উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : মূল্যবোধের অবক্ষয়

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৯-২০১৯ ইং ০০:০৩:৪২ | সংবাদটি ১১৬ বার পঠিত

ভালোবাসার কথা এখনও আমরা শুনি, তবে খুব কম। চারিদিকে মাংসল ক্রোধ। খবরের পাতায় আগুন, রক্তের ছড়াছড়ি। মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশের সূক্ষ্ম পেশিগুলো প্রতিদিন আঘাতে আঘাতে জরাজীর্ণ। রাজনীতির নগ্ন ছোবলে অতিষ্ঠ ছাপোষা মানুষ। স্বাধীনতার ৪৯ বছরের দোরগোড়ায় আমরা এলাম। এখনও আমরা পারিনি সুখী, স্বনির্ভর হতে। জাতের নামে বজ্জাতি আজও র্নিমূল হয়নি। টিভি চ্যানেলগুলো কেড়ে নিয়েছে মানুষের বইপাঠের অভ্যাস। তবুও এক বুক আশা নিয়ে আমরা বাঁচতে চাই এই প্রীতি হন্তারক যুগেও।
মূল স্রোত আজ পঙ্কিল। ক্ষুুধিতের হাহাকার, না-পাওয়ার বেদনার সাথে এসে মিলেছে হিংসা ও অন্যায় অবিচারের লাঞ্ছনা ও যন্ত্রণা। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, হঠকারিতা ও পেশি শক্তির উন্মাদ আস্ফালন। মডেলিং এর নামে নারী মাংসের নগ্ন প্রদর্শন। নাইট ক্লাব, বার সংস্কৃতির দ্রুত সম্প্রসারণ জাতিভেদ, মূল্যবোধের সংকোচন। রাজনীতির পঙ্কিল আবর্তে মেরুদন্ডহীন হয়ে বেঁচে থাকার অভ্যাস। এর মধ্যেই আবার সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা। হ্যাঁ, এই মালিকানায় আমরা অন্যায় পথে অর্জিত কালো টাকাকে নিজের বলে জানি। আমরা যেহেতু ‘অন্যের কথা’ ভাবি না তাই আমরা অন্যকে রক্ষা করি না, অন্যের উন্নতির জন্য সচেষ্ট হই না। যেহেতু পুত্র-কন্যা আমার আপন, তাই তাদের প্রতি আমরা যতœবান হই। অর্থ-মান-যশ-প্রতিপত্তির দিকে তাদের এগিয়ে দেবার প্রয়াস পাই।
এই আপন-পর ভেদের সঙ্গে ‘সম্পদ’ শব্দটাকে বুঝে নিতে হয়। সম্পদ আর সম্পত্তি শব্দ দুটোকে আমি গুলিয়ে ফেলতে চাই না বা একাসনেও বসাতে চাই না। ‘বাপের সম্পত্তি’ যখন বলি তখন আমার সহোদর ভাই সেই সম্পদের মধ্যে কি পড়ে না, ‘কাঞ্চনমূল্যে বিচার্য বাপের সম্পত্তিতেই আমার আকাক্সক্ষা। কীভবে সেই সম্পত্তি একদিন ব্যক্তিগত হবে সে-বিষয়েও সিংহভাগ মানুষের তৎপরতা নিয়ে আমাদের অতীত-বর্তমান এবং মনে হয় ভবিষ্যৎও।
ভুলি কী করে, সম্পত্তিতেই আছে কলহের বীজ। যেখানে সম্পত্তি সেখানেই ভয়, সম্পত্তি হারাবার ভয়। সে সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে লোভ।। আমরা শুধু সম্পত্তি আঁকড়ে ধরেই থাকি না, লোভে অন্যের সম্পত্তি কেড়ে নিতে চাই। এই ভাবে কলহ ও চক্রান্তের শুরু, তারপরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। আজ এই যুদ্ধেই আমরা ক্লান্ত। আমরা এখন সম্পত্তি রক্ষায় যতœবান, নিষ্ঠাবান হয়েও হিংসাদীর্ণ, দ্বন্দ্ব-কলহে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। এই সমস্যা এখন আমাদের সমাজে এমন ভাবে বেড়ে চলেছে যাতে আমরা ক্রমশই এগিয়ে চলেছি সামগ্রিক বিনাসের দিকে।
এর কি কোনো সমাধান নেই? অবশ্যই আছে। সে সমাধানের গোড়ার কথা হল ব্যক্তি শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা। ব্যক্তিকে এ শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা থাকবে যে সম্পত্তি ব্যবহার করতে হবে সমাজের কল্যাণের জন্য। অতিথি সেবা এমন গৃহস্থের ধর্ম, সমাজসেবাও তেমনি সম্পত্তিবানের কর্তব্য। সম্পত্তিবান তো আর আকাশ ফুড়ে সম্পত্তির অধিকারী হননি, তাকে ‘সম্পত্তি’ দিয়েছে এই সমাজ। তাকে ভূললে চলবে না, সম্পত্তির অধিকার তিনি পেয়েছেন এই সমাজের কাছ থেকে। সম্পত্তির পরিচালক তিনি। কিন্তু সীমা অতিক্রমকারী পরিচালক নন। সীমা বলতে আমি নৈতিক অধিকারের সীমা বুঝাতে চাইছি। ধর্মের ভাষাতেও কিন্তু সর্বজনের হিতের কথাটি স্বীকৃত। অনেকে আবার বিপ্লবের পথটাকেই উপযুক্ত মনে করেন-কখনো রাজনৈতিক বিপ্লব, কখনও সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
তাহলে কি ঘুরে-ফিরে সেই মূল্যবোধের কথাই এসে যায়? সব কিছুরই যদি নিয়তি থাকে-প্রেম, ভালোবাসা, রাগ-অনুরাগ, স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যৎ সব কিছুই, তাহলে অবশ্যই মূল্যবোধের নিয়তি আছে। না, নিয়তি এক্ষেত্রে মৃত্যু নয়। পাপবোধ যখন মিলোয় না, আনন্দবোধ যখন হারিয়ে যাবে কোন মহাশূন্যে? মূল্যবোধ হারায় না, শুধু অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে যায়। মূল্যবোধ তো শুধু গ্রহণ ও লালনের বিষয় নয়, তা প্রদান, প্রসার ও বর্জনেরও বন্তু। এই মূল্যবোধের কারণেই সমষ্টির কল্যাণের জন্য কতবার যে যুবসমাজ ব্যক্তি ও পরিবারের সুখ বিসর্জন দিয়েছে ইতিহাস তার সাক্ষী হয়ে আছে।
মনন জগতের সঙ্গে মূল্যবোধের চলা। তাই ভাঙাগড়ার মধ্যে মূল্যবোধ তার আশ্রয় খুঁজে নেয়, আমরা দেখি বা না-দেখি। মূল্যবোধের আশ্রয়ের সঠিক ঠিকানা কি সব সময় আমাদের জানা থাকে? প্রজন্ম-বিচ্ছেদ তো এই মূল্যবোধের আশ্রয়স্থলগুলোর প্রকৃত সন্ধান যদি যুবসমাজ করতেন তাহলে মনীষীদের ছবিগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিত না। মূল্যবোধের মৃত্যু নেই বলেই শুরু হয়েছে নব মূল্যায়ন-শুধু এদেশে নয়, সমগ্র বিশ্বে। তাই এখন সমকালীনদের দেখি সাফল্যের ঘামঝরা দৌড়, স্বেদাক্ত কলেবরে ওরা ছুটছে স্কুলে-কলেজে। ওদেরও (ধর্মীয় গ্রন্থ) আছে-চাকরি আর কম্পিউটার; ওদের লাইব্রেরি এখন ইন্টারনেট।
বোধ তাহলে মাথার ভেতরে আজও কাজ করে। বোধ আছে বলেই মানবজীবনে এত সমস্যা। মনুষ্যের মনের তলায় যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত যে হিংসা, লোভ, ক্রোধ সেগুলোকে কোন যাদুমন্ত্রে পরিবর্তন করা যায়? পরিবর্তন তো অবশ্যই কাম্য।
শিক্ষা-সংস্কৃতি-সংগঠন সব কিছুরই পরিবর্তন চাই। সিস্টেমের বদল চাই। কিন্তু পরিবর্তন তো হঠাৎ ঘটবে না। আত্মজ্ঞান তো সহসা আসবে না। সেজন্যেই চাই ধৈর্য, নিস্ক্রিয়তা নয় কখনোই। যে চেতনার কথা আমরা বলি তার নানা স্তর আছে। আমাদের বোধ কাজ করে চেতনার সাথে। এই চেতনা যদিও সমকালের গন্ডিতে আবদ্ধ তথাপি তার মধ্যে রয়েছে এমন এক সমগ্রতা যা গঠিত হয়েছে একদিনে নয়, এক যুগে নয়, এক শতাব্দীতেও নয়। আমাদের চেতনার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো। তাই বোধের দ্বারা মানব মনের ওপরের অংশ পরিবর্তন ঘটে, নিচের তলায় আলো পৌঁছাতে সময় লাগে। এখানে আলোর গতি ধীর হলেও আমাদের একমাত্র ভরসা এই বোধিদ্বীপ, এই সদর্থক চেতনা। ব্যক্তি, সমাজ ও সংস্কৃতির উত্তরণ এই আলোর দ্বারাই সম্ভব। বিশ্বমানবের সাথে মৈত্রী স্থাপন এই আলোর দ্বারাই সম্ভব। সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যেও এই আলোর বড় প্রয়োজন।
এই আলো আনে শান্তি-যার সাথে জড়িয়ে আছে সাম্যমুখী সংস্কৃতি, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি, গ্রাম ও নগরের সাথে গঠনমূলক সমন্বয়, আরো কত কী! এই আলোই পূর্ণ সত্যের পথে নিয়ে যায়। পরস্পর বিরোধী অসত্য থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে রাখে।
মানবের বোধ-চেতনা অবশ্যই তার বুদ্ধিকে বাদ দিয়ে নয়। এসব কিছু মিলেই মানুষ বেগবান। তার মধ্যে যে নিগূঢ় শক্তি তা শুধু সৃজনধর্মী নয়, বৈচিত্র্যমুখী ও ঐক্যসন্ধানী। অথচ ভাবতে কষ্ট হয়, এই মানুষই ক্ষমতার আকর্ষণে দুর্নীতির দুর্ভেদ্য অরণ্যে আত্মঘাতী বিচরণ করেছে, অপধর্মের উত্তেজনায় অসহিষ্ণু হয়েছে, বিচিত্র ছলনাজাল বিস্তার করে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। তবুও এই মানুষই দিতে পেরেছে আলোকিত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। ভোগ ও ত্যাগ-দুটি পরস্পর বিরোধী কৃত্য। এ-নিয়ে আজ বিশ্বময় দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বে আজ আর গরিবের প্রতিপক্ষ শুধু ধনী নয়। এখন ধনীর সঙ্গে ধনীর বিবাদ, প্রতিষ্ঠিত ধনীর সঙ্গে উঠতি ধনীর সংঘাত। যে ভোগবাদ একদিন ছোটো এক অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে আবদ্ধ ছিল আজ সেটা সীমানা ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে কী হয়েছে? যারা ধনী তারাও অসুখী, ভোষোপকরণ যাদের সামান্য তারাও ভোগবাদের প্রভাবে অস্থির। এই কারণেই লোভের মাত্রা নিরন্তর বেড়েই চলেছে, হিংসার কুটিল জাল ক্রমবিস্তৃত হচ্ছে, দ্বন্দ্ব তীব্রতর হচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষমতা দানবীয়। এই ক্ষমতাবলে মানুষ প্রকৃতির উপর অনেক বেশি কর্তৃত্ব ফলাচ্ছে। আমি মনে করি না এটাই সুখ ও মুক্তির একমাত্র পথ। এতে তৃষ্ণা বাড়ে। কিন্তু পিপাসা নিবারণের সুশীতল বারি তো সবসময়, সর্বত্র সবার কাছে মজুত থাকে না। ভোগবাদের অকল্পনীয় প্রসারে তৃষিতের কাছে একদিন ভোগ্য সামগ্রীও হবে দূর অস্ত। কারণ চরম সত্য এই যে, ভোগবাদ আনে লোভ, হিংসা, ধ্বংসের অকল্পনীয় প্রসার। আমরা আজ সত্যিই বিপন্ন। আমাদের সভ্যতার আজ মহাসংকট। এর থেকে উত্তরণের জন্যে চাই বোধ, চাই চেতনা, চাই প্রজ্ঞা-যা যথাযথ অর্থেই মানবসমাজের রক্ষাকবচ।
বোধ, চেতনা, যুক্তি, প্রজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও মানবসমাজ আজ কেন বিপন্ন-এ প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক। কোনো কিছুর সাথে যোগ স্থাপনের ঝোঁক মানুষের স্বভাবজাত। এই যোগ তার জন্মভূমির সাথে, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনের সাথে, ভাষা-সংস্কৃতির সাথে, তার প্রাত্যহিক জীবনচর্যার সাথে। কিন্তু মানুষে মানুষে যে সংঘাত আর সূত্রপাত ভাব ও বিপরীত ভাবের কারণে। ভয়, লোভ, হিংসা, কুসংস্কার, অন্ধ, ক্রোধ-এসবই বিপরীত ভাব; যার দ্বারা যোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা পদে পদে বিঘিœত, বিপর্যস্ত হয়। এই বিপর্যয় সন্বন্ধে মানুষ ছাড়া আর কে ই বা মানুষকে সতর্ক করবে? মানুষের জন্য অনিবার্য পথ নেই, তাকে পথ বেছে নিতে হয়। সময়ের সীমানার মধ্যেই পদে পড়ে একাধিক বিকল্প সম্ভাবনা দেখা দেয়। এর ভিতরে কোনটা শ্রেয় সেটাই বড় প্রশ্ন। সেই পথই খুঁজে নেওয়া আবশ্যক যার সাথে উচ্চতর সত্যের যোগ আছে অথচ সাময়িক সমস্যাও উপেক্ষিত নয়।
এদেশে সামাজিক ও নৈতিক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু কোনো নাটকীয় পরিবর্তন শীঘ্র আশা করা যায় না। আমরা মনে রাখব, ঐক্যের বিকল্প-ব্যবস্থা বয়ে আনবে বিনাশ ও বিপত্তি। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে আমাদের ছোট বৃত্তের ভিতর এমন সমাজ ও সংস্কৃতি রচনার জন্য সচেষ্ট হই যেখানে শান্তি-স্বাধীনতা-ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে, সেবা ও সহানূভূতির মধ্য দিয়ে প্রকৃত প্রতিবেশীর জন্মলাভ ঘটবে ফলে সম্ভব হবে নতুন সমাজ বির্ণিমান।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট

 

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT