উপ সম্পাদকীয় দৃষ্টিপাত

বেদে সম্প্রদায়

খোরশেদ মাহমুদ প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩২:১৮ | সংবাদটি ১০৪ বার পঠিত

‘এই সিঙ্গা লাগাই, দাঁতের পোক ফালাই, খা খা খা বখখিলারে খা! কাঁচা ধইরা খা’- এই হাঁকডাকগুলো আজ আর শোনা যায় না। আধুনিকায়নের এই যুগে আগের মতো এখন আর বেদে সম্প্রদায়ের লোকদের চোখে পড়ে না। কালের গহ্বরে যেনো হারিয়ে যেতে বসেছে চিরচেনা গ্রামীণ জনপদের এই সম্প্রদায়গুলো।
বিজ্ঞানের উন্নতিতে গ্রাম কিংবা শহর সব স্থানেই এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। টিভি, কম্পিউটার আর সেলফোনেই যেন বিনোদনের প্রধান মাধ্যমে হয়ে পড়েছে। বেদের হাঁকডাক বানর আর সাপ খেলায় মানুষ এখন আর আকৃষ্ট হয় না। বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে চিন্তার ও বিনোদনের ও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার এই যুগে কেমন আছে ঠিকানা আশ্রয়বিহীন জীবনে এই যাযাবর বেদে ও মানতা সম্প্রদায়রা। নিজ ভূখন্ডে বাস করেও পরবাসী যেন এরা।
নৌকার বহর নিয়ে নদী থেকে নদীতে বয়ে চলে এ সম্প্রদায়। তাদের হাজার বছরের বংশ পরম্পরার পেশা বাদ দিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে ভিন্ন পথ অবলম্বন করতে হচ্ছে তাদের। গুটিকয়েক যারা এ পেশাকে আগলে রেখেছে তাদের জীবন চলছে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে। এদের রাজ্য নেই, আছে জলে ভাসা নৌকার বহর এই বহরই এদের রাজ্য। এই বহরের প্রধান হলো সরদার আর এই সরদারই হলো রাজা। এই রাজাই নিয়ন্ত্রণ করেন বেদের এই বহরকে। সবাই এই বহরকে রাজ্যসম সম্মানে রাখেন।
জলে ভাসা জীবনেও তাদের আছে বেশ জোরালো নিয়মকানুন, তা মেনেই সবাইকে চলতে হয়। বেদে সম্প্রদায়ের সর্দার এদের রাজা। তার নিয়ন্ত্রণে চলতে হয় বহরের সবাইকে। সর্দাররা বংশক্রমেই সর্দার হয়। সর্দারের পরিবারের বড় ছেলেই পরবর্তী সর্দার বা রাজা হয়ে থাকেন। সর্দারের দৃষ্টিতে অপরাধ করলে বেদে সমাজে জুতাপেটা, অর্থদন্ডসহ নানা ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে।
এই সম্প্রদায়ের মেয়েরাই প্রধানত আয়-রোজগার করেন। পুরুষরা সারাদিন বাচ্চাদের দেখাশুনা ও ঘরের কাজ করে থাকেন। কেউ কেউ পুকুর-ডোবায় তলিয়ে যাওয়া সোনা-রুপা তুলে দেয়ার কাজ করেন। কেউবা বিভিন্ন রোগের ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-কবজসহ বিক্রি করছেন শাড়ি-চুড়িসহ প্রসাধনীও। কেউ কেউ ভানুমতি খেলা ও জাদুমন্ত্র নিয়ে হাজির হচ্ছেন মানুষের দুয়ারে। বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে অনেক উপ-সম্প্রদায়। যেমন- মীশ্চিয়ারি, গাড়লীমালবৈদ্য, বাজিকর, হাতলেহেঙ্গা, শালদার, বান্দরওয়ালা, কুড়িন্দা, সওদাগার ইত্যাদি।
বেদেদের ব্যবসার মৌসুম শেষ হলে বেদে পরিবারে বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিয়েতেই তারা সবচেয়ে বেশি আনন্দ করে থাকে। বেদের বিয়েতেও আছে বেশ ভিন্নতা। পূর্বনির্ধারিত করা গাছের মগডালে অথবা ঘরের চালে বসে বর, তারপর নেয় মৃত্যুঝুঁকি। কনে গাছের নিচে এসে বরকে নামানোর জন্য কাকুতি-মিনতি করেন। কনে বরকে আজীবন আয়-রোজগার করে খাওয়াবে বলে একের পর এক প্রতিশ্রুতি ও প্রলোভন দেন। তখন বর গাছ বা চাল থেকে নেমে আসেন। আর এভাবেই বিয়ে সম্পন্ন হয়।
এদের জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে নেই কোন ধারণা। তাই প্রত্যেকের গড়ে ৭-৮টি সন্তান রয়েছে। অন্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান কোন ধরনের মৌলিক চাহিদার সুযোগ সুবিধা তারা পায় না। সাহায্য-সহায়তায় নেই সরকারি-বেসরকারী উদ্যোগ। এরা সব ধরনের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। দেশ, সমাজ, সভ্যতার অনেক কিছুই জানা নেই তাদের। অর্থনীতি, রাজনীতির খবরও নেই তাদের কাছে। ভোটের রাজনীতি, ভোটাধিকার, কে জিতল আর কে হারল- সে খবর তারা রাখে না। ভূখন্ডের শত শত বছরের পুরনো বাসিন্দা হলেও এদের নেই কোন প্রকার নাগরিক অধিকার।
কচুরিপানার মতোই নদীর পানিতে ভেসে বেড়ায়। এ সম্প্রদায়ে নাম স্বাক্ষর করতে পারে- এ ধরনের মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে। শিশুদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এবং ভূমি সমস্যায় এ সম্প্রদায়ের মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করে থাকে।
এ সম্প্রদায়ের কারও মৃত্যু হলে কলাগাছের ভেলায় লাশ ভাসিয়ে দেয়া হতো। আর বর্তমানে এর পরিবর্তন এনে নদীর পাড়ে বা কোন ভূস্বামীর দানকৃত পরিত্যক্ত ভূমিতে ঠাঁই মিলে যাযাবর লাশটির। তারপর আবারও নৌকা নিয়ে ছুটে চলা। নদীর মাঝে ঢেউয়ের বুক চিরে অজানা অনিশ্চিত ও দুর্বিষহ জীবনের দিকে- উজান কিংবা ভাটির দেশে। এ চলা যেন সহ¯্র বছর ধরে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT