সাহিত্য

নীল ভালবাসা

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৯-২০১৯ ইং ০০:১৩:৪৬ | সংবাদটি ৫৯ বার পঠিত

জেল হয়ে গেল হৃদয়ের। গম চুরির অপরাধে দুই বছরের সাজা হলো তার। অথচ সে চরি করেনি, সহযোগিতাও করেনি। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। জেল গেটে হৃদয়ের মায়ের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। হৃদয়ও তার চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। রাগে ক্ষোভে চোখ লাল হয়ে আছে। অথচ কিছুই করার নেই। জোরে একটা চিৎকার করেও বলতে পারছে না- ‘আমি চুরি করি নাই আমাকে জেল কেন দিলা?’
জেল গেটে অন্যান্য পুলিশের সাথে মন্তরাও ছিল। সুগঠিত সুন্দর চেহারা। আজানুলম্বিত কেশ। সুন্দর পরিপাটি। মায়াময় চাহনি। হৃদয় যখন জেলে ঢুকছে তখন হৃদয়ের মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। মন্তরা ততক্ষণে হৃদয়ের মায়ের পাশে দাঁড়াল। কাঁদবেন না মা আমি আছি। ও আমার ছোট ভাইয়ের মত। এখানে ওর কোন কষ্ট হবে না। আমি ওকে দেখে রাখব। আপনি আর কাঁদবেন না মা। চোখ ভারি হয়ে উঠল মন্তরার। ঠিক জলে ছল ছল আঁখি। হৃদয়ের মা জড়িয়ে ধরলেন মন্তরাকে। বিপদে কাছে পেলে অনেক দূরের মানুষও অতি আপন হয়ে যায়।
চোখ মুছতে মুছতে হৃদয়ের মা বিদায় নিলেন। এই ফাঁকে হৃদয়কে ওরা কোথায় নিয়ে গেল- বারবার ফিরে তাকিয়েও আর চোখে পড়ল না।
কথা রাখল মন্তরা। জেলে সে স্বেছাসেবিকা। অনেক বলে কয়ে সে এ কাজ নিয়েছে। দীর্ঘ বার বছর বিনা দোষে জেল খাটার পর মুক্তি মিলে মন্তরার। কিন্তু সে মুক্ত হতে চায়নি। কী অদ্ভুত! কারণ তার জীবনটাই অদ্ভু। এমন জীবন কারো কাম্য নয়। জেল থেকে কে না মুক্তি পেতে চায়? কিন্তু মন্তরা মুক্তি চাইল না। চাইল আজীবন জেল। তবে হ্যাঁ সেটা একটা ছেট্ট কাজের মধ্য দিয়ে তার জীবন অতিবাহিত করতে চাইল। আর অনেক ভেবে চিন্তে জজ সাহেব এই অর্ডারটি জারি করেছেন। অবশ্য জজ সাহেব কোন অবস্থাতেই রাজী হচ্ছিলেন না। কিন্তু ওর ঐকান্তিক ইচ্ছা ও কাকুতি মিনতি উপেক্ষা করতে পারলেন না জজ সাহেব। শেষ পর্যন্ত এসিস্যান্ট কোয়াটার মাস্টার পদে নিয়োগ দিয়ে মন্তরাকে জেলে রাখলেন।
হৃদয়ের খানাপিনার ব্যাপারে অত্যন্ত সহাজ অন্তরা। সব সময় খোঁজ খবর নেয়। কাজের ফাঁকে হৃদয়কে দেখে আসে। ওর প্রতি কেমন যেন মায়াময় ভঙ্গিতে তাকায় মন্তরা। হ্যাঁ ওর একটি ছোট ভাই ছিল। ঠিক হৃদয়ের বয়সী। দেশে ফেলে এসেছে। দেশে সবকিছুই ফেলে এসেছে। বাবা, মা, ভাই বোন আত্মীয়-স্বজন, জাত-ধর্ম জমিদারী সব ফেলে এসেছে সে প্রেমের টানে। নিজের প্রাণটা হাতে নিয়ে পালিয়ে ছিল মন্তরা সুরুজের সাথে।
সুরুজ বাঙালি। এক সুঠামদেহী বাঙালির যুবক। ওর গুণে ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে মন্তরা দেশ ছেড়েছিল। একজন ভারতীয় হিন্দু ব্রাহ্মণের মেয়ে হয়ে একটা মুসলিম ছেলের হাতধরা কত বড় বিপদজনক তা ভুক্তভোগী মাত্র অনুমেয়। তারপরও খোদাকে ধন্যবাদ যে ভালয় ভালয় দেশ ছাড়তে পেরেছিল। না হয় নির্ঘাত সুরুজের প্রাণ যেতো। আর তার কী হতো? জিন্দা লাশ হয়ে চিরকাল বেঁচে তাকতে হতো। মন্তরা ভেবেছিল যেহেতু দেশের গন্ডি পেরোতে পারছে নিশ্চয়ই সুখী হবে সে। কিন্তু বিধির লিখন না যায় খন্ডন। অবশেষে বেঁচে আছে মন্তরা তবে জিন্দা লাশ অপেক্ষা বেশি কিছু নয়।
সুরুজ মন্তরাকে নিয়ে উঠল নিজ বাস গৃহে কুমিল্লার ছোট্ট একটি গ্রাম ফুলপুর। গ্রামীণ জীবনই এখানে মুখ্য। যদিও শহর থেকে বেশি দূরে নয়। তথাপি কাক ডাকা ভোরে জেগে উঠা, গরু ট্রাক্টর ইত্যাদি নিয়ে মাঠে যাওয়া, ধানকাটা, ধান রোপন হাঁস-মুরগীর কোলাহল সহ বাংলার চিরাচরিত রূপই এখানে প্রধান। মন্তরা জমিদারী ছেড়ে পেল ছোট্ট একটি ঘর। স্বামী সেবার ব্রত নিয়ে সে এসেছে। স্বামীর সামান্য আয়ের মধ্যেই সে নিজেকে মানিয়ে নিল। রান্না বান্না, ঘর গেরস্থালি সবই সামাল দিতে লাগল মন্তরা। সে বাংলার গ্রামীণ জীবনের সাথে তাল মিলিয়ে একটি সুখের স্বর্গ রচনা করল।
এদিকে খুব ভোরে দরজায় কষাঘাত। চোখ খুলল মন্তরা। চারিদিকে পাখপাখালির কিচি মিচির। হাঁস-মুরগের কুটরিতে চলছে বেরিয়ে আসার আকুতি। আলু থালু মন্তরা কোন রকম শরীরটাকে টেনে তুলল। ঘুম যেন চোখ থেকে যেতেই চাচ্ছে না। কয়েকবার হাই তুলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। দরজা খুলতেই চোখ কপালে উঠল মন্তরার। একী পুলিশ। পুলিশ কেন? আপনারা কী চান? এত সকালে কেন এসেছেন? ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে গেল মন্তরা।
কোন জবাব না দিয়ে মন্তরাকে পায়ে ঠেলে ঘরে ঢুকল পুলিশ। ঢুকেই সুরুজকে নেড়ে চেড়ে দেখল। সুরুজ মৃত। সুরুজের কোন সাড়া নেই। কী ব্যাপার? কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই মন্তরাকে হ্যান্ডকাপ পরালো এক পুলিশ সদস্য। মন্তরা চিৎকার করে বলল কী হয়েছে? আমাকে বলুন। পুলিশের এস আই সিরাজ তালুকদার বলল, স্বামী হত্যার অপরাধে তোমাকে এরেস্ট করা হলো। মন্তরা কি বলবে ভেবে পেল না। তবুও বলল এসবের আমি কিছুই জানি না উনিতো আমার পাশেই ঘুমিয়ে ছিল। ওর মৃত্যু হয়েছে আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। দাঁড়ান একটি বার আমার স্বামীকে দেখতে দেন। পুলিশের কনস্টেবল এক ধাক্কা মেরে বলল- ‘বেটি খুনি। খুন করে আবার মায়াকান্না দেখাচ্ছে। চল বেটি থানায়। গুতো দিয়ে সব স্বীকার করাব।
মন্তরার কিছু করার ছিল না। পাশের ঘরের জা সেজুতি বেগম মুখ ঝামটা মেরে বলল, কী সাহসরে বাবা- একদিকে সব ছেড়ে ছুড়ে এসেছে অন্যদিকে যার সাথে আসল তাকেই মেরে ফেলেছে- ডাইনী একখান। যা এখন জেলের ভাত খা। এত গুণের দেবরটাকে মেরে ফেলল? দেখেন গ্রামবাসী দেখেন....। এতক্ষণে গ্রামের অনেক লোক এসে জড়ো হয়েছে এখানে। এস.আই সিরাজ তালুকদার লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে লাশ ময়না তদন্তে পাঠালেন, আর মন্তরাকে নিয়ে গেলেন থানায়। মন্তরা বুঝতেই পারল না কি থেকে কি হলো?
গ্রামের সবাই হা করে দাঁড়িয়ে থাকলো পুলিশের চলন্ত জীপটির দিকে।
সেজুতি দেখল সুন্দরী মন্তরা পুরো দখল করে নিয়েছে সুরুজকে। যদিও সুরুজ- সৎ দেবর তবুও ওদের বিভিন্ন সমস্যায় বেশ সাহায্য করত। সেজুতি সুন্দরী নাদুস নুদুস। তবে স্বামীর সাথে বনিবনা কম। স্বামীর সাথে দেনদরবার নিত্য নৈমিত্তিক। ক্ষেতে কাজ করে সে। রাতে প্রায়ই ঝগড়া হয়। সেক্সী সেজুতি স্বামীকে বার বার পেতে চায়। কিন্তু স্বামী চান মিয়া ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ফলে অতৃপ্তি নিয়েই তাকে থাকতে হয়। এদিকে সুরুজ তখন তাগড়া জোয়ান। কলে কৌশলে বাগে পেতে চায় সেজুতি এবং এক সময় সে সুরুজকে বাগিয়ে নেয়। তাকে তার গোপন রহস্য ভেদ করতে দেয় সেজুতি। আর দিন দিন ওর সাহস বাড়তে থাকে।
একদিন দুপুরে রঙ লীলায় মেতেছিল সেজুতি। ঠিক তখনই চান মিয়া কী কাজে ঘরে ঢুকল। সেজুতি ও সুরুজের কীর্তি কলাপ চাক্ষুস দেখে ফেলল চান মিয়া। হাতের বাঁশের কঞ্চিটা পাগলের মত চালাল দুজনের উপর। বাড়ি খেয়ে পালাল সুরুজ। সেই যে পালাল আর কেউ তাকে দেখেনি। কোথায় গেল সে? চান মিয়া ও আর খোঁজ করেন আছে না মরেছে। অবশ্য সেজুতি সেদিন স্বামীর পায়ে ধরে ক্ষমা ভিক্ষা চাইল ‘ওগো আমার মাথা ঠিক ছিল না। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমাকে ক্ষমা করে দাও। জীবনে আমি আর এমন ভুল করব না।
-চাঁন মিয়া সেদিন কিছুই বলেনি। শুধু মুখ ফোটে একটি কথা বের হয়ে এল- ছিনাল।
অনেকদিন কথাবার্তা বন্ধ ছিল স্বামী স্ত্রীর মধ্যে। চান মিয়া ভাবছিল তালাক দিয়ে দিবে ওকে। এমন- বিশ্বাস ঘাতিনী ঘরে রাখা ঠিক না। কিন্তু পরক্ষণেই ওর রূপ লাবন্য আর ভালোবাসা চোখের সামনে ভেসে উঠল। আর সেজুতির আদর যতœও বেড়ে গেল স্বামীর প্রতি। কিছুদিন পর রাগ পড়ল চান মিয়ার। আচমকা জড়িয়ে ধরে সে চুমো খেল সেজুতিকে। সেদিন শিব লীলা চলল সারারাত। অদম্য চাঁন মিয়া সেদিন কোত্থেকে যেন শিবশক্তি আয়ত্ত করল। এটা ওর পৌরুষে আঘাতের পরে প্রতিক্রিয়া না প্রতিশোধ বুঝে উঠতে পারল না সেজুতি। অত্যাচারের আধিক্যে সকালে কোমর তুলে দাঁড়াতে পারল না। ব্যথা নাশ করতে সেদিন প্যারাসিটামল খেতে হলো তাকে।
সুরুজ লজ্জা পেয়ে সেদিন কুমিল্লা ছেড়ে পালাল ঢাকায়। আর ঢাকা ছেড়ে একদিন কোলকাতা। একটা ফার্মে চাকরি। কেটে গেল আট বছর। এখন সুরুজের বয়স আটাশ। এরই মাঝে মন্তরার সাথে পরিচয় অত:পর প্রেম। এরপর দেশ ত্যাগ। সুরুজের সাথে বাংলাদেশে আসা। মুসলিম হওয়া অ:পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সুরুজের সাথে ঘর সংসার- এটা যেন একটা স্বপ্নের মত মন্তরার কাছে। বারবার মানসপটে ভেসে উঠে সুরুজের মুখ। হায়- সুরুজ। কী প্রেম দিলে তুমি। আমি তো এক মুহূর্তও তোমাকে ভুলতে পারি না।
-অব্যক্ত বেদনায় নীল চিহ্ন মখে। কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে, চোখ ভরে আসে নোনা জল। দুই হাতে মুছে মন্তরা। সুরুজ যেন চোখের পানি হয়ে বেরিয়ে আসে অন্তর থেকে। ভালোই হয়েছে। সুরুজ চোখের পানি হয়ে এখনও বেঁচে আছে মন্তরার কাছে।
চান মিয়া ও সেজুতি ভালোই পেতেছিল সংসার। সুরুজের ভাগের জমি জমা বাড়ি ঘর সবই ভোগ করছিল ওরা। হঠাৎ সুরুজের আবির্ভাব কোনভাবেই মানতে পারছে না ওরা। আগে সুরুজ একান্নবর্তী ছিল। আর এখন। কোত্থেকে এক উটকো ঝামেলা এসে জুড়ে বসেছে সম্পত্তির অর্ধেক। এছাড়া সেজুতির সাথে গোপন সম্পর্কতো ছিলই সুরুজের চান মিয়ার মাথায় কুবুদ্ধি ঘুরতে থাকে। স্বামী স্ত্রী দুজন শেয়ার করে। সেজুতি যেমনি রূপবতী তেমনি কুটকৌলী। সে স্বামীকে বলল- এক ঢিলে দুই পাখি মারতে হবে।
-কি রকম?
-একজনকে মারব আর একজনকে দেব পুলিশে।
-আচ্ছা। বেশ তো। তোমার মাথায় দারুণ বুদ্ধি।
রাতের খাবারের পর মন্তরাকে ডাকল সেজুতি।
-কি করিস ঘরে একা একা?
-না ভাবী। এমনি শুয়ে আছি।
-নাগরের কথা ভাবছিস?
-না। উনিতো এসে যাবে একটু পর। কিন্তু যারা কোন দিন আসবে না ওদের কথা ভাবছি।
-ও; তোমার মা-বাবা, ভাই-বোন?
-হ্যাঁ, ওদেরই কথা ভাবছিলাম।
-হ্যাঁ, মন্তরা। আমারও মা-বাবার কথা মনে পড়ছে। অনেকদিন ধরে ওদের দেখিনি। সে দুধটা খা। সেজুতি গ্লাস ভর্তি দুধ এগিয়ে দিল। মন্তরা অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও দুধটা খেল। অভাবের সংসার। দুধ খাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার। সেজুতির একটা গাই থাকায় ওরা একটু আধটু দুধ খাচ্ছে।
এরই মধ্যে সুরুজ এসে মন্তরা উঠল।
-ভাবী আসি- বলে দৌড় দিল মন্তরা। সুরুজকে খাইয়ে দাইয়ে কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে ওর শরীরটা।
-আমার খুব ঘুম পাচ্ছে সুরুজ।
-তাহলে ঘুমিয়ে পড়। আমারও ঘুম পাচ্ছে।
বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ওরা।
গভীর রাতে কৌশলে বাহির থেকে হুড়কা খুলে ঘরে ঢুকল সেজুতি ও চাঁন মিয়া। তখনও গভীর ঘুমে সুরুজ ও মন্তরা। সেজুতি নাড়িয়ে দেখল মন্তরাকে। না নড়ছে না গভীর ঘুমে অচেতন। মনে মনে ভাবল- এই তো সুযোগ। চান মিয়া আচমকা চেপে ধরল সুরুজের গলা। আর সেজুতি পায়ের উপর বসে পড়ল সুরুজের। স্থ’ূলদেহী সেজুতির ওজন কমপক্ষে ৮০ কেজি। জোর করে রাতে পারল না সুরুজ। মুখ দিয়ে কোন কথাও উচ্চারণ করতে পারল না। দেড় মিনিটের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে এল দেহটা। মৃত্যু নিশ্চিত করে বেরিয়ে এলো ওরা। কৌশলে দরজার হুড়কাটা একটা চুরি দিয়ে বাড়ির থেকে লক করে নিল।
গ্রামের মাতব্বরটাও হাত ছিল এ কাজে। সুরুজের কিছু জমি মাতব্বরের দখলেও ছিল। চান মিয়ার সাথে মাতব্বরের সম্পর্কটা ভালোই। সুরুজ ফিরে আসলে চান মিয়া ও মাতব্বরের মাথায় বাড়ি পড়ল। কিন্তু ওরা মুখে কিছুই প্রকাশ করল না। অন্যদিকে মাতব্বরের লোভাতুর দৃষ্টি মন্তরার উপর। আহারে মন্তরা এত রূপ যৌবন নিয়ে এই ঘরে? কথায় কথায় মাতব্বর ইয়াবর হালদার বলল- চান মিয়া তুমি কাজটা করে ফেললে আমি থানা সামলাবো।
-সত্যি বলছেন মাতবর সাব?
-হ্যাঁ। সত্যি বলছি।
পরিকল্পনা মাফিক যে রাতে সুরুজ খুন হলো তার ঠিক দু’ঘন্টা পরে পুলিশ হানা দিল মন্তরার ঘরে।
পুলিশের সুরতহাল রিপোর্ট ও আইও রিপোর্টে মন্তরা দোষী সাব্যস্ত হলো। মন্তরার কোন আত্মীয় স্বজন না থাকায় আইনী লড়াই সে করতে পারল না। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেল সে। কিন্তু মন্তরা ভাবলো এই দুনিয়ায় তো আর কেউ রইল না। জেল থেকে বেরিয়ে সে যাবে কোথায়? শিয়াল কুকুর তাকে কামড়ে কামড়ে অতিষ্ট করে তুলবে। নিজ দেশেও ফিরতে পারবে না সে। ওখানে ফেরা মানে নির্ঘাত মৃত্যু। কেউ মেনে নেবে না ওকে। মন্তরা নিরবে মনের সাথে যুদ্ধ করে সিদ্ধান্ত নেয়। না- এখান থেকে আর বের হবো না। এখানটাই আমার শেষ ঠিকানা।
মন্তরা উকিলের জেরার মুখে কোন মন্তব্য দেয় না। হ্যাঁ ও বলে না, নাও বলে না। বাদী পক্সের উকিল- নিজেই সিদ্ধান্ত দেন..
মাননীয় আদালত- এই আসামীর নিরবতা প্রমাণ করে সে নিজেই ওর স্বামীর হন্তরিক।
জজ বলেন- ‘অর্ডার! অর্ডার!!
স্বামী সুরুজ মিয়া হত্যার অপরাধে তার স্ত্রী মন্তরাকে যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত করা হলো।’
মন্তরা- রায় শুনে খুশি হলো না বেজায় হলো কিছুই বুঝা গেল না। মাথা নিচু করে চার দেয়ালের খাচায় বন্দী হলো সে।
দেখতে দেখতে কেটে গেল বারটা বছর। আদালত থেকে মুক্তির আদেশ আসল মন্তরার। কিন্তু মন্তরা বিচলিত হয়ে উঠল। মুক্ত হয়ে আমি যাব কোথায়? আমার সুরুজ চলে গেছে। বিনিময়ে সে দিয়েছেএই জেল নামক আশ্রয়। এটা ফেলে আমি কার কাছে যাব? আমি তো সুরুজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। সুরুজ তুমি চলে গেছ কিন্তু আমি তোমাকে বুকের কুটরিতে কবর দিয়েছি। প্রতিনিয়ত তোমার আমার কথা হচ্চে। এখান থেকে তোমাকে কেউ নিতে পারবে না। বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সুরুজ কখনও আলাদা হবার নয়। মৃতুর পর তোমাকে আবারও গভীর আলিঙ্গনে বাঁধর সুরুজ। তোমার আর আমার কবর হবে পাশাপাশি।
আদালতে একটা পিটিশন জমা দিল মন্তরা। সবিনয় অনুরোধ করে বলল- মাননীয় আদালত- আমাকে মুক্তি দিবেন না। আমি মুক্তি চাই না। আমার যে অপরাধ এটা বড়ই জঘন্য। নিজ স্বামীকে হত্যার অপরাধ। এই বার বছরে এর যথাযথ শাস্তি হতে পারে না। হয় মৃত্যুদ- দিন নতুবা আমৃত্যু কারাদ- দিন।
আদালতে আসীন জজ মহোদয় দরখাস্তের সারসংক্ষেপ পড়ে বললেন- তোমার শাস্তিতো কেটে গেছে। এখন একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে আদালত আটকে রাখতে পারে না। যাও তুমি মুক্ত। এ কথা শুনে মন্তরা যেন মৃত্যু পরওয়ানা পেল। করজোরে বলল- মাননীয় আদালত আমাকে দয়া করুন- আমাকে মুক্তি দিবেন না। আমার শাস্তি আরও বাড়িয়ে দিন যাতে এভাবে আর কেউ স্বামী হত্যা না করে।
জজ সাহেব ভারী দুশ্চিন্তায় পড়লেন। তিনি এক সপ্তাহ আরও চিন্তা করত সুযোগ দিয়ে আদালত মূলতবী করলেন।
পরের সপ্তাহে জেলে থাকার দাবী নিয়ে হাজির হলো মন্তরা। সেই একই ভাবে করজোড়ে প্রার্থনা করল মন্তরা- আমাকে জেল দিন হুজুর।
অনেক ভেবে চিন্তে আদালত এই সিদ্ধান্ত দেয় যে জেলে থাকবে মন্তরা-
উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মন্তরার মুখ। সে যেন এই মাত্র আকাশ জয় করে এলো।
মুখে ও অন্তরে হাজারো শুকরিয়া জানায় মন্তরা।
জেলে থাকলো মন্তরা ঠিকই তবে শাস্তি ভোগে নয়। কাজের মধ্য দিয়ে। এসিস্ট্যান্ট কোয়ার্টার মাস্টার হিসাবে কাজ পেল সে। আর এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে চলার ও স্বাধীনতা পেল।
হৃদয় মন্তরাকে জানালো অনেক গভীর থেকে বোনটির জন্য অনেক মায়া পড়ে গেছে তার। গল্পে গল্পে মন্তরা হৃদয়ের অন্তরে এক দেবীতুল্য ছায়া। পুজো দিতে ইচ্ছে করল হৃদয়ের। হৃদয়ের মুক্তির দিন হাসি মুখে বিদায় জানাল মন্তরা। হৃদয়ের দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো। বলল- দিদি আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবো। সারাজীবন তোমাকে পুজো দিয়ে কাটাতে চাই। মন্তরা বলল- না ভাই তার আর প্রয়োজন নেই। মন চাইলে- দেখে যেও তোমার দিদিকে। হৃদয় মুক্ত বাতাসে পা বাড়ালো। দরজায় তখনও দাঁড়িয়ে মন্তরা দিদি যেন বলছে- ধন্যবাদ- মুক্ত বিহঙ্গ। বেঁচে থাকো তোমরা...... অনেক সুখী হও.....।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT