উপ সম্পাদকীয়

আসামে ১৯ লাখ মানুষ কি রাষ্ট্রহীন হবে?

ইনাম আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৯-২০১৯ ইং ০০:০৪:০৬ | সংবাদটি ১১২ বার পঠিত

বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারতের আসাম রাজ্যের চূড়ান্ত নাগরিক নিবন্ধন বা এনআরসি প্রকাশিত হয়েছে। এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন। এই বাদ পড়ার তালিকায় সংখ্যাধিক্য হচ্ছে হিন্দুদের, বিশেষ করে দলিত হিন্দুরা। এর মধ্যে বাংলাভাষী মুসলিমরা রয়েছেন, রয়েছেন অন্য রাজ্যের লোকেরাও। তবে এই তালিকায় সবচাইতে বেশি সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাংলাভাষী মুসলিমরা। তবে ভারত বলছে, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ওই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফরে এসে একই কথা শুনিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি শোনা গেছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হিসেবে গণ্য হবে। তাই আমরা আশা করি যে এই নাগরিক তালিকার বহির্ভূত বাংলাভাষী মুসলিমদের ভারত বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করার অপচেষ্টা করবে না।
খোদ ভারতেই এই এনআরসির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বইছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একে ‘অনর্থক ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ কর্মকা-’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্যই এই তালিকা করা হয়েছে। অনেক লেখক ও বুদ্ধিজীবীও এর সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। রোমিলা থাপার, অরুন্ধতী রায়, শশী থারুর, সমরেশ মজুমদার, তপোধীর ভট্টাচার্যসহ অনেকেই এর সমালোচনা করেছেন। অনেক রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করেছে। এমনকি বিজেপিও এই পদ্ধতির সমালোচনা করেছে।
অনেকেই বলছেন, এটা ‘পর্বতের মূষিক প্রসব’। বিশেষ করে বিজেপি নেতারা দাবি করছেন যে এই পর্যন্ত ৫০ লাখ কিংবা এক কোটি বা তার চেয়ে বেশি লোক বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছেন। সেই তুলনায় আসামের নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়া মুসলিমদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। আবার বিপরীত ভাবে বলা যায়, এটা ‘মূষিকের পর্বত প্রসব’। কেননা যারা বাদ পড়েছেন তাদের তো নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ভারতের নাগরিক করা যেত। এদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বাদ দেওয়া অন্যায়। এতে ভারতের যে অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি ছিল, তাকে ক্ষুণ্ন করা হলো।
আসামে যে কোটি কোটি অবৈধ অভিবাসী আছেন বলে দাবি করে আসা হচ্ছিল, তা মোটেই ঠিক নয়। তবে অনেকেই এখন এই সুযোগে অনেক উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করছেন। আসামের অর্থমন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, নাগরিক তালিকা থেকে যারা বাদ পড়েছেন তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এর আগে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও বলেছিলেন যে যাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে পাওয়া যাবে, তাদের বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে মারা হবে। আসামের কিছু নেতাও এ ব্যাপারে কিছু হিংসাত্মক মন্তব্য করেছেন। এনআরসিকে কেন্দ্র করে একটা ধর্মভিত্তিক বিভাজন তৈরি হচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়।
বাংলাদেশ মনে করে, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, ১৯৭১ এর মার্চ মাসের পর বাংলাদেশ থেকে কোনো অভিবাসী অন্যায়ভাবে ভারতে যাননি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করও ঢাকায় এসে বলেছেন, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এতে বাংলাদেশের কোনো শঙ্কা নেই। আমরা আশা করব ভারত এনআরসির বিষয়টিকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে।
যারা এনআরসি থেকে বাদ পড়ছেন তাদের এখনই বিদেশি বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে না। তাদের আইনগত ব্যবস্থায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তারা প্রথমে ট্রাইব্যুনাল, পরে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারবেন। তবে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। যারা এনআরসি থেকে বাদ পড়েছেন, তারা অত্যন্ত দরিদ্র। তাদের পক্ষে এই আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়তো বা সম্ভব হবে না। আর যে ‘ডকুমেন্টস’ দেখানোর কথা বলা হচ্ছে তা তাদের পক্ষে দেখানো কঠিন। কেননা, এই ধরনের ‘ডকুমেন্টস’ রাখার সংস্কৃতি এই অঞ্চলে বেশি একটা চালু নেই। তাই সবাই যে প্রমাণ হাজির করতে পারবেন, তা মনে হয় না।
নাগরিক নিবন্ধন থেকে একজন বিধায়কও বাদ পড়েছেন। এই বিধায়কের নাম অনন্ত কুমার মালো, যিনি অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা এআইইউডিএফের নেতা। এর প্রধান নেতা বদরুদ্দিন কামরান। এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ভারতের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যরা। বাদ পড়েছেন কারগিল যুদ্ধে অবদানের জন্য রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাও। মনে হচ্ছে, এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এখন দেখবার বিষয়, কঠোর আইনি প্রক্রিয়া অবলম্বন করার পরেও তারা নাগরিকত্ব ফেরত পান কি না। বলা হচ্ছে, এদের প্রমাণ করতে হবে তারা ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের আগ থেকে ভারতের বাসিন্দা। এই প্রমাণ করাটা অনেকের পক্ষে সম্ভবপর হবে না। অমুসলিমদের জন্য অবশ্য আলাদা ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আসামের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত লাল বিশ্বশর্মা বলেছেন যে তাদের জন্য প্রয়োজনে ভারতের নাগরিকত্ব আইন পরিবর্তন করা হবে। যারা অমুসলিম, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বিজেপি আগেই বলেছিল যে যেসব হিন্দু বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে শরণার্থী হিসেবে ভারতে প্রবেশ করবে, তাদের নির্যাতিত বিবেচনায় ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। সুতরাং, অমুসলিমদের নাগরিকত্ব আইন সংশোধিত হয়ে নাগরিক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সমস্যা হবে আসামের বাংলাভাষী মুসলিমদের। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, তারা আসামের আদি বাসিন্দা।
আসামের করিমগঞ্জ সিলেটের অংশ ছিল। ১৯৪৭ সালে করিমগঞ্জ মহকুমাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। এটি মূলত মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন বাংলাদেশে রয়েছেন। তাই দেখা যায় যে, বাংলাদেশে বা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে অনেকেই আসাম থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। আমাদের জানা মতে, বাংলাদেশ থেকে ভারতের আসামে গেছেন এমন নজির তেমন একটা নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সেটা প্রকাশ্যে বলেছেন। সুতরাং, আমরা আশা করব ভারতে যারা ক্ষমতাসীন রয়েছেন তারা যেন দায়িত্বশীল মন্তব্য করেন। যারা নাগরিক নিবন্ধনের চূড়ান্ত পর্যায় থেকে বাদ পড়েছেন, তাদের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে সেটা যেন তারা পরিষ্কারভাবে বলেন। কেউ যাতে রাষ্ট্রহীন না হয়ে পড়েন সে জন্য জাতিসংঘও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যেখানে একজনকেও নাগরিকত্বহীন করা অন্যায়ের বিষয়, সেখানে এত অধিকসংখ্যক লোককে রাষ্ট্রহীন করা অন্যায় হবে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশন ইউএনএইচসিআরের কমিশনার ফিলিপে গ্রান্ডি ভারতকে আহ্বান জানিয়েছেন যে কাউকে যেন নাগরিকত্বহীন না করা হয়।
ধর্মভিত্তিক এই বিভাজন পরবর্তীকালের জন্য অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়াবে। কাশ্মীর সমস্যার পর আবার একটি ধর্মভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া কখনোই কাম্য নয়। মার্কিন কংগ্রেসম্যান এন্ডি নেভিন বলেছেন, ভারত তার ধর্মনিরপেক্ষ মর্যাদা ক্রমেই হারাচ্ছে। প্রকৃত অর্থে, তার এই প্রতিক্রিয়া ভয়ংকর রূপ নেবে যদি এই ধরনের ধর্মভিত্তিক বিভাজনের মাধ্যমে বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়। তাদের যদি কোনো ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়, তবে তারা মানবেতর জীবনযাপন করবে। তাদের যদি কোনো ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হয়, সেটা হবে সাময়িক। এই পারমিটে তারা বেশিদিন জীবিকা চালাতে পারবেন না। তারা ভারতে থাকবেন, অথচ সেখানকার নাগরিক নন। এটা তাদের জন্য যেমন মর্যাদাহানির বিষয়, তেমনি তাদের অস্তিত্বও সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। এই মর্যাদাহানির গ্লানি সইতে না পেরে আসামে ইতিমধ্যে একজন মুসলিম মহিলা আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছেন।
আশঙ্কার কথা হচ্ছে, অনেকগুলো ডিটেনশন ক্যাম্প বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী স্থানে করা হচ্ছে। আমাদের অনুরোধ থাকবে, এই ক্যাম্পগুলো যেন বাংলাদেশের নিকটবর্তী স্থানে না করা হয়। এতে বাংলাদেশের সীমান্তে ‘পুশ ইন’ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দ্বিতীয়ত, তাদের যে সীমিত অধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার মাধ্যমে একটা বিব্রতকর ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্ম হবে। কেননা এতে তাদের জীবিকা অনিশ্চিত হবে। তাদের উত্তরাধিকারীদের ভবিষ্যৎও অনিরাপদ হবে।
বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সহকর্মীদের অভিপ্রায়Ñএকটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থান বর্তমান সরকারের রয়েছে। কিন্তু পাশের রাষ্ট্রে যদি এরূপ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প তৈরি হয়, তবে তার প্রতিক্রিয়া এখানে পড়তে বাধ্য। ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে এই বিষ ছড়িয়ে পড়বে। এই ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমরা আশা করব, ভারত এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করবে। তারা কাকে নাগরিক করবে আর কাদের করবে ন এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এখানে আমাদের কাছ থেকে তালিম নেওয়ার প্রয়োজন তাদের নেই। তবে আমরা চাইব, কেউ যাতে রাষ্ট্রহীন না হয়ে পড়ে। আর কাউকে যেন রাষ্ট্রহীন করে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া না হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বিজেপির কিছু নেতা উসকানিমূলক বক্তব্য রাখছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি দিলীপ কুমার ঘোষ বলেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গেও এরূপ বাংলাদেশের অভিবাসীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের একটি সুসম্পর্ক বিরাজমান। দুদেশের নেতাদের মধ্যে চমৎকার সমীকরণ রয়েছে। তাই আমরা আশা করব, এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য ভারতের দায়িত্বশীল কেউ না দেন। কেননা এতে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়বে। খবর পাওয়া যাচ্ছে, ভারতের এহেন কর্মকান্ডে সাম্প্রদায়িক মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্মীয় বিভাজন তৈরি হচ্ছে। আমরা চাই এমন বিভাজনকে দমিয়ে রাখতে। কিন্তু ভারতে যদি এমন নীতি গৃহীত হতে থাকে, তাহলে সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পাবে। তাই আমাদের সতর্ক থাকার বিকল্প নেই। ভারতকেও স্পষ্টভাবে আমাদের অবস্থান জানিয়ে দিতে হবে।
লেখক : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT