সম্পাদকীয়

শকুন সুরক্ষায় দিবস

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪৬:০৪ | সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত


বিশ্ব শকুন দিবস আজ। শকুন রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে প্রতি বছর আজকের এই দিনে দিবসটি পালিত হয়। শকুন বিলুপ্ত হওয়ার পথে আমাদের দেশে। প্রকৃতিকে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত শকুনকে আকাশে বিশাল ডানা মেলে এখন আর তেমন উড়তে দেখা যায় না। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই শকুন একটি অপরিচিত পাখি। তিন দশক আগেও এদেশে শকুন ছিলো বেশি সংখ্যক পাখির মধ্যে অন্যতম। কিন্তু বর্তমানে শকুন দুর্লভ প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। হয়তো আগামী প্রজন্মকে শকুন সম্বন্ধে জানতে হলে বই, পুস্তক আর ইন্টারনেটের ওপরই নির্ভরশীল হতে হবে। বাস্তবে কোনো শকুনের দেখা না-ও মিলতে পারে। আর এই শকুন বিলুপ্ত হওয়ায় বাংলাদেশ এনথ্রাক্স, জলাতংকসহ পশু হতে সংক্রমিত রোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। মূলত খাবার ও আবাসস্থলের অভাবেই বিলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন বর্জ্যভূক এই প্রাণীটি। বিশেষজ্ঞদের মতে যথাযথ উদ্যোগ না নিলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই প্রাণীটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
পরিবেশ সুরক্ষায় শকুনের জুড়ি নেই। শকুন পৃথিবীর ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনার’ দায়িত্ব পালন করছে। প্রাকৃতিকভাবেই এই দায়িত্বটুকু পালন করছে বিভিন্ন বর্জ্যভূক প্রাণী। এর মধ্যে শকুন অন্যতম। শকুন শুধু প্রকৃতিকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্বই পালন করছে না, প্রকৃতিকে জীবাণুমুক্তও রাখছে। বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রকার শকুন দেখা যায়। যেমন-বাংলা শকুন, সরুঠুঁটি শকুন এবং রাজশকুন। এর মধ্যে বাংলা শকুন ও সরুঠুঁটি শকুন আবাসিক শকুন হিসেবে টিকে আছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে রাজশকুন। বর্তমানে যে দুই প্রজাতির শকুন রয়েছে, তা-ও বিলুপ্ত হওয়ার পথে। পরিসংখ্যানের তথ্য হচ্ছে, এক সময় ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় চার কোটি শকুন ছিলো। বর্তমানে এই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র দশ হাজারে। ১৯৯০ সাল থেকে এই উপমহাদেশে বাংলা শকুনসহ অন্যান্য শকুন হ্রাস পেতে শুরু করে। এর মধ্যে বাংলা শকুন বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ৯৯ শতাংশই। বাকি আছে মাত্র এক শতাংশ। এই প্রজাতির শকুনকে বিশ্বের একটি মহাবিপন্ন প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আর বাংলাদেশে শুকুনের সংখ্যা বর্তমানে নেমে এসেছে তিনশ’র নীচে। শকুন বিলুপ্তির কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশগত সমস্যা দেখা দিয়েছে। শকুনের অবর্তমানে বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ ও গবাদিপশু। বিভিন্ন এলাকায় কুকুরের সংখ্যা বেড়ে গিয়ে জলাতংক সংক্রমের হার বেড়ে গেছে। শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোয় এনথ্রাক্স ও জলাতংক রোগ বেড়ে গেছে। প্রথমত আবাসস্থলের অভাবে এদেশে শকুনের বংশবিস্তার ঘটছে না। শকুন বট, শিমুল, দেবদারু ও তালসহ বড় গাছে বাসা বাঁধে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এখন এইসব গাছ নেই বললেই চলে। ফলে শকুনেরা আর বাসা বাধতে পারছে না। তাই প্রজননও হচ্ছে না। এছাড়া, গবাদি পশু চিকিৎসায় ‘ডাইক্লোফেনাক’ এবং ‘কিটোপ্রোফেন’ নামক বিষাক্ত ওষুধ ব্যবহার করায় মৃত্যু হচ্ছে শকুনের। এই দুটি ওষুধ দিয়ে যেসব গবাদি পশুর চিকিৎসা করা হচ্ছে, সেই পশু মারা গেলেও ওষুধের কার্যক্ষমতা বজায় থাকে। আর এই মরা গরু খেয়ে ওষুধের বিষক্রিয়ায় শকুনেরও মৃত্যু ঘটে। তার ওপর ইদানিং গবাদি পশু মারা গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাটিতে পোতে রাখা হয়। ফলে শকুনের খাবার সংকট বাড়ছে।
পরিবেশ সুরক্ষা তথা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য শকুনের জুড়ি নেই। সুতরাং শকুনের সুরক্ষা খুবই জরুরি। এজন্য প্রথমে ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন ওষুধে পশু চিকিৎসা বন্ধ করতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশে পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করা হয়েছে ইতোমধ্যেই। কিন্তু নিষিদ্ধ হয়নি কিটোপ্রোফেন। তাছাড়া, ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ হলেও চোরাই পথে এই ওষুধ উৎপাদন হচ্ছে এবং ব্যবহার করা হচ্ছে গবাদি পশু চিকিৎসায়। তার মানে, এই নিষিদ্ধ ওষুধ দুটি গবাদি পশু চিকিৎসায় যথারীতি ব্যবহার করা হচ্ছে সমানতালে। এই ওষুধগুলোর উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করতে হবে। শকুন রক্ষায় ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সমন্বয়ে শকুন সংরক্ষণ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর আলোকে তিন বছর আগে সিলেট এবং খুলনায় শকুনের জন্য দুটি নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। সিলেটের নিরাপদ এলাকার ৬২ শতাংশ বাংলাদেশে এবং বাকি অংশ ভারতে অবস্থিত। সরকারের এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলার আকাশে আবার ভেসে বেড়াবে শকুনের দল। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে, দূর হবে অনেক সংক্রামক রোগ ব্যাধি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT