সাহিত্য গল্প

হকার

আবদুল্লাহ হারিস পাশা প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩৩:৪০ | সংবাদটি ৮৮ বার পঠিত

ক্লাস রুমের বাইরে মাথায় কাঠের চেয়ার নিয়ে হাঁটু ভাঙ্গা করে বসে আছে হাসান। প্রফেসর জামান স্যারের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেয়নি বলে তাকে নীল ডাউন করে রেখেছেন। হাসানের এ করুণ অবস্থা দেখে ডিপার্টমেন্টের ছাত্ররা হাসাহাসি করছে। হাসানকে এই আপত্তিকর স্বপ্ন দেখার হাত থেকে বাঁচালেন তার মা।
রাত সাড়ে ৩টা বাজতে আরো দু’চার মিনিট বাকি। এসময় মায়ের ফোন পেয়ে হকচকিয়ে গেল হাসান। দুশ্চিন্তা নিয়েই সে ফোনটা রিসিভ করল।
-কি হয়েছে মা? হ্যালো। মা। কি হয়েছে?
-(নিরুত্তর)।
-কি হল! কথা শুনা যায় না। হ্যালো।
বিছানায় উঠে বসে হাসান। ক্ষণিকের মধ্যে নাকের আগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে মুখ চেপে মোবাইলটা কানে ধরে রাখে। আস্তে আস্তে শব্দটা চিনতে পারে। মায়ের নাক ডাকার শব্দ্ ‘ধ্যাত্তেরি’ বলে হাসান ফোন রেখে দেয়।
হাসানের মা স্কিন টাচ মোবাইল ব্যবহার করেন তবে মোবাইলে লক সিস্টেম পছন্দ করেন না। এর আগেও অনেকবার অনেকের কাছে তিনি নিজের অজান্তেই বেলা অবেলায় কল দিয়েছেন।
প্রচন্ড অস্বস্তি লাগছে হাসানের। রাত সাড়ে ৩টা খুব খারাপ একটা সময়। সে ঘুমোতে যায় ঠিক বারোটায়। উঠে দু’টার আগে। এখন সাড়ে ৩ টায় সে বিছানায় বসে আছে। তার প্রচন্ড ক্ষুধাও লাগছে। ফোন পাওয়ার সাথে সাথে তার ঘুম চলে যায়। নিস্তব্ধ বাকি রাতটা তার জেগেই কাটাতে হল।
ড্রয়িংরুমে বসে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে হাসান। নতুন হকার পত্রিকা দিয়ে দেয় সাড়ে সাতটা থেকে পৌণে আটটার মধ্যে। এখন সাতটা চল্লিশ বাজে। এই হকার পত্রিকা দিতে এসে গুণে গুণে তিনটা বেল দেয়। বেল দিতে তার ভালো লাগে মনে হয়। ভালো লাগার কারণটা আজকে ব্যাটাকে বলতেই হবে- ভেবে রাখে হাসান।
তার ঘোর কাটে কলিংবেলের আওয়াজে। কিন্তু আজ যে মোটে একবার বেলের শব্দ আসলো। দরজা খুলে দেখলো এক পঞ্চাশোর্ধ মহিলা খাবারের ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া মিসেস রওশন।
-স্লামালিকুম, আন্টি।
-কি বাবা ভালো আছো? তোমার মা কালকে বলছিলেন যে বাসার সবাই তোমার মামাবাড়িতে যাচ্ছেন। তুমি যেতে পারছো না। কাজের বুয়াটাও ছুটিতে। তাই ভাবলাম সকালের নাস্তাটা দিয়ে আসি।
-আন্টি বাসায় ব্রেড, ফ্রুট সব আছে তো। আর আমি ডিম ভাজিটাও করে নেব।
-আরে রাখো তো। বাড়ি থেকে মিষ্টি এসেছে। রাজশাহীর মিষ্টি। পরোটা দিয়ে খেয়ে দেখোই না কেমন স্বাদ। আমার সামনেই খাও। মিসেস রওশনের এ কথা শুনে ঢোক গিললো হাসান। মিষ্টির সাথে পরোটার কেমিস্ট্রি কল্পনা করতে কষ্ট হচ্ছে তার।
-আচ্ছা আন্টি। আমি একটুপর খাব। এত সকালে আমি কিছু খাই না।
-ঠিক আছে। আর দুপুরে কি খাবে বল। আমি রান্না করে রাখবো।
-আমি অনলাইনে অর্ডার দিয়ে দেব। বাসায় এনে দিবে। আপনি চিন্তা করবেন না।
-ওসব কিভাবে কি রাঁধে তার কোন ঠিক আছে! তুমি এসব অনলাইনে অর্ডার করতে যেও না। আমার বাসায় আজ খাবে।
-আন্টি আপনি অযথাই কষ্ট করছেন। সমস্যা হবে না।
-আরে রাখো তো।
হাসানের হাতে ট্রে রেখে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেলেন মিসেস রওশন। হাসান বুঝতে পারছে না সেই এই উৎকো ঝামেলা হতে কিভাবে রেহাই পাবে। হাসানের মায়ের কানে গেলে তিনি লঙ্কাকান্ড ঘটিয়ে ছাড়বেন। সবার জীবনযাত্রা এক নয়। খাওয়ার রুচিও এক নয়। সকালের নাস্তায় যদি পরোটার সাথে মিষ্টি থাকে তবে দুপুরের খাবারে ভাতের সাথে কি খেতে দিতে পারেন মিসেস রওশন? এটি চিন্তিত করে তুলেছে হাসানকে। সে ভাবছে যদি ভাতের সাথে টুস্ট বিস্কিট দেওয়া হয় এবং মিসেস রওশন বলেন, ‘বিস্কিট গুড়ো করে ভাতের সাথে মাখিয়ে খেয়ে দেখোই না কেমন স্বাদ। তবে তা যথেষ্ট বিব্রতকর হবে। এই অদ্ভুত ভাবনা শেষে সে যখন ঘড়ির দিকে তাকায় তখন আটটা পাঁচ বাজে।
আজ পত্রিকার আশা ছাড়তেও মন চাইছে না হাসানের। গত মাসে হকার যে বিলের রশিদ দিয়েছিল তা জোগাড় করল হাসান। ছাপা করানো বিলে হকারের নাম ও মোবাইল নাম্বার দেওয়া। এ নাম্বারে কল করে দেখা গেলো তা বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ, এটি প্রধানমন্ত্রীর ফোন নাম্বারের মতো শুধুমাত্র ফার্মালিটি রক্ষার্থে দেওয়া।
অনলাইন পত্রিকায় খবর আছে তবে সে পত্রিকায় গন্ধ নেই। বইয়ের গন্ধ, পত্রিকার গন্ধ কনো পিডিএফে বা অনলাইন পত্রিকায় পাওয়া যায় না। হয়তো একদিন এমন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হবে সেখানে পিডিএফে বই পড়ার সময় মোবাইল থেকে বইয়ের গন্ধ বের হবে। বইয়ের গন্ধে অপশন থাকবে দুইটি। একটা নতুন বইয়ের গন্ধ, এখানে ছাপাখানায় ব্যবহৃত কালির গন্ধ, বাইন্ডিং করার সময় যে গ্লু ব্যবহার করা হয় তার গন্ধ থাকবে। আরেকটা গন্ধ হবে পুরোনো বইয়ের গন্ধ। উইপোকায় খাওয়া, ময়লার স্তর পড়া বইয়ের গন্ধ কিরকম হয়? এসব উদ্ভট বিষয় ভাবতে ভাবতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় হাসান।
বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে আরাম করে কৃষ্টি দেখছে হাসান। এই বৃষ্টি নিয়ে একেক মানুষের একেক প্রতিক্রিয়া। বৃষ্টি দেখে অনেক কবির কলমের কালি ফুরোয়। অনেকে বৃষ্টিতে জলকেলি খেলে, অনেকে কাগজের নৌকা ভাসায়, আবার বৃষ্টিতে ভিজে অনেকে অসুখ বাঁধায়। সেজন্য বৃষ্টিকে সবার জন্য আশীর্বাদ মনে করে না হাসান। এই বৃষ্টি টানা দুই ঘন্টা চললে ঢাকার রাস্তায় নৌকা চলবে। জলাবদ্ধতা দেখে শহুরে অনেক শিশুদের মধ্যে বিরাট আনন্দ দেখা দেয়। ব্যস্ত শহরে সেখানে এতটুকু জায়গা খালি নেই, ডোবা-খাল যেখানে পাইকারি ঘুষে ভরাট হয় সেখানে কিছু পানি জমলে সেটা আসলেই পর্যটন কেন্দ্র হয়ে ওঠে। জলাবদ্ধতার মধ্যে যখন কোন গাড়ী যায় তখন কি সুন্দর ঢেউ উঠে। এ বিষয়কে হাসান সিটি কর্পোরেশনের ব্যর্থতার একটি প্রশংসনীয় দিক হিসেবেই ভাবছে।
আবারো কলিং বেলের আওয়াজ ভেসে আসছে। ঘড়ির কাটা পৌণে ন’টা ছুই ছুই করছে। এই ভারী বর্ষণে হকার আসবে না নিশ্চিত। কলিং বেলে চাপও পড়েছে একবার। মিসেস রওশন খাবারের অন্য কোন জটিল কেমিস্ট্রি নিয়ে আবার হাজির হলেন কি না দেখতে দরজা খুললো হাসান।
আকস্মিক ঘটনা বুঝে উঠতে পারলো না সে। দরজার কিছুদূর সামনে শুয়ে আছেন এক ব্যক্তি। কাপড় চোপড় বৃষ্টিতে ভিজে বেহাল দশা। হাতের কাছে পত্রিকা। ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে হকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে হাসান।
-কি হয়েছে আপনার? পড়ে গেলেন কি করে?
আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন হকার আবদুর গফুর। উনার চেহারার সাথে অভিনেতা দিলদারের অদ্ভুত মিল রয়েছে।
-এই বৃষ্টির মধ্যে আসার কি দরকার ছিল।
হাসানকে ধমকে উঠেন আবদুল গফুর।
-রাখেন ভাই। কোন কোম্পানির সস্তা সুইচ লাগাইছেন এইগুলো?
কত বাড়িতে সুইচ টিপি কিছু হয় না। হাত দিতেই শক দিয়া ফালাই দিল। আরেকটু সময় ধইরা রাখলেইতো আমি ফুঁস।
-স্যরি ভাই। আর আপনি ভেজা হাত দিয়ে সুইচে হাত দিতে গেলেন কেন? ভেতরে এসে গা’টা মুছুন।
-বাদদেন তো ভাই। আমি যাই। সময় নাই।
-রাজশাহীর দু’টা মিষ্টি খেয়ে যান।
মিষ্টির কথা শুনে কঠিন চোখে হাসানের দিকে তাকায় আবদুল গফুর। তারপর হাসানের হাতে পত্রিকা দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যান তিনি।
একজন মানুষ বৈদ্যুতিক শক খেয়েছে। তাকে মিষ্টি অফার করাটা ঠিক হয়নি। ভুল বুঝতে পেরে হাসান লজ্জিত হয়। পত্রিকা নিয়ে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছে হাসান। দু’তলা থেকে হকারের সাইকেলটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নড়বড়ে এবং পুরাতন ফনিক্স সাইকেল। সাইকেলের পিছনে বেশকিছু পত্রিকা একটি পলিথিন দিয়ে মোড়ানো। সাইকেলে চড়ে প্যাডেলে চাপ দিতে শুরু করেছেন আবদুল গফুর। তার বাম হাত দিয়ে তিনি সাইকেলের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরেছেন। অন্য হাত দিয়ে পিছনে পত্রিকার উপরের পলিথিন ধরে রেখেছেন। আবদুল গফুরের হাতে সময় নেই। পত্রিকার জন্য ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে আরো অনেক হাসান।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT