উপ সম্পাদকীয়

প্রাসঙ্গিক কথকতা

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৯-২০১৯ ইং ০০:১১:৪৮ | সংবাদটি ১১১ বার পঠিত

আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আজ বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য স্থান দখল করে নিয়েছে। আপন কৃতিত্বে, নিজস্ব পররাষ্ট্র নীতির সাফল্যে এই দেশটির একটি গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ব পরিমন্ডলে। সারাবিশ্ব যেখানে বাংলাদেশকে বেশ গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে সেখানে কিভাবে নিছক মানবিক একটি সমস্যা নিয়ে আমাদের দেশটিকে পোহাতে হচ্ছে কষ্টকর একটি দুঃখ জাগানীয়া প্রহর।
সমস্যাটি আর কিছুই নয় এটি আমাদের দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিয়ে। এরা দুঃখের দিনে আশ্রয়প্রার্থী হিসাবে এসেছিলো আপন প্রাণটি হাতে নিয়ে। আজ তারা আশ্রিত অবস্থান থেকে প্রায় জমিদারী অবস্থানে চলে এসেছে। তারা নিজস্ব সংগঠন গড়ে তুলেছে। আপন নামে বিভিন্ন পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন এর আইডি জাতীয় কাগজপত্র করে নিয়েছে। তাদের একজন নেতাও নির্বাচিত করে ফেলেছে, যে নেতাটি বেশ দৃঢ়কণ্ঠে আশ্রয়দাতা বাংলাদেশ সরকারকে নিজ অবস্থান এবং অভিমত জানিয়ে দিচ্ছেন। রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে আশ্রিত পরবাসী সেটা যেমন স্বীকার করেন তেমনি তাদের নিজ ভূমে যেতেও রাজী কিন্তু যখনই আপন ভূমে ফেরত যাওয়ার মতো অবস্থান সৃষ্টি করা হলো তারা সবাই বেঁকে বসলেন। তারা যাবেন না কারণটি রাজনৈতিক নয় যদিও তারা সেইমতই বলছেন। আসলে তারা যেতে অনিচ্ছুক এই রাজার হালতের জীবনের স্বাদটুকু ভুলতে পারছে না বলে। তারা খাবারদাবার পাচ্ছেন বিনামূল্যে এবং অপরিমেয় আয়োজনে। তাই তারা আমাদের ঘাড়েই চেপে বসতে চাইছেন। আমাদের সরকারটি মায়ানমার রাষ্ট্রটির ভ্রƒকুটী, ভারত এর নাখোশ মনোভাব আর চীনের তমসাচ্ছন্ন মুখাবয়ব সবকিছুকে হেলাভরে সরিয়ে দিয়ে মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিলো। সাথে সাথে বিশ্ব দরবারে আওয়াজ তুলেছিলো এ সকল রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থাবলী নিশ্চিত করতে। প্রথমে বিশ্ব মোড়লরা আমলই দিতে চায়নি বাংলাদেশ নামক ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটির চিৎকার চেচামেচীতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্ব আর সুদৃঢ় অবস্থান সেই সাথে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাধ্য করে বিশ্ববিবেককে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কথা বলতে, ব্যবস্থা নিতে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের গোচরে আনতে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার জাতিসংঘ মিশনের পর্যবেক্ষক দল এসে সরেজমিনে সবকিছু দেখে গেছেন। কর্তব্যকর্ম কি সে ব্যাপারেও তারা নিরীক্ষা প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন তারপরেই সকলের কান খাড়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে যাদেরকে নিয়ে এতো আয়োজন, এতো চিৎকার চেঁচামেচী তারা যেন বাংলাদেশে খুটি গেড়ে বসেছে। তারা বেশ বড়োসড়ো সংগঠন গড়ে তুলেছেন। সোচ্চার কণ্ঠে নিজ দেশে ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের নানা জায়গায় তারা ছড়িয়ে ছিটিয়েও পড়ছে। তারা নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এরা চোরাচালন সহ নানা ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্ম সহায়ক দ্রব্যাদির বাহক হিসাবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। যারা এই কয়দিন আগেও কান্নারত, বিলাপরত অবস্থায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে আহাজারী করছিলো আজ তারাই যেন লাভ করেছে এক আসুরীক শক্তি। তারা বাংলাদেশ সরকার এর নেয়া ব্যবস্থাবলী যেন আমলেই নিতে চায় না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মমতাময়ী চরিত্রের প্রকাশভঙ্গী আর রাষ্ট্রীয় নানা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাবলী রোহিঙ্গাদের জন্য যেন জীবনের নববার্তা বহন করে এনেছে। আরামে খাওয়া দাওয়া আর ঝোপ বুঝে কোপ মারার মতো নানা জাতীয় অবৈধ ব্যবসাপাতি তাদেরকে একেবারে স্বর্গাদপী গরীয়সী ভূমির অধিবাসি করে তুলেছে। মাতৃরূপেন ঃ সংহিতা এর প্রকাশ আমাদের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীর আচরণে প্রকাশ পেয়েছে। একটি পুরো দ্বীপ তাদের জন্য সাময়িক বাসস্থান হিসাবে সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এই সকল রোহিঙ্গাদের প্রতি চরম শত্রু ভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপন পররাষ্ট্রনীতি আর কূটনৈতিক কর্মযজ্ঞ দ্বারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহায়ক শক্তি হিসাবে দাড় করাতে পেরেছিলেন এবং এখন সেই শক্তিগুলি তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এই উদ্দেশ্য সাধনে। সেখানে কোন ধরনের নেতিবাচক কর্মকান্ড গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত নয় বলেই মনে হয়।
প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে আমাদের দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করতে চাই। এই ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। প্রাচীন কৃষি ব্যবস্থা বা চাষ পদ্ধতির সমান্তরাল হয়ে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি আপন স্থান করে নিয়েছে কৃষি জমি চাষাবাদ আর জাতীয় অর্থনীতি বিনির্মাণে। আশা করা যায় শীঘ্রই রোহিঙ্গাদের দখলে থাকা একটি পুরো দ্বীপও পাহাড়ী ভূমি মুক্ত হবে কারণ রোহিঙ্গারা আপন দেশে ফেরত যাবে। সেই সকল ভূমি ও দ্বীপটি পুরোপুরি আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে আশা করা যায়।
মৎস্য উৎপাদনে আমাদের দেশটি পিছিয়ে নেই। আজ এই ব্যাপারে কাউকে দুশ্চিন্তা করতে হয় না কারণ প্রয়োজনীয় মৎস্য দেশীয় খাত থেকেই আহরিত হচ্ছে। শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত কর্মহীনরা আপন আয়ত্বে থাকা জলাশয় বা পুকুরটিও মৎস্য চাষে কাজে লাগাচ্ছেন। এখন সরকারি সহায়তা তথা ব্যাপক ঋণ সুবিধা বিস্তৃত আকারে নিশ্চিত করতে পারলে মৎস্য উৎপাদন ক্ষেত্রটিতে আসতে পারে আরেকটি বিপ্লব। আভ্যন্তরীন চাহিদা মিটিয়ে টিনজাত মৎস্য ব্যাপক আকারে বিদেশের বাজারে স্থান করে নিতে সক্ষম হবে অচিরেই।
পশুসম্পদ এমন একটি খাত যেটি মানব সভ্যতার আদি অবস্থা থেকেই সম্ভাবনাপূর্ণ ও মূল্যবান সূত্র হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আজকাল জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক হিসাবে পশু সম্পদকে গণ্য করা হয়। একজন আদর্শ কৃষককে সরকারি প্রনোদনার মাধ্যমে পশু খামার বা নিছক আপন আঙ্গিনায় গড়ে তোলা গবাদী পশুর গোয়ালঘর ব্যবহারকে পর্যন্ত উৎসাহিত করতে হবে। যার কর্ম তার সাজে হিসাবে গ্রামের প্রান্তিক খামারীকে তার আপন ক্ষেত্রটিতে নিজের মেধা আর পরিশ্রম এর সমন্বয় ঘটাতে যতোটুকু সরকারী প্রণোদনার প্রয়োজন সেটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। সংবাদ পাঠ করলাম ব্রাজিল থেকে আমাদের সরকার মাংস জাতীয় দ্রব্যাদি আমদানি করতে যাচ্ছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, তদারকী ও মালিকানা নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন গো সম্পদ বিষয়ে। বিভিন্ন প্রজাতির গবাদি পশু বর্তমান বাংলাদেশে সহজলভ্য হয়ে উঠছে। কোনটি শুধুমাত্র মাংস উৎপাদনে আবার কোনটি দুগ্ধ উৎপাদনে অবশ্যই ফলপ্রদও উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া দিচ্ছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত বিদেশে গো মাংস রফতানীকারক দেশগুলির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। সঠিক জায়গায় সঠিক চাবিটি ঘোরাতে পারলে আমরাও সেটি হতে পারবো। শ্লোগানমুখর আর মিছিল নির্ভর রাজনীতির বদলে কর্মের রাজনীতির বয়ান আমাদের তরুণ সমাজকে বুঝিয়ে দিতে হবে সেটা। মনে রাখতে হবে গো সম্পদ কৃষকের আদিঅন্ত জীবনধারার অঙ্গস্বরূপ। অনেকেই মৌসুমী কৃষক সেজে বসেন। কোরবানী ঈদকে সামনে রেখে বেজায় উৎসাহী হয়ে উঠেন পশু সম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণে। কোন কারণে বাজার পড়ে গেলে গালে হাত দেয়া হতোদ্যম মৌসুমী কৃষককে সংবাদচিত্রে দেখতে পাওয়া যায়। এ জাতীয় উদ্যোগ কখনোই আকাংখিত নয়।
বাংলাদেশে ব্লাকবেঙ্গল ছাগল আর মেষ এর উৎপাদন সুবিধা, বিচরণ ক্ষেত্র এবং পালন এর ব্যবস্থা রয়েছে আশাপ্রদভাবে। এটির বিস্মৃতি ঘটানো প্রয়োজন দ্রুতলয়ে। দ্রুত সরকারী বা বেসরকারি খাতে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে ব্লাক বেঙ্গল ছাগল এর মাংস ও দুগ্ধের চাহিদা রয়েছে বিশ্বব্যাপি। ছাগদুগ্ধ দ্বারা নানা প্রকার স্বাস্থ্যকর উপাদান তৈরি করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপি। এটি যেকোন ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক কৃষক কিষানীরা লালন পালন করতে পারবে আপন আঙ্গীনায়। এইগুলি গৃহস্থের আঙ্গীনায় অবস্থান করেই নিজেদের উদরপূর্তি ঘটাতে পারে। অন্যদিকে ছাগল ও মেষের বংশ বৃদ্ধি হার দ্রুতলয়ে ঘটে থাকে আবার রোগবালাই বলতে বিশেষ গুরুতর কিছুই নাই। মেষের মাংস বিশ্বব্যাপী সমাদৃত তাই আমাদের কৃষক সমাজ সহ তরুণ প্রজন্ম সকলকেই এ ব্যাপারে অগ্রণী হতে হবে নিজ স্বার্থেই। বাংলাদেশের নদনদী পানি ধারন ক্ষমতা হারানোর ফলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সকল নদ-নদী খনন করে দুই পাড় ভরাট করে বনায়ন সৃষ্টি করলে আবহাওয়াগত উষ্ণতা কমবে, বন্যার আশংকা হ্রাস পাবে আর গাবাদী পশু, ছাগল ভেড়া জাতীয় পশু সম্পদের খাদ্য সংকটও দেখা দেবেনা নদী তীরবর্তী ঘাসের ফলনে। পুরুষস্য ভাগ্যম দেবা না জানতি।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT