উপ সম্পাদকীয়

সহিষ্ণুতা ও শতফুল বিকশিত করার সংস্কৃতি

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৯-২০১৯ ইং ০০:৪২:৩০ | সংবাদটি ৮৯ বার পঠিত

সহিষ্ণুতা হল, গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি বা পিলার (Pillar) গুলোর অন্যতম। যে দেশে সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি যতো শক্তিশালী সে দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তিও ততো দৃঢ়। গণতান্ত্রিক অনুশীলনে সহিষ্ণুতা বলতে কি অর্থ প্রকাশ করে? সহিষ্ণুতার মুল বাণী বা কোর ম্যাসেজ হল, অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া, অন্যের মত যাতে নির্ভয়ে প্রকাশিত হয় সেরকম পরিবেশ তৈরী করা। সমালোচনাকে অসীম ধৈর্য ও মুল্য দিয়ে বিবেচনায় নিয়ে আসা। গণতান্ত্রিক অনুশীলনে মনে করা হয়, সকলের মতামতের মধ্যেই কিছু না কিছু গঠনমূলক বক্তব্য থাকে, প্রতিটি নাগরিকই অনন্য, তাই তাদের মতামত ও অনন্য সৌন্দর্যে ভরপুর। যেহেতু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সকলের মতামতের ভিত্তিতে সরকার পরিচালিত হয়ে থাকে তাই সকলের সম্মিলিত মত জানা ও প্রাসঙ্গিক, গঠন মুলক মতকে গ্রহণ করার মাধ্যমে জন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা সহজ হয় এবং তাঁর মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে গণতন্ত্রের উৎকর্ষ সাধনের কাজ সহজতর ভাবে সুসম্পন্ন করা যায়।
গণতন্ত্রের মর্মবাণী স্ফটিকস্বচ্ছ্ব ভাবে প্রকাশ করে, সকলের বোধগম্য ভাষায়, সহিষ্ণুতার সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যাটি মনে হয় দিতে পেরেছেন, মহৎ ও কালজয়ী দার্শনিক কার্লাইল। সহিষ্ণুতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে কার্লাইলের বহুল আলোচিত ব্যাখ্যাটি হল, “আমি তোমার মতামতের সাথে ভিন্নমত পোষণ করতে পারি কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা যাতে অক্ষুন্ন থাকে সে জন্য সর্বাধিক ত্যাগ প্রকাশে আমি প্রস্তুত। “অধিকাংশ রাজনীতি বিজ্ঞানীদের ধারণা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ব্যপারে কার্লাইলের এই ব্যাখ্যাটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। সামাজিক অস্থিরতা, ধর্ষণ, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব এমন কি সৌজন্যমূলক সম্পর্কও বজায় না রাখা, এরকম সময়ে কার্লাইলের বাণী যে আমাদের কাছে কতোটুকু প্রাসঙ্গিক তা মনে হয় নাগরিক সমাজকে ব্যাখ্যা করে উপস্থাপন করার প্রয়োজন নেই।
সহিষ্ণুতা এবং পস্পরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করার সংস্কৃতি মুলত জাগ্রত হয় দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুশীলনের মাধ্যমে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে আগামী ২০২১ সালে। আমাদের এখন সাল তামামির মতো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও তাঁর অনুশীলনের বিষয়ে দুর্বলতাগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করে চিহ্নিত করার সময় এসেছে। যদিও একটা উল্লেখযোগ্য সময় বাংলাদেশ সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে তাঁর পরেও ঘোষিত ভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চর্চা ও নেহায়াত কম সময় করা হয়নি। গণতান্ত্রিক চর্চার গুনগত ত্রুটিকে আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে, গণতন্ত্রের পরিশুদ্ধ চর্চার অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃত গণতান্ত্রিক পদ্ধতির চর্চার অভাবে আমরা যদি প্রজাতন্ত্রের নাগরিকদের কাক্সিক্ষত উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে না পারি, তাহলে গণতন্ত্রের মুল বাণী অনুযায়ী সরকার পরিচালনাকারী, সরকারের বাইরে অবস্থানকারী সকল রাজনৈতিক দলকেই দায় বহন করার মত উদারতা দেখাতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকার এবং রাজনৈতিক দলসমূহই নয়, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং পেশাজীবীরা ও তাদের দায় এড়াতে পারেবেন না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতভিন্নতাকে শ্রদ্ধার সাথে দেখা হয়ে থাকে। কিন্তু সকল গণতান্ত্রিক দেশে কিছু কিছু জাতীয় মৌল নীতির ক্ষেত্রে সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমাদের দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে মৌলিক কিছু নীতির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐক্যমত লক্ষ্য করা যায় না। এই যে, ঐক্যমতের অভাব, পরস্পরের প্রতি অনাস্থা, এ গুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতার অনুপস্থিতির কারণেই ঘটে থাকে।
রাজনীতিতে সহিষ্ণুতার অভাবের বিভিন্নমুখী প্রভাব আমরা নানাভাবে অবলোকন করে থাকি, বিশেষ করে তা দৃশ্যমান হয়ে থাকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে। সহিষ্ণুতার অভাবে সমাজে পরস্পর বিরোধী নুতন নুতন দল ও উপদলের উত্থান ঘটে। এ সমস্ত দল ও উপদলগুলোর মধ্যে তৈরি হয় অনৈক্য ও বিরোধ এবং এর ফলে দল, উপদল ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী গুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এ’রকম দ্বন্দ্বের ফলে জাতীয় সংহতি বিপদগ্রস্থ হতে পারে। সামাজিক অস্থিরতার সুযোগে, জনশৃঙ্খলা ও বাধা গ্রস্থ হয়ে পড়ে। সহিষ্ণুতার অভাব, অনৈক্য, মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতার অভাবে সমাজে এক ধরনের নীরবতার সংস্কৃতি বা ‘কালচার অব সায়লেন্স’ও তৈরি হয়ে যেতে পারে। এর ফলে, জনমত প্রকাশের স্বতস্ফুরততা স্তিমিত হয়ে যাওয়াটাই খুব স্বাভাবিক। ‘কালচার অব সায়লেলেন্সে’র কারণে স্বাভাবিক ভাবে সরকার পরিচালনায় জনমতের প্রভাব ক্রমাগত কমে যেতে পারে।যখনই জনমত সরকারকে প্রভাবিত করেনা, তখনই গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় কিছটা হলে ও অশনিসংকেতের ছায়া পড়তে থাকে।
পরমত সহিষ্ণুতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অবাধে উৎসাহিত করে থাকে। গণতান্ত্রিক সমাজের মৌল নীতি হচ্ছে, “শত ফুল ফুটতে দেয়ার” স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা।শত ফুল বা ভিন্ন রকমের অসংখ্য মতামত দিয়েই নাগরিকরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী দেশ শাসনের সুযোগ পাবেন। সরকার পরিচালনায় জনমতের প্রভাব যত বেশি নিশ্চিত হবে, নাগরিকদের সন্তুষ্টি ও ততো বেশি বৃদ্ধি পাবে। জনমতের প্রতিফলনে সর্বাধিক লাভবান হয়ে থাকেন ক্ষমতাসীন সরকার। কারণ জনমতের ভিত্তিতে সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করে সরকারী নীতি ও পরিকল্পনাসমুহ বাস্তবায়নের ফলে নাগরিকদের মন জয় করা হল গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য সাধনে সরকারী দল সফল হলে পরবর্তীতে আবার ও স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনায় ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রবল হতে থাকে।
অগণতান্ত্রিক ও অসহিষ্ণু মনোভাব পোষণ করার কারণে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে বিপন্ন হয়ে অনেক দেশ ভঙ্গুর দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে , জাতিগত ভাবে এতে করে ব্যপক ভাবে মর্যাদাহানী ঘটে থাকে। একটি আত্মমর্যাদাশীল দেশের জন্য এরকম মর্যাদাহীনতা আত্মগ্লানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাপক সম্ভাবনার এই দেশে, শুধুমাত্র পরিশুদ্ধ গণতন্ত্রের চর্চার মাধ্যমে একটি মর্যাদাবান জাতি হিসাবে নিজেদেরকে এই “ ভূ-গ্রাম” বা গ্লোবাল ভিলেজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। অর্থনৈতিক ভাবে আমরা অনেকদূর এগিয়ে গেছি, আছে আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ত্যাগ ও সাহসের উদাহরণ তৈরি করে আমরা অর্জন করতে পেরেছি নিজেদের স্বতন্ত্র ভূখ- ও পতাকা। অগনিত প্রতিভাবান তরুন আছে আমাদের, যারা বিশ্ব পরিম-লে বারবার তাদের মেধার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন । সভ্য জাতি হিসাবে, নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার জন্য শুধু মাত্র প্রয়োজন সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশকে শক্তিশালি করা। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই এ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণের এ’ চাহিদা কি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অসম্ভব কোন প্রত্যাশা ?
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজ গবেষক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT