ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৯-২০১৯ ইং ০০:১০:৫৬ | সংবাদটি ৫৩ বার পঠিত


[পূর্ব প্রকাশের পর]
১. শান্তি প্রয়াস।
ঐতিহ্যের মৌলিক তথ্যগুলো উদ্ধার ও বোধগম্য করে লিপিবদ্ধ করা এবং এ সংক্রান্ত গবেষণাকর্ম যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরী। রূপকথা গল্প কাহিনী ও রাজা উজির ভিত্তিক বাহুল্য কথা বাদে ও মূল্যমান তথ্য উপাত্ত আর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড অনেক আছে যা ঐতিহ্য ইতিহাসের অতি মূল্যবান উপাদান। উপজাতীয়দের মূল্যায়নের পক্ষে সে সব সংগৃহীত হওয়া জরুরী। সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে নিযুক্ত উপজাতীয় পন্ডিতদের কাছে এরূপ গবেষণাধর্মী সেবা কাজই কাম্য। গঠনমূলক কিছু করা ছাড়া কেবল বেতন ভাতা পাওয়ার মহড়া আর প্রচলিত নাচ গান চর্চাতেই বর্ণিত প্রতিষ্ঠানটি বন্দি হয়ে আছে। এটা যেন বেতন ভাতায় বাধা আর দশটা পেশার সমান, অন্যতম অর্থকরী পেশাও নিযুক্তি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক পন্ডিত মহল, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উপজাতি সংক্রান্ত কষ্টকর তথ্য সংগ্রহে যেমন উদাসীন, তেমনি উদাসীন স্থানীয় পন্ডিত মহলও। স্থানীয় পন্ডিতদের অনেককে উপজাতীয় সর্দারদের দীর্ঘ কুলিন রাজ রক্তধারী হওয়ার প্রমাণে অধিক আগ্রহী দেখা যায়। তজ্জন্য তথ্য প্রমাণের পরিবর্তে, রূপ কথাই যথেষ্ট বিবেচিত হচ্ছে। কিছুতে ও সত্যাসত্য যাচাই আর মূল্যায়ন নেই। উসাই-তে আগে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের একক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তা ছিলো অত্যন্ত শিথিল। এখন স্থানীয় নিয়ন্ত্রক হলো জেলা পরিষদ। সুতরাং তাতে আরো পোয়া বারো। যথেচ্ছ লেখা ও বলাকে ঠেকায় কে? মহল নির্মাণ ও ভোগ বিলাসে বরাদ্দ বাড়ছে। গঠনমূলক কিছু করাটা উপেক্ষিত। পার্বত্য অঞ্চলের তথ্যবহুল ও নিরপেক্ষ কোন ইতিহাস নেই। এই অভাবটি অত্যন্ত প্রকট হলেও, তথ্য সংগ্রহ, বিষয় ভিত্তিক বিন্যাস যাচাই-বাছাই গবেষণা, রচনা ও প্রকাশনায় কারো কোন গরজ নেই। জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ডে, সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, জেলা প্রশাসন এবং সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, কোটি কোটি টাকার তহবিলের মালিক। কিন্তু এই জরুরী কাজটি সম্পাদনের উদ্যোগে ও বরাদ্দে কারো কোন আগ্রহ নেই। বর্ণিত কর্তৃপক্ষ মহলের সবারই অধিক আগ্রহ নির্মাণ কাজ, বেতন ভাতা ও ভোগ বিলাসে, কারণ তাতে কিছু উপরি মিলে। সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা ও নগদ লাভকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়।
সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় কেবল উপজাতীয় লেখকদের কিছু নিম্নমানের বই প্রকাশিত হয়। হালে মিঃ টি, এইচ লুইনের দু তিনটি বই এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ক্রটি পূর্ণ অনুবাদ কাজে অনুবাদক নির্বাচন ও অনুবাদ যাচাই কাজটি পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতা দুষ্ট। ফলে এ কাজটি নিম্নমানের হয়েছে। বাঙ্গালী পন্ডিতদের প্রতি তাদের পরশ্রীকাতরতা অত্যন্ত প্রকট। আমি নিজেকে পন্ডিত মনে করি। তবু পার্বত্য অঞ্চলের তথ্য উপাত্ত নিয়ে সর্বাধিক আলোচনা গবেষণা রচনা ও প্রকাশনার রেকর্ড আমারই প্রাপ্য। আমি গবেষণা ও প্রকাশনার জন্য বর্ণিত কর্তৃপক্ষ সমূহের সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা চেয়েও বিফল হয়েছি। আমার তথ্য বহুল পান্ডুলিপি, প্রাইমারী পড়–য়া উপজাতীয় পন্ডিত, আর নিম্নমান সহকারীদের দ্বারা যাচাই-বাছাই করে, তার মান নির্ণয় করা হয়। তাতে আমি প্রত্যাখ্যাত। অথচ আমার প্রদত্ত তথ্যাদি বহুজনের উক্টরেট ডিগ্রী লাভের সুত্র এবং এনসাইক্লোপেডিয়াতেও গৃহীত। উপজাতীয় গুণগানমুলক উদ্ভট কাহিনী, আমার লেখনীর উপজীব্য হলে নিশ্চয়ই আমি সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেতাম। সর্বাধিক দুঃখজনক ঘটনা হলো, জেলা প্রশাসক বাহাদুর ও অনুরূপ সাংস্কৃতিক ও পুঁথিগত উন্নয়নের ব্যাপারে উদাসীন। পাবলিকের কাছে থেকে সংগৃহীত চাঁদার দ্বারা একটি ডিস্ট্রিক্ট ফান্ড গঠিত হয়ে জেলা প্রশাসকের ঐচ্ছিক তহবিল রূপে পরিচালিত হয়। উক্ত তহবিলের দ্বারা মেহমানদারী ত্রাণ কাজ দুস্থ দুর্গতদের সহায়তা দান ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ সমাধা করার ঐতিহ্য আছে। আমি একটি বই এর প্রকাশনা সহায়তায় উপরোক্ত কর্তৃপক্ষের সবার কাছ থেকে একে একে বিমুখ হয়ে শেষ অবলম্বন হিসাবে জেলা প্রশাসকের শরণাপন্ন হই। কিন্তু এখানেও আমি অস্পৃশ্য। তবে এটাই আমার সাত্বনা যে, আমি দয়ার পাত্র ও ঋণী হওয়া থেকে বেঁচে গেছি। বর্ণিত কর্তৃপক্ষদের সবাই জাতি ও দেশের পোষ্য করুণার পাত্র। তাদের কর্মকান্ড, টাকার নিরিখে মূল্যায়িত হয়। কেবল আমার মত অভাগারা বেগার খাটে। এই খাটুনী টাকার নিরিখে মূল্যায়িত হয় খুব কম। আগের জামানায় রাজা বাদশাদের প্রশস্তি গেয়ে এবং প্রকৃত সংস্কৃতি চর্চা করেও কবি ও লেখকেরা পুরস্কৃত হতেন। আজকাল ও মহল বিশেষের প্রশস্তি গাথায় লাভ হয়। তবে বেয়াড়া বস্তুনিষ্ঠ লেখকেরা দুর্ভাগা, যেমন আমি নিজে। পার্বত্য অঞ্চলের তথ্য ও ঘটনাবলীর বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার সুত্রপাত আমি করে গেলাম। এজন্য আমি অনেকের কাছে অস্পৃশ্য। তবে সময় আসবে, যখন আমার এ অপ্রিয় আলোচনাগুলো অনেক উচ্চ দামে বিকুবে। পার্বত্য অঞ্চল ও তার অধিবাসীদের তথ্য নির্ভর পরিচয় জানতে এবং এই অঞ্চলে শান্তি রচনায়, আমার লেখা তথ্য ও সুপারিশগুলো আশা করি একদিন কাজে লাগবে। জাতি ও দেশের জন্য এটি হবে আমার বেগার খাটার উপহার। এর কোন প্রতিদান আমি আশা করি না। তবে কোন খাটুনীই বৃথা যায় না। মহৎ উদ্দেশ্যে কৃত প্রতিটি কাজ বীজের মত অঙ্কুরিত হয় ও ফল উৎপাদন করে।
আমার জানা মতে, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে কিছু স্থানীয় লোক কাহিনী ও গীতিকা সংগৃহীত আছে। সেগুলোর অনুবাদ সম্পাদনা ও মুদ্রণ কাজটি সমাধা করা গেলে, স্থানীয় ইতিহাস ঐতিহ্যের তালিকায় কিছু মূল্যবান তথ্য সংযোজিত হবে। ইনস্টিটিউটের সুচিত অনুবাদ কাজটিও নির্ভুল ও যথেষ্ট নয়। এই অঞ্চল ও উপজাতীয়দের নিয়ে মিঃ টি এইচ লুইন সহ বহু পাশ্চাত্য পন্ডিত মূল্যবান অনুসন্ধানী বিবরণ রেখে গেছেন। ঐ পথিকৃত পন্ডিত ব্যক্তিদের রচনাগুলো বাংলায় ভাষান্তরিত হওয়া দরকার। খন্ডিত ও ত্রুটিপূর্ণ অনুবাদ নয়, এবং উপজাতীয় অনুবাদকই তজ্জন্য যথেষ্ট বিবেচিত হতে পারেন না।
এই পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতীয়দের সংশ্রব ও শিকড় ভারত ও আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানকার ইতিহাস ঐতিহ্যের সংশ্লিষ্টতা ঐ সব অঞ্চলেও প্রাপ্তব্য। ভারত ও ফলে ইতিহাস লোক ঐতিহ্য আর লোক গাথা সমূহে এই অঞ্চলের অনেক শিশগই অন্তর্ভুক্ত আছে। সে সব সংগ্রহ করা দরকার। দেঙ্গা ওয়াদি আবেদ ফুং নামীয় লোক কাহিনীটি আরাকানী ভাষায় লিখিত পাওয়া যায়। ঐ কাহিনীটি তাদের মাঝে প্রচলিত রাধা মোহন ধনপতি পালার আরাকানী সংস্করণ বলে আশা করা হয়। তফাৎ হলো ঐ কাহিনীটির চাকমা নাম শব্দে রাধামোহন শব্দটি আগে এসেছে আর আরাকানী সংস্করণে পরে। দেখা দরকার ঃ ঐ কাহিনীতে কোন ভিন্নতা ও নতুনত্ব আছে কিনা। আরাকানের এই কাহিনীগুলোকে স্থানীয়ভাবে বলে খাজা ওং বা রাজা কাহিনী।
যেখানে ইতিহাসের পক্ষে প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ নেই, সে স্থলে লোক শ্রুতি ও কাহিনীর যুক্তি গ্রাহ্য অংশ গুলো ইতিহাস বলে গ্রহণীয়। পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতীয় ইতিহাসের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটি সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নিতে পার্শ্ববর্তী দেশের ইতিহাস আশতি, লোক, কাহিনী ও গীতি ভাষ্য থেকে সহায়তা নেয়া উপকারী হতে পারে। পার্শ্ববর্তী দেশের ইতিহাসে বর্ণিত ও সমর্থিত কথা কাহিনীর সামঞ্জস্যপূর্ণ বিবরণগুলো স্থানীয় ইতিহাস রূপে বিবেচ্য হতে পারে। উদাহরণরূপে বলা যায় : চাকমা দেশান্তর কাহিনীতে এমন সব ভৌগোলিক স্থান ও নদীনালার বর্ণনা আছে, যা নেপাল সীমান্ত থেকে আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত। তাদের ভাষাটিও এই অঞ্চলের সাথে সামঞ্জস্যশীল। সুতরাং যৌক্তিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, চাকমাদের আদি বাসস্থান চম্পকনগর, অবশ্যই নগর নাম প্রবণ সাবেক ভারতীয় এলাকায় অবস্থিত আলো। ঠিক একইভাবে চাকমা আদি রাজা শের মস্তখার বাসস্থান, রোসাং অঞ্চলে আলো বলে লোক গীতির ভাষ্যকে লোক সমর্থিত ইতিহাস বলেই জ্ঞান করা যায়। সাথে সাথে ভাবা যায় তার অনুগামী চাকমারাও ছিলো আরাকানবাসী।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আজিজপুর
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায়
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • Developed by: Sparkle IT