উপ সম্পাদকীয়

সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪৪:১১ | সংবাদটি ৫৮ বার পঠিত

যেকোনো অঞ্চলের ঐতিহ্যের লালন মূলত সভ্যতার লালন। কারণ ঐতিহ্যের মাঝেই নিহিত থাকে অঞ্চল ও জাতির সভ্যতার শিকড়। ঐতিহ্যে পাওয়া যায় বহুকাল ধরে চলে আসা কবিতা ও গান, পাওয়া যায় শিক্ষা ও অপরূপ প্রকৃতি এবং আরো অনেক কিছু। হরেক রকম পিঠা ও নানান উৎসবেরও সন্ধান মিলে ঐতিহ্যের খোঁজে বের হলে। ঐতিহ্যের অনুসন্ধান চলতেই থাকে এবং মানুষ তা খুঁজেও পায়। এখানে সংক্ষেপে সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যের কিছুটা উপস্থাপন করছি।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বকোণ অর্থাৎ ঈশান কোণের বিভাগ হলো সিলেট বিভাগ। চারটি জেলা নিয়ে গঠিত এই বিভাগের একটি জেলা হলো সুনামগঞ্জ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়াতে গেলে লোকমুখে শুনতে পাই হাসন রাজার সুনামগঞ্জ বা হাওর-বাওড়ের সুনামগঞ্জ। মরমী কবি হাসন রাজা দেশ-বিদেশে বহুল পরিচিত। সুনামগঞ্জ শহরে হাসন রাজার বাড়িতে আছে হাসন রাজা মিউজিয়াম। সুনামগঞ্জে যারা বেড়াতে আসেন তারা এ মিউজিয়ামটি দেখে যান। হাসন রাজাকে নিয় যারা গবেষণা করতে চান তারা এখানে এলে অনেক তথ্য পেয়ে সমৃদ্ধ হন। এছাড়াও সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়েছে। বর্ষাকালে টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, দেখার হাওর দেখলে চোখ জুড়ায়, মন ভরে। হাওরের মায়ায় অজান্তেই মানুষ কবি হয়ে ওঠে। তবে এতো যে হাওর এবং এতো এতো কবি-সাহিত্যিক যে সুনামগঞ্জের গৌরব বাড়িয়েছে, সেই সুনামগঞ্জের নামকরণে কিন্তু অন্য তথ্য মিলে। ইতিহাসে আমরা যে মোঘল শাসনামল পাই, সেই মোঘল শাসনের জনৈক সিপাহী ছিলেন নাম সুনামুদ্দি। সেই সিপাহী সুনামুদ্দির নামেই সুনামগঞ্জের নামকরণ হয়। এই সুনামগঞ্জের এক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা সংক্ষেপে বলছি। অবকাঠামো এবং অবস্থানের বিবেচনায় নিলে আমি বলতে পারি সিলেট বিভাগে এমন দৃষ্টিনন্দন আরেকটি বিদ্যালয় নাই। এটি হলো সুনামগঞ্জের এক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়’। এ বিদ্যালয়টির রয়েছে প্রায় একশত বত্রিশ বছরের ঝলমলে ইতিহাস। এমন একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের আমিও ছাত্র ছিলাম। কিন্তু সুরমা নদীর পাড়ের এই বিদ্যালয়ের নামটি কিভাবে জুবিলী হয়ে গেল তা অনেকেই হয়তো জানেন না।
আমরা জানি সুনামগঞ্জ ১৯৮৪ সাল থেকে জেলায় উন্নীত হয় এবং ১৮৭৭ খ্রীস্টিয় সাল থেকে তা ছিলো মহকুমা। আর যে বিদ্যালয়টির কথা এখানে উল্লেখ করেছি সেটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৭ খ্রীস্টিয় সালে। জানা যায় সেই সময়ের স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের উদ্যোগে এবং তৎকালীন প্রশাসনিক সহায়তায় বিদ্যালয়টি গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠাকালে সুনামগঞ্জ ছিলো ব্রিটিশীয় শাসনের অধীন এবং ওই বছরই মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ব্রিটিশ সিংহাসনে আরোহণের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উদযাপন হয়। ওই পঞ্চাশ বছর পূর্তি উৎসবকে গোল্ডেন জুবিলী বা সুবর্ণ জয়ন্তী হিসাবে পালন করা হয়। আর ওই সময়কে স্মরণ করে বিদ্যালয়ের নামে সাথে তখন জুবিলী শব্দটি সংযুক্ত করা হয়। সেই থেকেই মানুষের মুখে মুখে এটি ‘জুবিলী ইশকুল’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তবে ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও সরকারিকরণ করা হয় ১৯২৮ খ্রিস্টিয় সালে। আমার কাছে মজার এক ব্যাপার হলো, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার একশত বছর বয়সে আমি ওই বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি পরীক্ষা দিই। এই বিদ্যালয়ের পূর্বদিকে আছে তার নিজস্ব খেলার মাঠ এবং পশ্চিম দিকে বেশ বড়ো এক দিঘি। দিঘিটির উত্তর পারে আছে মুসলিম ও হিন্দু ছাত্রাবাস। এখন দিঘির দক্ষিণ পাড়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে এক সুন্দর শাপলা চত্বর করা হয়েছে, যা পুকুরের সৌন্দর্যকে বাড়িয়েছে বহুগুণ। উত্তর দিকে এগুলে দেখতে পাওয়া যায় সুরমা নদী বয়ে চলেছে। বিদ্যালয়টির প্রধান প্রবেশদ্বারের সামনে দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে চলে গেছে শহরের প্রধান সড়ক। এই বিদ্যালয়ের সীমানার ভিতরে পাঠাগার, বাক্সেট খেলার মাঠসহ আরো কি কি আছে তা এলেই দেখতে পাবেন। সুনামগঞ্জ শহরে বেড়াতে আসলে দেশের প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় দেখে যেতে পারেন।
সুনামগঞ্জের নানান অঞ্চলে নানান উৎসব হতো যা এখন হারিয়ে যাচ্ছে। আমার গ্রাম হরিনাপাটির কথাই যদি বলি, তাহলে বলতে হয়, গত শতাব্দীর শেষ দিকেও অগ্রহায়ণ মাসের নতুন ধান ঘরে তোলার পর সেখানে এক ধরনের পিঠা উৎসব হতো। এই পিঠাকে স্থানীয়ভাবে রুট বলা হয়। পিঠা তৈরির জন্য সকাল থেকে বাড়িতে চাল ভিজিয়ে রাখা, তারপর সেই চাল পিষে কাই মাখানো হয়, পরে ওই কাইয়ের সাথে পিঁয়াজ, হলুদ ইত্যাদি মসলা সামগ্রী মিশিয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট আকৃতির চ্যাপ্টা গোলাকার পিঠা বানানো হয়। একেকটি পিঠা ভাত খাওয়ার থালার আকৃতির হতো। ওই পিঠার উভয় পিঠে তেল মাখিয়ে তা কলাপাতা দিয়ে মোড়ানো হয়। সন্ধ্যার সময় বাড়ির আঙ্গিনায় বা ধান শুকানোর খলায় প্রথমে নিচে খড় বিছিয়ে তার উপর এক সাথে পনেরো-বিশটি পিঠা পাশাপাশি রাখা হয়। পরে ওই পিঠার উপর আবার খড় দিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ওই আগুন অনেকক্ষণ ধরে জ্বলতো আর আমরা ছোটরা তখন সারা খলায় দৌড়াদৌড়ি করতাম। তখন প্রত্যেক সামর্থ্যবানদের বাড়িতে খলায় একসাথে রুট পোড়া হতো। রুট পোড়া হয়ে গেলে তা আবার টুকরিতে করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পালা। এরপর প্রতিটি রুট কেটে ছোট ছোট করে তাতে ঘি মাখিয়ে শুরু হতো খাওয়ার পালা। এমন মজার ঐতিহ্যের উৎসব এখন আর হয়না।
সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যের বর্ণনা এখানেই শেষ নয়। এখানে সংক্ষিপ্তাকারে ব্যক্ত করা হয়েছে। শেষ করছি একটি যাদুঘরের কথা বলে। প্রায় শতবর্ষ পুরনো সুনামগঞ্জের পুরাতন আদালত প্রাঙ্গণে গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যের যাদুঘর। এটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে রাজগোবিন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। এখানে ঘুরে আসতে পারেন আরো ঐতিহ্যের সন্ধানে।
লেখক : কবি।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • পারিবারিক সু-শিক্ষা ও বর্তমান সমাজ
  • অপেক্ষা, আর কতোকাল
  • উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টিই বড়ো চ্যালেঞ্জ
  • প্রসঙ্গ : হকারমুক্ত ফুটপাত
  • Developed by: Sparkle IT