শিশু মেলা

আইসক্রিম এবং চিনি

মিদহাদ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৮-২০১৯ ইং ০০:০৮:০৩ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত

আরিফ, এই আরিফ। কোথায় গেলি?
জ্বি আম্মু, বলেন।
শোন, দোকানে যা। এক কেজি পেয়াজ, আর এক কেজি আলু নিয়ে আসিস।
আচ্ছা আম্মু ঠিক আছে।
আরিফ মা বাবার একমাত্র ছেলে। ক্লাস টেনে পড়ে। পড়াশোনায় ভালো। আরিফের বাবা একটা ফার্ণিচারের দোকানে দেখাশোনার কাজ করেন। ফার্ণিচারের দোকানটা খুব একটা বড় নয়। আরিফের বাবার সামান্য বেতনেই ওর পড়াশোনা আর পরিবার চলে। আরিফের মা গৃহিনী। ভাবুক ধরনের ছেলে আরিফ। কখনোই মা বাবার কোনো কথার অবাধ্য হয় না। চিন্তা করে কীভাবে সে মা বাবার স্বপ্নকে বাস্তব করবে।
আনমনা হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে আরিফ। দোকানে যাবে। মা একশো টাকার একটা নোট হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। রাস্তায় হাঁটার সময় আরিফ খেয়াল করলো একটা ছোট্ট পথশিশু রাস্তার ধারে বোতল কুড়াচ্ছে। চুলগুলো উশখুশ। কাপড়ের বালাই নেই। পাশে থাকা একটা রেস্টুরেন্টের দিকে এক দৃষ্টিতে শিশুটি তাকিয়ে আছে। আরিফের মন নিমিষেই খারাপ হয়ে গেলো। এমন সময় আরিফের পাশ দিয়ে হুহু করে একটা মোটরসাইকেল চলে গেলো। মোটরসাইকেলে একটা বাচ্চা ছেলে বসা। হাতে থাকা আইসক্রিমটা ছেলেটার হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেছে। মোটরসাইকেল থেকে নেমে বাচ্চাটাকে তার বাবা বললেন, আমি আরেকটা আইসক্রিম এনে দিচ্ছি। এখানে দাঁড়াও। বাচ্চাটার জন্য আরেকটা আইসক্রিম নিয়ে এসে মোটরসাইকেল করে চলে গেলেন সেই ভদ্রলোক। আরিফ সেখানেই দাঁড়ানো ছিলো। হুট করে সেই পথশিশুটি এসে আইসক্রিমটা হাতে নিলো। সামান্য একটু গলেছে তাতে কী? হাসি ফুটা মুখ দেখে আরিফ কিঞ্চিৎ সময় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো।
আরিফ আবার হাঁটা শুরু করলো। দোকানে যাবে। দোকানীকে গিয়ে বললো, এক কেজি আলু আর পেয়াজ দেয়ার জন্য। দোকানদার দোকানে থাকা ছোট্ট ছেলেটাকে ডেকে বললো,
এই রাসেল, এক কেজি আলু আর পেয়াজ দে। ছেলেটা, ‘দিতাছি মহাজন’ বলে ব্যাগ হাতে নিলো। আরিফ পেজ আর আলু নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো। হঠাৎ শোরগোলের আওয়াজে পেছন ফিরলো আরিফ। দোকানদার সেই বাচ্চা ছেলেটাকে বেধরক পেটাচ্ছে। আরিফ কিছু বলার আগেই দোকানদার সেই বাচ্চা ছেলেটাকে বললো,
তোরে চিনি লইতে ক্যাডা কইছো? আমার এতোটা চিনি যে মাটিতে পড়লো, সেইটার টাকা কি তোর বাপে দিবো? ছেকেটা কান্না করতে করতে বললো, মহাজন আমায় এইবারের মতো ক্ষমা কইরা দেইন। ওমা গো লাগতাছে। আল্লাহর দোহাই লাগে আমার হাতে ব্যথা করতাছে। এরকম ভুল আর হইবো না।
দোকানদার বললো,
না। আইজ তোরে শেষ কইরা দিমু। দোকানটা কী তোর নঙ্গরখানা মনে হয়? যা ইচ্ছা তাই নষ্ট করবি?
আরিফ ছেলেটার কান্না দেখে দোকানীকে বললো,
আংকেল, ও তো ক্ষমা চাচ্ছে। আর এরকম হবে না। আর মারবেন না ওকে।
দোকানী আরিফকে চোখ রাঙিয়ে বললো,
টাকা কি তুমি দিবা? আমার যে লস হইলো?
আরিফ বললো, আমি দিবো। আপনি ওকে আর মারবেন না। কত টাকা?
দোকানী বললো, আধাকেজি চিনি নষ্ট হইছে। পঁচিশ টাকা।
আরিফ পঁচিশ টাকা দোকানীকে দিলো। দোকান থেকে আরিফ বেরিয়ে পড়লো। পেছনে সেই ছোট বাচ্চা ছেলেটার কান্না ঝড়া চোখ, যে চোখ স্বপ্ন দেখতে শেখায়। যে চোখের স্বপ্ন হাতছানি দেয়, উঁচু আকাশ পর্যন্ত।
আরিফ এগিয়ে চললো। সে এই পৃথিবীর মায়াকাননে কেবল শিশুদের প্রতি নির্মমতা দেখতে পায়। কখনোবা শিশুরা নির্যাতিত হচ্ছে, কখনোবা সেই শিশুর স্বপ্ন কাচের গ্লাসের মতো ভেঙ্গে যাচ্ছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিফ। উফ...

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT