উপ সম্পাদকীয়

জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৮-২০১৯ ইং ০১:১৫:০৬ | সংবাদটি ৫২ বার পঠিত

অতি সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যৌথভাবে গবেষণা চালান মার্কিনযুক্ত রাষ্ট্র ও অষ্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা। তারা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন পরমাণু যুদ্ধের চেয়েও ভয়ানক বা বিপর্যয়কর। যেভাবে জলবায়ু পাল্টাচ্ছে তাতে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। আর্দ্র এলাকায় বেশি পানি থাকার কারণেই মূলত প্রচৃর বৃষ্টিপাত হয়। আর শুষ্ক বা শুকনো এলাকায় আরো বেশি শুকনো ভাব বিরাজ করে বলে দেখা দেয় মারাত্মক খরা। অতি সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স’ নামক সাময়িকীতে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ তথ্য পাওয়া গেছে মহাসাগরের পানির লবণাক্ততার উপর ব্যাপক গবেষণার ফলাফলে। বৃষ্টিপাতের চক্র বৃদ্ধির জোরালো ইঙ্গিত মিলেছে বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বাড়ার কারণে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, এ-সংক্রান্ত গবেষণাটি করা হয়েছে ১৯৫০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মহাসাগরের লবণাক্ততার নানা তথ্যপাতির ভিত্তিতে। এ সময় তাঁরা বেশি গুরুত্ব দেন লবণাক্ততা বা স্যালাইনিটির পরিবর্তনের প্রতি।
গবেষণায় দেখা গেছে, বৃষ্টিপাত চক্র ও বাষ্পীভবনের পরিবর্তনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে মহাসাগরের পানির লবণাক্ততা। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ ৫০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখান, গুরুত্বপূর্ণ বা ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে পানিচিত্রে। নিবন্ধের অন্যতম লেখক সুসান উইজফেলস বলেছেন, অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীতে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া বা পরিবর্তন আরো বেশি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতএব এখন থেকেই এসব ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হতে হবে যাতে করে এ-সংক্রান্ত সমস্যা সহজেই মোকাবিলা করা যায়। সুসান আরো বলেন, সবদিক বিবেচনা করে বলা যেতে পারে পানিচক্রে বেশি পানি চলে যায় পানির বাষ্পীভবনের কারণে। ফলে ঘটে মাত্রাতিরিক্ত বা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত। অর্থাৎ আর্দ্র এলাকায় থাকে বেশি পানি। আর শুকনো এলাকা হয়ে পড়ে আরো শুষ্ক। এই গবেষণা চালানো হয় যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের বিজ্ঞান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএনআইআরও ল্যাবরেটরিতে। তবে উষ্ণতা বাড়ার কারণে বাষ্পীভূত এলাকায় পানিচক্রে পানির উপাদানে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে, সে সম্বন্ধে এখনও কিছু বলা হয়নি। বলা হয়েছে, এ নিয়েও চলছে ব্যাপক গবেষণা। এর ফলও জানানো হবে শিগগির। আর এর ফলে এ-সংক্রান্ত আরো অনেক বিষয় সন্বন্ধে অবহিত হওয়া যাবে যা এ ধরনের প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ করবে। জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে দেখা দিচ্ছে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি বা খরা বড় জলোচ্ছ্বাস, সুনামি, ভূমিকম্প, ভূমিধস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিপর্যয়। তাতে জীবন ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানের প্রলয়ংকর ভূমিকম্প (৯.৯ মাত্রার) ও সুনামি এরই প্রকৃত উদাহরণ। এর চরম নেতিবাচক প্রভাবও পড়ে সারাবিশ্বে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এল-নিনো ও লা-নিনোর কথা যে শোনা যায় সেটিও ঘটছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বাড়ার কারণে আরো কত ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। এ জন্যও প্রয়োজন আরো ব্যাপক ও উন্নত গবেষণা। এরই মধ্যে পৃথিবীতে বেড়েছে বাতাস, সমুদ্রের ঢেউ ইত্যাদি। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এসব কারণে এক সময় হয়তো এই পৃথিবী মানুষ, পশু-পাখি ইত্যাদির বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এদিকে আরেকটি প্রতিবেদন জানিয়েছে, ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছে জলবায়ু। আর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে আমাদের এই সবুজ গ্রহটির উপর। সম্প্রতি নেচার জিয়োসায়েন্স নামের একটি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভয়ানক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, উত্তর মেরুতে বরফের নীচে বছরের পর বছর আটকে থাকা মিথেন গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে বায়ুমন্ডলে। বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বাড়তে থাকায় বরফ গলে মুক্ত হয়ে পড়ছে এসব গ্যাস। বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে তা জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। একদল গবেষকের চালানো গবেষণালব্ধ ফলাফল নিয়ে এই নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ফেয়ারব্যাংকসের আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেটি ওয়ালটার অ্যান্টনির নেতৃত্বে সম্প্রতি এই গবেষণায় চালানো হয়। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন সবচেয়ে বিরূপ প্রভাব ফেলে যে গ্যাস কার্বন ডাই অক্সাইড, তার পরই মিথেনের স্থান। এই গ্যাস উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। গবেষণাটি চালাতে গিয়ে গবেষকরা উত্তর মেরুতে এমন হাজারটা স্থান খুঁজে পেয়েছেন যেখানে বুদবুদ আকারে মিথেন গ্যাস নিঃসরণের প্রমাণ রয়েছে। কোটি কোটি বছর ধরে এগুলো বরফের নীচে চাপা পড়ে ছিল। পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার ফলে প্রতিনিয়ত মেরু অঞ্চলে বরফ গলছে। এতে অনাবৃত হয়ে পড়ছে জমে থাকা মিথেন গ্যাস। জলবায়ু পরিবর্তনের এই গ্যাস সুষ্পষ্টভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বে গ্যাস তৈরি হওয়ার বিভিন্ন উৎস রয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রাকৃতিক, কিছু মানুষের সৃষ্টি। জমিতে ময়লা জমে আবর্জনা জমে গ্যাস সৃষ্টি হয়। আবার খামারে পালিত বিভিন্ন প্রাণীর আবর্জনা থেকেও গ্যাস তৈরি হয়। এসব উৎস থেকে মিথেন শনাক্ত করা সহজ কাজ নয়। কেটি ওয়ালটার অ্যান্টনির নেতৃত্ব গবেষকরা উত্তর মেরুতে গবেষণা চালাতে গিয়ে যে গ্যাস পান, এর কার্বন কণার সঙ্গে সাধারণ মিথেন গ্যাসের অনুর মধ্যে থাকা কার্বন কণার পার্থক্য রয়েছে। এটিই মূলত গবেষকদের কাছে তথ্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে, বরফের নীচে থাকা মিথেন বহু বছর আগের প্রাচীন গ্যাস। উত্তর মেরুর মিথেন নিয়ে গবেষণা করছেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইউয়ান নিসবেট। তিনি বলেন, উত্তর মেরু দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠেছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে পালা দিয়ে ওই অঞ্চলে মিথেনের উৎসও বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তন ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের বনভূমি বিশেষ করে উজান হিমালয় অঞ্চলের অরণ্যের উপর বাড়তি চাপ ফেলছে। ইতিমধ্যে বিপন্ন হিমালয় সন্নিহিত এলাকার বিরল প্রজাতির গাছপালা। জাতিসংঘের এক রিপোর্টে একথা বলা হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, বনাঞ্চলের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রায় ৪.৫ শতাংশ, বিশেষ করে উজান হিমালয় অঞ্চলে। নানা রকমের চ্যালেঞ্জ সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে এই কুপ্রভাবের ফলে। যেমন ক্রমবর্ধমান জনবসতি, জঙ্গল মাফিয়াদের গাছ কাটা, গবাদি পশুর বিচরণ ইত্যাদি। এর ঠিকমত মোকাবিলা করতে না পারায় বনভূমির বহু বিরল প্রজাতির গাছপালা আজ বিপন্ন। উজান হিমালয় অঞ্চল ছাড়া বিরল প্রজাতির গাছপালা আছে একাংশে ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বনাঞ্চলে। এই প্রসঙ্গে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, লোকসংখ্যা বাড়ছে, বিচরণভূমি বাড়ছে পাহাড়ে। বন ধ্বংস হলে ভূমিক্ষয় হয়। ভূমিধস নামে। সেই ধস গিয়ে পড়ে পাহাড়ি নদীতে। তাতে নদীর গভীরতা কমে যায়। নদীর পানি ধারণ ও বহন ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বন্যা হয়। নদী তার গতিপথ পাল্টায়। বনের কিছু এলাকা, বহু গ্রাম তলিয়ে যায় নদীগর্ভে। জলবায়ু পরিবর্তনের দরুন এটা হয়, নাকি এটা হলে জলবায়ূ পরিবর্তন হয়-সেটা কোটি টাকার প্রশ্ন। অন্যদিকে সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি রিপোর্টে বলা হয়েছে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার মানুষের আর্থিক বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হলে জলবায়ু পরিবর্তনের দিকে আরও বেশি নজর রাখতে হবে। দারিদ্র্য মোচন ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বাড়াতে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা আরও কম করতে হবে বিকাশমুখী দেশগুলোকে। বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়নের ফলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ ৪.৯ ভাগেরও বেশি জৈববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আর এ-সংক্রান্ত প্রকট সমস্যার সম্মুখীন হবে মূলত দরিদ্র দেশগুলোই। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সমীক্ষা রিপোর্টে এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। জার্মান জীববিজ্ঞানীরা জলবায়ুর ব্যাপক সমীক্ষা শেষে তাঁদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্ব উষ্ণায়নের হার ২১০০ সাল নাগাদ বাড়তে পারে গড়ে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৩.২৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট। তাতে ওই সময়ের মধ্যে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হতে পারে ৪.৯ ভাগ। এর ফলে যে কি অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে তা ভেবে শরীরে শিহরণ জাগে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামস্টি

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • পারিবারিক সু-শিক্ষা ও বর্তমান সমাজ
  • অপেক্ষা, আর কতোকাল
  • উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টিই বড়ো চ্যালেঞ্জ
  • প্রসঙ্গ : হকারমুক্ত ফুটপাত
  • জনদুর্ভোগের রকমফের
  • পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে
  • ‘যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে...’
  • খাদ্যে ভেজাল
  • রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কি আদৌ সম্ভব?
  • আসামে এনআরসি বিজেপির রাজনৈতিক খেলা
  • শ্রী শ্রী অনুকূল চন্দ্র
  • মিতব্যয়িতা
  • হংকং : কেন গণআন্দোলন
  • যানজট মুক্ত মহানগরী : কিছু প্রস্তাব
  • পানি নিয়ে ভাবনা
  • ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?
  • সৈয়দ মহসীন আলী : ক্ষণজন্মা রাজনীতিক
  • শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
  • রোহিঙ্গাঁ সমস্যা : প্রয়োজন আশু সমাধান
  • Developed by: Sparkle IT