ইতিহাস ও ঐতিহ্য

শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা

মো. আব্দুশ শহীদ নেগালী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৯-২০১৯ ইং ০০:০৮:২৮ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলাধীন ৮নং রেঙ্গা দাউদপুর ইউনিয়নে এ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান। এদেশের অনেক জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে ওলি, জ্ঞানী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গেরনামে। দাউদপুরের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। হযরত শাহজালাল (রহ.) অন্যতম সফরসঙ্গী ছিলেন হযরত শাহ দাউদ কুরেশী (রহ.)। তাঁর নামেই ইউনিয়ন, গ্রাম ও প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়।
অত্র অঞ্চলের ইসলাম প্রিয় মানুষ ভুলে যায়নি ঐ ত্যাগী ওলির নাম। ইসলামী মূল্যবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দাউদিয়া মাদরাসা নামে একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমান ঈদগাহ সংলগ্ন ছোট্ট এক খন্ড ভূমির উপর। তখনকার ব্রিটিশ আমলে ভারত উপমহাদেশে আর্থ সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থার উত্থান পতনের প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে যারা একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিশ্চয় ওরা সর্বযুগে প্রশংসার দাবীদার। ধীরে ধীরে ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধির পেতে থাকলে মাদরাসাটি স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। মাদরাসার অবস্থান থেকে প্রায় ১০০ গজ পূর্ব দিকে এক কালের বিশাল ‘বুড়ি বরাক’ নদীর তীরে দাউদপুর পূর্ব বাড়ির চৌধুরী পরিবারের জায়গার উপর মাদরাসাটি স্থানান্তর করা হয়। যা অধ্যাবধি স্বস্থানেই বহাল রয়েছে। বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত ও সুযোগ্য পরিচালনার অভাবে দীর্ঘদিন মাদরাসাটি ইবতেদায়ীর মানে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
মহান আল্লাহপাক মানবজাতির কিছু সংখ্যকের উপর এতো অনগ্রহ করেছেন যারা তাদের সহায় সম্পত্তি খোদার রাহে বিলিয়ে দিতে কৃপণতা করেননি। ওরাইতো মহান আল্লাহর কাছে প্রথম শ্রেণির মানুষ। এমন একজন মহীয়সী মহিলার কথা বলছি। দাউদ পূর্ব পাড়া নিবাসি ফজিরা বানু চৌধুরী। যার মাত্র দু’জন কন্যা সন্তান ছিলো। কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁর নিজস্ব জমি ২১.১০ একর জায়গা ১৮৯১ সালে দাউদিয়া মাদরাসার নামে ওয়াক্বফ করে দিয়েছিলেন। তিনি সাধারণ মহিলা নয়। শিক্ষার প্রতি যে অনুরাগ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা ইতিহাসে সত্যিই বিরল। দাউদপুর ইউনিয়নে তুড়–কখলা ও হোসেনপুর গ্রামে দক্ষিণ দিকে বিশাল শাইলকার হাওরের মুক্তির বন অঞ্চলে ২১.১০ একর জমির অবস্থান। যা অধ্যাবধি অত্র মাদরাসায় ভোগ করে আসছে। এ সকল জমি-জমা উপভোগের মধ্য দিয়ে মাদরাসাটি আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে পায় এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেবার উপায় বের হয়।
তখন ছিলো ইংরেজ শাসনামল। দেশের মানুষ ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ঝুকে পড়ে। মাদরাসার নির্ধারিত কোনো কারিকুলাম না থাকায় স্থানীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইংরেজি পাঠ্যপুস্তক মাদরাসা সিলেবাসের অন্তর্ভুক্তি করা হয়। এতে জেনারেল শিক্ষায় আগ্রহী ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা অনেক হারে বেড়ে যায় এবং মিডিয়া অব ইংলিশ (এম.ই) হাই স্কুলে নামকরণ করা হয়। দীর্ঘ আরও কয়েক বছর এভাবে চলতে থাকলে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি দ্বিমুখী সমস্যায় পৌঁছে যায়। প্রতিষ্ঠানটিকে যে মৌখিকভাবে নামকরণ করা হয়েছিলো এম.ই হাই স্কুলে স্থায়ীভাবে রূপান্তারিত করা হবে নাকি পূর্বেকার দাউদিয়া মাদরাসা থাকবে। বহু বিতর্কের পর হযরত শাহ দাউদ কুরেশী (রহ.) স্মৃতি বিজড়িত এলাকার ইসলামী মূল্যবোধ সম্পন্ন জনগণ মাদরাসাকে মাদরাসা হিসেবে পুনর্বহাল করলেন এবং সাধারণ শিক্ষার চাহিদা পূরণের জন্য দাউদপুর ও মোগলাবাজার ইউপি’র গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের প্রাণপণ প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হলো রেবতী রমন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে এতদঞ্চলে কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায়, দূর দূরান্ত থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ছাত্র জড়ো হতেন এ প্রতিষ্ঠানে। আশপাশ কয়েকটি ইউনিয়নের প্রবীণ মুরুব্বিদেরকে বলতে শুনেছি তারা ছিলেন এক সময় এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। আরও গৌরবের বিষয় হচ্ছে, আরবি, উর্দু ও ফারসি কবি কলিকাতা আলিয়া মাদরাসার সাবেক হেড মহাদ্দীছ। ঢাকা সরকারী আলিয়া মাদরাসার সাবেক হেড মহাদ্দীছ ও সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ আল্লামা হরমুজ উল্লাহ সয়দা (রহ.), বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা মরহুম আব্দুল মান্নান (রহ.) ও সাবেক পুলিশ আইজিপি ই.এ. চৌধুরী সাহেবসহ অত্র এলাকার সরকারি উচ্চ পদস্থ অনেক সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র।
দিন দিন মাদরাসার উন্নতি হতে থাকলো। বোর্ডের কাছে আলিমের স্বীকৃতি চাওয়া হলো। বোর্ডের তদন্ত রিপোর্ট আসলো। আলিম ক্লাস চালানোর মতো বিল্ডিং নেই। অনেক কিছুর পর স্মরণাপন্ন হলেন আইজিপি ই.এ. চৌধুরী সাহেবের। যার পিতা হচ্ছেন খান বাহাদুর গৌছ উদ্দিন চৌধুরী। এ চৌধুরী পরিবারের প্রস্তাব হলো মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক আমার পিতার নাম দেখে আজীবন দোয়া করবেন যদি মাদরাসার নামের সাথে গৌছ উদ্দিন নামটি যুক্ত করে দেন। তবে আমরা একটি বিল্ডিং করে দেবো। দীর্ঘ বিতর্কের পর গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত আসলো নাম-ধাম কিছুই নয়, আমরা মাদরাসা উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে চাই। এ সিদ্ধান্তের আলোকে চৌধুরী পরিবারের সম্মানিত সদস্যরা তখনকার যুগে পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি ভবন নির্মাণ করে দিলেন। তখন থেকে মাদরাসার নামকরণ করা হয় দাউদিয়া গৌছ উদ্দিন সিনিয়র মাদরাসা। তবে এটা চির সত্য যে, মাদরাসার দুর্দিনে দাউদপুর সহ আশপাশ গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ মাদরাসাকে সম্মানজনক অবস্থানে টিকিয়ে রাখার জন্য সাহায্যের হাতকে প্রসারিত করেছিলেন। মাদরাসার জন্য ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করেছেন সকল পেশার মানুষ।
অতীতকে পরিবর্তন করে নতুন আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে এ প্রতিষ্ঠান। তাতে রয়েছে আকর্ষণীয় ক্লাস রুম, আইসিটি রুম, হল রুম, ছাত্রীদের নামাযের রুম। সৌন্দর্য্যমন্ডিত দ্বিতল ভবন। উত্তরাংশের সিংহভাগ জায়গা সৌকত আহমদ চৌধুরী ক্রয় করে মাদরাসাকে দান করেছিলেন যেখানে মাদরাসার বহুতল ভবন প্রতিষ্ঠিত। মাদরাসার অনতিদূরে রয়েছে তিন তলা বিশিষ্ট দাউদপুর জামে মসজিদ, উত্তর পাশে রয়েছে দাউদ কুরাইশি (রহ.) কবর, মসজিদের দক্ষিণ পাশে শাহী ঈদগাহ এবং ঈদগাহের উত্তর পশ্চিম কোন জুড়ে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হযরত দাউদ কুরাইশি হাফিজিয়া মাদরাসা। এসব মিলে দাউদপুর যেন একটি দর্শনীয় স্থান। দক্ষ (প্রধান) প্রিন্সিপাল ও যোগ্য শিক্ষক মন্ডলি দ্বারা পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি অতীত ও বর্তমানকে একই সূত্রে আবদ্ধ রাখতে আয়োজন করতে যাচ্ছেন আগামী ২০২০ সালের প্রথম দিকে মাদরাসাটির দু’শত বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হবে।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আজিজপুর
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায়
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • Developed by: Sparkle IT