উপ সম্পাদকীয়

বৃহত্তর সিলেটবাসীর একটি গৌরবগাঁথা

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৮-২০১৯ ইং ০০:১৪:৪৪ | সংবাদটি ৭৩ বার পঠিত

সিলেট মহানগরীটি প্রকৃতির রূপসুধা আহরণ করে বেড়ে উঠেছে কালক্রমে। মোগল আমল থেকে এই মহানগরীটির সৃষ্টিকাল শুরু হয়, সমৃদ্ধ হয়। ইংরেজ জমানায় আবার নানা ধরনের কূটকৌশলের কারণে নানাধরনের কাটা ছেড়ায়ও পড়েছে একাধিকবার। তারপরেও সিলহট বা সিলেট শহর যা কালক্রমে মহানগরী হিসাবে আবির্ভূত রয়েছে। এটি একটি বিস্ময়কর মহানগরী। হযরত শাহজালাল মজররদ ইয়ামনী (র.) এর আগমনে যেমন এটি ধন্য হয়েছে তেমনি এখানে স্বাধীনতা অর্থাৎ ইংরেজ শাসকদের নাগপাশ বা অধীনতা থেকে মুক্তিলাভের অগ্র সৈনিক ভ্রাতৃদ্বয় যারা আত্মত্যাগ বা শাহাদত বরণ করেছিলেন তাদেরকে বরণ করে হয়েছে ধন্য। সৈয়দ মাহদী আর সৈয়দ মোহাম্মদ হাদী ভ্রাতৃদ্বয় প্রথমেই এই উপমহাদেশে নিজেদের জীবনদান করেন সিলেটের ইংরেজ কালেক্টর লিন্ডসের নিজ হাতের পিস্তলের গুলিতে। কারণ তারা দুই ভাই নিজ জীবনের বিনিময়ে হলেও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করতে আর জাতীয় স্বার্থে আপন প্রাণ উৎসর্গ করার শপথ গ্রহণে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে। সৈয়দ মোহাম্মদ মাহদী আর সৈয়দ মোহাম্মদ হাদী এই দুই ভাই-ই ভারত উপমহাদেশে ইংরেজ হঠাও আন্দোলনে প্রথম প্রাণদানকারী শহীদ। অতীতকে ভুলতে যাওয়াদের দলে ভিড়ে আমরাও এই দুই ভাইয়ের সমাধি পর্যন্ত অযতœ অবহেলায় ফেলে রেখেছিলাম এবং কালক্রমে সেগুলিকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিলাম। সমাজ সচেতন ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই দুই প্রথম (ইংরেজ খেদাও) যোদ্ধা শহীদ ভ্রাতৃদ্বয়ের সমাধি খুঁজে বের করেন এবং সেগুলি রক্ষার্থে উদ্যোগী হন। খুব সম্ভবত লোকমুখে শুনতে পেয়ে আমিই বছর তিরিশেক আগে ব্যাপারটি নিয়ে বেশ জোরালো ভাষায় লেখালেখি করেছিলাম। সচেতন মহল সাড়া দিয়েছেন, প্রশাসনও এগিয়ে এসেছিলেন ত্বরিত গতিতে। তাদের কবরগাহ উদ্ধার করা হয়েছিলো এবং সেগুলি রক্ষাকল্পে ব্যবস্থাও গৃহিত হয়েছিলো।
আমরা সিলেটবাসী বেভুলা নই বা অকৃতজ্ঞও নই। আমরা সবসময়ই নিজ আদর্শ আর ঐতিহ্যকে জাগরুক রাখতে চাই। এমনকি বর্তমান যুগের আধুনিকতার ছোবলে প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার মতো স্মৃতি বা স্মারক চিহ্নগুলি আমরা পুনর্জীবিত, পুননির্মিত বা পুনঃসংস্কার এর ব্যবস্থা নিতে প্রায় ঘুমন্ত প্রশাসনকে জাগিয়ে তুলেছি এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছি, সেটাই বা কম কিসে। বর্তমান কালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সিলেটের স্মারক চিহ্ন হিসাবে আলী আমজাদ সাহেব এর ঘড়ি আর কীনব্রীজের ছবিগুলি ভেসে উঠে। নবাব আলী আমজাদ সাহেব আপন লোকলস্কর নিয়ে রাজসিক বজরাতে করে সিলেট আগমন করে তীরে নামতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। তিনি সেখানে শুধু নিজের জন্য নয় পরার্থে একটি ঘাট নির্মাণ এর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সেই ঘাটটি অদ্যাবধি ব্যবহারযোগ্য আছে এবং প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সেটি আপন প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করছেন। আলী আমজদের ঘাট বলতে যেমন আমরা সেই নির্দিষ্ট ঘাটটিকে বুঝি তেমনি সকল মানুষকে নির্দিষ্ট সময় মেপে চলার সুবিধা দান করতে লন্ডনের বিগবেন ঘড়ির আদলে তিনি একটি ঘড়িও স্থাপন করেন এই সুরমা তীরে এবং বলাবাহুল্য নির্দিষ্ট ঘাটটির সন্নিহিত স্থানটিতে। শুনেছি এককালে নাকি ঘড়িটির ঘন্টাধ্বনি শহরের মধ্যভাগ পর্যন্ত লোকের কর্নকূহরে পৌছাত। সময়ের বিবর্তনে সেটি অকার্যকর হয় নাই কারণ পাকিস্তানী জামানায় যখন আমরা সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলে পাঠ গ্রহণ করতে যেতাম আমরা নবাব আলী আমজাদ সাহেব এর ঘড়িটি দেখেই সময়টি মেপে নিতাম। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালে নানা প্রকার ধুন্ধুমার এর কারণে ঘড়িটির কলকব্জা অকার্যকর হয়ে পড়ে। সেটি সময় গননা বন্ধ করে দেয়। পর্যাক্রমে সিলেট পৌরসভা পরবর্তীতে সিলেট সিটি কর্পোরেশন সেটিকে পুনঃচালুকরণ এর লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন কিন্তু সেটি ছিলো একান্তই আধুনিক প্রক্রিয়ায়। তাই বারবার স্থাপন, পুনঃস্থাপন করার পরও সেই চিরচেনা অবয়ব থাকা সত্ত্বেও ঘড়িটি আর প্রাণ পায় নাই। আশা করবো সেই ইংরেজ কোম্পানীটি সেই আমলে ঘড়িটির যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছিল তাদের সাথে যোগাযোগ করে আসল আর অকৃত্রিম যন্ত্রপাতি এনে লাগানো হোক ঘড়িটিতে। হোক সেটা মান্ধাতার আমলের, হোক সেটা বড় চ্যাপ্টা চাবী দিয়ে সপ্তাহে একবার দম দিয়ে চালানোর ব্যবস্থা সমেত। তারপরেও তো ঘড়িটি প্রাণ পাবে। আদি সিলেটের রূপটি ফুটিয়ে তুলবে। মানুষজন রোমাঞ্চিত হবে নিজেদের অতীতকে আবার ঝালাই করে নিতে পারবে।
সিলেট এর আরেক ঐতিহ্য ক্বীন ব্রীজ। এটি সিলেট শহরকে যুক্ত করেছিল নদীটির (সুরমা) অপর পাশের বিরাট জনগোষ্ঠীর সাথে। অনেক কষ্টে খেয়া নৌকা বা নিজ বাহনের গয়না নৌকাই ছিলো ভরসা। ধীরলয়ের জীবনের সাথে নদী পারাপারটি আরেকটি ঝক্কি। দৈনন্দিন প্রয়োজনের নিরিখে সেটিকে মেনে নিয়েছিলো নদী পারাপারে রত জনগোষ্ঠী। এ জাতীয় কষ্টকর আবার অবমাননাকর ব্যবস্থাটি মনঃপুত হয়নি আরেকজন করিৎ কর্মা, উদার হৃদয় ব্যক্তিত্বের। সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ থানাধীন রণকেলী বড়বাড়ি নিবাসী তৎকালীন আসাম পরিষদের (সংসদ) সদস্য মৌলবী আব্দুল রহিম চৌধুরী সোনা মিয়া সাহেবের। তিনি বিষয়টি নিয়ে দেনদরবার শুরু করেন উচ্চ মহলে। আসাম আইন পরিষদে বিষয়টি প্রস্তাবাকারে পেশ করেন। সংসদে তিনি জোরালো ভাষায় সিলেট শহরের মধ্যখান দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণের দাবী পেশ করেন।
সুদূর চীন থেকে উৎসারিত ব্রহ্মপুত্র নদীটি ভারতের আসাম রাজ্যটি পেরিয়ে সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী আমলশীদ নামক জায়গায় এসে দুভাগ হয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে সুরমা এবং কুশিয়ারা নাম ধারণ করে দুটি পৃথক নদী হিসাবে। কুশিয়ারা নদী দিয়ে প্রবাহিত হতো সত্তর শতাংশ পানি আবার সুরমা নদী দিয়ে প্রবাহিত হতো বাকি তিরিশ শতাংশ। প্রবাহিত পানির পরিমাণ এর রকমফের হলেও সুরমা নদিিট আকারে ছিল সুবিশাল তেমনি ছিলো এর নাব্যতা। বিরাট আকার এর স্টীমার এর সাথে অন্যান্য ধরনের মধ্যম বা ছোট আকার এর জলযান সমুহের আধিক্য থাকায় নদী পারাপার রত নৌকা যাত্রীরা পড়তেন বিপাকে। বিরাট আকার এর ঢেউয়ের কবলে পড়ে নৌকাডুবি ছিলো নিত্যকার ঘটনা প্রাণহানিও হতো আকছার। এতো বড় বড় মানুষ আসাম আইন পরিষদে সিলেট অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করলেও এই জাতীয় নদী পারাপার বিষয়ক সমস্যাটি নিয়ে ছিলেন প্রায় বেখেয়াল। তদানীন্তন সমাজের বিত্তশালী আবার অগ্রসর চিন্তার ধারক মৌলবী সোনা মিয়া সাহেব বিষয়টি নিয়ে ভাবনায় পড়েন এবং আসাম আইন পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন করেন, তৎকালীন প্রমত্তা সুরমা নদীর উপরে সেতু নির্মাণের ব্যাপারে প্রাঞ্জল যুক্তি, প্রয়োজনীয়তার নিরিখে আর জনদুর্ভোগ লাঘবে সেতুটির গুরুত্ব সবকিছুই মৌলবী আব্দুর রহীম চৌধুরী সোনা মিয়া সাহেব তুলে ধরেন এবং সেতুটি নির্মাণ বিষয়ক প্রস্তাবটি পাশ করিয়ে নিতে সক্ষম হন। বাকি ছিলো বরাদ্দ প্রাপ্তি। সেটিও তিনি নিশ্চিত করেন দিল্লী, কলকাতা সব জায়গায় ধরণা দিয়ে কারণ সর্বাধিক আলোকিত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একজন হিসাবে পরিগণিত মরহুম আব্দুর রহিম সোনা মিয়া সাহেবের ছিলো সর্বমহলে যাতায়াত এর অবাধ সুযোগ ও গ্রহণযোগ্যতা। তিনি সেই অনুকূল পরিস্থিতিটা কাজে লাগান। তৎসঙ্গে সিলেট তথা আসামের অন্যান্য বরেণ্য ব্যক্তিত্বরাও সহযোগিতা আর সহমর্মিতার হাত বাড়ান মৌলবী সোনা মিয়া সাহেবের ব্যতিক্রমধর্মী প্রচেষ্টা বাস্তবে রূপ লাভ করতে। তার একক এবং সম্মিলিত উভয় প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে সুরমা নদীর উপরে সেতুটি নির্মিত হয়। প্রগতি বিরোধিরা নানা প্রকার কুটকৌশল আর অপপ্রচার এর দ্বারা সেটিকে বিঘিœত করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়। তদানীন্তন আসামের ডেপুটি গভর্ণর মাইকেল ক্বীন সেতুটি উদ্বোধন করেন এবং জনসাধারণের সুবিধার্থে উন্মোচিত করে দেন। জনাব সোনা মিয়া সাহেব গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার এলাকাবাসীকে ব্যবসা বাণিজ্যে নৌ সুবিধা ব্যবহার করে কুশিয়ারা নদীতে পৌঁছার এবং সুদূর মার্কুলী পর্যন্ত পৌঁছার সুবিধার্থে গোলাপগঞ্জ থেকে বিরাট একটি খাল খনন করিয়ে দেন যা আজও মৌলবীর খাল নামে পরিচিত। সিলেট জকিগঞ্জ সড়কটিও তার প্রচেষ্টায় প্রাণ পায়।
বড়ে মুশকিলছে হোতা হ্যায় চমনমে দিদাওয়ার পয়দা।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT