মহিলা সমাজ

এক বুক শূন্যতা

তাসলিমা খানম বীথি প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৮-২০১৯ ইং ০১:২৬:২৯ | সংবাদটি ৪৩ বার পঠিত

দ্রুত গতিতে কমলাপুর রেলস্টেশনে ঢুকলো মাহমুদ। টিকিট কাটার লাইনে, চায়ের দোকানে, কফি শপে, স্টেশনের বিশ্রামরুমে ‘না! সেখানেও নেই। পাশে একজনকে জিজ্ঞাসা করতেই বললÑকিছুক্ষণ আগে সিলেটের ট্রেনটি ছেড়েছে। ফেসবুকে জেরিনের স্ট্যাটাসটি চোখে পড়তেই দেখা করতে স্টেশনে এসেছিলো মাহমুদ। কল রিসিভ হচ্ছে না দেখে ফেসবুকে নক করে জেরিনকে। কিছুক্ষণ পর ইনবক্সে মেসেজের উত্তর।
কেমন আছো?
Ñভালো।
Ñতুমি?
Ñভালো নেই।
Ñকেন?
Ñকাজিনদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে পরিবার থেকে চাপ আসছে।
Ñমাহমুদ বলে- তোমার স্টাট্যাস দেখলাম ঢাকা আসছিলে। আমি তো ঢাকায়ই থাকি। একটু তো নক করতেই পারো। দেখা হলো বরং ভালোই লাগতো। ঢাকা আসলে বললে না যে।
Ñতুমি ঢাকায় থাকো, জানি না তো। কাজিনের বিয়েতে এসেছিলাম।
Ñদেখো, এখন তো আসলে সময়ও হয়েছে। তাতে তোমার আপত্তি কেন? পরিবার কি তোমার অমতে কাউকে চাপিয়ে দিচ্ছে?
Ñজেরিন উত্তর দেয়-না।
Ñমাহমুদ বলে-এ নিয়ে মন খারাপ করো না। এখন ভালো মনের একজন পাত্র খুঁজে পাওয়া অনেক কঠিন। আর তুমি কাউকে পছন্দ করলে সেটা পরিবারকে জানিয়ে তাদের কাজটা সহজ করে দিতে পারো। আমি তো পোস্ট দেখি। যখন তুমি যাবার ট্রেনে চেপে বসে পিক দাও তখন। আর তখন শুধু চলে যাবার পথে তাকিয়ে থাকা।
Ñঅপেক্ষায় থাকো মানে! বুঝলাম না।
Ñমাহমুদ বলে -আমি জানি পথকে শুধু যেতে দিতে হয় না, পথের সাথে হাঁটতে হয়। কিন্তু এতটা পিচ্ছিল যে... পেরে উঠতে পারি না কিছুতেই।
Ñজেরিন হেসে বলে-আমার পথে কেউ চেয়ে থাকে এটা জেনে সত্যি ভাবাচ্ছে। তবে একদিন এ পথ চলা শেষ হবে। অনেকদিন হলো তোমার কোন কবিতা শুনি না। একটা কবিতা শুনাবে।
মাহমুদ কবিতা আবৃত্তি করে-
‘প্রাক্তন’
বৃষ্টি তুমি ফেরার দিনে এসো
ফিরে যাবার বেদনাটা ছুঁয়ে
পায়ের ছাপের বিষণœতা ধুয়ে
ফেরার দিকে ফিরে খানিক হেসো।
ফেলে যাওয়া তোমার হাসির ছটা
ফোটায় ফোটায় ফুটুক বৃষ্টিফুল
ধুয়ে নাও শ্যাম, রাধার কলঙ্কটা
লীলায় নাচুক কদম আর বকুল।
মাহমুদ জেরিনকে বলে-আমি একটা সময়ে তোমাকে নিয়ে ভাবতাম। ভাবতাম বললে ভুল হবে। প্রচন্ড ভালোবাসতাম। কিন্তু সাহস পাইনি। তোমাকে বলব বলে অনেক ট্রাই করেছি। যদি ফিরিয়ে দাও। সেই ভেবে বলিনি। তবে তোমার কাজিন তারেককে বলেছিলাম তোমার কথা। সে তো আমার নামে মামলা করার প্রস্তুতি নিলো। পারলে ওখানেই লোকজন নিয়ে আমাকে মারধোর করতে চেয়েছিলো। পরদিন আমার অফিসে এসে বসের সামনে অপমান করে গেলো। লজ্জা আর ভয়ে ঐদিনই সিলেট ছাড়তে মন চাচ্ছিল। তারপরে আর ভয়ে ভয়ে তোমাকেও কিছুই বলিনি।
জেরিন তখন বলে- মানে কি?
Ñতোমার কথা কিছুই বুঝতে পারিনি। সব মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো। কিছু বলার থাকলে সরাসরি বলতে পারতে। তুমি একটা ভীতুর ডিম।
Ñমাহমুদ আবার ইনবক্সে মেসেজ দেয়- ভাবতাম, ভালো লাগত। ভালো লাগতে লাগতে কখন যে ভালোবেসেছি। নিজেই জানতাম না। কিন্তু ঐ ঘটনার পর আমি প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম। তারপর বাকী সব চেপে গেলাম আর কখন সিলেট থেকে বদলি হতে পারব তাই ভাবছিলাম।
আমি জানি, তুমি আমার সাথে থাকলে ওরা কিছুই করতে পারত না। কিন্তু ঘটনার তাৎক্ষণিকতায় আমি এসব ভুলে যাই। সত্যি খুব ভয় পেয়েছিলাম। বিশেষ করে মান-সম্মানের ভয়।
Ñজেরিন বলে- তুমি একটা পাগল। কখনো বুঝতেই পারলে না আমাকে।
Ñমাহমুদ বলে- স্যরি, এখন আসলে এটা বলা আমার উচিৎ হয়নি। ভাবছিলাম তখন যেহেতু বলিনি, আর কোনদিন বলবও না। আবেগে বলে দিলাম। ক্ষমা করো।
Ñজেরিন তখন মাহমুদকে জিজ্ঞাসা করে বিয়ে করছ- হুম।
Ñমাহমুদ আবার ফেসবুকে ইনবক্সে মেসেজ দেয়-কখনও ঢাকায় এলে আমার বাসায় বেড়াতে আসবে। আমার বউ জানে, তুমি আমার খুব ভালো বন্ধু। যদি আর কখনও সিলেটে আসি তো তোমাকে না দেখে ফিরব না
Ñজেরিন তখন মাহমুদের মেসেজের উত্তর দেয়-এখন তুমি একজন নারীর ভালোবাসার মানুষ। বিয়ে করা স্বামী। এসব শুনিয়ে কী লাভ?
Ñমাহমুদ জবাব দেয়- আরে পাগলী, প্রেম কি বুড়ো হয়? না মরলে, সেও বেঁচেই রয়।
মাহমুদের সাথে ফেসবুকে চ্যাট করে জেরিনের তখন প্রচন্ড মন খারাপ হয়। কারণ জেরিনও মাহমুদকে ভালোবাসতো। শুধু অপেক্ষায় ছিলো সে নিজে থেকেই বলুক। হৃদয়ে এক বুক শূন্যতা নিয়ে ট্রেনের জানালায় মুখ রেখে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে নেয় জেরিন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT