উপ সম্পাদকীয়

আ.ন.ম শফিকুল হক

মোঃ রফিকুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৮-২০১৯ ইং ০১:১০:৪৬ | সংবাদটি ১১৮ বার পঠিত

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য বর্ষীয়ান জননেতা আ.ন.ম শফিকুল হক না ফেরার দেশে চলে গেছেন। মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘ লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হলো তাকে।
১৪ আগস্ট বিকেল সাড়ে তিনটায় স্থানীয় একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ...... রাজিউন। তার অকাল মৃত্যুতে সিলেট বিভাগে শোকের ছায়া নেমে আসে। সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য এই ত্যাগী ও নির্মোহ নেতার মৃত্যু যেন সবাইকে বেদনাবিধূর করে দিয়েছে। সবার মুখে একটাই বাক্য ছিল আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন। নিজেকে সকল দুর্নীতির ঊর্ধ্বে রেখে দলের জন্য লড়াই সংগ্রাম করে গেছেন। নেতা কর্মীদের জুলুম-নির্যাতনে সর্বদা পাশে থেকে সাহস যুগিয়েছেন। সকলের আশ্রয়স্থল হিসেবে বটবৃক্ষের মত ছায়া দিয়ে আগলে রাখতেন। তাঁর অসম্ভব ভদ্র আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করত। হাসিমুখে কলাকৌশল বিনিময় তাঁর অভ্যাস ছিল। সকাল-বিকাল এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের সময় দিতেন। এ যেন এক কর্মীবান্ধব জননেতা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরবর্তী দুঃসহ ও প্রতিকূল রাজনীতির পরিস্থিতিতে নিজের জীবনবাজী রেখে দলকে সুসংগঠিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। জাতির পিতা মুজিবের আদর্শ ও সোনার বাংলা কায়েমের অগ্নি পরীক্ষায় লড়াই সংগ্রাম করে গেছেন আমৃত্যু।
তিনি ১৯৪৫ সালে বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের মৌলভীর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ২০১৯ সালের ১৪ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই ৭৪ বৎসরের বর্ণাঢ্য জীবনে স্ত্রী, দুই পুত্র ও তিন কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক নেতা কর্মী ও শুভাকাংখী রেখে গেছেন। ছাত্রজীবনে লেখাপড়ার পাশাপাশি পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ১৯৬৫ সালে এমসি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালীন তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ছাত্রলীগ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। উত্তাল রাজনীতির বিশেষ করে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বারবার জেল জুলুমে আটকা পড়ছিলেন, ছয় দফাকে বাংলার মুক্তির সনদ বলে সারা বাংলার পথে প্রান্তরে তার পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে ছিলেন তখন তাঁর স্বকীয় প্রতিভা দিয়ে উপলব্ধি করে তাকে সমর্থন করে নিজেও আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এ যেন একটি ফুলকে বাঁচার ও একটি মুখের হাসির জন্য মরণপণ লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হন।
১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে ছাত্র রাজনীতির তকমা যেন আইয়ুবের গদিতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। আগরতলা ষড়যন্ত্রের নাটক সাজিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছিল, বাংলার আপামর জনতার আন্দোলন সংগ্রামে তাঁকে মুক্তি দিয়ে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হয়। সেই উত্তাল ও অগ্নিঝরা দিনগুলোতে আ.ন.ম শফিকুল হক ছিলেন সিলেট জেলার ছাত্র রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৭০ সালে যখন নির্বাচন আসে তখন জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত করার মহান দায়িত্বও পড়ে তার এলাকার। তিনি নিরলসভাবে সেই কাজ করে গেছেন। দলকে উজ্জীবিত করতে নেতা-কর্মী নিয়ে দলে দলে গ্রাম বাংলার পথে প্রান্তরে মুজিবাদর্শ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৫নং সেক্টরের অধীনে বেসামরিক নেতৃত্বে জীবনের ঝুকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে পুরো নয় মাস কাজ করে গেছেন। স্বাধীনতার পরবর্তীতে নিজে দেশ ও জাতীর কল্যাণে কাজ করেছেন। কিন্তু ৭৫ পরবর্তীতে যখন আবার আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার মহাপরিকল্পনা স্বাধীনতা বিরোধীরা শুরু করে, তখন মুজিব হত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ সংগ্রামে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। পরিবার পরিজনের চিন্তা বাদ দিয়ে প্রকাশ্যে গোপনে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে জেল-জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু দল থেকে কখনো পদচ্যুতি ঘটাননি। হুলিয়া মাথায় নিয়ে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর আওয়ামী লীগের ঝান্ডা বহাল রেখেছেন। পদ ক্ষমতা লোভ তাঁকে কোন অবস্থায় টলাতে পারেনি। পরিচ্ছন্ন ও নির্মোহ রাজনীতিবিদ হিসেবে সব দলই তাকে পেতে কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু তিনি মুজিব আদর্শে ছিলেন অবিচল ও দলের এক অতন্ত্র প্রহরী। ১৯৮৬ সালে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ তাঁকে জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে এবং ২০০২ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬ বৎসর তিনি সম্পাদকের কাজ সফলভাবে চালিয়ে যান। তার দলীয় কর্মকান্ড জেলার নেতা কর্মীকে আবেগ আপ্লুত করে। তার দক্ষতা ও সাংগঠনিক তৎপরতার কারণে ২০০৩ সালে সিলেট জেলার সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তিনি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। দীর্ঘ দশ বৎসর সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার পাদপ্রদীপে থেকেও একেবারে সাদা-মাটা জীবন যাপন করেছেন। কোন ধরনের অর্থবিত্তের মালিক হননি। পুরো রাজনীতিক জীবনে ভাড়া বাসায় থেকে রাজনীতি করে গেছেন। নেই কোন ব্যাংক ব্যালেন্স কিংবা স্থাপনা বা অট্টালিকা। ছেলে-মেয়েগুলো ইউরোপ দেশে থাকার কারণে ওরাই তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে তাঁকে চালিয়ে গেছেন।
২০০১ সালে ওয়ান ইলেভেনে মাথায় হুলিয়া নিয়ে সেনা শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নানা কৌশলে দলের অস্তিত্ব সংকটে জননেত্রী শেখ হাসিনার কারাবরণের সময় নেত্রীর মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে দেশে-বিদেশে নিজের জ্ঞান গরিমা দিয়ে কাজ করেছেন। কোথায়ও তাকে সেনা শাসকের ফাঁদে পা ফেলতে দেয়নি। বর্তমানে যারা রাজনীতির চরম শিখরে অবস্থান করছেন অনেকেই তার হাতে গড়া নেতা। ২০১২ সালে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের শেষ সম্মেলনে তিনি দলের সিনিয়র সদস্য হয়ে মন খারাপ করেননি। বিধায় জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় জাতীয় পরিষদের অন্যতম সদস্য হিসেবে মনোনীত করেন।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত ১৪ আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেন। পরদিন বিশ্বনাথে তার জন্মভূমিতে ১ম জানাযা ও হযরত শাহজালালের মাজারে ২য় জানাযা শেষে দরগাহর করবস্থানে সমাহিত করা হয়। শহীদ মিনার ও মুসলিম সাহিত্য হল প্রাঙ্গণে তাঁর স্মৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও পুষ্পস্তবক সকল দলের নেতা কর্মীরা অর্পণ করেন।
একজন আদর্শ শিক্ষক, রাজনৈতিক গুরু ও সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আ.ন.ম শফিকুল হকের চলে যাওয়ায় সিলেটের রাজনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি ৭৫ পরবর্তীতে সাপ্তাহিক খবর ও সাপ্তাহিক সমাচারসহ বিভিন্ন পত্রিকার সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করতেন। ক্ষণজন্মা এই প্রবাদ পুরুষ সিলেট বিভাগের দাবি দাওয়া সহ সকল প্রকার উন্নয়নে যথাযথ ভূমিকা পালন করেছেন। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন তাঁর বান্দাকে জান্নাতবাসী করেন। আমীন।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বিশ্বে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি : কীসের ইঙ্গিত
  • বাঙালির হৃদয়ের ভাষা বাংলা
  • নৈতিকতা ও জাগ্রত মূল্যবোধ ছাড়া সোনার বাংলা গড়া সম্ভব নয়
  • উহান সিটি কি ব্যাংকরাপ্টেড হচ্ছে!
  • পড়িলে বই আলোকিত হই
  • জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য
  • জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি পুনর্গঠন ও কিছু প্রত্যাশা
  • চাই মানসম্পন্ন বই
  • প্রসঙ্গ : রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • করোনা ভাইরাস
  • মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ আল আজাদ
  • শহীদ মিনার সাহসী কথা বলে
  • একুশে ফেব্রুয়ারি
  • ভাষা আন্দোলন এবং একুশে
  • ফুলতলী কামিল মাদ্রাসা : প্রাপ্তির ১০০ বছর
  • টিলায় থাকা ছেলেটি
  • ভাষা বিপ্লব থেকে স্বাধীনতা
  • স্বপ্নগুলো থাকে অধরাই
  • বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে হাইকোর্টের রুল
  • মাইক্রোপ্লাস্টিক ও পরিবেশ
  • Developed by: Sparkle IT