শেষের পাতা সিলেটে ৬০ হাজার চামড়া ধ্বংস

বাজারে নিয়ন্ত্রণ নেই ব্যবসায়ীদের কাঁচা চামড়া রপ্তানীর দাবি

ইউনুছ চৌধুরী ঃ প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৮-২০১৯ ইং ০৪:৩১:২৭ | সংবাদটি ৫৬ বার পঠিত

পবিত্র ঈদুল আযহায় কোরবানীর পশুর চামড়া নিয়ে যে নজিরবিহীন বিপর্যয় হয়ে গেলো তাতে সিলেটে প্রায় ৬০ হাজার চামড়া বিনষ্ট হয়েছে বলে অনুমান করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে প্রায় ৫ কোটি টাকার সমপরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তারা। যদিও জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে এই সংখ্যা আরো বেশি।
এদিকে, চামড়ার ব্যবসা করলেও চামড়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই বলে জানিয়েছেন সিলেটের ব্যবসায়ীরা। সারাদেশের চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন ঢাকার আড়ৎদার ও ট্যানারি মালিকরা। চামড়া ব্যবসায়ী নিজেরাই পাওনা টাকা না পেয়ে দেউলিয়া হওয়ার অবস্থা।
ব্যবসায়ীরা বলেন, এবার যা হয়েছে তা নজিরবিহীন ও ভয়াবহ। এব্যাপারে এখনও যদি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া না হয়, তবে এই ব্যবসায় আর টিকে থাকা যাবে না।
ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, সিলেট জেলায় প্রতি ঈদে চামড়া সংগ্রহ করা হতো ৭০ থেকে ৮০ হাজার। এবার ২৫ হাজারের মতো চামড়া সংগ্রহ করা গেছে। প্রায় ৬০ হাজার চামড়া নষ্ট হয়েছে বলে জানান সিলেটের ব্যবসায়ীরা। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা বলে জানান তারা। যদিও জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস বলছে এবছর কোরবানী হয়েছে ৯৮ হাজার পশু। সে হিসেবে সংখ্যা আরো বাড়বে। এদিকে, মৌলভীবাজারে প্রতি বছর ১২/১৫ হাজার চামড়া সংগ্রহ করলেও এবছর মাত্র ৩/৪ হাজার চামড়া সংগ্রহ করা গেছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। প্রায় ১০/১২ হাজার চামড়া নষ্ট হয়েছে বলে জানান তারা। একই অবস্থা হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। জানা যায়, মৌসুমী ব্যাবসায়ীরা মাঠ পর্যায়ে চামড়া সংগ্রহ করে স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রি করেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সেই চামড়া নির্দিষ্ট উপায়ে সংরক্ষণ করে রাখেন। পরে সেই চামড়া তারা বিক্রি করেন ঢাকায় আড়তদারের নিকট। আড়ৎদাররা আবার সেই চামড়া ট্যানারির নিকট বিক্রি করেন।
ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ ও ক্ষোভের সাথে জানান, ঢাকায় আড়ৎদারের চামড়া বিক্রির পর টাকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ৪/৬ মাস বা আরেক কোরবানীর ঈদ পর্যন্ত। তারপরও পাওয়া যেতো পাওনা টাকার ৪০/৫০ ভাগ। তবে চামড়া ব্যবসায় এই নৈরাজ্য শুরু হয়েছে ২০১৫ সাল থেকে। এবছর যা বিপর্যয়ের পর্যায়ে চলে গেছে। এবছর ব্যবসায়ীরা তাদের পাওয়া টাকার মাত্র ৮/১০ ভাগ টাকা পেয়েছেন। কারো ২০ লক্ষ টাকা পাওনা, তাকে দেয়া হয়েছে মাত্র ৭০/৮০ হাজার টাকা। কেউ ১০ লক্ষ টাকা পাবেন তিনি পেয়েছেন মাত্রা ৪০ হাজার টাকা। এভাবে সাধারণ ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা আড়ৎদারদের নিকট আটকা পড়েছে। অপরদিকে, টাকা চাইলে আড়ৎদাররা বলেন তাদের শত শত কোটি টাকা ট্যানারির নিকট আটকা পড়ে আছে।
চামড়া সংগ্রহে নজিরবিহীন অবস্থার কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, এতিমখানা ও মাদরাসার জন্য চামড়া সংগ্রহ করে চরম বিপাকে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো। যেখানে চামড়া সংগ্রহ করার জন্য আমরা খোঁজ করতাম সেখানে মানুষ সড়কে চামড়া ফেলে পালিয়ে গেছে। একজন ব্যবসায়ী জানান, নগরীর একটি মাদরাসা থেকে তাকে ফোন করে অনুরোধ জানায় তাদের চামড়াগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রায় ৩ হাজার চামড়া তারা সরাতে গেলেও অনেক টাকার প্রয়োজন। রাতে তাদের চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে জেনেও সেই চামড়া নিয়ে আসি। সেগুলো থেকে মাত্র ১শ চামড়া ভালো ছিল বাকিগুলো ফেলে দিতে হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, চামড়া শুধু ক্রয় করলেই হবে না একে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করতেও টাকার প্রয়োজন। একটি চামড়া সংরক্ষণে ৭/৮ কেজি লবণ লাগে। চামড়ার কাজ সবাই করতে চায় না, ফলে চামড়া শ্রমিকের মজুরী ১৫ থেকে ১৮শ’ টাকা। তাই, পূঁজি না থাকলে চামড়া পেলেই সংরক্ষণ করা যায় না। এদিকে, আবার রয়েছে লবণ ব্যবাসয়ীদের কারসাজি। যেই চামড়ার দাম নেই দেখেছে তারা লবণ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। সাড়ে ৭শ থেকে ৮শ টাকা লবণের বস্তা হলেও লবণ বিক্রি হয়েছিল ১৩শ থেকে ১৪ টাকায়। সময় মতো লবণ পেলে আরো প্রায় ১০ হাজার চামড়া সংরক্ষণ করা যেতো বলে ব্যবসায়ীরা জানান। এক ব্যবসায়ী জানান, লবণের জন্য তিনি অগ্রীম টাকা দিয়ে রেখে ছিলেন। কিন্তু যখন চামড়ার দাম পড়ে গেলো লবণ ব্যবসায়ী জানান, তার লবণ শেষ হয়ে গেছে অন্য জায়গা থেকে এনে দিতে হবে। পরে অন্য জায়গা থেকে এনে দেয়ার কথা বলে বস্তা প্রতি আরো ২শ টাকা বেশি রেখেছে।
সুনামগঞ্জের জাউয়া বাজারের চামড়া ব্যবসায়ী বাবুর্চি জয়নাল আবেদীন জানান, ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীদের এবার পথে বসতে হবে। ক্ষতি হবে জেনেও চামড়া সংগ্রহ করেছি। এখন সরকার বিশেষ ব্যবস্থা না নিলে চামড়া সংগ্রহটাই বড় ক্ষতির কারণ হবে।
চামড়া ব্যবসাটি গভীর সংকটে পড়েছে উল্লেখ করে সিলেট শাহজালাল বহুমুখী চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহ সভাপতি শাহিন আহমদ বলেন, সিলেটে প্রায় ৪শ’ চামড়া ব্যবসায়ী ছিলেন। এখন মাত্র ২০/২৫ জন এই ব্যবসায় টিকে আছেন। তারা লাভ করছেন সেজন্য নয় বরং বিপুল অংকের টাকা আড়ৎদারের নিকট আটকা পড়ে আছে। এখন ব্যবসা বন্ধ করলে সেই টাকা খোয়া যাবে বলে অনেকে ব্যবসা টিকেয়ে রেখেছেন। আবার অনেকে যাওয়ার কোন জায়গা নেই বলে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক ব্যবসায়ী পূঁজি হারাতে হারাতে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে কাঁচা চামড়া রপ্তানীর সুযোগ দেয়ার দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করেছিল, তিনি যেনো ঢাকায় আসেন। তিনি জানিয়ে দেন, কথা বলে কি করবেন। আমরা কথা বলতে বলতে হয়রান হয়ে গেছি। কিন্তু কোন কাজ হয়না। সরকারের টাকার প্রয়োজন নেই, তাদের টাকাগুলো ছাড়ের ব্যবস্থা করে দিলেই ব্যবসা চলবে। এখানে কোন প্রক্রিয়ায় কারা চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন তা বের করে ব্যবস্থা নেয়া হোক। তিনি বলেন, এবার নগদ টাকা দিয়ে চামড়া ক্রয় না করলে আড়ৎদারদের নিকট চামড়া বিক্রি করবো না। প্রয়োজনে সব চামড়া ফেলে দিব। তিনি আক্ষেপের সাথে জানান, ভারতে চামড়া ৮শ থেকে সাড়ে ৮শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমাদের চামড়া ধ্বংস করা হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের চামড়া শিল্পও ধ্বংস হবে এবং অন্যদেশ সেই সুযোগ নিবে। এব্যাপারে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এর পরিচালক খন্দকার সিপার আহমদ বলেন, চামড়া বিপর্যয়ের পর সরকার যখনই কাঁচা চামড়া রপ্তানীর কথা বলেছে তখনই এর বিরুদ্ধে ট্যানারিগুলো সরব হয়ে উঠেছে। এতে বুঝা যায় এখানে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। চামড়া যদি মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয় তা হলে কাঁচা রপ্তানী করাই ভালো। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। সরকার এফবিসিসিআই এর মাধ্যমে আড়ৎদারদের নিকট স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাওনা আদায়ের ব্যবস্থা করেছে। তিনি সিলেটের ব্যবসায়ীদের পাওনা টাকার পরিমাণ উল্লেখ করে তালিকা পাঠিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা শিঘ্রই এর সুফল পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

 

শেয়ার করুন
শেষের পাতা এর আরো সংবাদ
  • সুনামগঞ্জে মুদি ব্যবসায়ী হত্যা মামলায় যুবকের যাবজ্জীবন
  • সিসিকের ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন লিপন বক্স
  • কমলগঞ্জে দুই সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশু নিহত ঃ আহত-৫
  • সিলেটের সম্ভাবনাময় পর্যটন নিয়ে সরকার আন্তরিক
  • মাধবপুরে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন
  • নদী রক্ষায় সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে
  • স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা পিযুষের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
  • টেলিনর হেলথ-এর সব ধরণের সেবা এখন সিলেটবাসীর হাতের নাগালে
  • জামালগঞ্জে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে যুবকের মৃত্যু
  • বদলে গেছে ঢাকা দক্ষিণ বাজারের ভাদেশ্বর রোড
  • রোহিঙ্গাদের জন্য আরও ৮ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড দেবে যুক্তরাজ্য
  • মোহামেডানসহ চার ক্লাবে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম
  • ছবি
  • রেলগেইট মারকাজ পয়েন্টে সিএনজি অটোরিক্সা শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষে ৯জন আহত
  • জীবনে বহুমাত্রিক বিকাশের জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই -সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এ এম এম খায়রুল কবীর
  • লিডিং ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগের সেমিনার অনুষ্ঠিত
  • এনআইডি জালিয়াতি জয়নালের জবানবন্দিতে ‘আরও নাম’
  • ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ২০ শতাংশ কমেছে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
  • দুর্নীতিবাজ কেউ রেহাই পাবে না --------------স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
  • টিআইবির চিঠিতে বেক্সিমকোর প্রশংসা শুদ্ধাচারের প্রত্যাশা
  • Developed by: Sparkle IT