উপ সম্পাদকীয়

মহাসড়কে চলাচল কতটা নিরাপদ

ইসহাক খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৮-২০১৯ ইং ০০:২২:৫৭ | সংবাদটি ৩০ বার পঠিত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় জানা গেছে, সড়কে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ বেপরোয়া গতি। ঈদ উপলক্ষে ১৫ দিনে অতিরিক্ত ট্রিপ দিতে মালিকদের চাপে চালকরা প্রতিযোগিতায় নামে। তখন গতিসীমা না মেনে গাড়ি চালানোর হার আরো বেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করে, যা নির্ধারণ করা আছে ৫৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। ঈদের পর শৃঙ্খলা না থাকায় ও অতিরিক্ত গতির বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির অভাবে প্রাণহানি বেশি হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার বড় কারণ অতিরিক্ত গতি। সড়কে শৃঙ্খলা জোরদার ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটি কমিটি ১১১টি সুপারিশ করেছে। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৭তম সভায় ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা হবে।
স্বাভাবিক সময়ে আমরা সড়কে নিয়মিত দুর্ঘটনার যে চিত্র দেখি তা আঁতকে ওঠার মতো। স্বাভাবিক সময়েও গড়ে ১০ জন করে মানুষ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। তবে ঈদের সময়ে আমরা যেন ধরেই নিয়েছি দুর্ঘটনা ঘটবে। মানুষ অকাতরে মরবে। ঈদের ছুটির পর থেকে ফাঁকা সড়ক ও মহাসড়কে ওভারটেকিং বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের প্রতিযোগিতাও বেড়ে যায়। আর সে কারণে প্রাণহানির ঘটনাও বেড়ে যায়। এ জন্য গতি নিয়ন্ত্রকের কী অবস্থা তা কেন্দ্রীয়ভাবে তদারক করে অপরাধ চিহ্নিত করে আইন অনুসারে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সমস্যাটা এখানে। অপরাধ চিহ্নিত করবে কে? যারা অপরাধ চিহ্নিত করবে, তারাই থাকে ঘুমিয়ে। না হয় থাকে টাকার ধান্ধায়। সড়কে যতগুলো পশুবাহী গাড়ি চলে, সব গাড়ির দিকে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর থাকে কড়া। রাস্তায় সেই গাড়ি থামিয়ে তারা চাঁদা আদায় করে। কোরবানির মৌসুম এলে পুলিশের বড় কর্তা জোর দিয়ে বলেন, মহাসড়কে পশুবাহী গাড়ি থামিয়ে পুলিশ চাঁদা আদায় করলে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। কেউ কি কোনো পুলিশকে তেমন কঠিন শাস্তি পেতে দেখেছে বা শুনেছে? তাই বলে চাঁদা নেওয়া কিন্তু থেমে থাকেনি।
তাহলে অপরাধ চিহ্নিত করবে কে? আজ পর্যন্ত দুর্ঘটনায় কোনো গাড়িচালককে শাস্তি পেতে কেউ দেখেছে, এ কথা জোর দিয়ে কেউ বলতে পারবে? কোনো চালককে শাস্তি দিলে সেদিনই দেশ অচল করে দেবে চালকরা এমন নজির আমরা অসংখ্যবার দেখেছি। বললে এভাবে বলা যায়, গাড়িচালকদের হাতে দেশবাসী জিম্মি।
পাশাপাশি এ কথাও বলা দরকার যে একজন চালক টানা পাঁচ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারে। এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা গাড়ি চালানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ঈদের সময় যাত্রী পরিবহনের জন্য সড়কে গাড়ি নামে বেশি। অথচ বৈধ চালক কম। চালকের সংকটের কারণে অবৈধ চালকও গাড়ি চালায়। যার পরিণতি আমরা চর্মচক্ষে দেখতে পাচ্ছি।
মহাসড়কে এসব অব্যবস্থাপনা আর বিশৃঙ্খলা দূর হওয়ার আশু কোনো সম্ভাবনা নেই। কে করবে? যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত তারা জনগণের সঙ্গে সাপলুডু খেলে মজা করে। এবার ঈদে উত্তরবঙ্গের ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি ছিল অবর্ণনীয়। কালিয়াকৈরের চন্দ্রা থেকে সিরাজগঞ্জ রোড পর্যন্ত দীর্ঘ কয়েক মাইল কঠিন জ্যাম ছিল সারাক্ষণ। এইটুকু জ্যাম ছাড়তে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা সময় লেগেছে। শিশু ও বয়স্কদের দুর্দশা ছিল সীমাহীন। অথচ দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বললেন, ঘরমুখো মানুষের যাত্রা স্বস্তিদায়ক হচ্ছে। পরের দিন যখন সব খবরের কাগজ ও চ্যানেলগুলো উত্তরবঙ্গের এই ভয়াবহ জ্যামের চিত্র তুলে ধরল, তখন মন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে দায় সারলেন। এই যদি হয় আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের কাজের নমুনা তাহলে আমাদের সমস্যা দূর হবে কিভাবে?
মহাসড়কে সবচেয়ে কঠিন যে সমস্যাটি রয়েছে, তা হলো ধীরগতির যানের অবাধ চলাচল। মহাসড়কে একটি ভারী যান নির্দিষ্ট গতিতে ছুটছে, তখন সামনে ধীরগতির কোনো যান পড়লে আর কি কোনো উপায় থাকে? ভারী যানটি হার্ডব্রেক করলেও ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে ১০০ গজ সামনে চলে যাবে। আর তাতেই ধীরগতির যানটির দফারফা হয়ে যাবে। মহাসড়কে অবাধে চলছে ভটভটি, সিএনজি, টেম্পো। এমনকি তিন চাকার রিকশা ভ্যানও চলে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে।
দুর্ঘটনাজনিত সব মৃত্যুই দুঃখজনক। তার পরও কিছু কিছু মৃত্যু মনে বড় দাগ কাটে। সিলেটে মধুচন্দ্রিমা শেষে ফেরার পথে নবদম্পতি সাদিয়া ও ইমরানের মৃত্যু বড় বেদনাদায়ক। পত্রিকা লিখেছে, মেহেদির রং হাতেই প্রাণ গেল সাদিয়া-ইমরানের। কুমিল্লায় একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু। এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া বড় কষ্ট। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১২ দিনে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২৫৩ জন। আহত ৯০৮ জন। এ কয়েক দিনে সংখ্যা আরো বৃদ্ধি হওয়ার কথা।
এ তো গেল মহাসড়কের কথা। এবার সড়কের কথায় আসা যাক। গ্রামগঞ্জের কথা বাদই দিলাম। খোদ রাজধানী শহরের অলিগলির যে চিত্র আমরা দেখি, তাতে ধরে নেওয়া যায় আমরা অভিভাবকহীন দেশের অসহায় নাগরিক। সব রাস্তাই এবড়োখেবড়ো। রিকশার ঝাঁকুনিতে পেটে ব্যথা হয়ে যায়। রয়েছে যত্রতত্র ময়লার স্তূপ। আমাদের যে দুটি সিটি করপোরেশন আছে, সেখানে যে দুজন সম্মানীয় মেয়র আছেন সেটা রাস্তায় ময়লার স্তূপ দেখলে বোঝার উপায় থাকে না। আগারগাঁও বাংলাদেশ বেতার থেকে মিরপুর পর্যন্ত নতুন একটি রাস্তা হয়েছে বছর তিনেক আগে। রাস্তাটি ৬০ ফিট নামে পরিচিত। এই রাস্তাটি মিরপুরবাসীর চলাচলে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু দুই বছর যেতে না যেতেই রাস্তাটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পুরো রাস্তা খানাখন্দে ভরা। রাস্তার দুই পাশে ময়লার স্তূপ। ময়লার কারণে রাস্তা চেপে সরু হয়ে গেছে। নাক না চেপে ওই রাস্তায় চলাচল করা যায় না।
মহল্লার যে রাস্তা দিয়ে আমি চলাচল করি, প্রতিবছর সেই রাস্তা মেরামত করতে দেখি। তিন-চার মাস যেতে না যেতে রাস্তা আবার আগের মতো ভাঙাচোরা, এবড়োখেবড়ো হয়ে যায়। শুরু হয় ভোগান্তি। কিছুদিন পর আবার রাস্তা মেরামত শুরু হয়। আবার সেটা মাস তিনেক চলে। আবার সেই আগের অবস্থা। এই অনিয়ম দেখার যেন কেউ নেই। কোনো জনপ্রতিনিধি জনগণের পাশে এসে দাঁড়ান না। চলছে তো চলছে। অথচ আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে চলছি বলে বড় ধরনের আওয়াজ শোনা যায়। বাস্তবে যার কোনো চিত্র চোখের সামনে দেখা যায় না।
বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে। বড় বড় সেতু হচ্ছে, কিন্তু আমাদের চারপাশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। যারা আমাদের সেবা করবেন বলে অঙ্গীকার করে ভোট চেয়েছেন, তাঁদের আমরা আর খুঁজে পাচ্ছি না। তাঁরা এখন সুদূরের মেঘ হয়ে আকাশে উঠে গেছেন। সেখান থেকে তাঁরা উদ্ভট ও অদ্ভুত ভাষায় কথা বলছেন। আমরা সেই ভাষা বুঝতে অক্ষম। আমরা শুধু শুধু ধরায় ধূলি হয়ে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছি। আর কত এই ভাসমান জীবন। আমরা এই অনিশ্চিত জীবনের অবসান চাই।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT