ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন

আতিকুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৮-২০১৯ ইং ০০:২৯:২৮ | সংবাদটি ১৩১ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
এই পরিপ্রেক্ষিতে এখন দরকার সরকার ও জনসংহতি সমিতির আরেকটি সংলাপ বৈঠকে বসা। এই লক্ষ্যে সন্তু বাবু মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর সাক্ষাৎ প্রার্থী হয়ে একাধিক বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। মনে হয় সরকার পক্ষ অপ্রস্তুত। পার্বত্য সংকট বিষয়ে সমাধানমূলক কোনো ধারণা তাদের নেই। এজন্যই পশ্চাদ ধাবন।
সরকার ও প্রশাসন আদালত নয়। চুক্তি ও আইনগত প্রশ্নে ভিন্নতা করার এখতিয়ার তাদের নেই। তাদের দায়িত্ব হলো তা পালন করা। চুক্তি ও আইন সংশোধন করার ক্ষেত্র উভয় পক্ষ ও জাতীয় সংসদ। কোনো অপ্রিয় দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকতে হলেও সুপ্রীম কোর্ট থেকে তার অনুমতি লাভ আবশ্যক। সরকার প্রতিপক্ষের সম্মতি গ্রহণ ছাড়াই, পার্বত্য চুক্তির প্রশ্নে এক তরফা আচরণ করছেন। জানতেও চাচ্ছেন না, সাংবিধানিক ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তাদের পরামর্শ কী। এটাও জনসংহতি সমিতির কাছে জিজ্ঞাস্য যে, চুক্তি মুখবন্ধ ও তার আভ্যন্তরিন ভিন্নতার মাঝে সামঞ্জস্য সাধন কি করে সম্ভব?
সরকার পার্বত্য বিরোধ প্রশ্নে ধামাচাপা দান ও সময় ক্ষেপণে ব্যস্ত। এটা সঠিক কর্তব্য পালন নয়। তারা এটা বুঝতে অপারগ যে, বিষয়টি এখন মীমাংসার দ্বার প্রান্তে উপনীত। চুক্তি থেকে পিছানো নয়, মূলতঃ এর দ্বারাই সাফল্য অর্জন সম্ভব। চুক্তির দ্বারা জনসংহতি সমিতির হাত পা বাঁধা। সে ভিন্ন কিছু করতে নীতিগত অক্ষম। এখন তার দ্বারা অনুষ্ঠিত সন্ত্রাস হলো, চুক্তি বাস্তবায়ন না করার হতাশা জাত উপদ্রব। তাদের সন্দেহ চুক্তি আদৌ টিকে থাকে কিনা। হয়তো আবার তাদের সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাই তাদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি।
সরকার তাদের আশ্বস্ত করছেন না। চুক্তির দোহাই দিয়ে তাদের এ কথা বুঝান সম্ভব যে, কতিপয় চুক্তি দফার দ্বারা সংবিধান লঙ্ঘিত হচ্ছে, যা চুক্তিতেই নিষিদ্ধ। আপত্তি ভূক্ত এই চুক্তি দফা সমূহ বাস্তবায়ন না করা চুক্তি লঙ্ঘন নয়। জনসংহতি সমিতি, চুক্তির এই দোষ ক্রটি সম্বন্ধে সচেতন। যুক্তির প্রতি তারা অনুগত। আলোচনা ছাড়া তারা স্বতস্ফূর্তভাবে বলতে পারে না যে, সরকারের এই স্থহিত করণ সিদ্ধান্ত যথার্থ। উভয় পাক্ষিক কোনো বৈঠকে, এখনো পার্বত্য চুক্তির দোষ ক্রটি উদঘাটন ও তা নিরসন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এমনটি হলে, জনসংহতি সমিতির এ সংক্রান্ত মূল্যায়ন কি তা জানা যেতো এবং তারই ভিত্তিতে সংকট উত্তরনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হতো। বুদ্ধি বৃত্তিক পর্যায়ে পার্বত্য চুক্তির পক্ষে বিপক্ষে এ যাবৎ অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। জনসংহতি সমিতি সে সম্বন্ধে অবশ্যই ওয়াকিবহাল। কিন্তু এ যাবৎ এই সংগঠনটি চুক্তির দোষ ক্রটির প্রশ্নে কখনো মুখ খুলেনি। চুক্তি তাদের এক বিরাট রাজনৈতিক অর্জন। এটিকে ঘায়েল করা তাদের লক্ষ্য হতে পারে না। তাই তারা এ ব্যাপারে নীরব। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হলো দোষ ক্রটি উদঘাটন ও তা নিরসনের ব্যবস্থা করা। সে দায়িত্ব পালিত হচ্ছে না। বিপরীতে জনসংহতি সমিতি, নিজেদের অর্জনকে কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করতে আন্দোলনে নেমেছে। এটা করা তাদের পক্ষে স্বাভাবিক। এটা তাদের পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা নয়, দৈনন্দিন রাজনীতির অংশ মাত্র। এই প্রেক্ষাপটে সরকার দোষী সেজে চুপ মেরে না থেকে, চুক্তির দোষ ক্রটি প্রশ্নে সোচ্চার হতে পারেন। তাতে জনসংহতি সমিতি হয় নমনীয় হবে, নয়তো উত্তপ্ত মনোভাব ব্যক্ত করবে। শেষ পর্যন্ত তাতে যুক্তিরই জয় হবে এবং জনসংহতি সমিতি চুক্তি সংশোধনে রাজি না হয়ে পারবে না। এ ছাড়া তারা দোষ ক্রটি স্বীকার ও চুক্তি সংশোধনীতে সম্মত হতে পারে না।
বাংলাদেশ সংবিধানকে পার্বত্য চুক্তিতে সর্বোচ্চ মান্যের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তাতে নীতিগতভাবে চুক্তির সংবিধান বিরোধী দফাগুলো অকার্যকরই বলা যায়। এই অকার্যকরতা সমাধানের মালিক সম্মিলিতভাবে চুক্তিকারী পক্ষদ্বয়, অথবা সুপ্রীম কোর্ট। চুক্তি দফা বাস্তবায়ন অথবা স্থগিত করণে চুক্তিকারী পক্ষদ্বয় ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষমতাবান। এই ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে, ঐক্যমত সৃষ্টির প্রয়োজনে, উভয় পাক্ষিক সংলাপ আবশ্যক। জনসংহতি সমিতি অনুরূপ সংলাপে উদগ্রীব বলে বিরোধ মীমাংসায় তার আন্তরিকতার প্রমাণ দিয়েছে। অথচ সরকার এ ব্যাপারে নিষ্ক্রিয়, যা দুঃখজনক। সংলাপ অনুষ্ঠিত হলে জনসংহতি সমিতি চুক্তির ব্যাপারে আরো ছাড় দিতে ও নমনীয় হতে সুযোগ পেতো, যা না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক।
চুক্তির দ্বারা বিভিন্ন বিষয়ে উভয় পাক্ষিক সমঝোতা হয়েই আছে। নতুন করে উচিত চার বিরোধীর ব্যাপার অমীমাংসিত কিছু নয়। এই প্রশ্নে উভয় পাক্ষিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হলে, অবশ্যই সুরাহা পাওয়া যাবে। জনসংহতি সমিতি কৃত সমঝোতার ভিন্নতা করবে, তা ভাবা অমূলক। বদ্ধমূল ধারণা আর সন্দেহই সরকারকে চিন্তায় ফেলে রেখেছে। সমিতিও তজ্জন্য সরকারের উপর আস্থা রাখতে পারছে না। নিয়মিত বৈঠক হলে, ভুল বোঝাবুঝি আর সন্দেহ তো দুর হতোই, যুক্তি মান্যতাও তাতে বাড়তো। বিরোধ মীমাংসায়ও তা হতো সহায়ক। সংযোগ না রেখে, দূরে বসে থেকে, সন্তু লারমা ও উপজাতীয়দের সন্দেহ করা সরকারসহ অনেকের মাঝেই ক্রিয়াশীল।
এটা স্বাভাবিক যে, স্বজাতীয় কল্যাণ ও নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি সন্তু বাবুরা অগ্রাধিকার সহকারে ভাববেন। বিপরীতে দেশ ও জাতির পক্ষে সরকারকেও সোচ্চার হতে হবে। নতুবা গোল হবে এক তরফা। এটাই হয়েছে চুক্তি কালে ও পরে। সরকার পক্ষের লক্ষ্য ছিলো উপজাতীয় পক্ষের সন্তুষ্টি বিধান এবং চুক্তি সম্পাদন। তাদের ভয় ছিলো সংলাপের ব্যর্থতায় যদি স্বাধীনতা ঘোষিত হয়ে যায়, তখন উপজাতীয়দের বাগে আনা হবে আরো কঠিন। যদিও এই ধারণা ছিলো অমূলক। ভারত সহ বিশ্ব পরিস্থিতি ছিলো জনসংহতি সমিতির প্রতিকূলে। সমঝোতায় দেরী হলে, ভারত নিজেই তাদের ঠেলে দিতো সীমান্তের এ পারে। এই বিরূপ চাপের মুখেও সন্তু বাবু জনসংহতি সমিতিকে চমৎকার নেতৃত্ব দিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকারকেও প্রচন্ড চাপের মুখে রেখেছেন। ফলে চুক্তিটি তারই চিন্তা চেতনার অনুকূলে সম্পাদিত হয়েছে তদ্বারা প্রমাণিত, তিনি একজন পরিপক্ষ রাজনীতিবিদ। তিনি পার্বত্য উপজাতীয় সমাজে এক অপ্রতিদ্বন্ধী নেতা।
আসলে সন্তু লারমা লেখা পড়ায় তো বটেই, রাজনীতিতেও নেতৃত্ব সুলভ দক্ষতায় একজন উঁচু মাপের নেতা। তাঁর সমকক্ষ দ্বিতীয় কোনো উপজাতীয় নেতা নেই। মূলতঃ একজন স্কুল শিক্ষকের পুত্র নিজেও পেশায় প্রথমে স্কুল শিক্ষক, তৎপর পার্বত্য উপজাতীয় সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ার সুবাদে গুরু রাজনীতিকে পরিণত। স্থানীয় উদীয়মান রাজনীতিকদের প্রায় সবাই তাঁর ও প্রয়াত বড় ভাই মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার শিষ্য। উচ্ছাভিলাষী শিষ্যদের কেউ কেউ এখন তাকে ডিঙ্গাবার চেষ্টা করছেন, যেমন ইউ, পি, ডি, এফ নেতা প্রসিত খীসা এবং মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার চ্যালেঞ্জকারী ত্রিপুরায় অবস্থানরত প্রিতি কুমার চাকমা। কিন্তু লারমা ভাতৃদ্বয়ের রাজনৈতিক শুরুর আসন টলানো তাদের কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা ছিলেন একজন রাজনৈতিক জিনিয়াস। ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমাও তিনি গুরু। এখন সে প্রধান গুরুর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে ছোট ভাই সন্তু লারমা। তিনিও আরেক জিনিয়াস। উপজাতীয়দের উপর তার রাজনৈতিক প্রভাব অপরিসীম। বিরল রাজনৈতিক প্রতিভাই তাকে নেতৃত্বের শীর্ষ স্থানে উন্নীত করেছে। তার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের কাছে উপজাতীয়দের প্রায় সবাই শ্রদ্ধাবনত। আকাশচুম্বী ইমেজের বলে মনে হয়, তিনি উপজাতীয় রাজাদেরও রাজা। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির এক প্রান্তিক নেতা হলেও, প্রতিভায় তিনি অন্যতম বাংলাদেশী জাতীয় নেতা হওয়ার যোগ্য। নেতৃত্বের বিরল প্রতিভায় তিনি অনেক জাতীয় নেতাকেও টেক্কা দিতে সক্ষম। তাকে ক্ষুদ্র পরিসরে, বিদ্রোহী উপজাতীয় নেতা রূপে ঠেসে রাখা অনুচিত। একমাত্র ব্যক্তি তিনি, যার দ্বারা সম্ভব, পাহাড়ি বাঙালিদের মাঝে সম্প্রীতির সেতু বন্ধন রচনা করা এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাকে উপড়ে ফেলা।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • সিলেটে আরবি ভাষাচর্চা
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা
  • Developed by: Sparkle IT