পাঁচ মিশালী

মরমি শিল্পী আবদুল আলিম

জামান মাহবুব প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪১:২৩ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির চিৎপ্রকর্ষের ব্যঞ্জনাময় প্রকাশ। আর লোকসংগীত এরই ঐশ্বর্যময় ধারা। বাংলার হাটে, মাঠে, ফসলের খেতে শ্রমজীবী মানুষ কিংবা নদীতে উদাস মাঝির কন্ঠে যে সুর ধ্বনিত হয় তা-ই লোকসংগীত। মানব-সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই লোক-সংগীতের সৃষ্টি। লোকসংগীত পল্লির সাধারণ মানুষের মুখে মুখে বংশপরম্পরায় শত শত বছর ধরে টিকে আছে। লোকসংস্কৃতির প্রাণভূমি গ্রামবাংলা। বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা। আনন্দবেদনা রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠানই লোকসংস্কৃতিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, অনন্য মর্যাদা।
বাংলার লোকসংগীতে বাঙালি তার মনের রুদ্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছে। সারি জারি বাউল কীর্তন ভাটিয়ালি গম্ভীরায় বাঙালি নিজেকে দিয়েছে উজাড় করে। চিরায়ত এসব গান আজও মানুষকে ভাবায় আন্দোলিত করে। আবদুল আলিম ছিলেন মরমী ধারার অসম্ভব জনপ্রিয় শিল্পী। আরও অনেক দিন পর্যন্ত বাঙালি তাঁর সংগীতের রসসুধায় আপ্লুত হবে।
১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামে আবদুল আলিমের জন্ম। তালিবপুর স্কুলে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। বাল্যকাল থেকেই গান বাজনার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল। কিন্তু শিক্ষক রেখে গান শেখার আর্থিক সামর্থ না থাকায় তিনি অন্যের গাওয়া গান শোনা মাত্রই কন্ঠে তুলে নিতেন। গান গাইতেন পালা পার্বনে। অল্পদিনেই তাঁর সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল আশেপাশের গ্রামে। তখন কোলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন সৈয়দ বদরুদ্দোজা। আবদুল আলিমের গান শুনে তিনি মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিয়ে যান কোলকাতায়। সেখানে গিয়ে সৈয়দ গোলাম ওলির কাছে গানের তালিম নেওয়ার সুযোগ পেলেন আবদুল আলিম।
আবদুল আলিমের দরাজ কন্ঠের গানে অচিরেই বিমুগ্ধ হন কোলকাতার সংগীত পিপাসুরা। একসময় কোলকাতার আলীয়া মাদ্রাসার মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত এক সভায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক তাঁর গান শুনে ভুয়সী প্রশংসা করেন। শুধু তিনিই নন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও বিখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ তাঁর সুকন্ঠের গান শুনে তারিফ করতেন। আবদুল আলিম উভয়ের ¯েœহ লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন।
আগেকার দিনে কোলকাতার গ্রামোফোন কোম্পানী থেকে রেকর্ড বেরুনো চাট্টিখানি কথা ছিল না। আবদুল আলিমের মাত্র ১৪ বছর বয়সে গ্রামোফোন রেকর্ড বেরুল। সবাই তাজ্জব। কানাইলাল শীল ছিলেন বিখ্যাত দোতারা বাদক। আবদুল আলিমের প্রতিভার সন্ধান পেয়ে তিনি তাঁকে শিষ্যত্বে বরণ করে নেন। শুরু হলো আবদুল আলিমের নতুন অধ্যায়।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। আবদুল আলিমের মন ভারতে থাকতে চাইল না। তিনি ১৯৪৮ সালে চলে এলেন পূর্ব পাকিস্তানে। ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি ডাক পেলেন। মরমি লোকসংগীতের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে অচিরেই তিনি পূর্ব বাংলার রসিকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। ‘দুয়ারে আইসাছে পাল্কী’, ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইল্যা’ ‘বন্ধুর বাড়ি মধুপুর’, ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া’, প্রভৃতি মরমি লোকসংগীত গেয়ে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করলেন। তাঁর গানের অসংখ্য রেকর্ড বেরুল মেগাফোন, কলম্বিয়া, হিজ মাস্টার্স ভয়েস, গ্রামোফোন কোম্পানি অব পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে। ঢাকার প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ সহ প্রায় ৫০টি চলচ্চিত্রের নেপথ্য কন্ঠশিল্পী ছিলেন আবদুল আলিম।
আবদুল আলিম ঢাকার সংগীত মহাবিদ্যালয়ের লোকগীতি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। সংগীতে অসামান্য অবদান রাখার জন্য ১৯৭৭ সালে তাঁকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে ১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এই গুণী মরমি সংগীত শিল্পী পরলোকগমন করেন। আবদুল আলিম নেই, কিন্তু তাঁর কন্ঠসুধা যুগ যুগ ধরে বাঙালিকে রসসিক্ত করবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT