সাহিত্য

নজরুলের জীবন ও সাহিত্য

জামান মাহবুব প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩১:৫৭ | সংবাদটি ৭৪ বার পঠিত

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্য তাঁর আবির্ভাব ঘটে তখনই যখন বৃটিশ সা¤্রাজ্যের দুঃশাসনে পরাধীন ভারতের নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষ স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। তাঁর একহাতে ছিল ‘বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণতূর্য। মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্য জীবনে (১৯১৯-১৯৪২) এই অসাধারণ প্রতিভাবান কবি মেধা ও মননের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সৃষ্টিকর্মে হিন্দু ও মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্য, বিশ্বসভ্যতা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, দর্শন, দেশাত্মবোধকসহ সকল বিষয়কে একই সুতোয় গেঁথেছিলেন।
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যার লেখনী মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে, উজ্জীবি করেছে তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা ১৩০৬ সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ, মোতাবেক ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা কাজী ফকির আহমদ, মামা জাহেদা খাতুন। তাঁর জন্মের আগে আরো চার ভাই জন্মেছিলেন। কিন্তু কেউ বেশি দিন বাঁচেননি। তাই অনেক দুঃখে পাওয়া মা-বাবার অমূল্য ধন কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম রাখা হলো ‘দুখু মিঞা’। নজরুলের ঝঞ্ঝামুখর জীবন এই নামের সার্থকতা-ই প্রতিপন্ন করেছে। দুঃখকষ্ট আর দারিদ্র কখনোই তাঁর পিছু ছাড়েনি।
চুরুলিয়া গ্রাম দারিদ্রপীড়িত এলাকা। তবে লেখাপড়ার চর্চা ছিল। শৈশবে দুখু মিঞাকে ভর্তি করা হলো মক্তবে। পড়ালেখা, খেলাধুলা আর একটু-আধটু ফাই ফরমাশ খাটা- বেশ সুখেই কাটছিল দিনগুলো। দুখু মিঞার বয়স যখন মাত্র আট, হঠাৎ বাবা মারা গেলেন। অভাব-অনটনের সংসার। ফলে ঐ বয়সেই নজরুলকে নামতে হলো রোজগারের ধান্ধায়। পিরের মাজারে খাদেমগিরি, আর মসজিদে আজান দেওয়া। বাচ্চা-মোল্লা হিসেবে গ্রামে খাতির-যতœও মিলল। দুচার পয়সা আয় উপার্জন যা হতো, সংসারের জন্যই ব্যয় করতেন। কিন্তু এতে অভাব কি ঘোচে?
বর্ধমান জেলার মহকুমা শহর আসানসোল। ওখানে চা দোকানে চাকরি জুটল। খাওয়া ফ্রি, মাইনে মাসে এক টাকা। তা-ই বা কম কিসে? পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল্লাহ। তার নজরে পড়লেন নজরুল। দুখু মিঞাকে সঙ্গে করে তিনি গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার কাজীর সিমলায় বড় ভাই সাখাওয়াত উল্লাহর কাছে নিয়ে গেলেন। ভর্তি করলেন দরিরামপুর হাই স্কুলে, সপ্তম শ্রেণিতে।
১৯১৪ সাল। নজরুল তখন পনেরো বছরের কিশোর। পূর্ববাংলার প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের সাথে তার খাপ খাওয়ানো কঠিন হয়ে উঠল। তাই ময়মনসিংহ থেকে পালিয়ে চলে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের রাণীগঞ্জে। চুরুলিয়া থেকে দূরত্বও তেমন নয়। ভর্তি হলেন শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে। পড়াশুনার পাশাপাশি চলল সাঁতার কাটা, এয়ারগানে পেঁপে শিকার, সংগীতচর্চা ও গল্প কবিতা রচনা।
সামনেই ম্যাট্রিক পরীক্ষা। ক্লাসের ফার্স্ট বয়। শিক্ষকদের প্রত্যাশা, ফাইনালে দুখু মিঞা নিশ্চিত ভালো ফলাফল করবেন। মা-ভাইবোন অপেক্ষার প্রহর গুণছেন, কবে ম্যাট্রিক পাশ করে দুখু মিঞা ভালো একটা চাকরি জোটাবেন। এর ফলে সংসারের দারিদ্র অনেকটাই ঘুচবে। কিন্তু জীবনটা তো সবসময় ছঁকে বাঁধা নয়।
সাল ১৯১৭। বিশ্বযুদ্ধের রণদামামা তখন বেজে উঠেছে। নজরুলের মন আর পড়াশুনায় টিকবে কেন? ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার ভাবনা শিকেয় উঠল।
ম্যাট্রিক পরীক্ষা না দিয়েই তিনি নাম লেখালেন বাঙালি পল্টনে। চলে যান করাচি।
যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে এলেন হাবিলদার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। দেশ ও জাতির মুক্তি আকাক্সক্ষায় তাঁর শোণিতে তখন বইছে বিদ্রোহী চেতনা। ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে তাঁর কলম গর্জে উঠল। লিখলেন বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’। এ কবিতার পরতে পরতে ছড়িয়ে দিলেন বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্র। এরপর বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় নজরুলের অগ্নিঝরা লেখা বেরুতে শুরু করল। ব্রিটিশ সরকার প্রমাদ গুণল। নজরুলকে জেলে পাঠিয়ে চাইল তাঁর লেখনী স্তব্ধ করে দিতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে নজরুল আরও জ্বালাময়ী গান ও কবিতা লিখতে থাকেন। লিখলেন-
‘কারার ওই লৌহ কপাট/ ভেঙে ফেল কররে লোপাট/ রক্ত জমাট, শিকল পূজায় পাষাণ বেদি....’।
লিখলেন- ‘শিকল পরা ছল মোদের/ এই শিকল পরা ছল/ এই শিকল পরেই তোদের করবরে বিকল...’।
রাতারাতি তার কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। নাটক, কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস- লিখলেন একের পর এক। তাঁর রচিত কাব্যের মধ্যে অগ্নিবীণা, সঞ্চিতা, বিষের বাঁশি, ফনিমনসা, সিন্দু-হিন্দোল, জিঞ্জির, ছায়ানট, পুবের হাওয়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। উপন্যাস লিখেছেন বাঁধনহারা ব্যথার দান, মৃত্যুক্ষুধা, রিক্তের বেদন ও কুহেলিকা। শিউলিমালা, জিনের বাদশার মতো অনেক ছোটগল্পের রচয়িতাও তিনি। এছাড়া অসংখ্য ইসলামি সংগীত, শ্যামা সংগীত, আধুনিক গান, ভাটিয়ালি গান ও দেশাত্মবোধক গান রচনা করে বাংলা সংগীত জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম মানবতার কবি, সাম্যের কবি। তাঁর কবিতায় ঠাঁই পেয়েছে নিপীড়িত, শোষিত ও লাঞ্ছিত মানুষের জয়গাথা। অপরূপ মমতায় তুলে ধরেছেন গণমানুষের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র। বড়দের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও লিখেছেন দু’হাতে। যখন তাঁর ‘প্রভাতি’ কবিতায় আহ্বান ধ্বনিত হয়- ‘ভোর হলো, দোর খোলো, খুকুমনি ওঠরে।/ ঐ ডাকে জুঁই শাখে, ফুল খুকি ছোটরে।/ খুকুমণি ওঠরে।’ তখন কি খোকা-খুকুর সাধ্যি থাকে বিছানায় পড়ে থাকতে।
আবার ‘খাঁদু-দাদু’ কবিতায় লিখেছেন ‘অ-মা তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং? খাঁদা নাকে নাচছে ন্যাদা- নাক ডেঙ্গা ডেং ড্যাং। ওর নাকটাকে কে করল খাঁদা রাঁধা বুলিয়ে? চামচিকে-ছা বসে যেন ন্যাজুড় জুলিয়ে। বুড়ো গরুর পিঠে যেন শূয়ে কোলা ব্যাং। অ-মা। আমি হেসে মরি, নাক ডেঙ্গা ডেং ড্যাং।’
এর অন্তর্হিত সৌন্দর্য, রস, শব্দ ও ছন্দের যে দ্যোতনা- তা শুধু শিশুদেরকেই নয়, বড়দেরকেও আনন্দ দেয়। ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’র কথাও তো ভোলার নয়। শিশু মনস্তত্বের গভীরে অবগাহন করে যে মন্ডা-মেধাই তিনি পরিবেশন করেছেন তা শুধু উপাদেয়ই নয়, অনির্বচনীয়।
রবীন্দ্র যুগে যেসব কবি রবীন্দ্র প্রভাব অতিক্রম করে স্বাধীনভাবে কবিতা রচনা করে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে নজরুল শীর্ষে। জনপ্রিয়তায় রবীন্দ্রনাথের পরেই তাঁর অবস্থান। বাংলা সাহিত্যে যুগ¯্রষ্টা কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সাহিত্য ও সংগীতে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা।
কবি নজরুলকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘জগত্তারিনী স্বর্ণপদক’ (১৯৪৫), ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ (১৯৬০), রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘ডি-লিট’ (১৯৬৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘ডি-লিট’ (১৯৭৪) ও বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একুশে পদক (১৯৭৬) প্রদান করা হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মোতাবেক ১৩৮৩ বাংলার ১২ ভাদ্র ঢাকায় পরলোক গমন করেন। তাঁকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT