বলা বা হেডফোনে গানশোনা বন্ধে কঠোর হতে হবে। গণপরিবহনের নির্ধারিত জায়গায় চালক ও হেলপারের ছবি, লাইসেন্স নম্বর ও ফোন নম্বর দেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকে প্রতি পাঁচ ঘণ্টা পর চালকদের বিশ্রাম এবং ৮ ঘণ্টা পর একজন বিকল্প চালকের ব্যবস্থা করতে হবে। দৈনিকভিত্তিতে চালক নিয়োগ না দিয়ে চালকদের সুনির্দিষ্ট মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ এসেছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, প্রয়োজনে চালকদের জন্য নির্ধারিত পোশাকের ব্যবস্থা করার কথা ভাবতে হবে।
নারী গাড়ি চালক ‘অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকি নেয়’- এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে এ পেশায় তাদের আলাদা সুযোগ দেওয়া, চাকরিতে নারী চালকদের অগ্রাধিকার দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে। পথচারীদের বেপরোয়া মানসিকতার কারণেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই দেশের সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিয়েও বেশকিছু সুপারিশ রয়েছে কমিটির খসড়া প্রতিবেদনে। শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করা, যেসব জায়গায় ফুটপাত নেই সেখানে ফুটপাত নির্মাণ, স্কুল-কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সামনে উঁচু করে জেব্রাক্রসিং নির্মাণ এবং সড়ক বিভাজকে পথচারীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে সেখানে। কমিটির খসড়া প্রতিবেদনের প্রথম সুপারিশটি জনসচেতনতা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর। তাতে বলা হয়েছে, সচেতনতা বাড়াতে সড়কে আচরণবিধি ও সচেতনতামূলক নাটিকা গণমাধ্যমে বিনামূল্যে প্রচার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এগুলো দিতে হবে বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড এবং বাসের টিকিটেও। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ট্রাফিক আইন ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে ধারণা দিতে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, দেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য সকল সংস্থা, পরিবহন মালিক, শ্রমিক সমিতি এবং সকল সরকারি-বেসরকারি সংগঠনের নিয়োজিত সকলকে দেশপ্রেম ও সেবার ব্রত নিয়ে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে একযোগে কাজ করতে হবে। প্রস্তাবিত সুপারিশমালায় বাস্তবায়নের যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে সময়সীমার মধ্যে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় দেশ পিছিয়ে যাবে। আসুন আমরা সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের আলোকে এবং সরকারের পরিকল্পিত উন্নয়নের অভিযাত্রায় অংশগ্রহণ করে পরিবহন খাতসহ সকল খাতে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হই।
লেখক : গবেষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT