মহিলা সমাজ

নন্দিতা

নার্গিস মোমেনা প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৮-২০১৯ ইং ০১:২৫:৫৮ | সংবাদটি ৪৩ বার পঠিত

নন্দিতার মন ও শরীর কোনটাই ভাল নেই। বিয়ের পর নন্দিতা একটু বেশিই কষ্ট পেয়েছে, সাথে প্রচন্ড রাগও হচ্ছে। বাবা মায়ের একমাত্র কন্যা হওয়ার কারণে অতি আদরের এই দুলালী অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ। বাবা মা তাকে আর্থিকভাবে কোন অভাবে রাখেনি। যখন যেটা প্রয়োজন চাহিদা মতো সবই পেয়েছে। কিন্তু মেয়েটা বড় হয়েছে খুব অবহেলায় । শেষ কবে বাবা মায়ের সাথে সে অভিমান করেছিল তার মনে নেই বললে ভুল হবে। কিন্তু নন্দিতা যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করে সেগুলো মন থেকে মুছে ফেলতো। অর্ঘ্যের সাথে তাই তার যতো জিদ, রাগ, আবদার আর নানান রাজ্যের স্বপ্ন। স্বভাবগতভাবেই অর্ঘ্য খুবই শান্ত প্রকৃতির একটি ছেলে। নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া সে অহেতুক কোনো কথা বলে না। তার কর্ম জীবনের কারণেই হয়তো সে ঘুম থেকে ওঠে দুপুর এক’টায় অথবা দু’টায়। কোনো কোনো দিন খেতে সময় পায়, আবার কোনো দিন হয়তো পায়ই না। কোনো রকমে খেয়েই অতি দ্রুত বাইকটা নিয়ে দেয় ছুট। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, অর্ঘ্য খুব মজা করে কফি বানায়। যতœ করে সুন্দর আকর্ষণীয়ভাবে দু’কাপ কফি ট্রেতে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে আসে। খাবারের পরিবেশনটা তার খুবই চমৎকার। নন্দিতার কফি খুব পছন্দ।।
দুপুরে দু’জনে একসাথে খেতে বসে, অর্ঘ্য আগে নন্দিতাকে নিজ হাতে খাইয়ে দেয় তারপর নিজে খায়। অর্ঘ্য খুব যতœ নিয়েই নন্দিতাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। নন্দিতার ডান হাতে ঝাল জাতীয় কিছু লাগলে খুব জ্বালা করে। এইটা অর্ঘ্যর মনে থাকে বেশ ভালো করেই। নন্দিতা ভাত মাছ এবং স্বাভাবিক খাবারে অভ্যস্ত নয়। সে প্রতি বেলাতেই মাংস পছন্দ করে। বিশেষ করে মুরগির মাংস আর রুটি খায় তবে নিজের হাতে তুলে খাবে না। অন্যদিকে অর্ঘ্য অন্তত দুপুরের খাবার বরাবরই সে ভাত মাছ মাংস খেয়ে থাকে। অন্যান্য সময় পছন্দমাফিক নিজ হাতে স্ন্যাকস তৈরি করে খায়, এর মধ্যে বার্গার তার খুবই পছন্দের খাবার। দুপুরের খাবার এক সঙ্গে খেয়ে কিছুটা গল্প করতে করতে খুব মজা করে কফি খায় দু’জনে। কিন্তু এতো কিছুর পরেও নন্দিতা সুখে নেই। সে খুব সাজানো গুছানো ও পরিপাটি একটি মেয়ে। পড়াশোনার প্রয়োজনে দেশের বাইরে যখন ছিল তখনও এতো অনিয়ম করেনি নন্দিতা। ইদানিং অতিমাত্রায় ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমায় নন্দিতা। নন্দিতা কাঁদে আর অর্ঘ্যকে বোঝায় তার যতো দুঃখ কষ্টের কথা। কিন্তু কে শোনে কার কথা। নন্দিতার যতো কথা আর গল্প সব তার শাশুড়ির সাথে ।
ঠিক সাত মাস আগেই নন্দিতা তার মাকে হারিয়েছে। মায়ের শূন্যতা বাবা পূরণ করে চলছে। বুঝতেই দেয় না মায়ের অভাব। তাই তার শাশুড়ি’ই এখন মা। বলে রাখা ভালো তার শাশুড়ি প্রকৃতপক্ষেই নন্দিতার মা হতে পেরেছে। অর্ঘ্যর সাথে আজকাল খুব কম সময়ই কথা বলে নীলা ইসলাম। নিজের মেয়ে নেই তাই নন্দিতাকে পেয়ে নীলা ইসলাম অনেক খুশি। নন্দিতা তাই তার শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে আর বলে তোমার ছেলে এমন কেন? আমি কি চাই কেন বুঝতে পারে না? নীলা ইসলাম অবাক হয়ে করুণভাবে তাকিয়ে থাকে আর চিন্তা করে কার পক্ষ নিয়ে কথা বলবে! অর্ঘ্যর বিষয়ে তেমন গুরুতর কোনো অভিযোগ নন্দিতার নেই, ধনীর একমাত্র দুলালী বলে কথা! সকল বিষয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে যায়। সামান্য ব্যাপার নিয়ে সিরিয়াস। ব্যাস ঘটে যায় বেশ বড় বিপত্তি। নন্দিতা তার শাশুড়ির সাথে কড়া লিকারের দুধ চা খায় আর বলে আমি যেদিন চাকুরি করবো সেদিন এইটা করবো, ঐটা করবো ইত্যাদি বকবক করতে থাকে। নীলা ইসলাম ছেলে বউয়ের কথা শুনে হাসে আর হালকা লিকারের লাল চায়ে চুমুক দেয়। অর্ঘ্যও মুচকি হাসে। মাঝে মাঝে শাশুড়ি বউ ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে বিভিন্ন রান্না বান্নার আইটেম দেখে ঘরে তৈরি করে সকলকে খাওয়ায়। অর্ঘ্য চেটেপুটে খেয়ে বলে, হুম ভালো হয়েছে। খুব মজাতো ইত্যাদি।
অথচ নন্দিতা আশা করে তাকে ঘরে নিয়ে যেয়ে সবার অলক্ষ্যে তাকে জড়িয়ে ধরে চিবুকটা দু’হাতে তুলে অর্ঘ্য বলুক অন্যভাবে। নন্দিতার আপসোসগুলো তার শাশুড়ি বুঝে আর অনুভব করে। অথচ এই নন্দিতার চাওয়া পাওয়াগুলো সীমিত। দামী শাড়ি, অলংকার বা দামী দামী কসমেটিকস এসবের প্রতি আকর্ষণ তার বরাবরই কম। সে শুধু চায় ভালোবাসা আর ভালোবাসা। চায় বুকভরা ভালোবাসা। যেখানে থাকবে শুধু নন্দিতা আর অর্ঘ্য। অর্ঘ্য মুখে কিছু না বলুক অন্তত আকার ইঙ্গিতে নন্দিতাকে যে বোঝাবে সে ওকে ভালোবাসে তাও কিছু বলে না।
নন্দিতা চেয়েছিল একটা সাঝানো গুছানো ‘তুমি’। কিন্তু তাকে হতাশ করে গত রাত্রে নন্দিতা দেখলো অর্ঘ্যর ফেইসবুকে তাদের প্রথম চা খাওয়ার একমাত্র ছবিটা ডিলেট করে দিয়েছে। এতে সে মনে অনেক কষ্ট পেয়েছে। অথচ অর্ঘ্যর এক বান্ধবীর রান্না করা বীফ খিচুড়ির ছবিটা তার ফেইসবুকে ঠিকই আছে। এই বিষয়টি কি নন্দিতা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারে? কোনো মেয়ে তার ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে এইটা মেনে নিতে পারে না। রাগে দুঃখে টিএসসি থেকে অর্ঘ্যর কিনে দেয়া সবুজ রংয়ের রেশমী চুড়ি ভেঙে নন্দিতা তার হাত কেটে রক্ত ঝরিয়েছে। তার শাশুড়ি দেখে হতবাক সেই সাথে কষ্টও পেয়েছে যথেষ্ট। তাছাড়া সেদিনই তার শাশুড়ির খুবই জরুরি একটা কাজ ছিল সেখানে সময়মতো যেতে ঘটলো এমন বিপত্তি।
নন্দিতার এধরনের আচরণে অর্ঘ্যও হতভম্ব, কতোটুকু কষ্ট পেয়েছে তা বুঝা যায়নি তবে নন্দিতার ধারনা সে মোটেও কষ্ট পায়নি এমনকি বিচলিতও হয়নি। নন্দিতা দেশের বাইরে পড়ালেখা করে। ছুটিতে এসেছিলো তার ছুটি শেষ হলো। আগামীকাল তার ফ্লাইট রাত এগারোটায়। অর্ঘ্য গতকাল সন্ধ্যা থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত অফিস করেছে। ওর শিফট ডিউটি, নাইট শিফট ও মর্নিং শিফ্ট করে বাসায় এসেছে। তার প্রচুর বিশ্রাম প্রয়োজন এটা নন্দিতা বুঝতে চায় না। নন্দিতা সার্বক্ষণিক তাকে কাছে পেতে চায়। অন্যদিন নন্দিতা অধির অপেক্ষায় থেকে বারবার দরজার দিকে তাকায় কিন্তু আজ সে নিশ্চুপ। গতকাল রাত্রে অর্ঘ্যরে অনুপস্থিতি তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে তাই অভিমানে সে ঘরে তার শাশুড়ির হাত ধরে শুয়ে থাকে। ভাঙা চুড়িতে কাটা তার হাতে খুব ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। নন্দিতা আবারো মা পেয়েছে। কিন্তু তার স্বামীকে যেমনভাবে চেয়েছিলো তেমনভাবে পায়নি।
নন্দিতার সমস্ত চিন্তা ভাবনা কেবল অর্ঘ্যকে ঘিরে। এই ভাবতে ভাবতে কিছুটা তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তন্দ্রা ভেঙ্গে উঠতেই তার ভেতর একই চিন্তা ঘুরপাক খায় এমনি করে সে অসুস্থ্য হয়ে পরে। একদিন অর্ঘ্য হারিয়ে গেলে মা-ও হারিয়ে যাবে, সেদিন কি হবে! চিন্তা করতে করতে সে ঘুমিয়ে পরে। নীলা ইসলাম খুব সতর্কতার সাথে উঠে যায়, পাশে যদি আদরের মেয়ের ঘুম ভেঙ্গে যায়। নন্দিতা মনে মনে বলে তুমি ভালো থেকো আম্মু, তোমাকে অনেক বিরক্ত করি, অনেক যন্ত্রনা দেই, কিন্তু মা, আসলেই তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT