শিশু মেলা

বঙ্গবন্ধুর ছেলেবেলা

জামান মাহবুব প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৮-২০১৯ ইং ০১:১৪:৩৫ | সংবাদটি ৬৬ বার পঠিত

বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা। হাজার বছরের ইতিহাস যদি আমরা ঘাঁটাঘাঁটি করি, তাহলে দেখব। এটিই বাঙালির সবচে বড় ঘটনা। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা তো শুধু দেশের গ-িতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি হয়ে উঠেছে বিশ্বমানবের ঘটনা, বিশ্ব ইতিহাসের এক হিরন্ময় অধ্যায়। কে এই ইতিহাসের ¯্রষ্টা? তিনি আর কেউ নন, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকে বলা হয়, ইতিহাসের রাখাল রাজা। ব্রিটিশ আমল থেকে বাংলায় জন্মগ্রহণ করেছেন বহু নেতা, বহু মনীষী। কিন্তু সেই তখন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে তাঁর মতো সাহসী পুরুষ, দূরদর্শী নেতা, অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক এই বাংলায় আর কেউ জন্ম নেননি। পাকিস্তানের ২৪ বছরের ১১ বছরই তাঁর কারাগারে কেটেছে। দু-দু’বার ফিরে এসেছেন ফাঁসির মঞ্চ থেকে। বাঙালির নিজস্ব জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে চিরন্তন আকাক্সক্ষা, তার সফল বাস্তবায়ন হয়েছে বঙ্গবন্ধুর অতুলনীয় নেতৃত্বে। আর সেজন্যেই তিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।
সে সময়ে ফরিদপুর জেলা বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রাম ছিল একটি অজ পাড়াগাঁ। সেই গ্রাম থেকে নৌকায় ঢাকায় যেতে তিন চার দিন লেগে যেতো। টুঙ্গিপাড়ার বুক চিরে প্রবাহিত হয়েছে মধুমতি নদীর শাখা। শান্ত, ¯িœগ্ধ, সবুজাভ গ্রাম থেকে বেরিয়ে এলেন হিমালয় তুল্য একজন মানুষ- শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ মার্চ। পিতা শেখ লুৎফর রহমান, মাতা সায়েরা খাতুন। পিতামাতার আদুরে সন্তান। তাই ‘খোকা’ নামেই ডাকতেন সবাই।
গ্রামবাংলার ষড়ঋতু, নদীনালা, খালবিল, পাখির কাকলি এবং আজানের সুমধুর সুরের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তিনি চোখে দেখেছেন বঞ্চিত মানুষের দুর্দশা, অনুভব করেছেন তাদের দুঃখ-ব্যথা। শুনেছেন ব্রিটিশ শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট অসহায় মানুষের করুণ কাহিনি। দেখেছেন পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ আর অত্যাচার-অবিচার। কিশোর মুজিব সংবেদনশীল। সবকিছুই তাঁর মনে গেঁথে রইল।
শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষা জীবন শুরু হয় বাড়ির কাছেই গিমোডাঙা স্কুলে এবং মাদারীপুর শহরে। গোপালগঞ্জে যখন তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েন, তখন তাঁর চোখ আক্রান্ত হয় গ্লুকোমায়। কোলকাতায় চোখের অপারেশন হলো। কিন্তু তিন বছর স্কুলে যেতে পারলেন না। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে কিশোর মুজিব ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন গোপালগঞ্জের খ্রিষ্টান মিশন স্কুলে। স্কুলে তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল ইতিহাস। পছন্দ করতেন ফুটবল আর ভলিবল খেলা।
অন্যের দুঃখ-কষ্টে তিনি স্থির থাকতে পারতেন না। গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে অধ্যয়নকালে প্রাইভেট পড়তেন শিক্ষক রসরঞ্জন সেনগুপ্তের বাড়িতে। একদিন পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরছেন, দেখলেন একটি ছেলে আদুল গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তাঁর গায়ের জামা পরিয়ে দিলেন ছেলেটির গায়ে।
সেবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছিল। পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন তাঁর কর্মস্থল গোপালগঞ্জ শহরে। মুজিব ছিলেন গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ায়। তিনি দেখলেন, গ্রামের বহু লোক খেতে না পেয়ে দারুন কষ্ট পাচ্ছে। তিনি কাউকে কিছু না বলে দরিদ্র মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিলেন গোলার ধান। বাবা যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন মুজিব অকপটে জানালেন অভাবী মানুষের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তিনি গোলার ধান বিলিয়ে দিয়েছেন। বাবা ছেলেকে চিনতেন। তাই কিছুই বললেন না।
১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক এবং বাণিজ্য ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এলেন গোপালগঞ্জের মিশন স্কুল পরিদর্শনে। শেখ মুজিব তখন মিশন স্কুলের ছাত্র। অনেক দিন ধরেই স্কুলের ভাঙা ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে পড়ত। অনেকবার চেষ্টা তদবির করেও ছাদ সারানো যায়নি। দুই মন্ত্রী যখন স্কুল পরিদর্শন শেষে গোপালগঞ্জের ডাক-বাংলোয় ফিরে যাবেন, তখন তাঁদের পথ আটকে দাঁড়ালো এক কিশোর। সঙ্গে আরও কয়েকজন ছাত্র।
কিশোর ছেলেটার সাহস দেখে থ বনে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চাই? পথ আটকে রেখেছ কেনো?’
নির্ভীক কন্ঠে কিশোর জবাব দিলো, ‘আমি শেখ মুজিবুর রহমান স্যার। এরা আমার সহপাঠী। স্যার, আপনাদের কাছে আমাদের একটা অভিযোগ জানাতে চাই।’
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বললেন, ‘কিসের অভিযোগ? শুনি।’
শেখ মুজিব বিনয়ন¤্র কন্ঠে বললেন, ‘স্যার, আমাদের হোস্টেলের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। পানিতে আমাদের বইপত্র, বিছানা, বালিশ ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। আমরা স্কুল কমিটির কাছে অনেকবার দরখাস্ত দিয়েছি, কাজ হয়নি।’
শেখ মুজিবের সাহসী বক্তব্য শুনে চমৎকৃত হলেন দুই মন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক ঘোষণা দিলেন, তিনি তাঁর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে বারোশ’ টাকা মিশন স্কুলের ছাদ সারাবার জন্যে দান করবেন। যথাসময়ে টাকা পাওয়া গেল।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঐ ঘটনার পর উপলব্ধি করলেন, এই কিশোরটির মধ্যে আছে সেই স্ফুলিঙ্গ যা তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে বেড়ে উঠতে সহায়ক। তিনি ডাক বাংলোয় এসে শেখ মুজিবকে ডেকে পাঠালেন। নানা কথাবার্তার পর তাঁর কোলকাতার ঠিকানা দিলেন এবং দেখা করতে বললেন।
শেখ মুজিব এভাবেই খুঁজে পেলেন তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পেলেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি। বাংলার পূর্ণ স্বাধীনতার গুরু দায়িত্ব সেদিন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যাঁর কাঁধে নিজের অজান্তেই তুলে দিলেন, তিনি তরুণ শেখ মুজিব।
এরপরের ইতিহাস- বাঙালির হাজার বছরের চির আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতা লাভের ইতিহাস। সে ইতিহাস রচিত হয়েছে আন্দোলন, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের গৌরবময় পথে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT