উপ সম্পাদকীয়

বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত

অ্যাডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৮-২০১৯ ইং ০১:১০:৪৫ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

ভবিষ্যতে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে-তা বিবেচনায় না নিয়েই নরেন্দ্র মোদীর সরকার সম্পূর্ণ একতরফাভাবে বিতর্কিত এবং রাজনৈতিক সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলের একমাত্র মুসলিম জনসংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের বর্তমান ভৌগোলিক অখন্ডতাকে দ্বিখন্ডিতকরণ করার এবং ওখানকার ৭০ বছর ধরে চলে আসা স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার করার পদক্ষেপটি ভারতের এবং সাথে কাশ্মীরের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ-আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
যদিও ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনকালীন সময়ে প্রচারিত ও প্রকাশিত বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারের ১২নং পৃষ্ঠায় কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সংক্রান্ত ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদ সমূহ বাতিলের অঙ্গীকার ছিলো; তা সত্ত্বেও এটি বাতিল করে কাশ্মীরের বিভাজন ও স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেবার পূর্বে গণতান্ত্রিক নীতিমালার প্রচলিত নিয়মানুযায়ী দেশটির সকল রাজনৈতিক দল, কাশ্মীরের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দল, কাশ্মীরের রাজ্য আইন সভাসহ গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলোর সাথে আলোচনাক্রমে মতামত নেওয়াটা প্রয়োজন ছিলো বলে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী ও বিশ্লেষক-বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
আসলে কারো সাথে কোনো প্রকার আলোচনা না করে বা মতামত না নিয়ে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জুরে এমন একটি বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনমূলক কর্মকান্ডকে নরেন্দ্র মোদীর সর্বাত্মকবাদী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ অভিহিত করে বিশ্লেষকরা বলেছেন মোদী কাশ্মীরে-‘সাংবিধানিক অভ্যুত্থান’ করেছেন, যার মূল্য সমগ্র ভারতকে দিতে হবে এবং এমনকি, ভারতের সীমানার বাইরেও সেটি ছড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে।
পাঁচ আগস্ট ভারতীয় পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি তাঁর উপর অর্পিত ক্ষমতাবলে কাশ্মীর সংক্রান্ত বিশেষ ক্ষমতা সংক্রান্ত ৩৭০ ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদ সংবিধান থেকে বাতিল করে দিয়েছেন এবং পরে পার্লামেন্টে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়। আগামী ৩১শে অক্টোবর থেকে সেটি কার্যকর হবে মর্মে জানানো হয়েছে।
কী ছিলো ৩৭০ ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদে এবং এগুলো বাতিল হওয়ার প্রেক্ষিতে কাশ্মীরে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
সংক্ষেপে বলা যায়, ৩৭০ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে কাশ্মীরকে সীমিত পর্যায়ের স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিলো। পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো ছাড়া কাশ্মীরের জন্য অন্য সকল বিষয়ে আইন প্রণয়নের কাজটি জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য আইনসভাই করতে পারতো। আর কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীর সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে কাশ্মীরের রাজ্য আইনসভার মতামত গ্রহণ করতো। এখানে উল্লেখ্য যে, ভারত শাসিত কাশ্মীর তিনটি অঞ্চল নিয়ে গঠিত; তাহলো-১. কাশ্মীর, ২. জম্মু এবং ৩. লাদাখ। এই তিন অঞ্চলের সমন্বয়ে জম্মু ও কাশ্মীর ছিলো পূর্ণাঙ্গ একটি স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য।
অন্যদিকে, ৩৫-এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাশ্মীর আইনসভা রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দাদের পরিচয়পত্র দিয়ে থাকে। কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দা ব্যতীত কাশ্মীর অঞ্চলে বসতি স্থাপন, জমি কেনা-বেচা করার অধিকার কারো নেই এবং এমনকি, সরকারি চাকুরী লাভ বা ছাত্রবৃত্তি পাওয়ার এখতিয়ার কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দা ব্যতীত অন্য কোনো অঞ্চলের লোকদের ছিলো না।
এই দুটি অনুচ্ছেদ বাতিলের ফলে যেমন কাশ্মীরে, তেমনি বৃহৎ অর্থে গোটা ভারতের রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
কাশ্মীর নিয়ে মোদী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ এ কারণে মারাত্মক যে, এর ফলে এটি কেবল ভারতের ৭০ বছরের প্রতিষ্ঠিত ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিগুলোকেই পদদলিত করেনি, সেই সাথে হিন্দুজাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নিয়ে যাবে।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহের লাল নেহরু যেখানে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ভেতরে বহুভাষিক, বহুধর্মীয় ও বহুজাতিসত্ত্বার মানুষদের রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে তাদের ধর্মীয় ও জাতি সত্ত্বার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে দিল্লীর অধীনে রেখে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী ভারত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং এর ফলে ভারতীয় রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে বিভিন্ন জাতিসত্বার মানুষ যেমন গুজরাটি জনগণ বলতে পারে আমরা গুজরাটি, বা কাশ্মীরের মানুষ বলতে পারে আমরা কাশ্মীরি বা পাঞ্জাবের লোকজন বলতে পারে আমরা পাঞ্জাবী; এই যে স্বকীয়তা বোধের গর্বের সাথে প্রকাশ করার নিশ্চিত করে বৈচিত্র্যময় অখন্ড অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নেহরু, সত্তর বছর পরে মোদীর বিজেপি দ্বারা সমর্থিত হিন্দু জাতীয়তাবাদী দর্শন-হিন্দুত্ববাদী জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থকরা নেহরুভিয়ান আদর্শের মৌলিক নীতিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে ভারতের বুকের ওপর সাম্প্রদায়িক হিন্দু জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রথমেই কাশ্মীর অঞ্চলে এতদিনকার প্রচলিত প্যাটার্ন বদলে দিতে চাইছে।
হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ও এর আদর্শবাদী সংগঠন আর এস.এস ভারতকে এমন একটি আদি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে দেখেন-যেখানে বহিরাগতদের দ্বারা ভারত আক্রান্ত ও দূষিত হয়েছিলো। তাদের এই বিশ্বদর্শন অনুসারে মুসলমানরা বহিরাগত হওয়ায় ভারতের বর্তমান জনসংখ্যার ১৫.২ শতাংশ মুসলমানদেরকে ভারতের মাটির পুত্র হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। এ কারণে জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য হিসেবে দেখানো একটি ঐতিহাসিক ভুল ছিলো, যার প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন।
হিন্দুত্ববাদী এই সাম্প্রদায়িক দর্শনের সূত্রেই জম্মু ও কাশ্মীরের ওপর মোদী সরকারের আঘাত; সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সেই ঐতিহাসিক ভুলের সংশোধন করতে চাইছে বিজেপি। এই সংশোধনীর ফলে কাশ্মীর অঞ্চলের মানচিত্র এবং ভূরাজনীতির ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। এই সংশোধনীর ফলে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মর্যাদা হারাবে, কাশ্মীরের এতদিনকার স্বায়ত্তশাসন, রাজ্য আইনসভা, নিজস্ব পতাকা সবকিছুর অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে কাশ্মীরিরা। কাশ্মীর অঞ্চল সরাসরি দিল্লী শাসনাধীনে চলে আসবে এবং সেই সাথে এই রাজ্যকে বিভক্ত করে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ, এ দু’টি কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এ দু’টি রাজ্য সরাসরি দিল্লীর অধীনে থেকে দুইজন লেফট্যানেন্ট গভর্নর দ্বারা শাসিত হবে। লেখক ও বিশ্লেষকগণ এই ব্যবস্থাকে বৃটিশ কলোনিয়াল পদ্ধতির সাথে তুলনা করে বলেছেন, এর ফলে কাশ্মীর অঞ্চল হবে দিল্লীর নতুন উপনিবেশ।
সমালোচকরা মনে করেন, বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আর.এস.এস) ভারতে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী আদর্শ প্রতিষ্ঠার নামে হিন্দু প্রধান উপনিবেশিক গণতন্ত্র’ গোটা ভারতের উপর চাপিয়ে দেবার লক্ষ্যেই কাজ করছে এবং কাশ্মীর অঞ্চলে আনীত পরিবর্তন সেই লক্ষেরই বাস্তবায়নের অংশ। কেননা, কাশ্মীর অঞ্চলের উন্নয়ন ও কাশ্মীরকে সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদী মুক্ত করার নামে মোদী সরকারের আশু লক্ষ্য হলো, কাশ্মীরের জনমিতি ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনয়ন করা।
যেহেতু কাশ্মীরে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেহেতু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর ভারসাম্য আনয়নের জন্য মূল ভূখন্ড ভারত থেকে হিন্দু এবং অন্যান্যদের কাশ্মীরে বসতি স্থাপন, ব্যবসায় বিনিয়োগ করার ও জমি কেনা-বেচার সুযোগ ও অনুমতি দিয়ে ব্যাপক সংখ্যায় বহিরাগতদের কাশ্মীরে পাঠিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা হ্রাস করে দেওয়ার মৌল উদ্দেশ্যই কাশ্মীরের বিশেষ অধিকারের স্মারক-৩৭০ ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদদ্বয়, বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। মি: মোদীর গৃহীত এ পদক্ষেপকে-গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরাইলিদের বসতি স্থাপন প্রকল্পের সাথে তুলনা করেছেন চিন্তাবিদরা।
ইসরাইল যেমন করে গাজা ও পশ্চিম তীরে মুসলমানদের সংখ্যালঘু করার জন্য ইহুদিদের ঐ অঞ্চলে বসতি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে-তেমনিভাবে কাশ্মীরে মুসলমানদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করার জন্যই সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলো বাতিল করে দিয়েছে মোদী সরকার। ফলে দলে দলে হিন্দুরা কাশ্মীরে বসতি স্থাপন করার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি কাশ্মীরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ এর ফলে কাশ্মীর হবে, ইসরাইল ফিলিস্তিনীর সংঘাতের অনুরূপ এক সংঘাতময় ভূখন্ড।
এখানে উল্লেখ্য যে, বর্তমানে ভারতাধীন জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ অঞ্চল মিলে মোট জনসংখ্যা হলো ১২৫৪৮৯২৬, এর মধ্যে মুসলমানরা হলো মোট জনসংখ্যার ৬৮.৩১% শতাংশ, হিন্দু ২৮.৪৩% শতাংশ, শিখ ১.৮৭% শতাংশ এবং বৌদ্ধ হলো ০.৮৯% শতাংশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাই বিজেপি এবং আর.এস.এস দলের মাথা ব্যথার কারণ।
তবে যে নামে বা যে কারণেই হোক মোদী সরকার কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধা বাতিল করেন না কেন-কাশ্মীর অঞ্চলে উন্নয়ন, শান্তি স্থাপন, সন্ত্রাস দমন বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করা, কোনো কিছুতেই মোদী সরকার খুব একটা সফল হতে পারবেন বলে মনে করেন না রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। এতো বড় একটা সাংবিধানিক পরিবর্তনের পূর্বে কাশ্মীরি জনগণের মতামত নেওয়াটা জরুরি ছিলো বলে অভিমত ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের। ভারতীয় লেখক রামচন্দ্র গুহ বলেন, ‘পার্লামেন্টের ভেতরে ও বাইরে বিতর্ক-আলোচনা হওয়া উচিত ছিলো। সেটা হয়নি, এটা গণতন্ত্র নয়, এটা সর্বাত্মকবাদীতা।’
বিশেষজ্ঞ লেখক কাঞ্চন চন্দ্র বলেন, ‘এটা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ। ভারত কাশ্মীর চায়, তবে কাশ্মীরিদের নয়।’
সংবিধানের অনুচ্ছেদ দু’টি বাতিলের কারণে কাশ্মীর অঞ্চলের মানচিত্র ও ভূরাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আসবে; কিন্তু শান্তি স্থিতিশীলতা কি আসবে। গত সাত দশক ধরে এই অঞ্চল উত্তপ্ত, অস্থিতিশীল ও সশস্ত্র সংঘাতে পরিপূর্ণ। তাই এই অঞ্চলকে বলা হয়ে থাকে, ‘বিশ্বের সবচেয়ে সংঘাতপ্রবণ এবং সামরিকায়িত অঞ্চল।’
সত্তর বছর ধরে কাশ্মীরিরা ভারী সামরিকীকরণের বাস্তবতার মধ্যে বাস করে আসছে। জমি দখল, ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর দায়মুক্ত অবস্থায় কঠোর শক্তি প্রয়োগ করার অধিকার থাকায় ওখানকার মানুষদের হত্যা, অন্ধ করে দেওয়া, নির্যাতন করা বা গুম করে দেবার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে বলে অভিযোগ করা হয়। ওখানকার মানুষের জীবনের নিরাপত্তা সর্বদা হুমকিস্বরূপ। ঐ অঞ্চলের শহরগুলোতে কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের বৌদ্ধকরণ এবং গণমাধ্যমগুলোতে কাশ্মীরিদের অপমানসূচক প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত আছে। কাশ্মীরিদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং ওখানকার জনগণের আকাংখাকে নৃশংসভাবে দমন করা হয়ে থাকে।
১৯৮৯ সাল থেকে কাশ্মীরে ভারত শাসনের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ চলে আসছে এবং বর্তমানের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, যা কাশ্মীর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মেনে নিচ্ছে না, সে অবস্থায় পুরো কাশ্মীর অঞ্চল এখন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির রূপ নিয়েছে এবং যেকোনো সময় এই আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। যদি তেমন ঘটে, সেক্ষেত্রে তা সামাল দেওয়া ভারত সরকারের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ, কাশ্মীরি যুবকরা, যারা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০% ভাগ এবং তাদের গড় বয়স ত্রিশের ঘরে; সেই সকল যুবকরা ভারত সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ-বিভ্রান্ত। আবেগ আর মানসিকভাবে যুবকরা, কাশ্মীরিরা ভারতের ওপর থেকে সমর্থন হারিয়ে ফেলেছে, সেইসব যুবকরা প্রত্যক্ষভাবে আন্দোলন সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছে সেই ১৯৮৯ সাল হতে।
আরো একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, শিক্ষিত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের যুবকরা ভারত সরকার বিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহে ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়া শুরু করেছে। যেমন গত জুলাইয়ে নিহত হওয়া জঙ্গি বিদ্রোহী ওয়ানি একটি বিশিষ্ট বিদ্রোহী দলের প্রধান ছিলেন, তিনি উচ্চ শিক্ষিত, উচ্চ শ্রেণির এক কাশ্মীরি পরিবারের সন্তান ছিলেন। ঐ বিদ্রোহী দলের নতুন কমান্ডার জাকির রশিদ ভাট চন্ডগড় শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র বলে জানা গেছে। ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষিত যুবকদের সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ায় কাশ্মীরের চুড়ান্ত ভাগ্য নিয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ভারতের গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ এর সাবেক প্রধান অমরজিত সিং দৌলত লিখেছিলেন, ‘কিছুই স্থির নয়; অন্তত: সমস্ত কাশ্মীরের। তবে, এ মুহূর্তে যুব সমাজের ক্ষোভ, বিরক্তি ও ক্রোধ এবং উদ্বেগজনকভাবে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ একমাত্র প্রতিবন্ধক।’ অন্যদিকে, কাশ্মীর সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা লে: জেনারেল জেএস সাধু একটি সংবাদপত্রকে বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাসীদের প্রতি জনগণের সমর্থন, তাদের মহিমা ও বর্ধিত উগ্রবাদ উদ্বেগের বিষয়।’ (ভারত কি কাশ্মীরকে হারাচ্ছে, বিবিসি নিউজ ২৬.৪.২০১৭)।
কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের চূড়ান্ত পরিণতির বিষয়টি এখনই বলা না গেলেও এটি বলা যায় যে, কাশ্মীরে আরও বিদ্রোহ, সহিংসতা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে, ভারতের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের এতোদিনকার ধারণার কফিনে আরও একটি পেরেক লাগিয়ে দেওয়া হলো। সে সাথে এটিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, আণবিক বোমা ও অস্ত্র সমৃদ্ধ দুই প্রতিবেশী একটি প্রচলিত যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়তে পারে-যা বিশ্বব্যবস্থার জন্য নিরাপত্তা হুমকি।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT