শিশু মেলা

রাম ছাগল

চন্দ্রশেখর দেব প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪৫:২৮ | সংবাদটি ১৭১ বার পঠিত

মুন্নু আর চুন্নু। একটা খালের দু’পারে দু’জনের বসতি। মুন্নু থাকে খালের এক পারে আর চুন্নু খালের অন্য পারে। বছর দুয়েক ব্যবধানে দুজনেরই জন্ম। এক সাথেই দুজন হেসে খেলে বড় হয়েছে। পাঠশালাতে পঞ্চম শ্রেণি পড়ে দুজনই সংসারে হাল ধরতে হলো। অন্যের জমিতে দুজনই কৃষি কাজ করে দিন যাপন করে। যখন কৃষি কাজ থাকে না শহরে বসে দিন মজুর খেটে সওদা নিয়ে বাড়িতে যায়। এভাবেই চলছিল খেটে খাওয়া জীবন। পরিবারের চাপে দুজনকেই বিয়ে করতে হলো। কোন ধরনের পুষ্টিকর খাদ্য জন্ম থেকেই খেতে পারেনি। খেতে পারুক আর না পারুক বিয়ে একটা করতেই হবে। এদিক দিয়ে একটুও পিছপা হয় না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি করতে জোর প্রতিযোগিতা চলে। এক সময় এদেরই বাচ্চারা টোকাই হয়ে ফুটপাতে আর এতিমখানায় জায়গা হয়। তাদের কোন চিন্তা নাই বাচ্চা নিয়ে। ওরা ভাল করেই জানে সরকার বা কোন সমাজ সংঘ এই বাচ্চাদের একটা ব্যবস্থা করবে। অতএব নো চিন্তা ডু ফূর্তি।
যাই হোক এবার মূল কথায় আসি। মুন্নু আর চুন্নু বিয়ে করার পর সংসারে বাচ্চাদের যখন জন্ম হলো রোজের আয় দিয়ে আর চলে না। বৌ এর কথায় কিছু টাকা দিয়ে দুটো রাম ছাগলের বাচ্চা কিনে পালন করতে লাগলো। ধীরে ধীরে ছাগল বড় হলো কয়েক বছর পরে ছাগলের বাচ্চা হলো। কিছু বড় হওয়ার পর বাচ্চা বিক্রি করে পরিবারের খরচ মিটাতো। হাট বারে মুন্নুর সাথে চুন্নুর দেখা হলে ভাল মন্দ খোঁজ খবর নিত। কেমন চলছে। কিন্তু দুজনেরই মন মরা মুখ। বাজার খরচ করে কুলিয়ে উঠতে পারে না। বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করে দিল। কিন্তু ওরা বাড়িতে এসে বই পড়ে না। নানা ধরনের খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মুন্নু, চুন্নু দুজনেই বুঝতে পারে তাদের বাচ্চার লেখাপড়া হবে না। তাই তাদের সাথে কামলা খাটতে নিয়ে যায়।
ঘরে ঝগড়া করে মন মেজাজ খুব খারাপ হলো মুন্নুর। রাগ করে জমিনের আল ধরে আনমনে হাঁটতে লাগলো। পথে চুন্নুর সাথে দেখা হয়। চুন্নুও হনহনিয়ে এদিক ওদিক চেয়ে হাঁটছে। চুন্নু মুন্নুকে বললো ভাই তুমি একটা রাম ছাগল। কি বললি তুই এত বড় সাহস তোর। বলেই মুন্নু চুন্নুকে ঘুষি মেরে দিল। দুজনেই কারো কথা না শুনে ধস্তাধস্তি শুরু করলো। মুহূর্তে দুই পারে মারামারি খবর পৌঁছে গেল। দেশের ঐতিহ্য লাঠিসোটা, বল্লম, কোচা নিয়ে সবাই হাজির। ভয়ঙ্কর মারামারি দু’পক্ষে শুরু হলে গ্রামের মুরব্বিরা আসার আগেই দু’পারের মানুষ আহত হয়ে রক্তারক্তি অবস্থায় হাসপাতাল যেতে হলো। দু’বাড়ির মহিলা বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে। মুরব্বীরা এসে মারামারি বন্ধ করে জানতে চাইলেন কি কারণে ঘটনা ঘটলো। চিৎকার চেচামেচির কারণে বুঝতে না পেরে শুক্রবার বিচারের তারিখ দিলেন। বলে দিলেন যার যা বলার বিচারের সময় সমাধান করে দিবেন। এ কথা শুনে দু’পারের মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেল।
এদিকে আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় বিচারের তারিখ পিছিয়ে গেল। বেশ কিছুদিন পরে আহতরা ফিরে এলে সবার সাথে আলাপ করে বিচারের দিন ঠিক করা হলো। নির্ধারিত দিনে দু’পারের লোক বিচার আঙ্গিনায় সমবেত হলে মুরব্বীরা চুন্নুর লোকদেরে বললেন কেন আপনারা এত বড় কা- করলেন। ওরা বললো চুন্নুকে ঐ পারের মুন্নু মারছে শুনেই আমরা সবাই এসে মারামারি করছি। মুন্নুর লোকগুলোও ঐ একই কথা বললো।
কিছু সময় মুরব্বীরা নিরব থেকে বললেন ভাল লাগলো আপনারা দু’পক্ষের একতা দেখে। যদি এই একতা দেশের জন্য করে যেতেন। দেশটা কতো ভাল থাকতো। আপনাদেরও উন্নতি হতো দেশেরও হতো। এই মারামারির কারণে কোট-কাচারি, মামলা-মোকদ্দমা, থানা-পুলিশ, ডাক্তার চিকিৎসা, ঔষধ-পত্র খরচ করে কতো টাকা ক্ষতি করলেন। একটু ভাবুনতো এই টাকা দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে কতোভাবে থাকতে পারতেন ভালো।
মুন্নুকে জিজ্ঞাসা করলেন কেন মারামারি করলো। মুন্নু বললো চুন্নু তাকে রাম ছাগল বলেছে। চুন্নু বললো তাকে রাম ছাগল বলেনি। তাহলে তাকে কি বলেছ। আমি তাকে বলার আগেই মারামারি করলো। আমার রাম ছাগল খোঁজে না পেয়ে বলতে চেয়েছি ‘ভাই তুমি একটা রামছাগল এদিকে কোথাও যেতে দেখেছে।’ কিন্তু মুন্নু পুরো কথা না শুনেইতো মারামারি করে এতজন লোকের রক্তপাত হলো। দু’পারের মানুষইতো সাধারণ খেটে খাওয়া। এবার সবাই ভুল বুঝতে পেরে একে অপরের সাথে মাফ চেয়ে কোলাকুলি করে লজ্জা মুখে মুরব্বীদের কাছে ওয়াদা করে বললো এরকম আর ভুল হবে না। সবাই মিলে মিশে নিজ নিজ বাড়ি পথে রওয়ানা হলো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT