সাহিত্য

হরিৎ প্রান্তরের সবুজ হৃদয়ের মেয়ে আসমা মতিন

কানিজ আমেনা প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪৯:০৫ | সংবাদটি ১৯৬ বার পঠিত

‘হরিৎ প্রান্তরের মেয়ে নামটি শুনলেই মনের মাঝে এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর। সর্ষেফুলের হলুদ ক্ষেতের মাঝে এক রূপসী কন্যা দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষেতের চারপাশে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠ। মেয়েটির চোখে মুখে রহস্য খেলা করছে। উদাসী চোখে সে একবার তাকাচ্ছে খোলা আকাশের দিকে। একবার তাকাচ্ছে খোলা মাঠের দিকে। তার পরনে হলুদ শাড়ি। খোঁপায় গুজা হলুদ সর্ষেফুল। কারো প্রতীক্ষায় সে অপেক্ষমান, হয়তো প্রিয়তমের জন্য। এক রোমান্টিক আবহ রয়েছে এই শিরোনামের মাঝে। বইটির লেখক আসমা মতিন। প্রবাসী কবি।
বইটির প্রথম কবিতা ‘আলোকিত পৃথিবীর নারী। কবি এখানে বলেছেন তিনি নারীকে শুধুই পুরুষের প্রেমিকা হিসেবে দেখতে নারাজ। যুগ যুগ ধরে নারী কি শুধু জুলাইখা, লাইলি, রাধা, ক্লিওপেট্রা, বেহুলা, শিরি, রজকিনি, জুলিয়েট, হেলেন, আর নূরজাহান হয়েই থাকবে? শুধুই পুরুষের মনোরঞ্জন করবে? না, বরং সে এখন আরো বিস্তৃত চিন্তা করে। সে সমগ্র পৃথিবীর জন্য এক আলোকিত নারী এক প্রেমময়ী নারী হতে চায়। মানবপ্রেমের এক আলোকিত নিদর্শন হতে চায়।
‘উচাটন মন’ কবিতায় কবি সন্তান আগমনের প্রতীক্ষায় রত। এক গর্ভবতী নারীর বাড়ির বারান্দায় বসে রোদ পোহানোর দৃশ্য কল্পনা করেছেন। ফুরফুরে মন তাঁর নীল শাড়ির আঁচলের মতোই বাতাসে ওড়ে।/ ঢিলে ঢালা লাল ঘটিহাতা ব্লাউজ পরেছিল/ স্নানের পর চুল পিঠে ছড়িয়ে দিয়ে রোদ প্রতীক্ষায়।
গতবার এমন দিনে স্বামী বাড়িতে থাকলেও এবারে সে রয়েছে দূরদেশে। পৌষের মেলা থেকে তার জন্য কারুকার্য খচিত শঙ্খের গহনা কিনে দিয়েছিলো। এবারও মেলা বসেছে। মেলা থেকে ভেসে আসা কোলাহলে তার মন আরো উচাটন হয়ে ওঠে স্বামীর বিরহে।
‘ঘুমন্ত মন’ কবিতায় কবি আশংকা প্রকাশ করেছেন যে তার শেষ বিদায়ের পর এই পৃথিবীর মানুষ কেউ কি তাকে স্মরণ রাখবে? তার জন্য দু’ফোটো অশ্রু ফেলবে? কারো হৃদয় কি তার জন্য হাহাকার করবে? আর তিনি বড় ক্লান্ত হয়ে অকুল ঘুমে ঘুমিয়ে থাকবেন। ‘কাব্যরসের স্তূপ’ কবিতায় কবির বিনয়ী মনের ভাব প্রকাশ পেয়েছে। কবি নিজেকে সেলিব্রেটি না বলে একজন সাধাসিধে ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। আত্মপ্রকাশের উন্মাদনা তার নেই, মঞ্চে বক্তৃতা দিয়ে মুখে ফেনা তোলার অভ্যাস তার নেই, অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাঝে তিনি নেই, বিজ্ঞাপনী প্রচারণাতেও তিনি নেই। কবি পাঠাগারে নিরিবিলি পরিবেশে বসে বই পড়ার মাঝেই সুখ খুঁজে পান। আর সেই সাথে পাঠকের ভালোবাসাই তার কাছে পরম পাওয়া।
‘মাটির বিস্কিট’ কবিতায় কবি অনেক রকম খাবারের নাম উল্লেখ করেছেন যা বিদেশীরা সাধারণত তাদের প্রাতঃরাশের টেবিলে পরিবেশন করে ও পেট ভরে খায়। যেমন- ‘পনির অমলেট, ফ্রাই মাসরুম, টমেটো, বেকবিন্স, ক্যারাবিয়ান সল্টফিস, কিপার স্কন মাফিন, ক্রস্যান্ট, প্যানকেক, কমলালেবুর মোরব্বা, চিনাবাদামের মাখন, চকলেট স্পেড, সিরিয়েল, দধিদুগ্ধ, ঘৃতমধু। নামগুলো শুনতেই জিভে জল চলে আসে। যদিও কিছু কিছু খাবার আমাদের কাছে অপরিচিত। শুধু তাই নয়। এর সাথে আছে কাঁটাচামচ, কারুকাজ খচিত চায়ের কাপ, মসলিন সুতোর বুননে তৈরি জামা, প্রমত্ত বিকেল, আলো ঝলমলে রাত। এসব কিছুর পরও কবির মনে শান্তি নেই। এসব ভােগ-বিলাসিতায় ডুবে থেকেও কবির মনে পড়ে পৃথিবীর অগণিত মানুষ তিন বেলা তিনমুঠো আহার পাচ্ছে না ঠিকমতো। তাদের কথা মনে হলে তখন কবির বিবেকে বড় আঘাত লাগে, মনে হয় মানবতা ও মনুষ্যত্ব যেন আজ চাপা পড়ে গেছে।
‘পরিহাস’ কবিতার শেষ চারটি লাইন হলো, সেই তারাই তোমার খঞ্জনি পা ভেঙে দেয়/ কেটে দেয় ময়ূর পুচ্ছ!/ নানা অপবাদের কলঙ্ক কপালে দেয় এঁকে/ এ তোমার শুভ্র সত্যের নির্মম পরিণাম।’ একজন নারী যৌবন বয়সে তার রূপ-সৌন্দর্য দেখিয়ে বেড়ায়, তখন অনেক পুরুষ তার পেছনে ঘুরে। সুন্দরের পূজা করে, এটার জন্য লালায়িত থাকে। কিন্তু যৌবনকাল শেষ হয়ে গেলে তখন কী হয়? তখন এই পুরুষেরা আর তার দিকে ফিরে তাকায় না, তার গুণকীর্তন করে না, বরং উল্টো তাকে কলংকেঁর অপবাদ দেয়। এই পরিণাম তো সেই নারীর নিজের হস্তেই তৈরি করা, যেমন কর্ম তেমন ফল। তাই যৌবনকালেই সচেতন হওয়া উচিত। অহেতুক নিজের রূপ-সৌন্দযের্র বড়াই করা অহংকার করা এবং তা পুরুষ সমাজে প্রদর্শন করে বেড়ানো উচিত নয়।
‘প্রাপ্য ছিল’ কবিতায় অসুস্থ অবস্থায় কবির মনের কিছু আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। জ্বরতপ্ত কপালে একটি হাতের ছোঁয়া ,জলপট্টি, তুলসী পাতার প্রলেপ, লেবুজলের শরবত, মাটির হাঁড়িতে দধি, চিকন চালের লেই, কিছু ঔষধ, কিছু পরামর্শ- এ সবই কবির খুব প্রাপ্য ছিল। নিষ্ফলা কোলাহল’ কবিতায় কবি তার চারদিকে মানুষের এত কোলাহল এত হৈ-হট্টগোলের মাঝে তার কাব্যচর্চার সাধনায় লিপ্ত হতে পারছেন না বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তার মস্তিষ্কে শব্দেরা খেলা করে, কিন্তু পরে আবার শব্দেরা হোঁচট খায়। কিছুই লেখা হয় না, খাতা শূন্য থেকে যায়।
‘হরিৎ প্রান্তরের মেয়ে’ কবিতায় কবি একটি মেয়ের জীবনের দুটি অংশ তুলে ধরেছেন। যে মেয়েটি বড় হয়েছে ফুল ফসল শ্যামলিমার মাঝে, যে মেয়েটি পাহাড়ি পাখিদের শিস শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠতো, যে মেয়েটি সুগন্ধি চা, গোলাপের পাপড়ি আর কৃষ্ণচূড়ার সাথে সারাদিন কথা বলতো, শীতের উষ্ণ রোদে যে মেয়েটি ফুলবাগানের ফড়িং ধরার খেলায় মেতে উঠতো সেই মেয়েটি হঠাৎ একদিন নিয়মের কাছে হার মেনে কোন এক রাজকুমারের হাত ধরে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে তার শৈশবকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল দূরদেশে। সে দেশে শীত এলে মেপল গাছের পাতা সব ঝরে যায়, কুয়াশাচ্ছন্ন হয় চারদিক, মেয়েটি জানালার কাচে এই দৃশ্য দেখে। সেই সাথে কুয়াশায় জমাটবদ্ধ হয়ে যায় মেয়েটির মনও। স্মৃতির ডানায় ভর করে মেয়েটি তখন হারিয়ে যায় তার শৈশবের ফেলে আসা সেই হরিৎ প্রান্তরে। এ যেন কবির নিজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। ‘ঞযব ফবংরৎবফ পড়ষড়ঁৎভঁষ যধহফশবৎপযরবভ’ ইংরেজি কবিতাটিতে কবি একটি বর্ণিল রুমালের কথা বলেছেন। তিনি একটি বাড়ির বেলকনিতে রোদের উষ্ণতায় বসে একটি রুমালে সিল্কের সুতায় ফুল তুললেন। এরপর এর উপরে সুগন্ধি গোলাপজল ছিটিয়ে দিলেন। সন্ধ্যায় বাড়ির কর্তা ফিরে এসে এই কারুকার্যময় রুমালটি দেখে অনেক খুশি হলেন ও কবিকে জিজ্ঞেস করলেন, কে তুমি প্রিয়?’ কবি তখন উত্তর দিলেন তিনি এমন এক নারী যে এই পৃথিবী ও সেই সাথে ছোট শিশুদের ভালোবাসেন। এই সুন্দর রুমালটির মত পৃথিবীও সুন্দর হয়ে ওঠুক বাসযোগ্য হয়ে ওঠুক, সব যুদ্ধবিগ্রহ থেমে যাক। শিশুদের জন্য এই পৃথিবী হয়ে উঠুক এক নিরাপদ আবাস ভূমি। আসমা মতিন বিরচিত ‘হরিৎ প্রান্তরের মেয়ে' বইটি একটি সুখপাঠ্য কবিতার বই। কবি এখানে একই সাথে তার রোমান্টিক মন ও মানবতাবাদী মনের চিন্তার তীব্র প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
প্রকাশ করেছে বাসিয়া প্রকাশনী। চার ফর্মার এ বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১২০ টাকা। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। প্রকাশকাল বইমেলা ২০১৯।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT