ধর্ম ও জীবন

ইসলাম কত সুন্দর

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৯-২০১৯ ইং ০০:০১:৪৩ | সংবাদটি ২১৬ বার পঠিত

কয়দিন ধরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। মাঠ ঘাট পানি থইথই। স্কুলে যাওয়া হচ্ছে না সাদিকের। ঘুষঘুষে জ¦র হল কয়দিন। মা নিষেধ করেছেন স্কুলে যেতে। স্কুলে যাওয়ার পথে বৃষ্টিতে ভিজলে জ¦র বেড়ে যাবে। সারাক্ষণ বাসায় পড়া, নামাজ আর খাওয়া এই তিনটিই যেন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৃষ্টির মধ্যে কারো বাড়ি যাওয়াও হয়না। কেউ আসেও না। সাদিক মা বাবার একমাত্র সন্তান। তাই খুব আদুরে।
আজ বিকেলে আকাশ খানিকটা পরিস্কার হয়েছে। মনে হয় তার রাগ একটু কমেছে। আকাশ রাগ করবেই না কেন? সূর্য প্রতিদিন আলো দেয়, প্রয়োজনমত আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে। আলো বাতাস পানি সবতো আকাশকে ঘিরেই। আকাশ থেকেইতো রিজিকের ফায়সালা আর রিজিক পাঠানো হয়। কিন্তু তার উপর কত জুলুম করা হয়। কলকারখানার সব ধোঁয়া তাকেই গিলতে হয়। পরিবেশের সব ক্ষতি তাকেই বহন করে চলতে হয়। আকাশ সংস্কৃতিই ভাল সব কিছু গিলে ফেলছে। তারতো পুরো নাখুশ হওয়ার কথা।
সাদিকের মনটা আজ যেন হালকা লাগছে। বেশ কয় দিন পর আজ একটু ঘরের বাহিরে বের হতে পেরেছে। বের হয়ে দেখতে পায় যে রাকিব রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে।
Ñএই রাকিব
Ñকে, সাদিক
Ñকেমন আছ
Ñভাল, তুমি কেমন, বেশ কয়দিন তোমাকে দেখি না। কি কোন সমস্যা?
Ñনা, তেমন নয়। একটু জ্বর ছিল আর বৃষ্টি। মা বের হতে নিষেধ করেছেন।
Ñওহ আচ্ছা। আমি ভাবছিলাম, কোথাও হয়তো বেড়াতে গিয়েছো। চল ও পুকুর ঘাটে বসে গল্প করি।
Ñসাদিক বলে চলো।
দুজনে গিয়ে পুকুর ঘাটের সিঁড়িতে বসে গল্প মেতে উঠে। অনেক দিন দুজনের গল্পে বসা হয় না। দুজনে এ কথা ওকথা বলতে বলতে সময় পার হয়ে যায়। হঠাৎ রাকিব বলে, জান সাদিক গত কয়েকদিন আগে আমাদের বাসার স্যার ইসলামের সৌন্দর্য নিয়ে আমাদেরকে বুঝিয়েছেন। যে ইসলাম কত সুন্দর, কত আধুনিক আর কত মানানসই।
স্যার বললেন, ইসলাম চির সুন্দর, চির নতুন, চির আধুনিক, চির মানানসই। তুমি ইসলামের কোন একটি বিধানও পাবে না যা, যুগের সাথে খাপ খায়না। ইসলামে আল্লাহ তায়ালা বিধান দিয়েছেন তার সাথে কোন মারাত্মক অসুবিধা হলে রুখসত বা বিকল্প ব্যবস্থা দিয়েছেন যেন জীবন দুর্বিহ হয়ে না যায়।
দেখ রাকিব ইসলামের সবগুলো কাজকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১. অতীব গুরুত্বপূর্ণ যা না পেলে জীবন ধারন করা অসম্ভব হয়ে যায়, জীবন হুমকির মধ্যে পড়ে যায়, ২. সাধারণ গুরুত্বপূর্ণ যা না পেলে জীবন হুমকির মধ্যে পড়ে না কিন্তু একটু কষ্ট হয়। ৩. সৌন্দর্য বর্ধক যা না পেলে কোন কষ্টও হয় না তবে সৌন্দর্য, চাকচিক্য কম হয়।
অতীব গুরত্বপূর্ণ বিষয়কে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে, দ্বীনের নিরাপত্তা, জীবনের নিরাপত্তা, আকল বা জ্ঞানের নিরাপত্তা, বংশের নিরাপত্তা, সম্পদের নিরাপত্তা।
আমার জন্য এগুলো বুঝা খুব কঠিন। স্যার আমাকে উদাহরণ দিয়ে বললেন, দেখ তোমার রাষ্ট্রে কেউ আক্রমণ করেছে। তোমার দেশ তারা দখল করতে পারলে তুমি দ্বীন পালন করতে পারবে না, নামাজ আদায় করতে পারবে না, রোজা রাখতে পারবে না ইত্যাদি। এখন তুমি যদি জীবনের মায়া করে আক্রমণ প্রতিহত না কর। তবে তোমার দ্বীন পালন করা কঠিন হবে বা পালন করতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা তোমাকে যে উদ্দেশ্যে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন তার কোনটিই তুমি পালন করতে পারবে না। তাই জীবনের চেয়ে দ্বীনের মূল্য বেশী। এখানে জীবনের মায়া করলে দ্বীন টিকাতে পারবেনা। তাই জীবন দিয়ে হলেও তোমাকে তাদের আক্রমণ রুখে দিতে হবে।
আবার ধর দ্বীনের বিধান হল মরা প্রাণীর গোস্ত খাওয়া যাবে না। কিন্তু তোমার নিকট কোন খাবার নেই। এদিকে তুমি কিছু না খেতে পারলে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা এমতাবস্থায় কোন মরা প্রাণীর গোস্ত যতটুকু খেলে তোমার জীবন বাঁচবে ততটুকু খেতে পারবে। রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ। কিন্তু তুমি যদি অসুস্থ হও যে রোজা রাখতে পারবে না তবে পরে এই রোজাগুলো আদায় করে নিবে। প্রথম উদাহরণে দ্বীনের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় উদাহরণে জীবনের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এভাবে গুরুত্ব বুঝে বিধান আরোপ করা হয়। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য।
সাদিক বলে বাহ বেশ সুন্দরতো, আসলে আমাদেরকে এতো সুন্দর করে কেউ বুঝায় না। তাই আমরা দ্বীন বুঝি না। দ্বীনকে বোঝা মনে করি। দেখ রাকিব গতকাল আব্বা আমার সাথে গল্প করছিলেন, এক পর্যায়ে বাবা বললেন, শোন রাকিব আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় তাঁর দ্বীন, দ্বীন আল ইসলাম। যখন কোথাও দ্বীনে টিকে থাকা আর সরে যাওয়ার প্রশ্œ আসবে তখন দ্বীনকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
রাকিব বলে চল, আজ এখানেই থাক অন্য দিন আরো আলাপ করা যাবে। এতে আমার ও তোমার উপকার হবে। এমনিতেই শুধু শুধু গল্প করে কি লাভ। গল্পের মধ্যেও সময়কে কাজে লাগাই। জীবন সুন্দর করি। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের উপর খুশি হন। দুজনেই এক সাথে বলে উঠে আমীন।

নাজাতের পথ যবানের হেফাজত
মেহেদী হাসান সাকিফ
বাকশক্তি আল্লাহর অনেক বড় একটি নেয়ামত। বান্দার বহুবিধ প্রয়োজন পূরণের জন্যই আল্লাহ এই নেয়ামত দান করেছেন। মানুষের মনের দুঃখ-কষ্ট, হাসি-কান্না, আনন্দ-উল্লাস ক্ষেত্রেও এই যবানই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। যিনি কোন কারণে যবানের এই নিয়ামত হারিয়েছেন তিনিই কেবল বুঝতে পারেন এই নেয়ামতের কদর কতটুকু!
অথচ আমরা প্রতিনিয়ত যবানের প্রতি নির্বিচারে জুলুম করে যাচ্ছি। যবানকে আল্লাহর নাফরমানিমূলক কাজে ব্যবহার করছি। রাসুল (সা.) বলেন, বান্দা চিন্তাভাবনা ছাড়া এমন কথা বলে, যার কারণে সে (পূর্ব পশ্চিমের দূরত্ব পরিমাণ) জাহান্নামের অতলে নিক্ষিপ্ত হয়। (বুখারি : ৬৪৭৭)
নিরবতা বিনা কষ্টের এক ইবাদত, বিনা অলংকারের এক সৌন্দর্য, বিনা প্রতাপের প্রতিপত্তি। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তুমি যখন চুপ থাকবে তখন নিরাপদই থাকবে। আর যখন কথা বলবে, তখন তা তোমার পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে’। (আল মুজামুল কাবির, তাবারানী/হাদিস নং ১৩৭)
এক দার্শনিকের অভিব্যক্তি, ‘আমি কখনো আমার নিরবতার উপরে অনুতপ্ত হইনি’। জবানের যথাযথ ব্যবহার দুনিয়া ও আখিরাতে অগণিত কল্যাণ বয়ে আনে। তদ্রুপ এর অপব্যবহার ডেকে আনে ধ্বংস। সঠিক কাজে জবানের ব্যবহার, অন্যায়, অসত্য ও হারাম থেকে জবানকে বিরত রাখা আল্লাহপ্রাপ্তির সহজ উপায়। এক কথায় জবানের হেফাজত মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কুরআনের ১৮তম পারায় সূরা মুমিনুনের শুরুতে মহান আল্লাহ তায়ালা খাঁটি মুমিন মুসলমানের সাতটি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে দ্বিতীয় গুণ হচ্ছে, যারা মুমিন তারা অনর্থক কথাবার্তায় নির্লিপ্ত। আয়াতে ‘লাগউন’ শব্দের অর্থ অনর্থক কথা অথবা কাজ, যাতে ধর্মীয় কোনো ফায়দা নেই। এর অর্থ উচ্চস্তরের গুনাহ যাতে ধর্মীয় ফায়দা তো নেই, বরং ক্ষতি বিদ্যমান। এ থেকে বিরত থাকা, বেঁচে থাকা ওয়াজিব। প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, মানুষ যখন অনর্থক বিষয়াদি ত্যাগ করে তখন তার ইসলাম সৌন্দর্যম-িত হতে পারে। এ কারণেই আয়াতে একে কামেল মুমিনের বিশেষ গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘যখন দুই ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে। ওই সময়ে সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।’ (সূরা কাফ : ১৭-১৮)
অর্থাৎ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই পরিদর্শক ফেরেশতা রেকর্ড করে নেয়। হজরত হাসান বসরি ও হজরত কাতাদাহ (রহ:) বলেন, এই ফেরেশতা মানুষের প্রতিটি বাক্য রেকর্ড করে। তাতে কোনো গুনাহ অথবা নেকি থাকুক বা না থাকুক। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘কেবল সেসব বাক্য লিখিত হয়, যেগুলো সাওয়াব বা শাস্তিযোগ্য। অবশ্যই তোমাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। আমল লেখক সম্মানিত ফেরেশতাগণ।’ (সূরা ইনফিতর : ১০-১১)। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালকে বিশ্বাস করে, তার উচিত সে যেন প্রতিবেশী ও মেহমানকে সম্মান করে এবং উত্তম কথা বলে, না হয় চুপ থাকে।’ (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ)।
ভালো কথা বলা, কম কথা বলা ও নীরব থাকাই হচ্ছে আল্লাহপ্রেমিকদের স্বভাব। হজরত আনাস ইবনে মালেক রা: থেকে বর্ণিত। নিজ জবানকে হেফাজত করতে পারলে মানুষের চিরশক্র শয়তানকে পরাভূত করা সহজ হয়ে যায়। হজরত আবু সাইদ খুদরি রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-এর নিকট এসে আরজ করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.) আমাকে কিছু উপদেশ দিন। প্রিয়নবী (সা.) বললেন, ‘তাকওয়া অবলম্বন করবে। কারণ, তা সব কল্যাণের মূল। জিহাদে যাবে। কারণ, তা মুসলমানদের জন্য বৈরাগ্য। আল্লাহর জিকির করবে এবং কুরআন তেলাওয়াত করবে। কারণ, তা পৃথিবীতে তোমার জন্য আলো আর আকাশে তোমার আলোচনার বিষয়। কল্যাণের বিষয় ছাড়া সবের্েত্র তোমার জবানকে হেফাজত করবে। তাহলে তুমি তা দ্বারা শয়তানকে পরাজিত করতে পারবে।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, চতুর্থ খ-)।
বর্তমান টেকনোলোজির এইযুগে সমাজ জীবন এখন অনেক পাল্টে গেছে। সোজা কথায় বলতে গেলে আমাদের জীবনের অস্তিত্ব ও উপস্থিতি রিয়েল লাইফ আর ভার্চুয়াল লাইফে বিভিক্ত হয়ে গেছে। দু' ধরনের সমাজে এখন আমাদের বসবাস। জবানের হেফাজতের ইসলামী নির্দেশনাগুলো আমাদের রিয়েল লাইফ বা বাস্তব জীবনে যতোটুকু প্রযোজ্য, ভার্চুয়াল লাইফ বা আন্তর্জালিক জীবনেও ঠিক ততোটুকুই প্রযোজ্য। কিন্তু এই জায়গার চিত্রটা বড়োই দুঃখজনক আর বেদনাময়। দুই জগতের আমি-আমরার মধ্যে দেখা যায় বিস্তর ব্যবধান।
ভর্চুয়াল লাইফের নমুনা হিসেবে এখানে ফেসবুকের কথাই বলি। এই একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের অনেকের জীবনের বাঁকে এনেছে নানান ধরনের পরিবর্তন। এই জগতটির একটি বড়ো সুবিধা হলো এখানে মন্তব্য প্রকাশে মানুষ থাকে পুরোপুরি স্বাধীন। যাকে যা ইচ্ছা বলা যায়। কেউ যেহেতু কারও সামনে থাকে না তাই চক্ষুলজ্জা বলতে যে একটা জিনিস কাজ করে রিয়েল লাইফে, এখানে এসে তা অনেকের ক্ষেত্রেই হাওয়া হয়ে যায়। আবার সামনাসামনি থাকলে মুখে লাগাম রেখে কথা বলার একটা বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু ফেসবুকে সেটার বালাই থাকে না। ফলে সামনাসামনি হলে যার সামনে কথা বলতেই সাহস হতো না, এখানে তাকে মনের মাধুরি মিশিয়ে যাচ্ছেতাই বলে দিতে পারছে মানুষ। এসব কারণে দেখা যাচ্ছে বাস্তব জীবনে যে লোকটি কখনও কটু বাক্য ব্যবহার করেন না এখানে এসে তিনিও বেপরোয়া হয়ে উঠেন অনেকসময়।
গীবত-কুৎসা-বদনামী-তাচ্ছিল্য ইত্যাকার নানা মন্দাচার থেকে অনেকেই বাস্তব জীবনে সতর্ক ও সচেতন থাকলেও ভার্চুয়াল জীবনে এসবকে থোড়াই কেয়ার করে। ভাবখানা থাকে এমন যে, ইসলামের সীমানা বাস্তব জীবন পর্যন্তই। এর থেকে আগ বেড়ে ফেসবুকের মতো ভার্চুয়াল জায়গায় ইসলামের নির্দেশনাগুলো অকার্যকর ও মূল্যহীন। এই ধরনের মানসিকতা থেকেই ট্রলবাজি আর পারস্পরিক কামড়া-কামড়ির উৎপত্তি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT