উপ সম্পাদকীয়

ফিরে দেখা : ১৫ আগস্ট ১৯৭৫

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৮-২০১৯ ইং ০০:১৮:১০ | সংবাদটি ৪১ বার পঠিত

বাঙালির জন্য অভিশপ্ত একটি সাল ১৯৭৫, একটি অভিশপ্ত মাস আগস্ট আর এর একটি অভিশপ্ত তারিখ ১৫ই আগস্ট। অফিসের কাজে ১৪ই আগস্ট সিলেট আসি এবং একটি হোটেলে অবস্থান করছিলাম। ১৫ই আগস্ট সকাল ৭টার রেডিও এর খবর শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম। অভিশপ্ত ১৫ই আগস্টে খুনী মেজর ডালিমের ঘোষণা বার বার প্রচার করা হচ্ছে। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘোষণাটি গর্বভরে প্রচার করছে খুনী ডালিম। সেদিন সেই দুঃখজনক ঘোষণা শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম। হোটেল থেকে রাস্তায় এসে দেখলাম চারদিকে শুধুই নীরবতা। কিছু কিছু মানুষ রাস্তায় থাকলেও সবাই যেন নির্বাক। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। ঢাকার কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। আস্তে আস্তে বেলা বাড়ছে। ভাবলাম হয়তো বা কিছুক্ষণের মধ্যে রাস্তায় প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-মিটিং মিছিল শুরু হবে। কিন্তু না। কিছুই হলো না। পিতার লাশ সামনে রেখে সবাই যেন নীরব। বুঝতে অসুবিধে হলো না, এ নির্বাক নীরবতায় বুঝি আচ্ছন্ন সারা বাংলাদেশ।
কিন্তু বার বার প্রশ্ন জাগে কেন এ নীরবতা। সেকি শুধুই খুনী ফারুক-রশীদ-ডালিম-নূর চৌধুরী গংদের ভয়ে? কি এমন শক্তি ছিলো ঐ জল্লাদদের? বাংলার শেষ নবাব সিরাজদ্দৌলাকে শারীরিকভাবে জল্লাদের ভূমিকায় এসে হত্যা করেছিলো ঘাতক মোহাম্মদী বেগ। তাই বলে কি মানুষ মনে করে যে সিরাজের মৃত্যু আর পতনের মূল শক্তি জল্লাদ ঐ বেগ? সেতো শুধুই হুকুম তামিলকারী একজন।
দেশের মানুষ তো মনে করতেই পারেন যে, পনেরই আগস্টের খুনী বা জল্লাদ চক্রের ভূমিকাও ছিল অকেনটা মোহাম্মদী বেগ এর মতোই। যদি তা-ই না হতো মোহাম্মদী বেগ যেমন নবাব সিরাজকে হত্যা করে ক্ষমতাভোগী বা সুবিধাভোগী হয়নি পনের আগস্টের খুনীদের অবস্থান ওতো অনেকটা তেমনি।
আমরা বিশ্বাস করি সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধান কে.এম সফি উল্লাহ, এ.কে খোন্দকার, নৌবাহিনীর প্রধান, রক্ষীবাহিনীর প্রধান হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা জানতেন না কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, সেদিন তারা মিলিত শক্তি নিয়ে খুনীদের প্রতিহত করতে এগিয়ে আসলেন না কেন?
মোস্তাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর গংরা মীরজাফরের ভূমিকায় কাজ করেছে সেটা তো সবাই জানেন। মানুষ আজও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন রক্ষীবাহিনীর প্রধানসহ তিন বাহিনী প্রধান ইচ্ছা করলেই সেদিন গুটিকয় উশৃঙ্খল সেনা সদস্যকে পাকড়াও করে শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু সেটা তারা করেননি তাদেরকে ভয় করে নয়, তাদের পেছনে ইন্ধনদাতা দেশী বিদেশী বাংলাদেশ বিরোধী শক্তিকে ভয় করে নয়। বলা যায় ঐ অপশক্তি ভয় করেই তারা অবৈধ মোস্তাক সরকারের প্রতি অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এবং সকল প্রকার নীতিনৈতিকতা-লজ্জা-ঘৃণার মাথা খেয়ে আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন বেতারে বিবৃতি দিয়ে। চাকুরী জীবন বলি, রাজনৈতিক জীবন বলি সব ক্ষেত্রেই ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ প্রমোশন চায়। ডিমোশন নয়। কিন্তু পনেরই আগস্ট আমরা কি দেখলাম? দেখলাম বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে জানিনা কিসের আশায় কিসের নেশায় কিসের ভয়ে রাষ্ট্রপতি শব্দটির প্রতি চরম অশ্রদ্ধা-অসম্মান প্রদর্শন করে অকৃতজ্ঞ বেইমান মীরজাফর মোস্তাকের কেবিনেটে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করলেন না। অপ্রিয় হলেও এটাও সত্য যে, বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে বেইমানী করে আওয়ামী লীগের তথা বঙ্গবন্ধুর অনেক ঘনিষ্ট সহচরসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা খুনী মোস্তাকের সভায় শপথ নিয়েছিলেন। উনারা শুধু বঙ্গবন্ধুর প্রতিই অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেননি মহান মুক্তিযুদ্ধ তথা বাংলাদেশের প্রতিই অসম্মান প্রদর্শন করেছেন।
তারপরও আমাদের গর্ব করার মতো অনেক কিছ্ইু আছে। বঙ্গবন্ধুর সত্যিকার কিছু সংখ্যক সহচর খুনী মোস্তাকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁরা মোস্তাককে নাকচ করে দিয়েছিলেন। অপরদিকে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার অনেকেই মোস্তাকের আমন্ত্রণে বঙ্গভবনে যোগ দিয়েছিলেন। আমাদের আরো গর্ব এখানেই যে, সেই সভাতে দাঁড়িয়েই আমাদের বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বাবা, সংসদ সদস্য সিরাজুল হক মোস্তাককে দোষী সাব্যস্ত করে চিৎকার করে বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার এবং সভা ডাকার কোনো এখতিয়ার মোস্তাকের নেই। তখন মোস্তাকের সেই সভা পন্ড হয় গিয়েছিলো। তখন যদি উপস্থিত সকল সংসদ সদস্যই একই সাথে সংসদ সদস্য সিরাজুল হকের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে চিৎকার করে মোস্তাকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন তখন কি মোস্তাক টিকে থাকতে পারতো? এতো গেল রাজনীতিবিদদের নিয়ে কথা। এদিকে সেদিন তো টাঙ্গাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিৎ আর বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী খুনী চক্রের বিরুদ্ধে তাঁদের বাহিনী নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য হলো সেদিন অস্ত্রধারী কেউ এগিয়ে আসেননি। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। সোজা কথা, সব সেক্টরের আদর্শহীন সুবিধাভোগী ভীরুদের অপচিন্তা, অপকর্মের ফলেই খুনীরা কিছু দিনের জন্য হলেও মীরজাফর মোশতাককে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে সব কথার বড় কথাটি হলো যাদের নির্দেশে খুনীরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করলো সেই নির্দেশদাতারা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চায়নি, তারা বাংলাদেশকে হত্যা করতে চেয়েছিল। দেশী-বিদেশী সেই পরাজিত শক্তি একাত্তরের লজ্জাজনক পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই দীর্ঘদিন যাবৎ পরিকল্পনা করেই ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট তা বাস্তবায়ন করে দেশীয় কিছু বিপথগামীর মাধ্যমে। এমন জনশ্রুতিতো রয়েছেই যে ১৪ই আগস্ট রাতে পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং আমেরিকার কিসিঞ্জার নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন এবং ১৯৭৫ পনেরই আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটিয়েই তারা বিছানায় যান। পাকিস্তানের ভুট্টো-ইয়াহিয়া-নিয়াজি চক্র আর আমেরিকার নিক্সন-কিসিঞ্জার চক্রের মিলিত ষড়যন্ত্রের ফলেই ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের হৃদয় বিদারক মর্মান্তিক হত্যাকান্ড। এটা তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তার মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ড নিবন্ধে অনেকের মনের কথাটিই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে বলেন, ‘১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডটি নিছক কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক হত্যাকান্ড ছিল না। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যকে চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে। সেই লক্ষ্যটি ছিল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধারা থেকে দেশকে কক্ষচ্যুত করা এবং এদেশে আবার পরাজিত পাকিস্তানি ধারা ফিরিয়ে আনা।’
এ প্রসঙ্গে একজন বিশ্বখ্যাত দার্শনিকের একটি মন্তব্যের কথা খুবই মনে পড়ছে। ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন প্রায় সমাপ্তির পথে তখন আমেরিকা জাপানে অকারণে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে বসে। এর ফলে যে অমানবিক ঘটনা ঘটেছিলো এর ইতিহাস কারো অজানা নয়। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে সেই দার্শনিক পন্ডিত ব্যক্তি বলেছিলেন, এই বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে যে দানবীয় শক্তির জন্ম হয়েছে মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে হলে পৃথিবীর সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে তাকে রুখতে হবে। একইভাবে ১৯৭৫ সালের পনেরই আগস্টে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে যে দানবীয় শক্তির জন্ম হয়েছে সেই দানবীয় শক্তিকে রুখতে হলেও বঙ্গবন্ধু তথা মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে ঋদ্ধ হয়ে সারাদেশের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সাথে সাথে এটাও স্মরণে রাখতে হবে যে, একাত্তরের গ্লানি এখনো তারা ভুলতে পারেনি। অকৃতজ্ঞ মীরজাফরেরা কিন্তু যুগে যুগেই জন্ম নেয়। তাইতো বলি-সাধু সাবধান!
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT