ধর্ম ও জীবন

জান্নাতুল বাকীতে একদিন

মাহমুদুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৮-২০১৯ ইং ০০:০৯:২৮ | সংবাদটি ১৭৫ বার পঠিত

মদিনায় আসার পর থেকে বেশ কয়েকবার জান্নাতুল বাকীতে গিয়েছি, কিন্তু কখনোই একা যাওয়া হয়নি। আমার আবার একাএকা না ঘুরলে তৃপ্তি আসেনা। মসজিদে নববীর একদম কাছেই আমাদের হোটেল তাই প্রায় সময় মসজিদে নববীতে সময় কাটে। এক দিন যোহরের নামায পড়ে কিছু ভাল্লাগছিলনা মসজিদের একপাশে বসে মোবাইল টিপছিলাম হঠাৎ খেয়াল হলো একটা লাশ নিয়ে জান্নাতুল বাকীতে যাওয়া হচ্ছে, তাড়াতাড়ি করে ওঠেই আমিও তাদের পিছু নিলাম। তারা যেখানে কবর দিবে সেদিকে না গিয়ে অন্য দিকে চলে গেলাম প্রায় খালিই ছিলো।
একটা কর্ণারে কয়েকজন লোক কাজ করছে দূরে থেকে দেখছিলাম। আমি আমার মতই হাঁটছিলাম আর কবর গুল দেখছিলাম,প্রায় সব কবরগুলো একই কিন্তু মাঝে মধ্যে দু’একটা কবর একটু আলাদা, সীমানা একটু বড়,উসমান রা.এর কবর ছাড়া অন্য কোনো কবরের নির্দিষ্ট তত্ত্ব নেই কোনটা কার কবর। তবে হাসান রা.হুসাইন রা. আয়শা রা. ফাতিমা রা.সহ আল্লাহর দশ হাজার সাহাবী এখানে শায়িত আছেন। হঠাৎ ধুলোঝড় শুরু ধুলোঝড় থেকে বাঁচতে শেষ সীমানায় চলে গেলাম,সেখানে কয়েকজন লোক কাজ করছে, তারা কবর থেকে লাশ তুলে নিচ্ছে নির্দিষ্ট একটা সময় পরে জান্নাতুল বাকী থেকে লাশ তুলে নেওয়া হয়। আমিও আগ্রহ নিয়ে দেখছিলাম, কংকালই তুলছিলো তারা। একটা কবর খুরে একজন খুব জোরেজোরে তাকবির দিয়ে দুয়া দুরুদ পড়া শুরু করলো বাকী যে কজন ছিলো, তারাও দৌড়ে গেলো, আমিও গেলাম। সেই কবর থেকে খুব সুঘ্রাণ বের হচ্ছে। আর লাশ ও কাফন একদম নষ্ট হয়নি। তারা আর সেই লাশ উঠায় নি, যেগুলো তুলেছিলো তা নিয়েই চলে গেলো।
আমিও তাদের সাথে বের হয়ে গেলাম।
হোটেলে এসেই বসে গেলাম জান্নাতুল বাকী নিয়ে পড়তে, আর কিছুটা আব্বার কাছ থেকে শুনে। গত ২২ বছর ধরে আব্বা এ শহরে নিয়মিত আসছেন। নিম্নে জান্নাতুল বাকীর কিছু ইতিহাস তুলে ধরলাম।
মক্কা মুকাররমা’-এর কবরস্থান জান্নাতুল মুআল্লা। আর মদিনা মুনাওয়ারার কবরস্থান জান্নাতুল বাকি। এর মূল নাম ‘বাকিউল গারকাদ’। হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় থাকাবস্থায় তাঁর দুধভাই হযরত উসমান ইবনে মাযঊন রাযি-এর মৃত্যু হয়। সাহাবায়ে কেরাম তখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, তাকে কোথায় দাফন করা হবে? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে, তাকে ‘বাকিউল গারকাদ’-এ দাফন করা হবে।
এভাবেই এ জায়গা কবরস্থান’র জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে যায় এবং সর্বপ্রথম হযরত উসমান ইবনে মযঊন রাযি.-কে দাফন করার মধ্য দিয়ে কবরস্থানটির ভিত্তি স্থাপিত হয়। তারপর কবরস্থান তিনদিকেই প্রশস্ত হতে থাকে। আজ সেটি বিশাল জায়গা জুড়ে বিস্তৃত।
জান্নাতুল বাকি মসজিদে নববির পুবদিকে অবস্থিত। প্রথমদিকে মদজিদে নববি আর বাকির মাঝখানে ‘হারতুত দাগওয়াত’ নামে একটি মহল্লা ছিলো। যেখনে মদজিদে নববির খাদেমরা তাদের বংশধর নিয়ে বসবাস করতেন। ১৪০৫ হিজরীতে মসজিদে নববি সংস্কারের সময় এই মহল্লাকে অন্য এক জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়। এখন এই জায়গাটি মসজিদে নববির বারান্দা হিসেবেই ব্যবহার হয় এবং এটার শেষ প্রান্তেই মসজিদে নববির চার দেয়াল।
মসজিদে নববির দেয়ালের পর ‘আবু যর’ নামে একটি সড়ক। তারপর যথেষ্ট উচ্চতার পর জান্নাতুল বাকি। কবরস্থানের চতুর্দিকে একটি উঁচু বাউন্ডারি। পশ্চিম দিকে একটি বড় গেইট। কবরস্থানে যাওয়ার জন্য একটি প্রশস্ত সিঁড়ি। ফজরের পরে এবং আসরের পরে কবরস্থান সবার যিয়ারতের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। বাইরে কয়েক প্লাটুন পুলিশের অবস্থান। ভেতরেও শক্তভাবে নজরদারি করা হয়। কোনো প্রকার বেদাতি কাজ শুরু হলে শক্ত হাতে দমন করা হয়।
মৃতদের দাফন করার জন্য জান্নাতুল বাকিকে নির্বাচন করে স্বয়ং আল্লাহ পাক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আদেশ দিয়েছেন। সর্বপ্রথম হুজুর সাল্লাল্লাহু আলালাইহি ওয়া সাল্লাম তার দুধভাইকে দাফন করেন। তারপর তাঁর চাচি-হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ (হযরত আলী রাযি.-এর আম্মা)। তারপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলালাইহি ওয়া সাল্লামের ছেলে হযরত ইবরাহিম রাযি.-কে এখানে দাফন করা হয়।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তিন মেয়ে-হযরত রুকাইয়া রাযি., হযরত যয়নাব রাযি., এবং হযরত উম্মে কলসুম রাযি.-এর কবরও এখানে। এই তিন মেয়েই হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত থাকাবস্থায় ইন্তেকাল করেন। এর একটু সামনে উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কুবরা রাযি. এবং উম্মুল মুমিনিন হযরত মায়মূনা রাযি. ছাড়া বাকি সকল উম্মুল মুমিনিনের কবর।
হযরত খাদিজাতুল কুবরা রাযি.-এর ইন্তেকাল হয় মক্কায়। তাই তাকে জান্নাতুল মুআল্লায় দাফন করা হয়। উম্মুল মুমিনিন হযরত মায়মূনা রাযি.-এর ইন্তেকাল মক্কা থেকে দশ মাইল দূরে “মাকামে সরফে’ হয়। সারাফ মদিনা দিকে আসতে যে সড়ক পাওয়া যায়, এর পাশেই। এটা আশ্চর্যজনক যে, হুজুর সা.-এর সঙ্গে হযরত মায়মূনা রাযি.-এর বিয়েও এখানেই হয়েছিল। মৃত্যুও এখানে। দাফনও এখানেই করা হয়েছে তাঁকে।
উম্মাহাতুল মুমিনিনের মধ্যে শুধু উম্মুল মুমিনিন হযরত যয়নাব বিনিতে খুযাইমা রা.-এর মৃত্যু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত থাকাবস্থায় হয়। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তাকে দাফন করেন। অন্যান্য উম্মাহাতুল মুমিনিন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায়ের পর মৃত্যুবরণ করেন। তাদের সবাইকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।
উম্মাহাতুল মুমিনিনের কবর হয়ে সামান্য বামে গেলেই হযরত আলী রাযি.-এর ভাই হযরত আকিল ও তার ভাতিজা আবদুল্লাহ ইবনে জাফর তৈয়্যার রাযি.-এর কবর। এর বরাবর একটি রৌশ। শুরতেই হযরত নাফে রাযি. এবং হযরত ইমাম মালিক রহ.-এর কবর। এর সোজা বরাবর সামনে বেড়ে আরো কিছু কদম পরে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহেবজাদা হযরত ইবিরাহিম রাযি.-এর কবর। এর কিছুটা দূরে হযরত ওসমান রাযি.-এর কবর।
হযরত উসমান রাযি.-এর কবরের বিপরীত দিকে হযরত হালিমা সা’দিয়া রাযি.-এর কবর। এর মাঝখানে আরেকটি বেড়া, যেখানে শুহাদাদের দাফন করা হয়েছে।
দরোজা দিয়ে প্রবেশ করে ডান দিকে দেয়ালের একদম নিচে ইসমাঈল ইবনে জাফরের মাযার। বামদিকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফুর কবর। এই পুরো কবরস্থানেই বড় বড় ব্যক্তিদের কবর।
এখন আর সেখানে কাউকে দাফন হয় না। অবশ্য সৌদি সরকার এখন এটাকে উত্তর-পশ্চিম দিকে যথেষ্ট প্রশস্ত করছে। সেখানে সাধারণ মুসলমানদের দাফন করা হয়। এর বেশিরভাগই হাজি। মূলত তারাই সৌভাগ্যবান, যারা মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন।
সৌদি সরকার দু’বার জান্নাতুল বাকি সংস্কার করেছে। প্রথম সংস্কার হয় শাহ ফয়সাল ইবনে আবদুল আজিজের আমলে। এসময় ‘বাকিউল গামাত’ এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত একটি সড়ককে বাকির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। উত্তর দিক থেকেও এক অংশকে বাকির সঙ্গে প্রশস্ততায় যুক্ত করা হয়। সর্বমোট ছয় হাজার মিটার সংযোগ করা হয়।
তাছাড়া বাকির ভেতরে পাকা রাস্তা বানানো হয়। যাতে বৃষ্টির মৌসুমে দর্শনার্থী এবং দাফন করতে আসা লোকদের কোনধরনের কষ্ট না হয়।
দ্বিতীয় দফা সংস্কার হয় শাহ ফাহাদ-্এর আমলে। এসময় আশপাশের সব মহল্লা, বাজার, সড়ক উচ্ছেদ করে জান্নাতুল বাকিতে সংযুক্ত করে জান্নাতুল বাকিকে প্রশস্ত করা হয়। এখন জান্নাতুল বাকির চতুর্দিকে সতেরশো চব্বিশ মিটার লম্বা দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। এতে মরমর পাথর লাগানো হয়েছে। দেয়ালে কালো লোহার জালি লাগানো। জান্নাতুল বাকির একপাশে মৃতের গোসল দেয়া এবং কাফন পরানোরও ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT