শিশু মেলা

বকরের ঈদের খুশি

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৮-২০১৯ ইং ০১:১৫:৪৭ | সংবাদটি ৯৬ বার পঠিত

আকাশ একটু মেঘলা। উত্তর আকাশে পানির ভার বেশী, হিমালয়ের বরফ থেকে খানিক পানি ধার নিয়েছে মনে হয়। ঐ আকাশে কাল সাজ একটু বেশী। এর মধ্যে ঈদের কেনাকাটা বাবা করে ফেলেছেন। কালই ঈদ হওয়ার সম্ভাবনা। বকরের পরিবার বর্তমান সমাজের অন্য দশ বিশটি পরিবারের মত নয়। এদের পরিবার এখনো একান্ন। যা ছিল আগেকার গ্রাম বাংলার চিত্র। যে যা পাব পরিবারের মা বাবা ভাই বোন চাচা দাদা সকলকেই নিয়েই খাব। আগে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক ছিল না। তাদের মন ছিল উদার। লেখাপড়া কম জানা থাকলেও অন্তর ছিল স্ফটিকের মত স্বচ্ছ। কারো সাথে রাগারাগি থাকলেও রেষারেষি খুব কম ছিল। মনে গিট ছিল না, মন ছিল খোলা। বকরের চার চাচা। বকরের বাবা সকলের বড়। বকরের তিন ভাইবোন। তিন চাচার ছেলে মেয়ে আরো বার জন। সব মিলিয়ে পরিবারের সদস্য সংখ্যা এখন পঁচিশ। আধুনিক কালে যার কল্পনা করা মেলা ভার। আমরা শিক্ষিত হয়েছি সাথে স্বার্থপরও। আমরা শিক্ষিত হয়েছি উদারতা হারিয়েছি। বকরের বাবার তদারকি আর চাচাদের মান্যতায় তাদের পরিবাবে এক অনন্য পরিবেশ। এযে এক জান্নাতী মিলন মেলা। পরিবারের কারো প্রতি কারো কোন অভিযোগ নেই। বকরের বাবার কথায় সবাই মেনে চলে। মাস শেষে চাচাদের বেতনের টাকা বকরের বাবার হাতে এনে দেয়। যার যা প্রয়োজন বড় ভাইয়ের নিকট থেকে চেয়ে নেয়। বকরের দাদা দাদী অনেক আগেই মারা গেছেন। পরিবারের সকল দায়িত্ব বকরের বাবার উপর। বকরের বাবা যা বলবেন চাচা চাচীরা সবাই তা শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করেন। তিনিও চেষ্টা করেন ইনসাফপূর্ণ কথা বলতে। কখনও ভুল হলে তিনি তা শুধরিয়ে নেন। বকরের বাবার প্রতি কারো সামান্যতম আপত্তি নেই। এতে করে দাদা দাদী না থাকলেও পরিবারে কোন সমস্যা হয়নি। বকরের বাবাই অন্য চাচাদের বিয়ে করিয়েছেন। অন্য ভাইয়েরা বকরের বাবা ছাড়া আর কিছু বুঝেনা। এ যেন এক সোনালী যুগের চিত্র। যে একজন কোন জিম্মাদারী নিলে এই দলের আর কেউ প্রতিবাদ করবে না। আজকালতো বাবা মায়ের কথাও আমরা শুনতে চাই না। অনেকেই বলে ফেলি ওনারা কী বুঝেন?
আজ ঈদের দিন। ফজরের পরপরই ঈদের জামাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। বাবা, চাচা, চাচাতো ভাই সবাই একসাথে ঈদগাহে যাবে। তাদের পরিবারের লোকজনই ঈদগাহে একটি কাতারের চার ভাগের এক ভাগ হয়ে যায়। তাদের দিকে সবাই কম বেশী তাকায়। অনেকেই যেন তাদের দেখে ঈর্ষা করে। কিন্তু এই ঈর্ষায় কোন ফায়দা নেই যদি না তাদের পরিবারের মত করে পরিবার সাজানো না যায়।
আজ সকালে সবার আগে ঘুম থেকে জেগেছেন মা চাচিরা। এটাই যে নিয়ম। মায়েরা সবার খাবার দাবার শেষে হাড়ি পাতিল বাসন কোষন ধুয়ে ছোট বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে নিজে ঘুমুতে যান। আবার সবাব আগে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে ফজর সেরে সাংসারিক কাজ শুরু করেন। আর দিনটি যদি কোন অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক হয় তবেতো আর কথাই নেই। তাদের যেন আর ঘুম নেই শুধু কাজ আর কাজ। তাদের গর্ভ ধারণে কষ্ট, সন্তান ভুমিষ্টের কষ্ট, সন্তানদের দুধ খাওয়ানোর কষ্ট, প্রতিপালনের কষ্ট, সাংসারিক কাজকর্মের কষ্ট সব মিলিয়ে তারাইতো আল্লাহর রাসুল সাঃ এর ঘোষণায় চার ভাগের তিন ভাগ সদাচার পাওয়ার হকদার। এটাইতো পূর্ণ ইনসাফ। বকর ও তার চাচাতো ভাইয়েরা সকাল সকাল গোছল করে নিচ্ছে। একটু পরেই ঈদগাহে যাওয়ার ডাক পড়বে। তার আগে সকলকেই খাওয়ার টেবিলে যেতে হবে।
ঈদগাহে যাওয়ার আগে বকরের বাবা ও চাচারা সব শিশুকে নতুন টাকা দিচ্ছে। এতে শিশুদের আনন্দ আরো বেড়ে যায়। বকরও বাবা ও চাচাদের থেকে তিন শত টাকা পেয়েছে। বকরভাবে এই টাকা দিয়ে বিকালে বাজারে যাবে ও সুন্দর চেয়ে খেলনা কিনে আনবে। এই ভাবনা নিয়ে সবার সাথে মসজিদের দিকে যাত্রা করে। প্রত্যেক বৎসর ঈদের নামাজ ঈদগাহেই হয়। এই বৎসর আকাশে বৃষ্টি থাকার কারণে মসজিদে নামাজ হচ্ছে। আজ কয়দিন থেকেই বৃষ্টি আর বৃষ্টি। ঈদগাহে জামাত হওয়ার কোন সুযোগ নেই। তারপরও আশা ছিল আকাশ পরিস্কার হলে ঈদগাহেই জামাত হত।
বকর ও পরিবারের উপযুক্ত পুরুষ লোকেরা নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছে। এখন বৃষ্টি নেই। যে কোন সময় আবার বৃষ্টি শুরু হতে পারে। বাড়ি থেকে মসজিদ একটু দূরে, পায়ে হাঁটার পথ ইচ্ছা করলে রিক্সায় আসা যায়। কিন্তু সবাইভাবে একটু কষ্ট করে পায়ে হাঁটলে অনেকের সাথে দেখা হবে, খবরাখবর নেওয়া যাবে, ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা যাবে। বকর সকলের সাথে হাঁটছে। রাস্তা থেকে একটু দূরে আবর্জনার স্তূপ। আশপাশের বাড়ি ও বাসাগুলো থেকে এখানে এনে ময়লা ফেলা হয়। বাতাসের প্রবাহে রাস্তায় এসেও ময়লার দুর্গন্ধ হানা দিচ্ছে। নাক চেপে সবাই একটু তাড়াতাড়ি হাঁটার চেষ্টা করছে। বকর দেখে পাঞ্জাবী ও লুঙ্গি পড়া একজন বৃদ্ধ লোক কি যেন কুড়াচ্ছে। কারো আর সেদিকে খেয়াল নেই। কিন্তু বকরভাবে আজ ঈদের দিন এই মুরুব্বি জামাতে না গিয়ে ময়লার স্তূপে কি কুড়াচ্ছে? এমনিতে টুকাইরা ময়লার স্তূপে প্লাস্টিকের বোতল বা আরো অন্য কিছু খুঁজে নেয়। এই বৃদ্ধকেতো টুকাই বলে মনে হয় না। বকর কাউকে কিছু না বলে সবার সাথে হাঁটতে থাকে। বকরভাবে এই বৃদ্ধ লোকটির খবর নেওয়া দরকার।
একটু পরেই সবাই বাসায় পৌঁছে যায়। বকরদের সাথে আরো কয়েকজন পড়শী এসেছে। ঈদের দিনে এইতো আলাদা এক আনন্দ। একজন অন্য জনের বাসায় যায়। কোশল বিনিময় করে। গল্পে মেতে উঠে। শিশুদের জন্য খেলার আয়োজন করা হয়। ইতিমধ্যে ভিতর থেকে খাবার টেবিলে খাবার পরিবেশন করা হয়। বকর তার বাবাকে বলে, বাবা আমি একটু বাহির থেকে আসি। আমি একটু পরে খাব। বাবা ভাবেন হয়তো তার কোন বন্ধু অপেক্ষা করছে। তিনি যাওয়ার অনুমতি দেন। বকর বাবাকে সালাম দিয়ে বেরিয়ে যায়। তার যাওয়াতো কোন বন্ধুর বাড়িতে নয়। সে যাচ্ছে ঐ ময়লার স্তূপে দেখে আসা বৃদ্ধের খবর নেওয়ার জন্য। সে কাছে যাওয়ার পর দেখে বৃদ্ধ ময়লার সাথে ফেলে দেওয়া কাঁচা মরিচ কুড়াচ্ছে। বকরের দিকে বৃদ্ধের কোন খেয়ালই নেই। বকর লোকটিকে সালাম দেয়। বৃদ্ধ লোকটি তার দিকে সালামের জবাব দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। যেন তিনি নিজ থেকে কিছু বলতে চান। বকর বলে, চাচা কিছু বলবেন? লোকটি বলে বাবা আমার বাড়ি নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়। আমার কেউ নেই, কোন কাজও পাইনা। আমি বৃদ্ধকে কে কাজ দিবে? আমার গায়ে শক্তি নেই। তাই এটা ওটা কুড়াই। জীবনতো থেমে থাকে না। বকর বলে চাচা তাই বলে এই ঈদের দিন? লোকটি বলে বাবা আমাদের আবার কিসের ঈদ? আমাদের সুখ আর দুখ, হাসি আর কান্না সব একই।
এইভাবে দীর্ঘক্ষণ তাদের মধ্যে আলাপ হয়। বৃদ্ধলোকটির কাঁধের ভাড়ে দুটি বস্তা রয়েছে, তার মধ্যে সব প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র। যখন যেখানে যায় এটাই তার সংসার, এখানেই তার বসবাস। এভাবেই তার দিন রাত কেটে যায় অনাহার অর্ধাহার তার নিত্যসঙ্গি। বকর তার হাতে বাবা চাচার কাছ থেকে পাওয়া তিন শত টাকা গুজে দেয় আর বলে চাচা আমি ছোট মানুষ আমি আপনার জন্য কী করতে পারি? আমার নিকট এই কটা টাকা আছে আপনার যদি কোন উপকার হয়। আপনি এই টাকাটা নিন। আপনার বাড়িতে পৌঁছার জন্য কাজে লাগাবেন। বৃদ্ধ লোকটি তার হাত থেকে টাকাটা গ্রহণ করে মাথা নুইয়ে বলতে থাকে বাবা আল্লাহ তোমার ভাল করুন। তার দু’চোখে পানি চিক চিক করে উঠে। কাঁধে বোঝার ভার নিয়ে পথ চলা শুরু করে। আব বকরের দু’চোখে খুশির অশ্রু বইতে শুরু করে যে আজ এই ঈদের খুশির সময় আমি একটি ভাল কাজ করতে পারলাম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT