পাঁচ মিশালী

প্রসঙ্গ: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য

মিহির রঞ্জন তালুকদার প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৮-২০১৯ ইং ০০:১৮:২১ | সংবাদটি ১৪৩ বার পঠিত

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের [১২০১-১৮০০] প্রথম কাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। বাংলা ভাষায় কোন লেখকের প্রথম এককগ্রন্থ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এ গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ প্রেমে রাধা ও গোপীদের পাগল প্রায় অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বসস্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লব পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুরা জেলার কাকিল্যা গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বাড়ির গোয়ালঘর থেকে অযতেœ রক্ষিত অবস্থায় একরাশ পুঁিথর সঙ্গে এ গ্রন্থটি পান। পুঁিথর প্রথম দুটি এবং শেষ পৃষ্ঠা পাওয়া যায় নি বলে এর নাম ও কবির নাম স্পষ্ট করে জানা যায় নি। কবির ভনিতায় ‘চন্ডীদাস’ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘ বড়– চন্ডীদাস’ পাওয়া যাওয়ায় এই গ্রন্থের কবি হিসেবে বড়ু চন্ডীদাসকে গ্রহণ করা হয় আবার গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠা না পাওয়াতে এর নামও পাওয়া যায় নি। তবে সম্পাদক বসস্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লব ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল রচিত ‘চন্ডীদাস চরিত’, ত্রৈলোক্য আচার্যের ‘বিদ্যাপতি’ ইত্যাদি গ্রন্থ অবলম্বনে এর নাম দেন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। অবশ্য পুঁিথতে প্রাপ্ত একটি চিরকুটে ‘শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ’ লেখা থাকায় অনেকে গ্রন্থটিকে ‘শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ’ নামকরণের পক্ষপাতী ছিলেন। গ্রন্থটিতে মোট ১৩ টি খন্ড রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে ১৩টি খন্ডের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করা হল। কাহিনী সূত্র বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা ড. সৌমিত্র শেখর।
১. জন্ম খন্ড: এই খন্ডে বর্ণিত হয়েছে, কৃষ্ণ ও রাধা উভয়েই ঈশ্বরের ইচ্ছায় মর্তে মানবরূপে জন্ম নিয়েছে। পাপী কংসকে বধ করার জন্য কৃষ্ণ দেবকী ও বাসুদেবের সন্তান হিসেবে জন্ম নেয়। কিন্তু জন্ম মাত্র বাসুদেব গোপনে কৃষ্ণকে অনেক দূরে বৃন্দাবনে জনৈক নন্দ গোপের ঘরে রেখে আসেন। সেখানেই দৈব ইচ্ছায় পদ্মার গর্ভে জন্ম নেয় রাধা। বালিকা বয়সেই আয়ান গোপের (ঘোষের) সঙ্গে রাধার বিয়ে হয়। আয়ান গোচারণে গেলে বৃদ্ধা পিসি বড়ায়িকে রাধার তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।
২. তাম্বুল খন্ড: রাধা অন্য গোপীদের সঙ্গে মথুরাতে দই-দুধ বিক্রি করতে যায়। বড়ায়ি তার সঙ্গে। বৃদ্ধা বড়ায়ি পথে রাধাকে হারিয়ে ফেলে এবং কৃষ্ণকে রাধার বর্ণনা দিয়ে জিজ্ঞেস করে এমন রূপসীকে দেখেছে কি না। এই রূপের বর্ণনা শুনে রাধার প্রতি কৃষ্ণ অনুরাগ অনুভব করে। কৃষ্ণ বড়ায়িকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু বিবাহিতা রাধা সেই উপহার পদদলিত করে।
৩. দান খন্ড: এই খন্ডে মথুরাগামী রাধা ও গোপীদের পথ রোধ করে কৃষ্ণ। তার দাবি নদীর ঘাটে পারাপার-দান বা শুল্ক দিতে হবে, তা না হলে রাধার সঙ্গে মিলিত হতে দিতে হবে। রাধা কোনোভাবেই এ প্রস্তাবে রাজি নয়। এদিকে তার হাতে কড়িও নেই। সে নিজের রূপ কমাবার জন্য চুল কেটে ফেলতে চাইল; কৃষ্ণের হাত থেকে বাঁচার জন্য বনে দৌড় দিল। কৃষ্ণ পিছু ছাড়বার পাত্র নয়। অবশেষে কৃষ্ণের ইচ্ছায় কর্ম হয়।
৪. নৌকা খন্ড: এরপর থেকে রাধা কৃষ্ণকে এড়িয়ে চলে। কৃষ্ণ নদীর মাঝির ছদ্মবেশ ধারণ করে। একজন পার করা যায় এমন একটি নৌকাতে রাধাকে তুলে সে মাঝ নদীতে নিয়ে নৌকা ডুবিয়ে দেয়। নদীতীরে উঠে লোকলজ্জার ভয়ে রাধা সখীদের বলে যে, কৃষ্ণ তার জীবন বাঁচিয়েছে।
৫. ঋার খন্ড: রাধা আর বাড়ির বাহিরে আসে না। শাশুরি বা স্বামীকেও সে আগের ঘটনাগুলো ভয়ে ও লজ্জায় খুলে বলে নি। রাধা অদর্শনে কৃষ্ণ কাতর। সে বড়ায়িকে দিয়ে রাধার শাশুড়িকে বোঝায়, ঘরে বসে থেকে কি হবে, রাধা দুধ-দই বেচে কয়টি পয়সা তো আনতে পারে। শাশুড়ির নির্দেশে রাধা বাইরে বের হয়। কিন্তু প্রচন্ড রোদে দুধ-দই বহন করতে গিয়ে রাধা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ সময় কৃষ্ণ ছদ্মবেশে মজুরি করতে আসে। পরে ভার বহনের মজুরির বদলে রাধার আলিঙ্গন কামনা করে। রাধা এই চতুরতা বুঝতে পারে। সেও কাজ আদায়ের লক্ষ্যে মিথ্যে আশ্বাস দেয়। কৃষ্ণ আশায় আশায় রাধার পিছু পিছু ভার নিয়ে মথুরা পর্যন্ত চলে।
৬. ছত্র খন্ড: দুধ-দই বেচে মথুরা থেকে এবার ফেরার পালা। কৃষ্ণ তার প্রাপ্য আলিঙ্গন চাইছে। রাধা চালাকি করে বলে এখন প্রচন্ড রোদ তুমি আমাদের মাথায় ছাতা ধরে বৃন্দাবন পর্যন্ত চলো। কৃষ্ণ ছাতা ধরতে লজ্জা ও অপমান বোধ করছিল। তবু আশা নিয়ে কৃষ্ণ ছাতা ধরেই চলল। কিন্তু তার আশাপূর্ণ করেনি রাধা।
৭. বৃন্দাবন খন্ড: রাধার বিরুদ্ধ মনোভাব কৃষ্ণের ভাবান্তর ঘটায়। কৃষ্ণ অন্য পথ অবলম্বন করে। ছলচাতুরি না করে বরং বৃন্দাবনকে অপূর্ব শোভায় সাজিয়ে তুলল। রাধা ও গোপিরা সেই শোভা দর্শন করে কৃষ্ণের উপর রাগ ভুলে যায়। তারা পরিবর্তিত কৃষ্ণ দেখতে আগ্রহ দেখায়। কৃষ্ণ সব গোপীকে দেখা দেয় এবং রাধার সঙ্গে তার দর্শন ও মিলন হয়।
৮. কালিয়দমন খন্ড: যমুনা নদী বৃন্দাবনের উপর দিয়ে প্রবাহিত। সেখানে কালিয়নাগ বাস করে। তার বিষে সেই জল বিষাক্ত। কৃষ্ণ কালিয়ানাগকে তাড়াতে নদীর জলে ঝাঁপ দেয়। কৃষ্ণের বীরত্বে কালিয়নাগ পরাস্ত হয় এবং দক্ষিণ সাগরে বসবাস করতে যায়। কালিয়নাগের সঙ্গে কৃষ্ণ যখন জলযুদ্ধে লিপ্ত তখন রাধার বিশেষ কাতরতা প্রকাশ পায়।
৯. যমুনা খন্ড: রাধা ও গোপীরা যমুনাতে জল আনতে যায়। কৃষ্ণ যমুনার জলে নেমে হঠাৎ ডুব দিয়ে আর ওঠে না। সবাই মনে করে কৃষ্ণ ডুবে গেছে। এদিকে কৃষ্ণ লুকিয়ে কদম গাছে বসে থাকে। রাধা ও সখীরা জলে নেমে কৃষ্ণকে খুঁজতে থাকে। কৃষ্ণ নদীতীরে রাধার খুলে রাখা হার চুরি করে আবার গাছে গিয়ে বসে।
১০. হার খন্ড: পরে কৃষ্ণের চালাকি বোঝা যায়। হার না পেয়ে রাধা কৃষ্ণের পালিতা মা যশোদার কাছে নালিশ করে। কৃষ্ণও মিথ্যা বলে মাকে। সে বলে আমি হার চুরি করব কেন, রাধাতো পাড়ার সম্পর্কে আমার মামি। এদিকে বড়ায়ি সব বুঝতে পারে এবং রাধার স্বামী আয়ান হার হারানোতে যাতে রাগান্বিত না হয় সে জন্য বলে যে, বনের কাঁটায় রাধার গজমোতির হার ছিন্ন হয়ে হারিয়ে গেছে।
১১. বান খন্ড: মায়ের কাছে নালিশ করায় কৃষ্ণ রাধার উপর ক্রুদ্ধ। রাধাও কৃষ্ণের প্রতি প্রসন্ন নয়। বড়ায়ি বুদ্ধি দিলো, কৃষ্ণ যেন শক্তির পথ পরিহার করে মদনবাণ বা প্রেমে রাধাকে বশীভূত করে। সে মতে কৃষ্ণ পুষ্পধনু নিয়ে কদমতলায় বসে। রাধা কৃষ্ণের প্রেমবাণে মূর্ছিত ও পতিত হয়।
১২. বংশী খন্ড: রাধাকে আকৃষ্ট করার জন্য সময়-অসময়ে কৃষ্ণ বাঁশিতে সুর তোলে। বাঁশির সুর শুনে রাধার রান্না এলোমেলো হয়ে যায়, মন কুমারের চুল্লি¬র মত পুড়তে থাকে, রাত্রে ঘুম আসে না, ভোরবেলা কৃষ্ণ অদর্শনে রাধা মূর্ছা যায়। বড়ায়ি রাধাকে পরামর্শ দেয়, সারারাত বাঁশি বাজিয়ে সকালে কদমতলায় কৃষ্ণ বাঁশি শিয়রে রেখে ঘুমায়। তুমি সেই বাঁশি চুরি করো। তাহলেই সমস্যার সমাধান। রাধা তাই করে। রাধা কৃষ্ণকে বলে, বড়ায়িকে সাক্ষী রেখে কৃষ্ণের কথা দিতে হবে যে, সে কখনও রাধার কথার অবাধ্য হবে না ও রাধাকে ত্যাগ করে যাবে না, তাহলেই বাঁশির সন্ধান মিলতে পারে। কৃষ্ণ কথা দেয়; বাঁশি ফিরে পায়।
১৩. বিরহ খন্ড: কৃষ্ণ তারপরও রাধার উপর উদাসীন। এদিকে মধুমাস সমাগত। রাধা বিরহ অনুভব করে এবং বড়ায়িকে বলে কৃষ্ণকে এনে দিতে। দুধ-দই বিক্রির ছল ধরে রাধা নিজেও কৃষ্ণকে খোঁজার জন্য বের হয়। অবশেষে বৃন্দাবনে বাঁশি বাজানো অবস্থায় কৃষ্ণকে পাওয়া যায়। কৃষ্ণ রাধাকে বলে , তুমি আমাকে নানা সময় লাঞ্ছনা করেছো, ভার বহন করিয়েছো, মায়ের কাছে আমার নামে বিচার দিয়েছো, তাই তোমার উপর আমার মন উঠে গেছে। রাধা বলে, তখন আমি বালিকা ছিলাম, আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমার বিরহে মৃতপ্রায়। কৃষ্ণ বলে, বড়ায়ি যদি আমাকে বলে যে, তুমি রাধাকে প্রেম দাও, তাহলে আমি তোমার অনুরোধ রাখতে পারি। অবশেষে বড়ায়ি রাধাকে সাজিয়ে দেয় এবং রাধা কৃষ্ণের মিলন হয়। রাধা ঘুমিয়ে পড়লে কৃষ্ণ নিদ্রিতা রাধাকে রেখে কংস বধ করার জন্য মথুরাতে চলে যায়। ঘুম থেকে উঠে কৃষ্ণকে না দেখে রাধা আবার বিরহকাতর হয়। রাধার অনুরোধে বড়ায়ি আবার কৃষ্ণের সন্ধানে যায় এবং মথুরাতে কৃষ্ণকে পেয়ে অনুরোধ করে। কিন্তু কৃষ্ণ বৃন্দাবনে যেতে চায় না। কৃষ্ণ বলে, আমি সব ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু কটু কথা সহ্য করতে পারি না। রাধা আমাকে কটু কথা বলেছে। (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য এখানেই ছিন্ন। পৃষ্ঠা পাওয়া যায়নি)

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT