ইতিহাস ও ঐতিহ্য

গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়

এডভোকেট মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৯-২০১৯ ইং ০০:০৮:৫৬ | সংবাদটি ২০২ বার পঠিত

তেরশত শতাব্দির সত্তর দশকের মধ্যদিকে তরফের শাসক ফতেহখান লোহানি নিজ সেনাপতি সৈয়দ মুসাকে তরফ রাজ্য পরিচালনার ভার দিয়ে অন্য সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দিনকে নিয়ে বখতিয়ার খিলজির মত অতর্কিত আক্রমণ করে উত্তর শ্রীহট্ট দ্বীপটি দখল করেন উত্তর শ্রীহট্টের সামন্ত রাজা গোবিন্দ পলায়ন করে পশ্চিমের হিন্দু রাজ্য লাউড় রাজ্যের সীমান্তে লাউড়ের গড়ের কাছে আশ্রয় নেন। রাজরাণী অর্পনাদেবী প্রতিবন্ধী পুত্র খড়গ ও তার নববিবাহিতা স্ত্রী সীতা এবং চাকর, ঝাটুসহ নৌকাযোগে পলায়ন করে পরবর্তিতে রাজা গোবিন্দের সাথে মিলিত হন। রাস্তায় ভয়ে যুবরাজ খড়গের মৃত্যু হলে নববিবাহিতা স্ত্রী সীতার বারমাসি নামক শোকগাথা যা পরবর্তিতে শোকগাথা হিসাবে লিখিত হয়ে যা হিন্দু সমাজে আজো গীত হয়। রাজবৈদ্য মহিপতি দত্ত তাঁর ছেলেদ্বয় কেশব দত্ত এবং প্রভাকরণ দত্তসহ পালিয়ে গিয়ে সমতল লাউড় রাজ্যের রাজধানি জগন্নাথপুরে আশ্রয় নেন। পরবর্তিতে কেশব দত্তের বাসস্থানকে কেন্দ্র করে জগন্নাথপুরের কেশবপুর গ্রাম গড়ে উঠে এবং এ কেশব দত্তেরই কবিপুত্র রাধা মাধব দত্তের পুত্র প্রখ্যাত বৈষ্ণবকবি ও গায়ক রাধারমন দত্ত (১৮৩৩-১৯০৭) যিনি সুনামগঞ্জের আরেক প্রখ্যাত মরমি কবি ও গায়ক হাছন রাজার সমসাময়িক। কেশব দত্তেরই ভাই প্রভাকরণ দত্ত নিজ যোগ্যতা বলে লাউড় রাজা বিজাসিংহের মন্ত্রীও হয়েছিলেন। প্রভাকরণ দত্তের বসতিকে কেন্দ্র করেই পাশের প্রভাকরপুর গ্রামও গড়ে ওঠে। এ প্রভাকর দত্তেরই জনৈক বংশধর ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন যার বংশধরগণের মধ্যে এ গ্রামেরই সুসন্তান বর্তমান বৃটিশ নাগরিক এবং বাংলাদেশস্থ সাবেক বৃটিশ রাজদূত আনোয়ার চৌধুরী ও তার উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চপদস্থ বৃটিশ রাজকর্মচারি ভ্রাতৃবৃন্দ। মহিপতি দত্তের ভ্রাতা মুকুন্দ দত্ত ও ভয়ে সাতগাঁও তরফের দিকে পালিয়ে গিয়ে তথায় বসতি স্থাপন করেন। সেখানকার দত্তবংশিয়রা তাঁরই বংশধর। লাউড় সীমান্তে আশ্রয় নেওয়া ব্রাহ্মণ রাজা গোবিন্দ কেশব দেবের বসতিকে কেন্দ্র করে সেখানকার ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামটি গড়ে ওঠে। ইদানিং সুনামগঞ্জের সুসন্তান জাতিয় কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ড. সাদিকের প্রচেষ্টায় পর্যটক আকর্ষণের জন্য সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সিমান্তে অবস্থিত প্রাচীন লাউড়ের গড় এবং নিকটস্থ সিলেটের পলাতক রাজা গোবিন্দের রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ প্রতœসম্পদ হিসাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা হচ্ছে।
পাঠানবীর ফতেহ খান লোহানি শ্রীহট্ট জয় করার পর আম্বরখানার উত্তরে গড়-দোয়ার এলাকায় তাঁর দূর্গ-বসতিসহ প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করেন এবং সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দিন তৎউত্তরে পীর মহল্লার পূর্বাংশে নিজ নিজ বসতিসহ ধর্ম-কর্মের জন্য খানকা শরীফও স্থাপন করেন। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে আম্বরখানায় প্রাপ্ত বর্তমান ঢাকা মিউজিয়ামে রক্ষিত ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে খোদিত শিলালিপি থেকে তা জানা যায়। যদিও শিলালিপিতে শুধু খান আজম খাকান মোয়াজ্জম মসনদী আলী খাঁন এর পরের অংশ অর্থাৎ আসল নামটি পড়া যায়নি। কিন্তু সে নামটি যে ফতেহ খাঁন লোহানি তা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়ই প্রমাণিত। ঢাকা মিউজিয়ামে রক্ষিত অন্য একটি শিলালিপি থেকেও জানা যায় যে, ফতেহ খান লোহানি ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের শাসক ছিলেন এবং এ শিলালিপিটি সোনারগাঁয়ের শাসক ঈশা খাঁনের সময়ের বিধায় উভয়ই ছিলেন সমসাময়িক। মুসলমানদের আগমনের ফলেই ফার্সি ভাষার প্রভাবেই শ্রীহট্টের নাম ছিলাহেত/ ছিলহেত যা পরবর্তিতে ইংরেজ আমল থেকে অদ্যাবধি ইংরেজি ভাষায় সিলহেট লেখা হলেও বাংলায় সংক্ষেপে সিলেট লেখা হয়। ইংরেজিতে ফার্সি/ আরবি বর্ণ-ছকে ইংরেজিতে স এবং ত বর্ণকে ট দিয়ে লেখা হয় বিধায় মোগল আমলের ফার্সিভাষায় ছিলহেত নাম ইংরেজি ভাষায় সিলহেট এবং বাংলায় সংক্ষেপে সিলেট হয়ে যায়।
ইতিমধ্যে ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ তরফে মুসলমানদের আগমন এবং সিলেট বিজয়ের সংবাদ পেয়ে তুর্কিস্থানের যাকে ফারসি ভাষায় তুরান বলা হয় সেখানকার প্রখ্যাত শহর কোনিয়া থেকে সেখানকার প্রখ্যাত সুফি দরবেশ জালাল উদ্দিন রুমির অনুসারি আরেক প্রখ্যাত সুফি সাধক হজরত সৈয়দ জালাল মুলকে তুরানি নামক পীর ও দরবেশ দিল্লী-গৌড়-সোনারগাঁ হয়ে তরফ আসেন এবং ফতেহ খাঁন লোহানি কর্তৃক সিলেট বিজয়ের পরপরই সাথিদের নিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সিলেট এসে রাজা গোবিন্দের গড়/দুর্গ এলাকায় বসতি স্থাপন করে ইসলামধর্ম প্রচারসহ এলাকায় শান্তি স্থাপনে অবদান রাখেন। পীর সৈয়দ জালাল (রাহ.) বসবাসসহ সেখানে সমাধিস্থ হওয়ার কারণেই এলাকার নাম হয় পীর মহল্লা। তুর্কি স্থাপত্যশৈলিতে নির্মিত তিনির রওজা মোবারক দেখলেই তা যে সবার পুরানো সহজেই বোঝা যায়। পীর-মহল্লা এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সমস্যা সমাধানের জন্য পীর সৈয়দ জালাল রাহ, তুর্কি প্রযুক্তিতে পীর মহল্লার পাহাড়িয়া এলাকায় যে কূপ খনন করান তা আজো আক্কল কূয়া নামে খ্যাত। এ কুয়ার পানি এত বিশুদ্ধ যে তা রীতিমত পান করলে মস্তিষ্ক পরিষ্কার থেকে জ্ঞান-বুদ্ধি বাড়ত বিধায় এ কূপের নাম হয় আক্কল কূয়া। তখন থেকেই বিশুদ্ধ পানির জন্য কূয়ার প্রচলন হয়। পূর্বে সকল এলাকায় মুক্ত দীঘি/ পুকুরেরই প্রচলন ছিল।
স্মরণ করা প্রয়োজন ভারত-গৌড় ও বঙ্গে সর্বপ্রথম তুর্কি মুসলমানগণই জয় করে এসব এলাকায় মুসলমানদের আগমনের পথ খোলে দেন এবং তুর্কি বা তোরান দেশ থেকে পীর-দরবেশ ছৈয়দ জালাল রাহ. এর ন্যায় প্রখ্যাত দরবেশগণের কারণেই সোনারগাঁ-সিলেটে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসার হয়। পীর সৈয়দ জালাল রাহ, প্রথমে আক্কেল কূয়া খনন করে তার কাছেই বসতি স্থাপন করে ইসলাম ধর্ম প্রচার আরম্ভ করেন এবং নামাজের জন্য একটি সুন্দর এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন যা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পরবর্তিতে নষ্ট হয়ে যায়। তিনির ওফাতের পর পীর মহল্লার অভ্যন্তরে একটি নীরব-নিভৃত স্থানে তিনিকে সমাহিত করা হয়। পরবর্তিতে সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দিনের উদ্যোগেই তুর্কি স্থাপত্যশৈলিতে একটি সুন্দর মাজার শরীফ নির্মাণ করা হয় যা আজো সবাইকে আকৃষ্ট করে। সিলেট বিজয়ি প্রখ্যাত সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দিনই মহান পীর সৈয়দ জালাল রাহ, এর মাযার শরীফের প্রথম খাদিমের দায়িত্ব নেন। এ জন্য পরবর্তিতে সৈয়দ নাসির উদ্দিনের খানকার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিষ্কর ভূমিও প্রদান করা হয়েছিল।
১৬১০ খ্রিস্টাব্দে লেখা গুলজারে আবরার নামক গ্রন্থে যে পীর জালালের উল্লেখ করা হয়েছে তিনিই সিলেটের প্রথম দরবেশ সৈয়দ জালাল রাহ. মুলকে তুরানি। দরগা মহল্লাস্থ আরেক প্রখ্যাত পীর হযরত শাহজালাল রাহ. ইরানি আসেন পরে মোগলামলে। আশ্রিত রাজ্য তরফের শাসক সৈয়দ মুসা আশ্রয়ের শর্ত ভঙ্গ করায় ত্রিপুরার যুবরাজ বিরাট বাহিনী নিয়ে তরফ আক্রমণের খবরসহ সাহায্যের আবেদন পেয়েই সিলেটের শাসক ফতেহখাঁন লোহানি প্রখ্যাত সেনাপতি ও খাদেম সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি সেনাদল দ্রুতগতিতে তরফের শাসক সৈয়দ মুসার সাহাযার্থে প্রেরণ করেন। তরফ তথা বর্তমান হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের নিকটবর্তি জিকুয়া নামক স্থানে উভয়পক্ষের তুমুল যুদ্ধে ত্রিপুরা বাহিনী জয়লাভ করে। যুদ্ধে সৈয়দ নাসির উদ্দিনসহ অনেক সাথি সেনা নিহত হলে নিকটস্থ মুড়ারবন্দে তিনিদেরকে সমাহিত করা হয়। মুড়ারবন্দে সৈয়দ নাসির উদ্দিনসহ সাথি সেনাদের সমাধিক্ষেত্র সর্বজন শ্রদ্ধেয় স্থান। তরফ শাসক সৈয়দ মুসা, পুত্র সৈয়দ ইব্রাহিম ওরফে বিরাম ও সেনাপতি শুদ্ধরাম বন্দি হয়ে রাজধানি উদয়পুরে নীত হলে নি:শর্তে ক্ষমা প্রার্থনার প্রেক্ষিতে সৈয়দ মুসা ও পুত্র ইব্রাহিমকে মুক্তি দিয়ে সৈয়দ ইব্রাহিমের কাছে আশ্রিত রাজ্য তরফের শাসনভার ফিরিয়ে দেয়া হয়। এ যুদ্ধে তরফের শাসককে সাহায্য করায় সিলেটের পাঠান শাসক ফতেহ খাঁন লোহানিকে শায়েস্থা করতে ত্রিপুরার মহারাজা স্বয়ং এক বিরাট সেনাদল নিয়ে দিনাজপুর হয়ে সিলেট আক্রমণার্থে অগ্রসর হয়ে সিলেটের নিকটবর্তি দক্ষিণ সুরমার কামালের বাজারের কাছে গোধারাইল গ্রামে উভয় পক্ষের তুমুল যুদ্ধে ফতেহ খাঁন লোহানি পরাজিত ও বন্দি হলে তাঁকে দুলালি ও ইটা রাজ্যের মধ্য দিয়ে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরার রাজধানি উদয়পুরে নীত হলে ফতেহ খাঁন মহারাজের পূর্বের আশ্রয় দানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে বর্তমান কার্যের জন্য অনুতপ্ত হয়ে নি:শর্তে ক্ষমা প্রার্থনা করলে কর প্রদানের শর্তে ফতেহ খাঁনকে মুক্তি দিয়ে সিলেট রাজ্য ফিরিয়ে দেন। এ বিজয়ের স্মৃতি স্মারক হিসাবে মহারাজা অমর মানিক্য ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে একটি স্মারক মুদ্রাও প্রচার করেন যার একটি ঢাকা মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। সিলেটের আম্বরখানায় প্রাপ্ত এবং বর্তমান ঢাকা মিউজিয়ামে রক্ষিত শিলালিপি থেকে জানা যায় সিলেটের প্রথম মুসলিম বিজয়ি শাসক পাঠানবীর ফতেহ খান লোহানি ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে সিলেট শাসন করলেও পরবর্তিতে সম্রাট আকবরের প্রভাবে মোগলবশ্যতা স্বীকার করেই সিলেট শাসন করেন। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে মহান মোগল সম্রাট আকবরের মৃত্যু সংবাদে বাংলার মোগলবিরোধী হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিত প্রখ্যাত বারো ভূঁইয়া সামন্ত শাসকগণ নতুন শক্তিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। সোনারগাঁর সাবেক শাসক ঈসা খাঁর সুযোগ্য পুত্র মুসা খাঁন বিদ্রোহ ঘোষণা করলে সুবেদার মানসিংহ নিজ পুত্র অর্জুন সিংহকে বিদ্রোহ দমনে প্রেরণ করলে মুসা খানের সাথে যুদ্ধে অর্জুনসিংহ নিহত হলে বৃদ্ধ সুবেদার মানসিংহ হতাশ হয়ে পড়েন। এ সময় বানিয়াচুঙ্গ রাজ্যের শাসক বীরযোদ্ধা আনোয়ার খাঁনও মোগল বশ্যতা অস্বিকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ভাটি রাজ্য বোকাহনগরের শাসক খাজা উসমান স্বাধীনই ছিলেন। সোনার গাঁওয়ের আশ্রয়ে লুকিয়ে থাকা ভূইয়া বায়োজিদ কররানি ষোল শতাব্দির শেষের দিকে নিজ সেনাদল নিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করে সিলেটের প্রথম মুসলিম বিজয়ি পাঠান শাসক ফতেহখাঁন লোহানিকে তাড়িয়ে দ্বীপরাজ্য সিলেট দখল করে নিজ শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং মোগলদের বিরুদ্ধে কাছাড় রাজ্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে এ এলাকায় মোগলদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট আকবরের সুযোগ্যপুত্র জাহাঙ্গীর হিন্দুস্থানের মোগল সম্রাট হিসাবে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি সুবেবাংলার বিদ্রোহ দমনার্থে তথাকার বৃদ্ধ এবং বিদ্রোহিদের সাথে সদ্য নিহত পুত্রশোকাহত সুবেদার মানসিংহকে দিল্লীতে ফিরিয়ে নিয়ে তাঁর অতিত কৃতিত্তের জন্য সসম্মানে অবসর দেন। সুবে বাংলার বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করে তথায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর বাল্যবন্ধু এবং আজমীরের প্রখ্যাত সুফি-সাধক খাজা মঈনউদ্দিন চিশতির নাতি খাঁজা ইসলাম খাঁন চিশতিকে প্রয়োজনীয় সেনাদল ও সম্পদ দিয়ে সুবেদার হিসাবে সুবে বাংলায় প্রেরণ করেন। নব-নিযুক্ত এবং দক্ষ সুবেদার ইসলাম খাঁন বিরাট মোগল বাহিনীসহ দ্রুতবেগে সুবে বাংলায় এসে সোনারগাঁর অদূরে অবস্থান নিয়ে দূত মারফত সোনারগাঁর বিদ্রোহ শাসক মুসা খাঁকে শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে মোগলবশ্যতা স্বীকার করতে আহ্বান জানান। বুদ্ধিমান মুসা খাঁন বিরাট মোগল বাহিনিসহ নতুন সুবেদারের দক্ষতার খবর পেয়ে কাল-বিলম্ব না করে আত্মসমর্পন করে মোগল বশ্যতা স্বীকার করলে সুবেদার ইসলাম খাঁন মুসা খাঁনকে মসনদে আলা উপাধি দিয়ে সুবের প্রশাসনে উচ্চপদে নিয়োগ দেন।
ইতিমধ্যে সুবে বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওয়ে স্থানান্তর হয়। পরবর্তিতে ভাটি রাজ্য বোকাইনগরের শাসক খাজা উসমানকে আত্মসমর্পন করে মোগল বশ্যতা স্বীকার করতে আহ্বান জানালে পাঠান বীর উসমান তাতে অস্বীকৃতি জানালে সুবেদার ইসলাম খাঁন ১৬১১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে সেনাপতি কামালের নেতৃত্ত্বে খাজা উসমানের বিরুদ্ধে এক অভিযান প্রেরণ করলে খাজা উসমান দলবল নিয়ে পালিয়ে গিয়ে ইটা রাজ্যের সূর্য্যগড়ের অধিনায়ক ইটা রাজ্যের রাজা সুবোধ নারায়ণের পুত্র সূর্য নারায়ণকে আক্রমণ করে দুর্গ দখল করেন। দূর্গ রক্ষার্থে রাজা সুবোধনারায়ণ এগিয়ে আসলে যুদ্ধে রাজা সুবোধনারায়ণ নিহত হলে তাঁর পুত্রগণ আত্মসমর্পন করে খাজা উসমানের বশ্যতা স্বীকার করার সাথে সাথে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। খাজা উসমান তাদেরকে কর প্রদানের শর্তে ইটা রাজ্য পরিচালনার ভার দেন। ইটা পরগণার বর্তমান দেওয়ানগণই তাঁদের বংশধর। খাজা উসমান সূর্য্যগড়ের নাম পরিবর্তন করে নিজ নামে গড়ের নতুন নাম রাখেন উসমান গড়। খাজা উসমান নব অর্জিত রাজ্যকে শক্তিশালি করতে কাজ করেন। খাজা উসমান তরফ রাজ্যের অংশাদিও দখল করে রাজ্য বিস্তৃত করেন। পরবর্তিতে সুবেদার ইসলাম খান খাজা উসমানকে আবারো মোগল বশ্যতা স্বীকার করতে আহ্বান জানালে খাজা উসমান তাতেও অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে সুবেদার ইসলাম খাঁন উসমানের বিরুদ্ধে সেনাপতি সুজাত খাঁর নেতৃত্বে এক বিরাট মোগল বাহিনী প্রেরণ করেন। একই সাথে সিলেটের বিদ্রোহি শাসক ভূঁইয়া বায়োজিদকে দমন করে সিলেট রাজ্যেও মোগল আধিপত্য বিস্তারের জন্য আরেক সেনাপতি কামালের নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনীও সিলেটের দিকে প্রেরণ করেন। উসমানের রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তে দৌলম্ভাপুর/ দুলর্ভপুরের যুদ্ধে মোগল বাহিনীর এক দক্ষ তীরন্দাজ সৈনিকের তীরের আঘাতে হাতিতে চড়ে যুদ্ধ পরিচালনাকারি উসমানের চক্ষু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে উসমানের মৃত্যু হলে খাজা উসমানের লোকজন সেনাপতি কামালের কাছে আত্মসমর্পন করলে পাঠানবীর উসমানের রাজ্যসহ ইটা ও তরফ এলাকা ও মোগলদের করতলগত হয়। অন্যদিকে সেনাপতি কামালের বাহিনী সিলেটের নিকটবর্তি দক্ষিণ সুরমা এলাকার কদমতলি নামক স্থানে অবস্থান নেয়। কাছাড় রাজা ও ভূইয়া বায়োজিদের সাহাযার্থে সৈন্য প্রেরণ করেন। কয়েকদিনের তুমুল যুদ্ধের পর কিছু মোগল সৈন্য আশ্চর্যজনকভাবে সুরমা নদী অতিক্রম করে উত্তর সুরমাস্থ ভূঁইয়া বায়োজিদের ভাই ইয়াকুবের দুর্গ দখল করে নেয়। এমন সময় খাজা উসমানের মৃত্যু এবং তাঁর সেনাদের পরাজয়ের খবর এলে ভূঁইয়া বায়োজিদ হতাশ হয়ে আত্মসমর্পণ করে বন্দি হয়ে সুবেদার ইসলাম খাঁর কাছে নীত হন। অন্যদিকে কাছাড়ের রাজা ভূঁইয়া বায়োজিদকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করার অপরাধে সেনাপতি কামাল কাছাড় রাজ্যের প্রতাপ গড় দুর্গ দখল করলে কাছাড় রাজা ভয়ে মোগল বশ্যতা স্বীকার করায় কাছাড় রাজ্যও মোগল সাম্রাজ্যভূক্ত হয়ে সুবে বাংলার অংশ হয়। এ সময়েই দ্রুত অভিযানের জন্য সুরমা নদীর সাথে বরাক নদের সংযোগ সাধন করা হয়। দ্বীপ রাজ্য সিলেট মোগল সাম্রাজ্যভূক্ত হলে বিজয়ি সেনাপতি কামাল দক্ষ সহসেনাপতি মোরারিজ খাঁনকে সিলেটের প্রথম মোগল শাসক/ ফৌজদার নিয়োগ করেন। এ যুদ্ধকেই রাজা গোবিন্দের সাথে হযরত শাহ জালালের যুদ্ধ বলে অপপ্রচার করা হয়। হযরত শাহ জালাল রহ., মোগলামলেই শান্তিপূর্ণভাবেই সঙ্গী-সাথিসহ শান্তির ধর্ম ইসলাম প্রচারার্থে সিলেট আসেন। এজন্যই সিলেটে সর্বদা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় ছিল।
ষোল শতাব্দির শেষের দিকে ইরান/ পারস্য থেকে আগত প্রখ্যাত সুফি-সাধক হযরত শাহজালাল রাহ. দিল্লীতে সমাধিস্থ আরেক প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত নিযাম উদ্দিন আওলিয়ার মাজার শরীফে সাধনারত ছিলেন বলে জানা যায়। সম্ভবত: সে সময়ে দিল্লীতে বসবাসরত ইসলাম খাঁন চিশতির প্রখ্যাত সুফি-সাধক হযরত শাহ জালালের সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিল। নামের সাথে সম্মানি ফার্সিশব্দ শাহ যুক্ত থাকায় সহজেই বোঝা যায় হযরত শাহজালাল রাহ. যে পারস্য/ ইরান থেকেই আগত। তাছাড়া তখনকার সময় আধ্যাত্মিক সাধনায় পারস্য অগ্রগামি ছিল। অন্যদিকে খাজা ইসলাম খান চিশতি ও উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি-সাধক পারস্য থে

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • সিলেটে আরবি ভাষাচর্চা
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা
  • Developed by: Sparkle IT