পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪০:৫০ | সংবাদটি ১৮৯ বার পঠিত

অথৈ পানির অঞ্চল সুনামগঞ্জের লজিং থেকে ফিরে আসলেও, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হাওর-বাওর, নদী-নালা, খাল-বিল ও পাহাড়-টিলায় সুশোভিত আমাদের সুনামগঞ্জ জেলার অফুরন্ত পানি সম্পদের ভান্ডার দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। সূর্যালোকে জাজ্বল্যমান রূপালী পানির হাওর-বাওর, খাল-বিল নদী-নালায় সজ্জিত উর্বর পলিমাটি দ্বারা গঠিত বিস্তীর্ণ সবুজ শ্যামল সোনালী ধানের বিরাট প্রান্তর এবং মৎস্য ভান্ডারে পরিপূর্ণ জলাশয়, পলি মাটিতে গঠিত উর্বর বৈচিত্র্যময় ভূমি, ষড়ঋতুর চাকচিক্য, নির্মল সৌন্দর্যমন্ডিত হিজল করচ বৃক্ষের সবুজ বেষ্টনীতে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাকে বিমোহিত করেছিল। কেননা অথৈ জলরাশির মধ্যেও অত্রাঞ্চলের মানুষের জন্য সৃষ্ট এই মনমুগ্ধকর পরিবেশ আর প্রাকৃতিক সম্পদ অনায়াসে বয়ে আনতে পারে সার্বিক কল্যাণ ও সমৃদ্ধি। যা সুনামগঞ্জবাসীর জন্য গর্বের বিষয় ও ঐতিহ্য।
বিপুল সম্ভাবনা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ সাজে সেজে আছে বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব দিকে অবস্থিত আমাদের সুনামগঞ্জ জেলা। স্বাধীনতা উত্তর সত্তর দশকের দিকে রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ স্বল্পতার কারণে যা এতদিন মানুষের অজানা ছিল, এখন তা ক্রমান্বয়ে মানুষ জানতে পারছে। নান্দনিক সৌন্দর্য আর প্রাকৃতিক কারুকার্যে ভরপুর এই জেলাকে বিধাতা যেন নিজ হাতেই সাজিয়ে দিয়েছেন। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাদদেশে অবস্থিত বিশাল রূপালী জলরাশিতে ভরপুর টাংগুয়ার হাওর, বারেক টিলা, যাদুকাটা নদী, লাউর রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ, সীমান্ত ঘেষা সীমান্তহাট, দোয়ারাবাজারের টেংলা টিলা গ্যাস ফিল্ড, বাঁশতলার ঝুমগাঁও ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত শরণার্থী ক্যাম্প, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ, তাহিরপুর অংশে টাঙ্গুয়ার হাওরের মনমাতানো সবুজ পরিবেশ, সীমান্ত ঘেষা পাহাড়ী মেঘ বৃষ্টির প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক পরিবেশ বিরাজিত বারিক টিলা, মরমী কবি হাছন রাজার বাড়ী, টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প, পাথর কোয়ারী ও নীলাদ্রি লেক। আদিবাসী পল্লীঘেষা মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা সুনামগঞ্জ সীমান্তের লালঘাট ঝর্ণাধারা, তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের সীমান্ত সড়কের নিকট স্বচ্ছ পানির লেক এবং আদিবাসী হাজং সম্প্রদায়ের পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে মনে হয় সত্যিই অপরূপ সুন্দরীরূপে সেজে আছে উত্তরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জ।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও হাওর-বাওর, পাহাড়-টিলা বেষ্টিত সমৃদ্ধ দেশ। দেশটিতে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় সাত শতকেরও অধিক নদ-নদী রয়েছে। মাকড়সার জালের মত বুনন শৈলী দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলো দেশকে ঘিরে রেখেছে বলেই বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়ে থাকে। সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় সর্বত্র এবং হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের অধিকাংশ উপজেলার নি¤œাঞ্চল হাওর-বাওর ও নদী-খাল-বিল দ্বারা বেষ্টিত ও মিঠা পানি এবং মৎস সম্পদে সমৃদ্ধ। ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলায় বিস্তৃত জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ মিঠা পানির এই হাওর হিজল-করচ গাছে সুশোভিত ও নানা প্রজাতির পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত টাঙ্গুয়ার হাওর, নলুয়ার হাওর, শনির হাওর, সাংগাইর হাওর ইত্যাদি। দেশের উল্লেখযোগ্য হাওরগুলোর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলাতেই রয়েছে সর্বাধিক এবং জলমহালের সংখ্যা মোট ৫১টি যার আয়তন প্রায় ৬,৯১২ একর। স্বাধীনতা উত্তর এইসব এলাকাগুলো সারা বছরই জলমগ্ন থাকতো আর গাছ বৃক্ষ লতাপাতায় সুশোভিত ও পশু পাখির কলরবে মুখর হয়ে উঠতো, ফলে এতদাঞ্চলের মানুষগুলো প্রকৃতি সুলভ সহজ সরল ও উদার প্রকৃতি স্বভাবে গড়ে উঠতো। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এই প্রভাব তাদেরকে সর্বদা আনন্দিত উৎফুল্ল থাকতেই দেখা যেতো। তখনকার সময় মাছ, পাথর ও ধান সুনামগঞ্জের প্রাণ কথাটি ছিল সর্বজন বিদিত। প্রচলিত কথা থেকেই বুঝা যায় তখনকার সময় সুনামগঞ্জের মানুষ ছিল পারিবারিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ, সুখী ও সমৃদ্ধ। ফলে তারা গান বাজনা ও আনন্দে থাকতো সদা উৎফুল্ল আর সে কারণেই অত্রাঞ্চলে শ্রেষ্ঠ কয়েকজন মরমী কবি, গায়ক ও বাউল স¤্রাটের জন্ম হয়েছিল। তাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মরমী গানের স¤্রাট ছিলেন হাছন রাজা, শাহ আব্দুল করিম, দুর্বিনশাহ, রাধারমন দত্ত, গিয়াস উদ্দিন আহমদ প্রমুখ। তাদের কবিতা, ছড়া ও গানের সুরে বিমোহিত থাকতো প্রকৃতির সেই সৌন্দর্যে উৎফুল্ল অত্রাঞ্চলের জলমগ্ন মন মানসিকতা সম্পন্ন স্বনির্ভর সুখী মানুষগুলো। আজও পলি দ্বারা ভরে ওঠা হাওরগুলোতে কান পাতলে তাঁদের গাওয়া উদাস করা বিমোহিত মিষ্টি সুর ও গানের কলি হাওরবাসীর কানে ভেসে আসে, যা বাংলার সাধারণ মানুষকে করে তুলে আবেগাপ্লুত। যা সুনামগঞ্জ জেলার মানুষের জন্য প্রকৃতির দেওয়া অকৃত্রিম অনন্য উপহার। প্রকৃতির দেওয়া এই পরিবেশ আর মৎস ও জলজ সম্পদ আগামীতে বয়ে আনতে পারে সুনামগঞ্জবাসীর জন্যতো বটেই দেশের জন্যও কল্যাণ, সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।
সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায় রয়েছে ঐতিহ্যবাহী রেলওয়ের রূপওয়ে এবং ছাতক সিমেন্ট কোম্পানীর চুনাপাথর পরিবহনের জন্য আরও একটি রূপওয়ে। তাছাড়া লাফার্জ সিমেন্ট কোম্পানীর চুনাপাথর পরিবহনের জন্য অত্যাধুনিক কনভেয়ার বেল্ট। প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ছাতকের নোয়ারাই ইউনিয়ন ও দোয়ারাবাজারের নরসিংপুর ইউনিয়নের উপর দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কুমরা এলাকার চুনাপাথর খনি থেকে চুনাপাথর আমদানী ও পরিবহনের জন্য এশিয়ার দীর্ঘতম কনভেয়ার বেল্ট স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত কনভেয়ার বেল্ট দ্বারা প্রতি ঘন্টায় ৮০০ মেট্রিক টন চুনাপাথর পরিবহন করা সম্ভব হয়ে থাকে। ভারতের সাথে প্রতি বৎসরে ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন চুনাপাথর আমদানি করার চুক্তি রয়েছে।
১৯৮৪ সালে দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ গঠিত হওয়ার পর থেকে বাংলাবাজার ইউনিয়নের বাঁশতলা এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব এক লীলাভূমি সর্বমহলে পরিচিতি পায়। গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত দেশের ঐতিহাসিক বাঁশতলা ও হকনগর পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে মোট ১১ (এগার)টি সেক্টরে বিভক্ত করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা হয়েছিল। উক্ত ১১টি সেক্টরের মধ্যে ১০টি সেক্টর ছিল ভারতের অভ্যন্তরে, কিন্তু আমাদের বাঁশতলায় স্থাপিত একটি মাত্র সেক্টরের ক্যাম্প ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যার নাম ঐতিহাসিক বাঁশতলা সেক্টর। আমার বাড়ি বাঁশতলা ওয়ার্ডের কুশিউরা গ্রামে হওয়ায় আমাদের বাড়িতেও সাবেক মন্ত্রী মরহুম মেজর জেনারেল শওকত আলী ও ক্যাপ্টেন হেলাল আহমদ সহ সেনাবাহিনীর এ কটি কোম্পানী অবস্থান করেছিল। ইতিমধ্যে বর্তমান সরকার কর্তৃক এই বাঁশতলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ নির্মাণসহ কয়েকটি দর্শনীয় স্থাপনা নির্মাণ করে এলাকাকে দর্শনীয় হিসাবে গড়ে তুলেছেন। ফলে বাঁশতলা এখন সকলের কাছেই পর্যটন এলাকা হিসাবে পরিচিত এবং রুচিশীল প্রকৃতি প্রেমিদের জন্য হৃদয় কাড়া এক পর্যটন কেন্দ্র। ভারতীয় সীমান্তের কোল ঘেষে পাহাড় টিলার উপরে যুমগাঁও এলাকায় গারো জাতির বসবাস, তাদের সাজানো গোছানো বাড়িঘর ও পরিবেশ অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর। গারো পাহাড়ের পাদদেশে ভারতের সীমান্ত ও কাটা তারের বেড়া ঘেষে চারদিকে রয়েছে সবুজ বেষ্টনীর সমারোহ। বিকাল বেলায় সবুজ বৃক্ষলতায় অবস্থানকারী পাখিদের কলকাকলি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের মনমাতানো ঝিঁঝিঁ শব্দে মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। দোয়ারাবাজারের অদূরে বাংলাবাজার ইউনিয়নের গ্রাম কুশিউরা। বাংলাবাজার থেকে কুশিউরা গ্রামের পাশেই মরাচেলা নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত পাকা রাস্তা পাড়ি দিয়ে সামান্য সম্মুখে অগ্রসর হলেই চোখে পড়ে আকাশের সাথে চির সখ্যতা স্থাপনকারী খাসিয়া জৈন্তা পাহাড় ও মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়। সেই গারো পাহাড় থেকে নেমে আসা মৌলা নদীর উপর নির্মিত হয়েছে স্লুইস গেইট। তিনদিক থেকে পাহাড় টিলা ঘেরা বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ ও পাহাড়ি ঝরণার ঝমঝম শব্দ ও পাক-পাখালির কলকাকলিতে সৃষ্ট প্রাকৃতিক মনোমুগ্ধকর অসাধারণ পরিবেশ, পর্যটকদের মন উদাস করে দিতে পারে। এহেন পর্যটন ঐতিহ্যের সাথে যদি বাঁশতলায় সীমান্তহাট বা শুল্ক স্টেশন স্থাপন করা হয়, তবে বাঁশতলায় মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য ও সুনাম আরও বৃদ্ধি পাবে। আমরা বাঁশতলা ও বাংলাবাজারবাসী এই শুল্ক স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে বাঁশতলাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশে রূপান্তর করার প্রত্যাশা করছি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT