শিশু মেলা

বিষ

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৮-২০১৯ ইং ০০:০৯:০৩ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

এই সিএনজি এই সিএনজি বলে রহিম উদ্দিন একটি সিএনজি ড্রাইভারকে ডাক দেয়। সিএনজি ড্রাইভার যেন শোনতেই পায়নি বলে চলে যায়। আবারো গাড়ির জন্য অপেক্ষা। এরই মধ্যে রহিম উদ্দিন একটি সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছেন।
রহিম উদ্দিন আবিরের ছোট চাচা। আবির এই বৎসর দশম শ্রেণীতে পড়ে। রহিম উদ্দিন আবিরকে নিয়ে ছোট বোনের বাড়িতে বেড়াতে যাবে। আজ বৃহস্পতিবার। আগামীকাল আবিরের স্কুল বন্ধ। তাই এই পরন্ত বিকালে বোনের বাড়ির উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়া।
আবিরের এক হাতে আমের ব্যাগ অন্য হাতে কাঁঠালের বস্তা ধরে দাড়িয়ে আছে। চাচার হাতেও একটি ব্যাগ। আবিরের দাদী ছোট মেয়ের জন্য কত কী দিয়েছেন। এত কিছু নিয়ে তারা সামনে আগাতে পারছে না।
একটু পরে একটি সিএনজি আসে। রহিম উদ্দিন ঐটিকে ডাক দিতেই ড্রাইভার গাড়ি থামায়। গাড়িতে আগে একজন যাত্রী ছিল। আবির ও রহিম উদ্দিন তাদের ব্যাগ বস্তা নিয়ে গাড়িতে উঠে। রহিম উদ্দিনের হাতে তখনও সিগারেট রয়েছে। গাড়ির অন্য যাত্রী বলে ভাই সিগারেটটা ফেলে দিন। কিন্তু রহিম উদ্দিন যেন শোনতেই পায়নি। তিনি সিগারেট টেনেই চলেছেন। অন্য যাত্রী আবারও বলে ভাই সিগারেট ফেলে দিন। এবার রহিম উদ্দিন রাগের সাথে বলে উঠে সিগারেটটা টাকা দিয়ে কিনেছি, ফেলে দেব কেন? এতে অন্য যাত্রীও রেগে যায়।
বলে, তাহলে আপনি সিগারেট শেষ করে গাড়িতে উঠতেন? আপনিতো জানেন গাড়িতে ধূমপান করা অন্যায়?
আপনার ন্যায় অন্যায় দেখা লাগবে না, রহিম উদ্দিন জবাব দেয়।
ড্রাইভারও রহিম উদ্দিনকে বলে ভাই সিগারেট ফেলে দেন। কেন তর্ক করছেন?
রহিম উদ্দিন চুপ করে সিগারেট ফেলে দেয়।
আবির চুপ চাপ সকল বিষয় শোনে। চাচাকে কিছু বলতে পারছে না। আবিরও জানে গাড়িতে ধূমপান নিষিদ্ধ। তারপরও আমাদের দেশে প্রায় সময়ই গাড়িতে ধূমপান করতে দেখা যায়। অনেক সময় এই ধূমপান নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে বিতন্ডা হয়। অনেক সময় গাড়ির ড্রাইভার, হেলপারও চলন্ত গাড়িতে ধূমপান করতে থাকে। এ যেন এক আজব কান্ড !
আবির দেখে বাড়িতেও মাঝে মাঝে চাচা সিগারেট খায়। তবে আবিরের বাবার সামনে কখনো সিগারেট খেতে দেখে নি। বড় ভাইয়ের আড়ালে চাচা ধূমপান করে। আজ সারা সকাল ফুফুর বাড়ির প্রস্তুতির জন্য সিগারেটে আগুন দেওয়া হয়নি কারণ সারা সকালেই বড় ভাই আশপাশে ছিল। তাই বাড়ি থেকে বের হতেই ধূমপানের পিয়াসে পেয়েছে।
আবির ভাবে চাচাতো এরকম নয়। কিন্তু যাত্রীতো কাকাকে খারাপ বলেনি। তারপরও চাচা রেগে গেলেন। ব্যাপার কী?
প্রায় আধ ঘন্টার মধ্যেই আবিরেরা ফুফুর বাড়িতে চলে আসে। ফুফুর বাড়িও গাড়ি চলাচলের রাস্তার পাশে। আবিরের ফুফা সৌদি আরবে থাকেন প্রতিবছর দুই মাসের ছুটিতে বাড়িতে আসেন। এই কয়দিন হল ছুটি শেষে তিনি সৌদি আরব চলে গেছেন। ফুফাকে বিদায় দেয়ার সময় আবিরেরা সবাই এসেছিল। আজ আবার ফুফুকে দেখতে এল।
আবিরকে দেখে ছোট ফুফাতো বোন রাহেলা ও নাওমী দৌড়ে আসে আবির ব্যাগ রেখে নাওমীকে কোলে তুলে নেয়। আর রাহেলাকে রহিম উদ্দিন কোলে তুলে নিয় আদর দেয়। আস্তে আস্তে সন্ধা ঘনিয়ে আসে এরই মধ্যে আবিরের ফুফু খাবারের জন্য বারবার বলতে থাকে। আবিরের চাচা বলে এই সময় কি কেউ খাবার খায়? কিন্তু আদরের ভাই বোনদের মধ্যে কয়েকদিন্ পর দেখা হলে মন যে উতলা হয়ে যায়। বোন ভাবতে থাকে ভাইয়ের কিভাবে সেবা করা যায়। ভাই কী করলে খুশি হবে। এ যে এক আনন্দের পেরেশানী।
আবিরের একজনই ফুফু। তিনি সবার ছোট। সবার আদরের। ফুফুর শ^াশুরী ছাড়া বাড়িতে আর কেউ নেই। মসজিদ একটু দূরে তাই আবির ও তার চাচা বাড়িতেই আছর মাগরিব এশা নামাজ আদায় করে। এশার নামাজের পর রাতের খাবার সেরে নেয়। এশার পর ফুফু, চাচা, আবির গল্পে মেতে উঠে। আবিরের ফুফু সুমাইয়া আবিরকে খুব ভালবাসে। আবির কোন আবদার করলে ফুফু কখনো ফেলে দেননি। এরই মধ্যে আবিরের চাচার রাস্তায় সিগারেট খাওয়ার বিষয়টি মনে পরে।
আবির ফুফুকে বলে, ফুফু আমি একটি কথা বলব। তুমি আমার পক্ষে থেক। এতে চাচার কান খাড়া হয়ে যায়। চাচা বলে তুই কি বলবি? আবির বলে আচ্ছা চাচা তুমি গাড়িতে সিগারেট নিয়ে কেন তর্ক করলে? তুমিতো জান এটা অন্যায়? আর ঐ যাত্রী খারাপতো কিছু বলেনি?
তুই এসব বুঝবিনা।
আচ্ছা বলনা।
শোন যারা ধূমপান করে খাওয়ার আগে এবং খাওয়ার সময় তার পিপাসায় তারা খানিকটা মাতাল থাকে। তাদের হিতাহিত জ্ঞান অন্য সময়ের তুলনায় একটু কম থাকে বলেই আমার মনে হয়। এটাও এক ধরনের নেশা। আর যাদের মাদকের নেশায় পেয়ে বসেছে তারা সেবনের আগে পিপাসায় মাতাল আর সেবনের পরে মাদকের ক্রিয়ায় মাতাল থাকে।
আচ্ছা কাকা বলতো, ধূমপান বিষপান এই কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমার মনে হয় ধূমপান বিষপানের চেয়েও অনেকাংশে মারাত্মক। কারণ একজন মানুষ বিষপান করলে নিজে নিজে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ধূমপানকারীরা শুধু নিজেরা ধ্বংস হয় না, আশপাশের সকলকেই ধ্বংস করে দেয়। এই দেখ আব্বার সামনে তুমি সিগারেট খাওনা। ভাল কথা। কিন্তু তুমি তোমার রুমে সিগারেট খাও। বাসায় নওশীন, নাবিলা, চাচী তোমার ধূমপানের কারণে তারাও বিষপানের শিকার। আরোও একটু দেখতো তোমার ভিতরে ধোয়া যাচ্ছে ফিল্টারিং হয়ে কারণ সিগারেটের শলাকার নিচে ফিল্টার আছে। আর তোমার সিগারেটের ধোয়া আমার ভিতরে ঢুকছে সরাসরি। একটু ভাবতো কে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত? এই যে তুমি ধূমপান কর, তার দ্বারা তোমার এবং কত মানুষের ক্ষতি হচ্ছে। মানুষের ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ, রক্তে বিষক্রিয়া, ক্যান্সার আরো কত রোগ ডেকে আনছে, বলতো কাকা? আমার মনে হয় পরকালে ধূমপায়ীদের নিজের এবং মানুষের এতো ক্ষতির হিসাব দিতে দিতেই শেষ হয়ে যাবে। আর একটি বিষয় ভেবেছ কি? যারা ধূমপান করে না, তাদের কাছে এই সিগারেটের ধোয়া কত বিরক্তিকর? তাদের কত কষ্ট হয়? আর যে বস্তু মানুয়ের ক্ষতি ডেকে আনে, যাকে বিষপান বলে, সে বন্তু নিজে সহ আরো দশজনের ক্ষতি করে তা কি করে মাকরুহ, মুবাহ, বৈধ হয়? আমার বুঝে আসে না। বিষকে কেউ হালাল বলে না। কিন্তু বিষের চেয়ে যে ধূমপান আরো বেশী ক্ষতি করছে তাকে নিয়ে বিতর্ক কেন?
এতক্ষণ রহিম উদ্দিন ও সুমাইয়া চুপ করে আবিরের কথা শোনে। রহিম উদ্দিন বলে, আমিতো এভাবে চিন্তা করিনি। তুইতো সুযোগ পেয়ে আমাকেই সব বললি। তোর ফুফুকেতো কিছু বললি না? সুমাইয়ারতো জর্দা ছাড়া পান চলে না আর তোর মা দাদীও জর্দা খায়, কই কাউকেতো তুই কিছু বলিসনি?
আবির বলে, বলার সাহস পাইনি। তুমি ধূমপান ছেড়ে দাও। তখন তোমাকে নিয়ে সকলকে বলব। আর ফুফুতো নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে। কয়েকদিন পর দেখবে ফুফু কুহু কুহু কাশবে। ডাক্তার ডাক্তার করব্।ে এই দেখ না দাদীর কি অবস্থা? কয়েকদিন আগে একবার দাদীকে বলেছিলাম দাদী জর্দা ছেড়ে দাও তুমি ভাল হয়ে যাবে। জান দাদী কী বলেছেন, যে তোমার ডাক্তার হওয়া লাগবে না। আর আমাকে জ্ঞান দিতে হবে না। আমি মরলেও জর্দা ছাড়তে পারব না। আমি বলেছিলাম দাদী মরার পর আর জর্দা পাবেও না, ছাড়বে কী? এই কথায় দাদী লাঠি দিয়ে আমাকে দৌড়ানি দিয়েছিল। এখন তোমরা ধূমপান ও জর্দা ছেড়ে দাও আমাকে সহযোগিতা কর।
আস আমরা দুনিয়ায় ধূমপানজনিত রোগ থেকে বেঁচে থাকি। অন্য দশ জনকেও ধূমপানের খারাপ দিকগুলো বুঝাই। পরকালে হিসাবের খাতাটা পরিষ্কার করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT