পাঁচ মিশালী

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও শান্তিনিকেতন

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৮-২০১৯ ইং ০০:২০:১৪ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আমাদের বিস্ময়ের অবধি নেই। সাহিত্য ও সংস্কৃতির সব শাখাতেই তিনি প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। কোন কোনটিতে তো তিনিই পথিক্য। দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পনের বছর বয়সে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বনফুল’ বের হয়। সেই থেকে আশি বছর অর্থাৎ সুদীর্ঘ পয়ষট্টি বছরের কর্মময় জীবনে তিনি অমিত সোনার ফসল ফলিয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলা শান্তি নিকেতন।
বিজ্ঞান ও প্রকৃতি প্রেমিক মানুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ পরিবেশ ভাবনা থেকেও দূরে ছিলেন না। প্রখর বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন, ‘অন্ন চাই, প্রাণ চাই, চাই মুক্ত বায়ু, চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু; তার চাওয়া পাওয়ায় পরিবেশের ভূমিকাই মুখ্য। পরিবেশ অনুকূল না হলে তার ওই চাওয়া যে কখনও পাওয়ার রূপ নেবে না তা তিনি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। তাই রবীন্দ্রনাথ বিশ শতকের শুরুতেই (১৯০১ খ্রি.) কলকাতার প্রায় ১০০ মাইল দূরে বীরভুম জেলার বোলপুরের ভুবন ডাঙায় পিতৃদেব দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত আশ্রমে একটি ব্রহ্ম বিদ্যালয় স্থাপন করেন প্রাচীন ভারতের ‘তপোবনের’ ধারনাকে সামনে রেখে। পরবর্তীকালে যার নাম হয় শান্তিনিকেতন। যেখানে বাড়িগুলো হবে মাটির তৈরি, পাঠদান হবে গাছতলায়। পরিবেশ হবে গাছ গাছালি সমৃদ্ধ ‘ছায়া-সুনিবিড়’। রবীন্দ্রনাথ তাই প্রকৃতির মাঝেই গড়ে ছিলেন শান্তিনিকেতন।
আজ যাকে আমরা পরিবেশ বলছি, যার বিষয়ে আজ সারা পৃথিবীর মানুষ মুখর হয়ে উঠেছেন, তখন প্রাচীন ভারতের তপোবনগুলোতে সেই পরিবেশের ব্যাপারটা ছিল অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়ানো। প্রকৃতির কথা তখন কেউ আলাদা করে ভাবতেন না। প্রকৃতির মধ্যেই তারা বাস করতেন। গাছপালা-পশু পাখিকে বাদ দিয়ে তাদের স্বতন্ত্র কোন জীবন ছিল না। রবীন্দ্রনাথ এমনই একটা পরিবেশ তৈরি করলেন শান্তিনিকেতনে।
রবীন্দ্রনাথ যেখানে মানুষ হয়েছিলেন, সেই চিৎপুর জোঁড়াসাঁকো অঞ্চলে কলকাতা নগরায়নের কুফলগুলো আজ থেকে শতাধিক বছর আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে সংবেদনশীল কবি যে নির্বাসিত বোধ করবেন তাতে আর আশ্চর্য কি? তাই তিনি বলেছেন ‘সবার মাঝে আমি ফিরি একালা কেমন করে কাটে সারাটা বেলা। ইটের পরে ইট, মাঝে মানুষ-কীট-নাইকো ভালোবাসা, নাইকো খেলা। (বধূ মানসী)-এই যার মনোজগতের পরিণতির সঙ্গে সঙ্গে গাছ পালার প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে জীবনকে খুঁজে পেয়েছেন।
বন বানীর ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, আমার ঘরের আশে পাশে যে সব আমার বোবা-বন্ধু আলোর প্রেমে মত্ত হয়ে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে তাদের ডাক আমার মনের মধ্যে পৌঁছল। কথাটা রবীন্দ্রনাথের জীবনে শুধু তত্ত্বকথা হয়ে থাকেনি। গাছপালা সম্পর্কে তার গভীর আগ্রহ ও জ্ঞান ছিল তা খুব কম কবির মধ্যেই দেখা গেছে। রবীন্দ্রনাথের কাব্যেই শুধু নয় গদ্য রচনাতেও বৃক্ষ ও পরিবেশ বন্দনার পরিচয় পাওয়া যায় ব্যাপকভাবে। আমরা জানি, এর বাস্তব ও জীবন্ত উদাহরণ হল শান্তিনিকেতন।
গাছপালার উপস্থিতি যে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অনুকূল তা আজকাল যারা সাধারণ বিজ্ঞান বা উদ্ভিদ বিজ্ঞান পড়েননি, তারাও বোঝেন। শুধুমাত্র দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার আলোকেই এটা বুঝা সম্ভব। উদ্ভিদ জগতের সহযোগিতা ছাড়া যে মানুষের প্রাণ ধারণ সম্ভব নয় এ কথা আজকাল সাধারণ মানুষও বুঝতে পারেন। গাছপালা থাকলে কীটপতঙ্গ আসে। সেই কীট পতঙ্গ এবং গাছের ফল- ফুলের টানে পাখিরা আসে। এইভাবে যে জীবন চক্র বা লাইফ সাইকেল তৈরি হয় তা গোটা পরিবেশটাকে ধরে রাখে। শান্তিনিকেতন তৈরি হয় তা গোটা পরিবেশটাকে ধরে রাখে। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ যে ‘বসন্তৎসব’ ‘বর্ষামঙ্গল’ অনুষ্ঠানের প্রবর্তন করেন, এর মূলে ছিল প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ।
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ পরবর্তিত বিভিন্ন উৎসবে যেমন ঐতিহ্য আর আধুনিকতা, মানুষ আর তার চারপাশের পরিবেশ স্থান পেয়েছে। তেমনি শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন ভবনের নির্মাণ শৈলিতে তিনি পরিবেশ ভাবনায় স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। শান্তিনিকেতনের সব বাড়িতেই যেমন- উত্তরায়ন, উদয়ন, কোনার্ক, শ্যামলী, পুনশ্চ, উদীচী ইত্যাদিতে খোলা-বারান্দা এবং চাতালের প্রাচুর্য ছিল। রবীন্দ্রনাথের এই পরিবেশ ভাবনাকে গৃহস্থাপত্যে রূপায়িত করতে সাহায্য করেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ কর, রাম কিংকর বেইজ, কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ শিল্পী ও বাস্তকারেরা।
সভ্যতার প্রতি রবীন্দ্রনাথের আহ্বান ছিল দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’। শতাব্দী ব্যাপী পৃথিবীতে যে নগরায়ন হয়েছে তা তো হয়েই গেছে। এখন গোটা বড় শহরকে ভেঙে আবার নতুন করে গড়ে নেয়া সম্ভব নয়। তবে রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ ভাবনার আলোকে দূষণমুক্ত পৃথিবী গড়তে হলে এমনভাবে নগর-পরিকল্পনা করতে হবে যাতে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদ না ঘটে। তাই সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ ভাবনার বিকল্প নেই।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT