উপ সম্পাদকীয়

অনন্য ব্যক্তিত্ব এম. সাইফুর রহমান

মামুনুর রশীদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪৭:১৩ | সংবাদটি ৫২ বার পঠিত

সিলেটের মাটি ও মানুষের সঙ্গে যে মানুষটির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশের উজ্জ¦ল নক্ষত্র। সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী প্রয়াত এম. সাইফুর রহমান। দলীয় পরিচয়ে নয় ব্যক্তি হিসেবে সিলেটে তাঁর আসন অনেক ঊর্ধ্বে। বিএনপি কিংবা চার দলীয় জোটের শাসনামলে সিলেটে যে উন্নয়ন অগ্রগতি হয়েছে তার সঙ্গে সাইফুর রহমানের নাম অবিচ্ছেদ্য। সাইফুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘকালীন অর্থমন্ত্রীদের অন্যতম একজন। এজন্য সাইফুর রহমানের সাফল্য ও ব্যর্থতার পর্যালোচনায় ভেসে ওঠবে একটি অনুন্নত দেশের অর্থমন্ত্রী দেশে উন্নয়নের ধারা সৃষ্টি করতে প্রয়োজনে নীতি নির্ধারণে কী ধরনের সংকটের সম্মুখীন হন এবং সব বিরোধীতার ভেতর থেকেও কীভাবে জনগণের মঙ্গল সাধনের জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালানো সম্ভব। সাইফুর রহমান দেশের সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তিত্ব, যার পদচিহ্ন, দেশের প্রতিটি দিক নির্দেশনাকারী অর্থনৈতিক নীতিমালায় অবধারিতভাবে এসে পড়ে। এসবের অনেক কিছুর জন্য তিনি যেমন অসামান্য সমাদর পেয়েছেন, তেমনি বিতর্কিত ও সমালোচিত হয়েছেন বহুবার। সাইফুর রহমান ভুল করার ভয়ে কখনও তার উদ্যোগ থেকে বিচ্যুত্ত হননি। সাইফুর রহমান এর অর্থমন্ত্রী হিসেবে একটি বড় বৈশিষ্ট্য, তিনি সারা জীবন দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত বাজারমুখী করার প্রয়াস বজায় রেখেছেন। সেজন্য আমরা দেখি দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালা সংস্কারের বিভিন্ন প্রয়াস তার আমলে। বাংলাদেশী টাকার চলতি হিসেবে রূপান্তর যোগ্যতা এবং পরে ভাসমান হারে প্রবেশ, বেসরকারি করণের চলমান প্রয়াস এসবই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এগুলো যে শুধু নীতি নির্ধারক হিসেবে তার দূরদর্শিতা এবং সাহসের পরিচয় বহন করে তা-ই নয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি যে বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মহলকে এসব উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন এবং সব আপাত অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তের দীর্ঘকালীন কার্যকারীতা সম্পর্কে আশ্বস্থ করতে পেরেছেন সেই সাফল্যের স্বাক্ষর রাখে। সেজন্য আমরা দেখি সাইফুর রহমানের আর্থিক খাতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নিতে দারুনভাবে সহায়তা করেছে। তিনি বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় যেসব সংস্কার প্রস্তাব এনেছিলেন তার মধ্যে রয়েছে মূল্য সংযোজনকর বা ভ্যাট। বাণিজ্য উদারীকরণ ও ভাসমান মুদ্রা বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু, বেসরকারি করণ নীতি ইত্যাদি। এছাড়াও শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্যব্যবস্থাও তিনি চালু করেছিলেন। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠির ভাগ্য উন্নয়নে তিনি অনেক নতুন কর্মসূচী গ্রহণ করেন। যা দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি বাজেটে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেছেন। তার সময়েই তিনি উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়েছেন। এ কর্মসূচীগুলো বাস্তবায়নের জন্য তিনি নিয়েছিলেন নানামুখী চ্যালেঞ্জ। দলের ভেতর থেকে তার নেওয়া কর্মসূচীর বিরোধীতা করা হলেও তিনি অত্যন্ত শক্তভাবে এগুলো মোকাবেলা করেছেন।
১৯৯১ সালে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে তিনি ব্যাংকিং রাজস্ব ও আর্থিকখাতে ব্যাপক সংস্কার আনেন। এর ফলে বেসরকারি খাতে ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া শুরু হয়। ফলে আর্থিক খাতে সরকারি ব্যাংকগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য কমতে থাকে। ১৯৯১ সালে সাইফুর রহমান রাজস্বখাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিনি তুলে ধরেন অভ্যন্তরীন সম্পদ আহরণের গুরুত্ব। দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য আমাদের অভ্যন্তরীন অর্থসংস্থানের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। দেশে ঘন ঘন হরতাল প্রসঙ্গে তিনি বলতে হরতাল ডেকে আমরা অর্থনৈতিক আতœহত্যা করি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সাইফুর রহমান অসাধারণ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। আন্তর্জাাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্ব ব্যাংকের বোর্ড অব গভর্নরসের নির্বাচিত চেয়ারম্যানও ছিলেন। ১৯৯৪ সালে অক্টোবরে মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের ৫০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন তিনি। সভাপতি হিসেবে বিশ্ব ব্যাংকে বিজ্ঞজনোচিত পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশ্ব ব্যাংকের কর্মকর্তারা এসময় তার এই ভূমিকা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। মরহুম সাইফুর রহমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। বেসরকারি খাতের উন্নয়নে তিনি সবসময় জোরালো সমর্থন দিয়ে গেছেন। ১৯৮০-৮২, ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে সাইফুর রহমান বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং আইএফডি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফে বাংলাদেশের অর্থ ও বাণিজ্য বিষয়ক প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৯সালে সাইফুর রহমান রাষ্ট্রপ্রতির বিশেষ দুত হিসেবে ভারত, শ্রীলংকা ও পাকিস্তান সফর করেন। ১৯৯৫ সালে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ায় অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে ও তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের প্রধান ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাইফুর রহমান অপ্রিয় ও অজনপ্রিয় সত্য কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেননি। সাফল্য ও ব্যর্থতাসহ ব্যক্তি সাইফুর রহমানকে মূল্যায়ন করতে হবে। দরিদ্র ভাগ্যাহত দেশের অসংখ্য মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে তার নিরন্তর প্রচেষ্টা ও অঙ্গিকারের প্রেক্ষিতে ব্যক্তি সাইফুর রহমান মিশে গেছেন উন্নয়নের একটি ধারায়। বাংলাদেশকে বিশ্ব বাজারে প্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর সংগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কে বেগবান করবে বলেই আমার বিশ্বাস। সেই সঙ্গে সবাই স্মরণ রাখবে একজন করিতকর্মা রাজনীতিবিদকে, স্পষ্টভাষী সংস্কারককে আর সিলেটের কৃতী সন্তানএম সাইফুর রহমানকে। ১০ম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

 

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT