সাহিত্য

সিলেটে সংস্কৃতচর্চা

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪৮:০৩ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত

প্রাচীন সমৃদ্ধ ভাষাসমূহের অন্যতম হচ্ছে সংস্কৃত। সংস্কৃতের সাথে হিন্দু ধর্ম, বেদ-বেদান্ত, রামায়ন-মহাভারত অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। ধর্মীয় আবেগমাখা সংস্কৃত ভাষাতে রচিত হয়েছে উন্নত মানের সাহিত্য। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসংখ্য গ্রন্থ এ ভাষাতে রচিত হয়েছে। এ ভাষার সাথে গণমানুষের সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। উঁচু শ্রেণীর ব্রাহ্মণ সন্তানরাই এ ভাষাতে উচ্চ মার্গের জ্ঞান সাধনা করেছেন। অভিজাত শ্রেণীতে সীমাবদ্ধ থাকলেও সংস্কৃত সাহিত্যের রয়েছে বিশাল ভা-ার। যারা জ্ঞানের সাধনা করেন তাদের মধ্যে কালক্রমিক বাস্তবতায় শ্রেণীভেদ থাকতে পারে। কিন্তু জ্ঞান সূর্যালোকের মত সর্বত্রগামী। তাই বহু ভাষার জননী হিসেবে অভিহিত সংস্কৃত ভাষার সম্পদ সকলের । ভাষাটির চর্চা এখন স্তিমিত। বলতে গেলে এটি মৃত ভাষাতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর বিশাল সম্পদ লুপ্ত হয়নি। গবেষণা এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের জন্য সীমিতসংখ্যক লোক এখনো সংস্কৃত শিখেন। কিন্তু এখনো আরবি, সংস্কৃত এবং ফারসিকে জ্ঞান রাজ্যের চাবিকাঠি হিসেবে স্বীকার করা হয়। সিলেটে আরবি ফারসি চর্চার আগে দীর্ঘকাল সংস্কৃত চর্চা হয়েছে। সংস্কৃত সাহিত্যে সিলেট ভূমির রয়েছে বিপুল অবদান। এখানে এ ভাষাচর্চার ইতিহাস নিঃসন্দেহে গৌরবজনক।
সংস্কৃত ভাষার সাথে আর্য জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কবে তারা এ উপমহাদেশে আসেন সে ব্যাপারে প-িতজনের নানা মত আছে। বেদের কাল নিয়েও বিতর্ক আছে। তবে সিলেট অঞ্চলে আর্য জনগোষ্ঠীর আগমন ও বসবাস সম্পর্কে মোটামুটি বিজ্ঞানভিত্তিক স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় ঃ
আমাদের বঙ্গদেশ খ্রীষ্টীয় সপ্ত শতাব্দী পর্যন্ত ব্রাহ্মণশূণ্য অনার্যভূমি ছিল। কিন্তু আমাদের পার্শ্ববর্তী শ্রীহট্টাদি অঞ্চলে প্রাচীন কাল থেকে ব্রাহ্মণ বসতি ছিল বলে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
জ্ঞানতাপস সুরেশ চন্দ্র সমাজপতি বলেছেন ঃ-
যখন আমাদের সমগ্র বঙ্গদেশ সমুদ্র গর্ভে বিলীন ছিল তখন শ্রীহট্টে আর্য জাতির বিজয় বৈজয়ন্তী উড়ছিল।
সিলেটে আর্য জনগোষ্ঠীর বসবাস সম্পর্কে তাম্রশাসন থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। নিধনপুর তাম্রশাসনে কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মা তার প্রপিতামহ ভূতিবর্মার দানকৃত । ভূমি বরাদ্দের নবায়ন করেছেন। এটি পঞ্চম শতাব্দীর ঘটনা। অন্যান্য তাম্রশাসনও সাক্ষ্য দেয় যে, ব্রাহ্মণরা সিলেট অঞ্চলে এসে ঐ সময়ে বসতি স্থাপন করেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে অন্ততঃ পঞ্চম শতাব্দীতে প-িতদের প্রতিষ্ঠা হয়েছে সিলেটে। বেদের কাল নিয়ে বিতর্ক সত্ত্বেও এটা স্বীকৃত যে খৃষ্টপূর্বকালেই বেদ-বেদান্তের জন্ম। তাই এটা বলা যায় যে, ভারতের অগ্রসর এলাকা থেকে। সিলেটে আগত ব্রাহ্মণেরা সংস্কৃত ভাষা নিয়েই আসেন। সিলেট অঞ্চলে (তখন যে নামেই অভিহিত হোক) ছিল তখন নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পন্ন অধিবাসী। তাদের ভাষা কেমন ছিল তা এ যাবৎ সুস্পষ্ট না হলেও গবেষকরা মনে করেন, তখন মুখের ভাষা ছিল পালি ভাষার কাছাকাছি। এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এ কারণেই চর্যাপদের ভাষার সাথে সিলেটী উপভাষার এত বেশি নৈকট্য বর্তমান। প-িত মথুরানাথ চৌধুরীর পর্যালোচনা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন ঃ
শ্রীহট্টের প্রাচীন গ্রাম্য ভাষা অনেকটা বৌদ্ধ পালি ভাষা মিশ্রিত ছিল, উহা আজও বৌদ্ধ প্রভাবমুক্ত হইতে পারে নাই ।
সিলেটে প্রথম পর্যায়ে সংস্কৃত ভাষা ও নতুন সংস্কৃতি নিয়ে আগত আর্য সন্তানরা পরিবেশ পরিস্থিতির জন্য উদারতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। সংখ্যায় তারা কম। উপরন্তু নতুন কৃষি প্রযুক্তি কাজে লাগানোর প্রয়োজনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে সুসম্পর্কেরও গরজ ছিল। ফলে প্রথমেই তারা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে না গিয়ে আপাত সমন্বয়ের পথ ধরেন। এর ফল হয় সুদূরপ্রসারী এবং বিলম্বিত হলেও তাতে আগন্তুক জনগোষ্ঠীর সাফল্য নিশ্চিত হয়। পরবর্তীকালে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও আত্মসমর্পন করতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে সিলেটে সংস্কৃতচর্চার সূচনা হয়।
সিলেটে সংস্কৃতচর্চার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য আছে। এ সম্পর্কে অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর বক্তব্য ঃ
খ্রীষ্টীয় এগার শতক থেকে সিলেটের বুকে হিন্দু সম্প্রদায় কর্তৃক সংস্কৃতে লেখা গ্রন্থের নিদর্শন মিলেছে। এমনকি বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্য ব্যাহত রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং বাংলাদেশের মধ্যে সিলেটীদের হাজার বছরের সংস্কৃতচর্চার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস যে অন্যতম স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক হিসাবে বিবেচনার দাবী রাখে সে কথা বলাই বাহুল্য।
সংস্কৃত ভাষায় কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন শাস্ত্র লিখিত ও আলোচিত হয়েছে। ধর্ম, সাহিত্য, দর্শন, জ্যোতিষ, অর্থ, স্মৃতিশাস্ত্র, আয়ূর্বেদ, ধনুর্বেদ, ন্যায়শাস্ত্র, তন্ত্র ইত্যাদি সংস্কৃত ভাষার মূল্যবান সম্পদ। জ্ঞানের এ সব শাখাতেই সিলেটী প-িতরা অবদান রেখেছেন। হযরত শাহজালালের আগমন এবং মুসলিম শাসনের পরও এ ধারা অব্যাহত থাকে। ফলে সিলেটের অবদান দিন দিন সমৃদ্ধতর হয়েছে। সংস্কৃত সাধনার ক্ষেত্রে সিলেটীদের অবদান সম্পর্কে আশরাফ হোসেন সাহিত্যরতœ উল্লেখযোগ্য তথ্য পরিবেশন করেছেন। শিলহটের ইতিহাস গ্রন্থে তিনি একশ’জন লেখকের প্রায় দু'শ গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন। বিবিধ শাস্ত্রে সিলেটী প-িত লেখকদের কয়েকজনের নাম ও গ্রন্থের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো।
পঞ্চখ-ের স্মার্ত্ত রঘুনন্দনের নব্য স্মৃতি, মহেশ্বর ন্যায়ালংকারের অষ্টাবিংশতি তত্ত্ব, অষ্টাবিংশতি প্রদীপ, ইটার ব্রজনাথ বিদ্যারতেœর গায়ত্রী ও সময় নির্ণয়, ঢাকাদক্ষিণের ভবদেব পঞ্চাননের অখ্যাতবাদ, মহামহাপোধ্যায় রামনাথ বিদ্যারতেœর স্মৃতি সন্দর্ভ, কালীচরণ তর্কবাগীশের দয়াদর্শ, রামদেব বিদ্যা নিবাসের
শ্রাদ্ধ দীপিকা, লাউড়িয়া অদ্বৈতাচার্যের গীতাভাষ্য, জৈন্তার শ্রীকবিরাজের রাঘব ও পান্ডবীয়, ঢাকাদক্ষিণের প্রদ্যুন্ন মিশ্রের শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যোদয়াবলী ও শুদ্রাহ্নিকাচার, পন্ডিত পক্ষধর মিশ্রের পক্ষ সাতনকারী, এক চক্ষু রঘুনাথ শিরোমনির নবন্যায়, ক্ষণ ভঙ্গুরবাদ ও ব্যুৎপত্তিবাদ, রামরাম ভট্টাচার্য্যরে তন্ত্ররতœ মালা, হৃষিকেশ বিদ্যাবিনোদের (গৌড় গোবিন্দের সভা পন্ডিত) মন্ত্রকোষ ও তন্ত্রচূড়ামনি, লাউড়িয়া কৃষ্ণ দাসের বাল্যলীলা সূত্র, মুরারি গুপ্তের চৈতন্য চরিত, রাম রমন ভট্টাচার্যের জ্যোতিষ সার সংগ্রহ, রজনীকান্ত দস্তিদার এম এ এর তত্ত্ব সিন্ধু, তারক চন্দ্র কৃতিরতেœর রুক্ষ্মিনীহরণ নাটক, গোপী নাথ ভট্টাচার্যের কারক রহস্য, মহেশ্বর ন্যায়ালংকারের ভাবর্ন চিন্তা মনি, হরিকান্ত ন্যায় বাগীশের সিদ্ধান্তরতœ, কৃষ্ণ চন্দ্র চক্রবর্তীর জ্যোতিষ সূত্র।
নমুনাস্বরূপ মাত্র কয়েকজন প-িতের উল্লেখ করা হলো। এই প-িতবর্গ এবং তাদের গ্রন্থাদির সমাদর ছিল সবখানে। সিলেটে রচিত ধর্মগ্রন্থগুলো কামরূপ, সিলেটসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু ধর্মকর্ম, আচার অনুষ্ঠানে অনুসরণ করা হতো। স্মার্ত রঘুনন্দনের এবং একচক্ষু রঘুনাথ শিরোমনির বিশেষ খ্যাতি ছিল।
এক সময় নবদ্বীপ ছিল জ্ঞানচর্চার বিখ্যাত কেন্দ্র। নবদ্বীপের সাথে সিলেটের ছিল সরাসরি সম্পর্ক। শ্রীচৈতন্যের পার্ষদদের অধিকাংশ ছিলেন সিলেটী। পরবর্তীকালে নবদ্বীপে শিক্ষা গ্রহণ করে অনেকেই নিজ নিজ গ্রামে ফিরে আসতেন। এদের অনেকে গৃহে টোল স্থাপন করে সংস্কৃত শিক্ষা দিতেন। এভাবে সিলেটে অসংখ্য। টোল ও চতুম্পাঠী স্থাপিত হয়। এর মাধ্যমে সংস্কৃতচর্চার অনুকূল পরিবেশ গড়ে উঠেছিল।
সিলেটে সংস্কৃতচর্চা সম্পর্কে সিলেটের বাইরের প-িতগণও অবহিত ছিলেন। ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেন সিলেটকে সংস্কৃতচর্চার একটি প্রধান কেন্দ্র বলেছেন। এমনকি তার মতে নবদ্বীপ ও শান্তিপুর শ্রীহট্টের দীপ শিখা হতে বিদ্যার আলো লাভ করেছে। 'শ্রীভূমির সন্তানদের সংস্কৃত সাধনা' নামে একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক রবীন্দ্র কুমার সিদ্ধান্ত শাস্ত্রী। তাতে ১০১ জন লেখকের ৩৫৯ খানা গ্রন্থের তালিকা দিয়েছেন লেখক। গবেষক এবং প্রাচীন। পুঁথিপুস্তকের সংগ্রাহক অধ্যাপক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য সংস্কৃত ভাষায় হাতের লেখা চার হাজার পুঁথি সংগ্রহ করেছেন। এর অধিকাংশই সিলেট থেকে সংগৃহীত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র রথীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার শিক্ষক ছিলেন সিলেটের শিবধন বিদ্যার্ণব। তার পা-িত্যে আস্থাশীল কবি বিদ্যার্ণব মহাশয়কে শান্তি নিকেতনে শিক্ষক নিযুক্ত করেন। অমিতাভ চৌধুরী লিখেছেন যে, শান্তি নিকেতন বিদ্যালয়ের প্রথম পাঁচ জন শিক্ষকের অন্যতম ছিলেন শিবধন বিদ্যার্ণব। ঠাকুর বাড়ীতে সবাই মনে করতেন কাশীর পরই সিলেটে প্রকৃত সংস্কৃত চর্চা হয়।
কালের নিয়মেই এখন সংস্কৃতচর্চায় আগ্রহ কমে এসেছে। শুধু জ্ঞানের জন্য জ্ঞানচর্চা এখন হয়না। তবু সিলেটের ঐতিহ্যের রেশ একেবারে মিলিয়ে যায়নি। স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি কলেজ সিলেটে আছে। শ্রীহট্ট সংস্কৃত কলেজে ভাষা সাহিত্য এবং বিভিন্ন শাস্ত্র পঠন পাঠন হয়।
তবে সামগ্রিক বিবেচনায় সংস্কৃত এখন বিলুপ্ত প্রায়। খোদ ভারতেও পাঠ্য তালিকায় এর স্থান নেই। টোল চতুম্পাঠী বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি পূজা, পার্বণ আচার অনুষ্ঠানেও এখন প-িত পুরোহিতদের ভূমিকা গৌন হয়ে আসছে। অতীতে প-িত দিতেন বিধান আর পুরোহিত সে অনুযায়ী পালন করতেন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। এখন সে ঐতিহ্যে চিড় ধরেছে।
পুরোহিত ও প-িতরা সনাতন হিন্দু ধর্ম চেতনার নিত্য নৈমিত্তিক যোগসূত্রের কাজ করতেন। তাদের মুখ নিঃসৃত স্ত্রোত্র শ্লোকের মধ্য দিয়েই আম জনতার ঘরে ঘরে প্রবাহিত হত সুললিত সংস্কৃত সাহিত্যের মূর্চ্ছনা। রেওয়াজ হত সনাতনী ভারতীয় রীতি নীতির। এখন বাঙালির টোল বা চতুম্পাঠীতে মেঘদূতের ছন্দ ধ্বনিত হয়না। স্পন্দিত হয় বরাহ মিহিরের ভবিষ্যৎ গণনা শাস্ত্রে অর্থকরী জ্যোতিষকলা।
টোল চতুম্পাঠীতেও আবার ছাত্র নেই। ভারতের রাষ্ট্রপতি স্বীকৃত জাতীয় সংস্কৃত পন্ডিত অধ্যাপক মুরারি মোহন বেদান্তাদিতীর্থ হাওড়া গোপাল ব্যানার্জী লেনের। বাসিন্দা। তিনি একটি চতুষ্পঠীর কর্ণধার। সম্প্রতি (১৯৯৮) তিনি বলেছেন ঃ আমার কৃষ্ণধন স্মৃতি ভূষণ চতুম্পাঠী দশ বছর আগেও ছিল রমরমা। এখন সর্বসাকুল্যে ছাত্র সংখ্যা চারজন। তাও এদের সংস্কৃত সাহিত্য, কাব্য, স্মৃতি এসব নয়-অর্থকরী উপার্জনের জ্যোতিষ শাস্ত্র পড়াতে হয়।
শ্যামা প্রসাদ রোড, শিলচর-১ থেকে প্রকাশিত দৈনিক সোনার কাছাড় পত্রিকায় এন এস এস পরিবেশিত এক প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে ঃ
খোদ জাতীয় প-িতের যখন এই অবস্থা তখন বাকী পন্ডিতদের হাল হকিকত সহজেই অনুমান করা যায়। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই এখন তিন হাজারের বেশী স্বীকৃত প-িত আছেন। আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, ওড়িশা ও বিহারের কথা ধরলে এই সংখ্যা ১৫ হাজারে দাঁড়াবে। এদের অধিকাংশেরই পরিবারের অন্ন জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। সপ্তাহে একদিন দূরদরশনে সংস্কৃতে খবর পড়া চালু হলেও সংস্কৃত সাধক পন্ডিতের অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের দিকে লক্ষ্য নেই। বাম জমানার আগে পর্যন্ত প্রতিটি হাইস্কুলে একজন করে সংস্কৃত প-িত রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। গত ১৫ বছরে বাম সরকার তাও তুলে দিয়েছে। দশ বছর আগে পশ্চিম বঙ্গের পাঁচ শ' সরকারী টোল বা চতুষ্পঠীতে ছাত্র পিছু সরকারী অনুদান ছিল, ১৫০০ টাকা। এখন ছাত্র কমে গেছে। অনুদান বাড়েনি। এই টাকায় টোল ঝাড় দেয়ার খরচও ওঠেনা। তাই পেট বাচাতে প-িতরা মেঘদূত, কুমার সম্ভব পড়া বাদ দিয়ে জ্যোতিষ শাস্ত্র পড়াতে জোর দিয়েছেন।
উল্লেখ্য ভারতে জ্যোতিষ শাস্ত্রের প্রচুর কদর আছে। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমেও অনেক সময় দিন ক্ষণ নির্ধারনে জ্যোতিষীদের মতামত বা অনুমোদন নিতে হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, পিভি নরসিংহ রায়, দেব গৌড়া, অটল বিহারী বাজপেয়ীসহ প্রায় সবাই জ্যোতিষীদের মতামত নিয়েই দিল্লীতে ৭ নং রেসকোর্স রোডের প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবনে উঠে আসার দিনক্ষণ নির্ধারণ করেন।
তবু সংস্কৃতের সুদিন নেই। কিন্তু সিলেটে হাজার বছর ধরে সংস্কৃতচর্চা এখানকার সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে। উর্দু, আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি চর্চার মতই সংস্কৃত চর্চাও সিলেটের সাংস্কৃতিক বৈভবকে মহিমান্বিত করেছে।
তথ্য সূত্রঃ
১. কৃষ্ণ কুমার পাল চৌধুরী প্রবন্ধ-সিলেট, সিলেটীত্ব, ও সিলেটের অহংকার; দৈনিক যুগভেরী, ৮ ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৩।
২. ঐ
৩. আগ্রহী পাঠক অধ্যাপক আসাদ্দর আলীর ‘চর্যাপদে সিলেটী ভাষা’ গ্রন্থ দেখতে
পারেন।
৪. উদ্ধৃতিঃ সাহিত্য সাধনায় সিলেট, শ্রীবিজিত কুমার দে। কৃষ্ণ কুমার পাল চৌধুরী সম্পাদিত সিলেট কথা, ১৯৯৬।
৫. মুহম্মদ আসাদ্দর আলী, সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় জালালাবাদ, সিলেট ১৯৯৬। ৬. মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, শিলহটের ইতিহাস, সিলেট ১৯৯০।
৭. মুহম্মদ আসাদ্দর আলী, পূর্বোক্ত।
৮. ঐ
৯. ঐ
১০. দৈনিক সোনার কাছাড়, ৬৬ এপ্রিল ১৯৯৮ রবিবার, শিলচর, সম্পাদক ঃ রনবীর রায়। এন, এস, এস পরিবেশিত প্রতিবেদন।
১১. ঐ
১২. ঐ
১৩. দৈনিক যুগশঙ্খ, রবিবারের উপহার সংখ্যা, ১৯ এপ্রিল ১৯৯৮, রংপুর, শিলচর, ভারত। সম্পাদক ঃ অতীন দাশ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT