উপ সম্পাদকীয়

সামাজিক আচরণ ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩০:১৪ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের জীবনাচরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, গবেষণা কার্যক্রমও চলছে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমরা সাধারণ মানুষেরাও বদলে যাওয়া জীবনও দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজের আচরণ প্রত্যক্ষ করছি। সামাজিক বন্ধন ও পারিবারিক সম্পর্কের রসায়ন যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, এ বিষয়টি একাডেমিক গবেষণা না করেই আমরা বলতে পারছি। প্রযুক্তিকে আমরা কার্যকরীভাবে কতোটুকু ব্যবহার করতে পারছি আর হাতের মুঠোর প্রযুক্তির মোহে কতোটুকু আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি, বিষয়টিকে ভেবে দেখতে হবে।
তরুণ বয়সের অনেকেই মনে করেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য সমাজের আচরণ বদলে যাওয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। বিষয়টি আপাত দৃষ্টিতে মেনে নেয়া যেতে পারে। প্রশ্ন হল, যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে, আমরা সামাজিকভাবে কতোটুকু পরস্পরের কাছাকাছি আসতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনকে কি আমরা আরও দৃঢ় করতে পেরেছি। অনেকে মনে করেন এসব বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন প্রগতি ও প্রযুক্তি বিরোধিতার শামিল। কারণ যোগাযোগ প্রযুক্তি আমাদেরকে দ্রুত তথ্য আদান প্রদানে সহায়তা করছে, আমাদের সময়ের সাশ্রয় করে, অনেক বেশি সৃষ্টিশীল ও গবেষণাধর্মী কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে। এসব অকাট্য ও যুক্তি নির্ভর বিষয়গুলো মেনে না নেয়ার কোন অবকাশ নেই। যে সমস্ত বিষয়কে আমরা আলোচনায় নিয়ে আসতে চাই সেগুলো হল, আমাদের চিরন্তন মূল্যবোধ, সমাজের ইতিবাচক আচরণ, পারিবারিক সহমর্মিতা উপর যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রভাব কতোটুকু।
প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বিশেষ করে যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারের সাথে সামাজিক সাংস্কৃতিক উন্নয়নের একটি সম্পর্ক আছে। আমাদের সাধারণ মানুষদের আমরা প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের জন্য কতোটুকু প্রশিক্ষিত করে তুলতে পেরেছি। আমাদের সংস্কৃতি কি সমান্তরালভাবে এগিয়ে গিয়েছে, যতোটুকু এগিয়ে গেছে উন্নত দেশগুলোর উদ্ভাভিত যোগাযোগ প্রযুক্তির উপাদানগুলো। সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের একটা ভারসাম্য থাকতে হয়। একটি প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে যতোটুকু ফলপ্রসূভাবে ব্যবহার করতে পারবেন, অর্ধশিক্ষিত ও প্রশিক্ষণবিহীন জনগোষ্ঠী অবশ্যই প্রযুক্তির উন্নয়নের সুফল সে পরিমান ঘরে তুলতে পারবেন না।
আমাদের দেশে সাধারণত, ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে সেলুলার ফোন বা মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট বা ট্যাব এবং বিভিন্ন রকমের কম্পিউটার। সেল ফোন বা মোবাইল ফোন যেহেতু সব চেয়ে সহজভাবে ব্যবহার করা যায় এবং সাধারণ যোগাযোগের জন্য উপযোগী, এ জন্য মোবাইল ফোনের ব্যবহারই সর্বাধিক। সেলুলার ফোন ও ট্যাবে আমাদের সাধারণ মানুষেরা মূলত প্রয়োজনীয় সংবাদ আদান প্রদান এবং সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করে থাকেন। এ সমস্ত যোগাযোগের বাইরে, আমাদের তরুণ সমাজসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ মোহাবিষ্ট হয়ে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ও চিরায়ত সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যহীন বিনোদন ও যোগাযোগে নিজেদেরকে যুক্ত করে ফেলেছেন। সম্ভাবনাময় একজন তরুণের মূল্যবান সময়, অধ্যয়ন, উদ্ভাবন, দক্ষতা বৃদ্ধির কাজের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় ও অনাকাক্সিক্ষত বিনোদনও যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাতি হিসাবে সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজের, মূল্যবান সময়ের অপচয়, শুধু অপুরণীয় ক্ষতিই নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেতের মতো।
এ ধরণের অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও বিনোদনের মোহ, পারিবারিক সদস্যদের চিন্তা, চেতনা ও মানস জগতে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক পরিবারে, পারিবারিক সদস্যরা “ভার্চুয়েল আইল্যান্ড” বা দ্বীপ তৈরী করে, নিজেদেরকে স্বেচ্ছায় দ্বীপান্তরিত করছেন এবং সমাজ ও পরিবার থেকে দ্রুতই নিজেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এরকম অবস্থা অব্যাহত থাকলে, আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, সংহতি ইত্যাদি হুমকির মুখে পড়তে পারে এ আশঙ্কা করাই যায়।
বাংলাদেশের গ্রাম এবং মফস্বল শহরে সামাজিকভাবে আমাদের বন্ধন, সহমর্মিতা নিয়ে আমরা একসময় গর্ববোধ করতাম। সম্প্রতি অনেকেই আমাদের এই বন্ধন দ্রুত শিথিল হয়ে পড়ছে বলে অভিমত ব্যাক্ত করছেন। সামাজিক বন্ধন শিথিলতার কারণ হিসাবে পেশাগত ব্যস্ততার কথা বলা হয়ে থাকে। জীবন ও পেশা আগের থেকে অনেক প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়ছে, এ কারণে আমরা এখন আর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ করতে সক্ষম হচ্ছিনা বলে বলা হয়ে থাকে। আমরা যারা মধ্যবয়সী, আশির দশকের সূচনালগ্ন পর্যন্ত দেখেছি, স্বত:স্ফূর্তভাবে আমাদের অভিভাবকরা প্রতিবেশী এবং পরিচিত মানুষদের খুঁজ খবর নেয়ার জন্য পরস্পরের বাড়ীতে যেতেন। পরিবর্তিত সামাজিক অবস্থায় সমাজের এ আচরণের পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করছি। বিশেষ কোন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত না হলে, এখন আর কেউ কারো বাড়ীতে আমন্ত্রণ ছাড়া যেতে চান না। যদি কোন কারণে যেতেই হয় তাহলে সে যাওয়াটাকে আনুষ্ঠানিকতায় রূপান্তর করেই তারা পরস্পরের বাড়ীতে সৌজন্য সাক্ষাত করে থাকেন। পেশাগত ব্যস্ততা এবং অন্যান্য ব্যস্ততার কথা বলে আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ কমিয়ে ফেলা, এই যুক্তির বাস্তবতা কি আসলেই সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে। পেশার সাথে যারা যুক্ত আছেন তারা যেরকম আচরণ করছেন এবং যারা কোন পেশাতে যুক্ত নেই, তারাও একই রকম আচরণ করছেন। এর অর্থ দাড়াচ্ছে, প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সংস্কৃতিকে আমরা যে কোন কারণেই বর্জন করেছি কিংবা বর্জন করতে যাচ্ছি। এই যে সমাজের মধ্যে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জনগোষ্ঠী তাদের বিপুল পরিমাণ সময় মোহগ্রস্থ হয়ে অপ্রয়োজনীয় ও অনাকাক্সিক্ষত যোগাযোগ ও বিকৃত বিনোদনের কাজে ব্যবহার করছেন। এই যে মোহগ্রস্থতা তা থেকে সমাজে নানা রকমের সামাজিক ব্যাধি তৈরি হচ্ছে, সামাজিক ব্যাধির বাই প্রোডাক্ট হিসাবে প্রতিদিন আমরা নীতি বিবর্জিত কর্মকান্ডের খবর দেখতে পাচ্ছি খবরের কাগজের পাতাতে। এখন প্রশ্ন হল, আমরা কি তাহলে যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ করে দেবো। এরকম বলা, মাথা ব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলার দেয়ার মত মধ্য যুগীয় উপদেশের সম-মানের হয়ে যায়।
আমরা অবশ্যই যোগাযোগ প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করব। এ জন্য আমাদেরকে কার্যকরীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই হবে না, এ জন্য প্রাসঙ্গিক আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে হলে আমাদেরকে শিক্ষার হারের সাথে শিক্ষার মানের দিকে নজর দিতে হবে। প্রযুক্তির বহুবিধ ব্যবহারের জন্য আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। সর্বোপরি আমাদের তরুণ সমাজকে সভ্যতাকামী ও উন্নয়নশীল দেশ সমূহের কাজ বা পেশার সংস্কৃতি, আচরণের সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। যোগাযোগ প্রযুক্তিকে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা উন্নয়নের কাজে কিভাবে ব্যবহার করা যায় সে ব্যাপারে প্রশিক্ষণ প্রদান করাও জরুরী। এরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আমাদের দেশের যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা নিজের ইচ্ছা, বিবেক এবং প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে প্রযুক্তির সর্বাধিক ও সুনির্দিষ্ট ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করবেন এবং জাতীয়ভাবে আমরা মূল্যবান সময়ের অনৈতিক ব্যবহারের হাত থেকে মুক্তি পাবো। আমরা অবশ্যই প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে, উন্নত ও সুসভ্য দেশের কাতারে পৌছুতে চাই। একই সাথে আমাদের সংস্কৃতির ইতিবাচক উপাদানের সংরক্ষণ ও বিশ্ব সংস্কৃতির অনুসরণীয় উপাদানগুলোকে ব্যবহার করতে ইচ্ছুক ও উন্মুখ। সকল শুভ উপাদানের সমন্বয় সাধন করে আমরা আমাদের উন্নয়নের স্বপ্ন যাত্রার সুপরিকল্পিত সূচনা ঘটাতে চাই।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজ গবেষক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • পারিবারিক সু-শিক্ষা ও বর্তমান সমাজ
  • অপেক্ষা, আর কতোকাল
  • উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টিই বড়ো চ্যালেঞ্জ
  • প্রসঙ্গ : হকারমুক্ত ফুটপাত
  • জনদুর্ভোগের রকমফের
  • পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে
  • ‘যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে...’
  • খাদ্যে ভেজাল
  • রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কি আদৌ সম্ভব?
  • আসামে এনআরসি বিজেপির রাজনৈতিক খেলা
  • শ্রী শ্রী অনুকূল চন্দ্র
  • মিতব্যয়িতা
  • হংকং : কেন গণআন্দোলন
  • যানজট মুক্ত মহানগরী : কিছু প্রস্তাব
  • পানি নিয়ে ভাবনা
  • ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?
  • সৈয়দ মহসীন আলী : ক্ষণজন্মা রাজনীতিক
  • শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
  • রোহিঙ্গাঁ সমস্যা : প্রয়োজন আশু সমাধান
  • Developed by: Sparkle IT