পাঁচ মিশালী

সংগ্রামী মানুষ

অ্যাডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৮-২০১৯ ইং ০০:২২:০৯ | সংবাদটি ১২১ বার পঠিত

সিলেট শহরে আমার ছাত্র রাজনীতির দিনগুলোতে যাদের সাহচর্য পেয়েছি, যাদের দ্বারা আমার রাজনৈতিক জীবন প্রভাবিত হয়েছিলো তাঁদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব রফিকুর রহমান লজু। একজন মুক্তিযোদ্ধা- দেশমাতৃকার স্বাধীনতার সশস্ত্র লড়াইয়ে জীবনবাজী রেখে সামনাসামনি যুদ্ধে অংশ নেওয়া গৌরবের অধিকারী বড় ভাই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মতো ছাত্র-তরুণদের নিকট একজন আদর্শবাদী অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বরণীয় এবং সম্মানিত ছিলেন এবং আছেন।
আমার দেখা সত্তর দশকের টগবগে যুবক রফিকুর রহমান লজু এই সময়ে এসে বার্ধক্যে উপনীত। ১৯৪৫ সালে সিলেট শহরের রায়নগরে জন্ম নেওয়া লজু ভাই সুন্দর স্বাচ্ছন্দময় জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে দেশ, জাতি ও জনগণের জন্য, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটা বাসযোগ্য রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক জীবনের কঠোর পথটাই বেছে নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ছাত্র জীবনের দিনগুলোতে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন তখনকার বিশ্বব্যবস্থায় দুটি আদর্শের লড়াই, এর একটা হলো আমেরিকার নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বিশ্ব এবং অন্যটা তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা। তিনি সহজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্বের নির্যাতিত, শোষিত, নিপীড়িত ও অত্যাচারিত বিশ্বের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মুক্তির জন্য সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই, সে কারণে লজু ভাই সমাজতান্ত্রিক ধারার কঠিন রাজনৈতিক আদর্শবাদী ধারাটাই বেছে নিয়েছিলেন।
বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় লালিত হওয়ার কারণেই তিনি তাঁর ছাত্রজীবনের সমগ্র সময়টুকু পড়াশুনার পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার অনুসারী ছাত্র সংগঠন তখনকার পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (স্বাধীনতার পরে এর নামকরণ হয়েছিলো বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) যোগদান করে পুরোটা সময় ছাত্রসমাজের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠা করা এবং সে সাথে সমাজ পরিবর্তনের দাবিতে সংঘটিত সকল আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে সিলেটের রাজনীতিতে তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেছিলেন, জেলার ছাত্র রাজনীতির প্রথম সারির নেতৃত্ব পর্যায়ে উন্নীত হতে সক্ষম হয়েছিলেন।
শুধু ছাত্র আন্দোলনেই যে তিনি জেলা নেতৃত্বে ওঠেছিলেন তা নয়, বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টি (সিপিবি-র) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সিলেট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক (উল্লেখ্য যে সিপিবি-তে তখন জেলা কমিটির সর্বোচ্চ পদ ছিলো সাধারণ সম্পাদক) হিসেবে তিনি সিলেটের রাজনীতিতে একজন সম্মানিত গুণীজন হিসেবে, একজন আদর্শবাদী ত্যাগী নেতা হিসেবে সকল মহলে স্বীকৃত ও সুপরিচিত হয়ে ওঠেছিলেন। সিলেটের স্থানীয় দাবি দাওয়া ভিত্তিক এবং জাতীয় রাজনৈতিক দাবি দাওয়া ভিত্তিক এমন কোনো আন্দোলন সংগ্রাম নেই বা ছিল না, যেখানে রফিকুর রহমান লজুর উপস্থিতি ছিলো না। ছাত্র আন্দোলন থেকে জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলন- প্রতিটি আন্দোলনে তিনি ছিলেন সরব-সক্রিয় এবং নেতৃত্বের অগ্রভাগে বীর সংগঠক ও অকোতভয় নেতা।
ষাটের দশকে তিনি যখন এমসি কলেজের ছাত্র পাকিস্তানে স্বৈর শাসক এবং লৌহ মানব খ্যাত আইউব খানের কঠোর সামরিক শাসনে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠীর উপর আইউবী শাসনের তান্ডব চলছিলো। চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো মৌলিক গণতন্ত্র বা বেসিক ডেমোক্রেসী নামক এক আজগুবি গণতন্ত্র এবং অন্যদিকে, শিক্ষা ক্ষেত্রে বাঙালি জনগণকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষা সংকোচন নীতি বাঙালি জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে শিক্ষা সংকোচন নীতি রিপোর্ট প্রণয়ন করেছিলো আইউব সরকার। সারা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ গর্জে ওঠেছিলো আইউবের বেসিক ডেমোক্রেসি ও শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে। সিলেটেও সংঘটিত হয়েছিলো তীব্র আইউব শাসন বিরোধী এবং শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ছাত্র-গণআন্দোলন। সে আন্দোলনেও প্রথম সারিতে থেকে আন্দোলন সংঘটিত করা ও আন্দোলনকে সফল করে তোলার ক্ষেত্রে রফিকুর রহমান লজু সক্রিয় ও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে।
আইউব বিরোধী ছাত্র গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়েই তিনি পরিচিতি লাভ করেছিলেন তখনকার সময়ে বাম ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মুখ্য সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির জেলা নেতৃবৃন্দের সাথে। তখন পার্টি গোপনে ছাত্র গণ আন্দোলনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করছিলো। আইউব খান পার্টিকে বেআইনী ঘোষণা করা সত্ত্বেও পার্টির নেতাকর্মীরা গণআন্দোলনে, ছাত্র আন্দোলনে ছিলেন সক্রিয়। এ পার্টির নেতৃবৃন্দের সাথে পরিচিত হওয়ার সুবাদেই জনাব লজু নেতৃবৃন্দের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন ছাত্র থাকাকালেই। তিনি তাঁর চেতনা দিয়েই উপলব্ধি করেছিলেন বাঙালির জাতীয় এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ধারায় রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণ করতে না পারলে বাঙালির সার্বিক মুক্তি অর্জন করা অসম্ভব এবং এজন্য আদর্শবাদী সংগঠন হিসেবে কম্যুনিস্ট পার্টির মাধ্যমেই সার্বিক মুক্তির আন্দোলনই সফল করা যেতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন বিধায় ছাত্রাবস্থায়ই তিনি এ পার্টিতে যোগদান করেছিলেন এবং তাঁর চারিত্রিক ও সাংগঠনিক দৃঢ়তা, আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা এবং প্রতিটি আন্দোলনে তাঁর সক্রিয়-সপ্রতিভ অংশ গ্রহণের কারণেই ১৯৬৬ সালের পার্টির পূর্ণাঙ্গ সদস্য পদ লাভ করেছিলেন তিনি। উল্লেখ্য যে, তখনকার সময়ে কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করতে হলে কয়েকটি ধাপ উত্তীর্ণ হতে না পারলে পূর্ণাঙ্গ সদস্য পদ অর্জন করা ছিলো প্রায় অসম্ভব।
জনাব রফিকুর রহমান লজু বর্তমানে রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় রয়েছেন,- এর জন্য স্বাস্থ্যগত কারণ অন্যতম। কিন্তু এটাও সত্য, ছাত্র রাজনীতি, গণ রাজনীতি, দেশমাতৃকার স্বাধীনতার যুদ্ধ প্রতিটা-ক্ষেত্রেই তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং জীবন-যৌবনের পুরোটা সময়ই তিনি তাঁর প্রিয় জনগণ ও দেশের জন্য উৎসর্গ করেছেন- বিনিময়ে কী পেয়েছেন বা কী হারিয়েছেন- সে হিসেব কখনো করেননি। জীবনে অনেক লোভনীয় অফার পেয়েছেন, কিন্তু কোনো লোভ লালসাই তাঁকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি।
১৯৭১ সাল, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। দেশ মাতৃকার মুক্তি আর স্বাধীনতার ডাক। জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সারা বাঙালি জাতি। সশস্ত্র পাক সামরিক জান্তা আধুনিক সব সমরাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বাঙালি জনগণের ওপর। পাকিস্তানীদের প্রতিরোধে কাল বিলম্বে না করে জীবনের মায়া ছেড়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন জনাব লজু। চলে যান ভারতের করিমগঞ্জে। সেখানে ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প পরিচালনার ও যৌত গেরিলা বাহিনীর গঠনের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিলো তাঁর ওপর। আর এ দুটি দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন বলে সকলের নিকট থেকে তিনি প্রশংসা ও সম্মান কুড়িয়েছিলেন। যুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বিজয়ীর বেশে সিলেটে ফিরে এসে তিনি দেশ গঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টির ২য় কংগ্রেসে জনাব লজু কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদ লাভ করা কোনো সহজসাধ্য বিষয় ছিলো না। কিন্তু পার্টির প্রতি সার্বক্ষণিক অবদান, নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা, তাঁর মেধা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা, মুক্তিযুদ্ধে অবদান-এসব কিছু বিবেচনায়ই তাঁকে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করা হয়েছিলো। একই সাথে তিনি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলো। এ দুটি পদে থেকেই তিনি দক্ষতার সাথে দেশ গঠনে কাজ করেছেন, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে, সর্বোপরি দেশের সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে গেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রেজুয়েশন প্রাপ্ত বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের গৌরবের অধিকারী রফিকুর রহমান লজুর জীবনের দিনগুলো শুধুই রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বৃত্তে আবদ্ধ ছিলো না। রাজনীতির পাশাপাশি লেখা-লেখি, সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সহ সামাজিক নানা কর্মকান্ডে বিচরণ ছিলো তাঁর। সঠিক অর্থে, বলতে গেলে তিনি একজন বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী মানুষ। নিজে কিছু পাবার জন্য নয়, সমাজকে দেবার জন্য কিছু মানুষ আছেন, যাদের একজন হলেন আমাদের লজু ভাই। সারাটা জীবন তিনি সমাজকে দিয়ে এসেছেন এবং এখনো এই বার্ধক্য বয়সেও তিনি সমাজের জন্য কাজ করে চলেছেন, পত্র-পত্রিকায় অব্যাহতভাবে লিখে চলেছেন। সমাজ বিপ্লব, সমাজের রূপান্তর মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন এখনো তিনি দেখে চলেছেন এবং তাঁর লেখনীতে এসব ফুটে ওঠছে।
ছাত্র জীবন থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন, সর্বক্ষেত্রেই তাঁর মেধার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়। মূলত: তাঁর মধ্যে ছিলো জ্ঞানের অসাধারণ গভীরতা। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা দিয়ে তিনি জীবনকে উপলব্ধি করেছেন, তাঁর সমকালীন বাঙালি সমাজ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিককে বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং এগুলোই তাঁর লেখায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। জাতীয় দৈনিক সংবাদ, দৈনিক গণবাংলা, দৈনিক আজাদ, দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক পূর্বকোণ, মাসিক ঝিনুক, দৈনিক সিলেটের ডাক প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি যেমন লিখেছেন, এখনো লিখে চলেছেন কোনো কোনো পত্র-পত্রিকায়।
তাঁর অপ্রকাশিত অথচ পরিশ্রম লব্ধ লেখা- সিলেটের ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলন (১৯৪৯-১৯৭০) এবং অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠনের জন্ম কথা- শীর্ষক বই দুটি পান্ডুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়াও তিনি শতাধিক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সমাজসেবক এবং সাংবাদিক প্রমুখদের কর্মময় জীবনালেখ্য কাহিনীর রচয়িতা এ লেখাগুলো জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে- যার সংখ্যায় প্রায় পাঁচ শতাধিক।
লেখক রফিকু রহমান লজু নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনেও সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন এবং করছেন। তিনি অন্যান্য সহকর্মীদের সহযোগিতায় সিলেটের প্রতিথযশা এবং জাতীয়ভাবে স্বীকৃত নেতা পীর হবিবুর রহমান স্মৃতি সংসদ এবং জননেতা আব্দুল হামিদ স্মৃতি সংসদ গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন এবং ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। সম্পাদক হিসেবে প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছেন পীর হবিবুর রহমান স্মারক গ্রন্থ, জননেতা আব্দুল হামিদ স্মারক গ্রন্থ। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন বামপন্থী নেতা তারা মিয়া স্মরণে ‘মনের মণিকোঠায়’ গ্রন্থ এবং প্রফেসর আবুল বশর সম্মাননা গ্রন্থেরও সম্পাদক তিনি। প্রফেসর আব্দুল আজিজ ও অন্যান্য সম্পাদিত বৃহত্তর সিলেটের ইতিহাস ২য় খন্ড এর সম্পাদক পর্ষদের অন্যতম সদস্য ও মৃত্যুঞ্জয়ী হিমাংশু শেখর ধর স্মারক গ্রন্থেরও অন্যতম সম্পাদক তিনি।
একজন সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত জনাব লজু সিলেটের তাঁর সমকালীন সময়ে যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে, তেমনি সামাজিক ক্ষেত্রেও সকলের নিকট ছিলেন সম্মানিত এবং গ্রহণযোগ্য আদর্শবান একজন ব্যক্তিত্ব। ছোটদের নিকট অনুকরণীয় বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন এ রাজনীতিক ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা বিনির্মাণের জন্য তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো উৎসর্গ করেছেন; স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করতে গিয়ে রাজনৈতিক জীবনের মূল্যবান সময়গুলো আত্মগোপনে কাটিয়েছেন, এমনকি, কারাবরণ করেছেন, তবুও কোনো ভয়ভীতি বা লোভলালসার নিকট তিনি তাঁর আদর্শ, লক্ষ্য ও রাজনৈতিক সংকল্প থেকে সরে আসেননি জলাঞ্জলি দেননি।
রাজনীতির বাইরেও তিনি সিলেটের নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন, উদীচী, মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি, মফস্বল সাংবাদিক সমিতি, পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতি (ইপজা) সহ বিভিন্ন সংগঠনের সিলেটে শাখা প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৬৫ সালের ১৩ জুলাই প্রতিষ্ঠিত সিলেট প্রেসক্লাবের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।
সিলেটের রায়নগরের সোনারপাড়ার শিলকেতন বাসভবনের স্থায়ী বাসিন্দা আজীবন সংগ্রামী আদর্শবাদী এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে রাজনৈতিক কারণেই আমার পরিচয় ঘটেছিলো সত্তর দশকের মধ্যভাগে। পরের অনেক বছর তাঁর সাথে একই আদর্শের রাজনীতি করার সুযোগ আমার হয়েছিলো এবং অতি কাছে থেকেই তাঁকে দেখেছি রাজনীতি- সমাজনীতি প্রভৃতিতে তাঁর অবিরাম নিবেদিত কর্মযজ্ঞ, দেখেছি- জীবনটাকেই দেশের জন্য বাজী ধরতে আজ তিনি জীবনের শেষপ্রান্তে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT