ধর্ম ও জীবন

আল্লাহর গজব আসে কেন?

আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৮-২০১৯ ইং ০০:১০:৫৫ | সংবাদটি ১০৩ বার পঠিত

মানুষের উপর যেসব বালা-মুসিবত আসে তা তাদের কৃতকৃর্মের কারণে আসে। ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন’। (সূরা : শূরা, আয়াত : ৩০)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘যখন তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের উপর বিপদ-আপদ আসে (মানুষের ব্যক্তিগত বা সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কর্মদোষে সাধারণত বিপদ-আপদ ঘটে) তখন মানুষ হয়ে পড়ে অকৃতজ্ঞ’। (সূরা : শূরা, আয়াত : ৪৮)
পবিত্র কুরআনে আরো ইরশাদ হচ্ছেÑ‘কল্যাণ যা তোমার হয় তা আল্লাহর নিকট হতে এবং অকল্যাণ যা তোমাদের হয় তো তোমার নিজের কারণে’। (সূরা : নিসা, আয়াত : ৭৯)
হযরত নূহ (আ.) হতে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পূর্ববর্তী নবী ও রাসুলগণের উম্মতের উপর যেসব আল্লাহর গজব নাজিল হয়েছে তা সেসব উম্মতগণের অন্যায়-অপকর্ম ও আল্লাহর অবাধ্যতার কারণেই হয়েছে। হযরত নূহ (আ.) এর উম্মতগণ তাঁকে অস্বীকার করে নানা ধরণের অপকর্মে লিপ্ত হলে আল্লাহপাক তাদেরকে গজব দিয়ে ধ্বংস করেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘আমি তো নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম হাজার বছর (৯৫০ বছর) অবস্থান করেছিলো। অতঃপর প্লাবন তাদেরকে গ্রাস করে। কারণ তারা ছিলো চরম সীমালঙ্গনকারী’। (সূরা : আনকাবুত, আয়াত : ১৪)
হযরত নূহ (আ.) এবং উম্মতগণের মধ্যে যারা তাঁর অনুসারী ছিলো তাদের উপর আল্লাহ গজব নাজিল করেননি বা তাদেরকে ধ্বংস করেননি। ইরশাদ হচ্ছেÑ‘অতঃপর আমি তাঁকে (নূহকে) এবং যারা নৌকায় আরোহণ করেছিলো তাদেরকে রক্ষা করলাম এবং বিশ্বজগতের জন্য ইহাকে করলাম একটি নিদর্শন’। (সূরা : আনকাবুত, আয়াত : ১৫)
হযরত নূহ (আ.) এর উম্মতের মধ্যে যারা অবাধ্য ও অপকর্মে লিপ্ত ছিলো তাদেরকে আল্লাহপাক গজব দ্বারা ধ্বংস করেছিলেন। এর দ্বারা প্রমাণ হলো, আল্লাহর অবাধ্যতা ও সীমাহীন অন্যায়-অপকর্মে লিপ্ত হলে আল্লাহর গজব আসে।
আ’দ, সামুদ, লুত (আ.) এর সম্প্রদায়, শুয়াইব (আ.) এর সম্প্রদায় তাদের নবীদেরকে অস্বীকার করায় এবং লাগামহীন পাপে লিপ্ত হওয়ার কারণে আল্লাহপাক তাদেরকে গজব দ্বারা ধ্বংস করেছিলেন। (সূরা : শু’আরা, আয়াত : ১০৫-২০৯)
গজবের দ্বারা পাপীদের ধ্বংসের কথা পবিত্র কুরআনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে মানুষকে সতর্ক করার জন্য। ব্যক্তিগত, সামাজিকভাবে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অপকর্ম করার কারণে পূর্ববর্তী জাতিকে যে গজব দ্বারা ধ্বংস করেছিলেন সে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ‘এবং আমি সংহার করেছিলাম কারুন, ফিরাউন ও হামামকে। মুসা সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের নিকট এসেছিলো। তখন তারা দেশে দম্ভ করতো। কিন্তু তারা আমার শাস্তি এড়াতে পারেনি। তাদের প্রত্যেকেই তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলোম। তাদের কারো প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচন্ড ঝটিকা, তাদের কাউকে আঘাত করেছিলো মহানাদ, কাউকে আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূগর্ভে এবং কাউকে করেছিলাম নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের কারো প্রতি জুলুম করেননি। তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিলো’। (সূরা : আনকাবুত, আয়াত : ৩৯-৪০)
দুর্ভিক্ষ, মহানাদ, শীলাবৃষ্টি, মহামারী, পানিতে নিমজ্জন, অগ্নিকান্ড, বন্যা, এডিস মশা, ডেঙ্গু এসব হচ্ছে আল্লাহর গজবের অন্তর্ভুক্ত। এসব আল্লাহর গজব আসে মানুষের লাগামহীন পাপের কারণে।
মানুষের অপরাধের কারণে আল্লাহর গজব নাজিল হয় সত্য কিন্তু সবচেয়ে বেশি গজব নাজিল হয় সমাজপতি বা শাসকগোষ্ঠীর অপরাধের কারণে। দুর্বল লোক বা অধীনস্থ লোকের পাপের কারণে আল্লাহর গজব নাজিল হয় না। এ বিষয়টি পবিত্র কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ‘আমি যখন কোন জনপদ ধ্বংস করতে ইচ্ছা করি তখন উহার ক্ষমতাশীলদেরকে সৎকর্ম করতে আদেশ করি। কিন্তু তারা সেথায় অসৎ কর্ম করে, অতঃপর উহার (জনপদের) প্রতি দ-াজ্ঞা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং আমি উহা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি’। (সূরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ১৬)
উক্ত আয়াত দ্বারা দিবালোকের ন্যায় প্রমাণিত, দুর্বল লোক বা অধীনস্থ লোকের অপারাধের কারণে আল্লাহর গজব নাজিল হয় না; বরং ক্ষমতাবানদের অপরাধের কারণে দেশের উপর, আমজনতার উপর আল্লাহর গজব নাজিল হয়। প্রশ্ন হলোÑ শাসকের পাপের কারণে শাসিত বা আমজনগণ শাস্তি পাবে কেন? এ স্পষ্ট জবাব হাদিসে রয়েছে। হযরত জাবের (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ ‘আল্লাহপাক হযরত জিব্রাইল (আ.) কে নির্দেশ দিবেন, অমুক অমুক শহরকে তার অদিবাসীদের উপর উল্টিয়ে দাও। জিব্রাইল (আ.) বলবেন, হে আল্লাহ! তাদের মধ্যে তোমার অমুক এক বান্দা আছেন, যিনি এক মুহূর্তের জন্যও তোমার নাফরমানি করেননি। তখন আল্লাহ বলবেন, তার ও তাদের সকলের উপর শহরটিকে উল্টিয়ে দাও। কারণ, তার সম্মুখে পাপাচার চলছিলো কিন্তু সেই পাপাচার দেখে তার চেহারা মুহূর্তের জন্যও মলিন হয়নি’। (বায়হাকী, মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা : ৪৩৮-৪৩৯)
আল্লাহর গজব থেকে বাঁচতে হলে প্রকাশ্যভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। আপদ-বিপদ ও আল্লাহর গজব আসে অপরাধের কারণে বিশেষ করে শাসকদের অপরাধের কারণে। তাই আল্লাহর গজব থেকে মুক্তির জন্য সকল প্রকার পাপ বর্জন করা আমাদের সকলের উচিত।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT