উপ সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার

নজরুল ইসলাম বাসন প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩৪:০১ | সংবাদটি ১২৬ বার পঠিত

অটিজম, অটিস্টিক, লার্নিং ডিফিকাল্টিজ বা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এসব শব্দের সাথে তিন সাড়ে তিন দশক আগে আমরা পরিচিত ছিলাম না, তখনও আমাদের সমাজে লার্নিং ডিফিকাল্টিজ সম্পন্ন বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক লোকজন ছিলেন, যেমন বর্তমানে ডিমেনশিয়া আক্রান্ত লোক আছেন। এইসব সমস্যাক্রান্ত লোকদের ডায়াগনোসিস সময় মত হত কি না এ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে আর এ কারণে আমাদের সমাজে লার্নিং ডিফিকাল্টিজ সম্পন্ন লোকদের সেবা পাওয়া ছিল দুস্কর। বর্তমানে টাওয়ার হ্যামলেটসে আপাসেন এবং ফিনিক্স স্কুল ছাড়াও স্পেশিয়েল নিডস স্কুল ও বয়স্কদের জন্যে ডে কেয়ার সেন্টার থেকে সার্ভিস পাওয়া যাচ্ছে। এই দুটি সংগঠন তাদের সেবার পরিধি বিস্তৃত করে বেশ কয়েক বছর ধরে ঢাকা ও সিলেটে ব্রাকের সাথে কাজ করে আসছে। আপাসেন লন্ডনে ডে কেয়ার সেন্টার ছাড়াও সব বয়সের শারীরিক অক্ষমতা সম্পন্ন লোকদের কেয়ারার সার্ভিস প্রদান করে। লন্ডনের ফিনিক্স স্কুল অটিস্টিক বাচ্চাদের শিক্ষা গ্রহণে একটি আধুনিক স্কুল।
বৃটেন বা উন্নত দেশ সমূহে অটিজমকে মোকাবেলা করা হচ্ছে বেশ আগে থেকেই তবে বাংলাদেশ এখনও এটিকে বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসাবে মোকাবেলা করছে, এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সুচনা ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা: প্রান গোপাল দত্তের উক্তি প্রণিধানযোগ্য, তিনি সংবাদপত্রে লেখা এক কলামে বলেছেন, “১৯৭০ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত আমার মেডিকেল কলেজে অধ্যয়ন কালে আমার মনে পড়েনা আমি অটিজম সম্পর্কে পড়েছি। যে টুকু পড়েছি তা ডাউন সিনড্রোম সম্পর্কে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত আমি মেডিকেল কলেজে নাক গলা বিভাগে কাজ করার সময়ও অটিজম এর সাথে বলতে গেলে পরিচয় হয়নি। এরপর তিনি যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে ডক্টরেট করতে যান তখন ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত তিনজন অটিস্টিক লোকের সাথে তার দেখা হয়। এই তিনজনই ছিলেন ভিন্ন ধরনের অটিস্টিক লোক। সেই থেকে তার অটিস্টিক লোকদের সাথে পরিচয়। এই ছিল দেশের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসকের অটিজম জগতে প্রবেশ। তার ভাষায় গত কয়েক বছর ধরে সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তনয়া সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নেতৃত্বে সুচনা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশে অটিজম নিয়ে যুগান্তকারি কাজ হচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে গড়ে উঠেছে প্রয়াস নামের বিশেষায়িত স্কুল। এর ধারাবাহিকতায় সিলেট শহরের আম্বরখানার চন্দনটোলায় গড়ে উঠছে ল-নের আপাসেন ও ফিনিক্স স্কুলের যৌথ উদ্যোগে স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার।
লন্ডনে আমার সাংবাদিকতার শুরু ইস্ট লন্ডনে সাপ্তাহিক সুরমার মাধ্যমে , এক দশক আমি সুরমায় কাজ করার সুবাদে দু’টি সংগঠনের সাথে পরিচিত হই। এর মধ্যে একটি এশিয়ান প্যারেন্টস স্পেশিয়েল নিডস এডুকেশন (আপাসেন) ও অন্যটি ফিনিক্স স্কুল। এই দুটি সংগঠনই শারীরিক অক্ষমতা সম্পন্ন, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে। আপাসেন এর সিইও হচ্ছেন মাহমুদ হাসান এমবিই এবং ফিনিক্স স্কুলের হেড টিচার হচ্ছেন স্টুয়ার্ট হ্যারিস ও ডেপুটি হেড টিচার ভ্যারোনিকা। সংগঠন দুটির পার্টনারশীপের মাধ্যমে বাংলাদেশের সিলেট শহরে ফিনিক্স স্কুল এবং আপাসেন এর ডে সেন্টার কাজ শুরু করেছে। সিলেটের মত একটি বিভাগীয় শহরে দেরীতে হলেও এ ধরনের দুটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে কাজ করার সুবাদের এই দুটি সংগঠন সিলেটে প্রশিক্ষণ ও সেবা প্রদানে এক নতুন ধারার সুচনা করতে পারবে। এই কেন্দ্রে বয়স্কদের জন্যে ফিজিও থেরাপি, টিচার্স ট্রেনিং, ইংরেজী ভাষা শিক্ষা দেয়া হবে। এ ছাড়াও থাকবে বিশেষায়িত আইটি ট্রেনিং। এই দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যারা সেবা প্রদান করবেন তারাও লাভবান হবে এবং যারা সেবা গ্রহণ করবেন তারাও লাভবান হবেন। বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন জেনারেশনকে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হলে তাদেরকে ইংরেজি ভাষা ও আইটিতে অবশ্যই দক্ষতা অর্জন করতে হবে, দক্ষতা অর্জন করতে হবে বিজ্ঞান ও অংকে।
শুধুমাত্র সরকারের উপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। আঞ্চলিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে প্রসংগত উল্লেখ করা যায় সিলেটে সুবিধা বঞ্চিত তরুণ তরুণীদের উদ্যোগে এবং এনআরবি উদ্যোক্তার অর্থায়নে খাদিম নগরের দলই পাড়ায় টিনশেডে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র একটি আইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় কবির উদ্দিন নামের এক তরুণ এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। ২৫০ জন ছাত্র ছাত্রীকে এক সেশনে কম্পিউটার শিক্ষা দেয়া হয়। ফ্রি ল্যান্সার, এ্যাপ ডেভেলপার, প্রোগ্রামার, গ্রাফিক ডিজাইনার কোর্স করানো হয়। এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা লাভ করে দু’জন ট্রেইনার সিলেটের হেতিমগঞ্জে আহমদ নারী শিক্ষা কলেজে ক্যাফে বিডি একটি ল্যাব পরিচালনা করছে, হাউজিং এস্টেটে তারা আরেকটি সেন্টার করেছে। এই সংগঠন অটিস্টিক শিশুদের জন্যে বাংলায় এ্যাপস বানিয়েছে। অটিস্টিক শিশু ও তাদের অভিভাবক শিক্ষকরা এই এ্যাপস ব্যাবহার করতে পারবেন। ফিনিক্স স্কুলেও তারা আইটি সাপোর্ট প্রদান করবে।
কয়েক দশক ধরে সিলেটী ছেলে মেয়েদের একটি বদনাম হয়ে গেছে তারা লেখাপড়া করে না, কথাটা কতটুকু সত্য মিথ্যা সে বিচারে না গিয়ে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় ল-ন থেকে সিলেটে গিয়ে সহজ ভাবে কোন কিছু করা প্রায় অসম্ভব, তারপরও ক্যাফে বিডি, আপাসেন, ফিনিক্সের মত ল-নের প্রতিষ্ঠান স্রেফ চ্যারিটির জন্যে বাংলাদেশে যাচ্ছে। তাদেরকে ডিস্টার্ব না করে সহযোগিতা করলে দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরাই লাভবান হবেন। আপাসেন এবং ফিনিক্স স্কুলের মাধ্যমে সিলেটে যে মডেল প্রতিষ্ঠিত হবে এই মডেলের বিশেষত্ব হবে অটিস্টিক শিশুদের সমাজে অন্যান্য শিশুদের মত বড় করে তোলা, সমাজে তারা বোঝা নয় বরং অটিস্টিক শিশুরাও স্বাভাবিক শিশুদের মত বড় হয়ে তাদের সুপ্ত প্রতিভাকে কাজে লাগাতে পারবে এটা প্রমাণ করা। বাংলাদেশে সূচনা ফাউন্ডেশন এবং প্রয়াস স্কুলের মত প্রতিষ্ঠানের মত সাথে পার্টনারশীপের মাধ্যমে অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্যে লাইব্রেরী ও রির্সোস সেন্টার গড়ে তোলা হলে প্রশিক্ষিত অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্যে কর্মসৃষ্টি করা হবে। তাদেরকে চিত্রাংকন, সংগীত ও নৃত্যে পারদর্শী করে তুলতে হবে। সমাজে একজন অটিস্টিক শিশুর অধিকারকে নিশ্চিত করতে হলে তার জন্যে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এসব কাজ করতে গেলে বাধা প্রতিবন্ধকতা আসবে। তবে লক্ষ্য যখন সমাজসেবা তখন এসব প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করাও সম্ভব।
লেখক : সাবেক মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন্স অফিসার টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল, ল-ন।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT