উপ সম্পাদকীয়

প্রাথমিক শিক্ষা হোক মানসম্পন্ন

নামব্রম শংকর প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৯-২০১৯ ইং ০০:১৬:২৬ | সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত

‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’- পন্ডিত গুণী ব্যাক্তির অমর এ বাণী উপলব্ধি করে প্রত্যেক জাতি- গোষ্ঠী, দেশ শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। ‘যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত’। তাই দেশ জাতির উন্নয়নে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। বিশ্বের প্রতিটি দেশে নিজ নিজ দেশের উপযোগী শিক্ষা কাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশে বাংলা মাধ্যম এবং ইংরেজি মাধ্যম (ন্যাশনাল কারিকুলাম) এ দুটি মাধ্যমের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। পাশা পাশি রয়েছে এ লেভেল, ও লেভেল যাকে সাধারনত আমরা বলি বৃটিশ কারিকুলাম। যা ন্যাশনাল কারিকুলাম থেকে একটু আলাদা, শিক্ষা ব্যয়ও অনেক বেশি এ বৃটিশ কারিকুলামের শিক্ষার্থীরা বিশেষ সামর্থ শ্রেণির। দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে জাতীয় পাঠ্যক্রম বাংলা মাধ্যমে। যে শিক্ষা পাঠ্যক্রম গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীসহ শহরের একই মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা একই পাঠ্যক্রমে শিক্ষা গ্রহণ করছে। যদিও শিক্ষা দানের পরিবেশ, শিক্ষক, শিক্ষার মান স্থান এবং পাত্র ভেদে ভিন্ন ভিন্ন।
বর্তমানে শিক্ষার হার যে হারে বেড়েছে, সে হারে শিক্ষার মান বাড়েনি বলে শিক্ষা বিশেজ্ঞদের অভিমত। সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়টি শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রাথমিক স্তরকে গাছের শিকড় হিসেবে ধরা হলে বলতে পারি, গাছের শিকড় শক্ত ভিতের উপর না দাঁড়াতে পারলে গাছ শক্তিশালী হতে পারেনা। সামান্য ঝড়েই গাছ উপড়ে পড়বে। তেমনি প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার প্রকৃত মান বজায় রাখতে না পারলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ নির্ভর, প্রকৃত মেধাহীন শিক্ষার্থী হয়ে বেড়ে উঠবে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকদের গুণগত মান বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। একজন মানসম্পন্ন শিক্ষকই কেবল শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম। সেকারণে শিক্ষকদের উপযুক্ত শিক্ষাদান বিষয়ক ট্রেনিং অবশ্যই প্রয়োজন।
দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মান আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রার অনেক অনেক নিচে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী কেবল পরীক্ষা পাশের জন্য নির্ধারিত সিলেবাস নিয়ে পড়াশুনা করছে। তারা মৌলিক জ্ঞান অর্জন না করেই মুখস্থ করছে, পরীক্ষা পাস করছে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, এতো পরীক্ষা কেন? পরামর্শ দিয়েছেন শ্রেণি ভিত্তিক মূল্যায়নের জন্য, পরীক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ না করে প্রকৃত শিক্ষাদানের উপর গুরুত্ব দান করার জন্য। অবশেষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয় অতি সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ২০২০ সাল থেকে পাইলটিং কার্যক্রম হিসেবে ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বার্ষিক পরীক্ষা থাকছেনা। ক্লাস পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। এ পাইলট কার্যক্রম শেষে ২০২১ সাল থেকে দেশের সব বিদ্যালয়ে এ পদ্ধতি চালু করা হবে।
শিক্ষাদানে ত্রুটি থাকলে, মানসম্পন্ন শিক্ষাদান না করতে পারলে শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষা দিবে আর সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে বসে থাকবে। শিক্ষার মান বাড়বেনা, মেধার বিকাশ ঘটবেনা, তবে বাড়বে শুধু কোচিং বানিজ্য। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপর চাপ বাড়বে, সারাদিন একটার পর একটা কোচিং এ যাবে, বুঝে না বুঝে মুখস্থ করবে। শিক্ষার্থীরা একটু একটু করে হোক, যা শিখবে স্কুল থেকে শিখবে। ঠিক মতো পড়ানো হলো কি না, শিক্ষার্থীরা তা বুঝল কিনা, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরী। শুধু একগাদা হোম ওয়ার্ক সাজিয়ে দিলাম আর শিক্ষার্থীরা বাসায় টিউটর বা কোচিং এ গিয়ে সেগুলো শিখে আসবে এটা ঠিক নয়। স্কুলগুলোতে বছরে তিনবার পরীক্ষা হচ্ছে। ঘটা করে হচ্ছে পঞ্চম শ্রেণি সমাপনী ও অষ্টম শ্রেণি সমাপনী পরীক্ষা। অতি উৎসাহী অভিভাবকরা সন্তানের জিপিএ ৫ প্রাপ্তির জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করতেও বাধ্য থাকেন।
আশির দশক বা তারও আগের শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষাদান, শিক্ষা গ্রহণের পরিবেশ আর নব্বই বা তার পরের শিক্ষা পদ্ধতি, পরিবেশের মধ্যে আমুল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি বড় ভাই-বোন পাড়ার কোন বড় ভাই-বোনের সাথে পার্শ্ববতী কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে। কোন আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া, কোন ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া। সম্ভবত কোন ভর্তি ফিও লাগেনি। শুধুমাত্র হাত দিয়ে শিক্ষকের সামনে নিজের অপর পাশের কান ধরতে হয়েছে বয়স প্রমানের জন্য। এরপর সব করেছেন স্কুলের শিক্ষক। কোন কোচিং করতে হয়নি, অভিাবকরাও সন্তানের প্রথম হওয়া নিয়ে এতো টেনশন করেননি। বর্তমানে কি দেখছি! একটু সামর্থ পরিবার হলেই তিন সাড়ে তিন বছরের শিশুদের নিয়ে গিয়ে ৮/১০ হাজার দিয়ে ভর্তি করাচ্ছি কোন কিন্ডার গার্টেন স্কুলের প্লে কøাসে। এসব স্কুলে প্লে, নার্সারী ওয়ান টু বা কেজি ওয়ান টু ক্লাসের কান্নারত শিশু শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের হা হুতাসের উপভোগ্য দৃশ্য বছরের প্রথম ছ’মাস নির্ধারিত। প্রতিমাসে হাজার, দুই হাজার টাকা বেতন গুনছেন। ডিসেম্বর জানুয়ারিতে দেশের খ্যাতনামা স্কুলগুলোতে ভর্তির জন্য কেঁদে কেঁদে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা শিশুদের ছবি প্রতিবছর সংবাদপ্রত্রের পাতায় ছাপা হয়। জীবনে পড়াশুনা কি সেটা বুঝার আগেই পরীক্ষার টেবিলে বসতে হচ্ছে অতি কোমলমতি শিশুদের।
কিন্ডার গার্টেন স্কুলগুলোতে প্লে, কেজি ওয়ান, কেজি টু ক্লাসে পড়–য়া অধিকাংশ শিশুরা অভিভাবক ছাড়া ক্লাসে থাকতে চায়না। তাই ক্লাসের প্রায় ৪/৫ ঘন্টা সার্বক্ষনিক স্কুলে থাকতে হয় অভিভাবকদের। এই শিশুরাও বছরে তিন টার্ম পরীক্ষা দিচ্ছে, প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে প্রথম হওয়ার জন্য। সন্তানকে জিপিএ ৫ পেতেই হবে। তাই অভিভাবকরা বিশেষ করে অতি উৎসাহী মায়েদের চোখে ঘুম নেই। ক্লাসের একটু ভালো কোন শিক্ষার্থীর খাতা ঘাটাঘাটি করছেন, পরস্পর হোম ওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ততা দেখার মতো। স্কুলের পড়ার বাইরে অতিরিক্ত যোগ্যতার জন্য সন্তানকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নাচ, গান, আবৃত্তি ইত্যাদি কোচিং-এ। অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকদের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে শিশুরা তাদের শিশুসূলভ আচরন প্রকাশে ব্যর্থ হচ্ছে। খেলার মাঠ নেই। তাই মাঠে খেলা হচ্ছেনা। যেটুকু সময় পাচ্ছে, তখন খেলছে মোবাইল, ল্যাপটপ। এতে প্রকৃত সৃজনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এক বক্তৃতায় উনাদের ছেলেবেলা এবং এখনকার ছোটবেলার পার্থ্যক দেখিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, আগে বাবা মা’দের ৮জন ১০জন করে সন্তান থাকতো। বাবা মায়ের মনোযোগ আশা আকাঙ্খা গুলো ১০ সন্তানের মধ্যে ভাগ হতো। কিন্তু, বর্তমানে ১জন বা ২জন সন্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই বাবা মা অভিভাবকের সকল আশা আকাঙ্খা এই একজনকেই পূরণ করতে হচ্ছে। সে কারণে এখনকার সন্তানরা অত্যন্ত চাপের মধ্যে বড় হচ্ছে। তাকেই ডাক্তার হতে হবে, তাকেই শিল্পি হতে হবে, তাকেই জিপিএ৫ পেতে হবে।
আরেকটি বিশেষ বিষয় উল্লেখ করে নিবন্ধনটির ইতি টানছি। তা হলো, শিশু কিশোর শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই এবং স্কুল ব্যাগ। বিশেষ করে কিন্ডার গার্টেন এবং ইংরেজি মাধ্যমের এসব স্কুলের অধিকাংশ পাঠ্যবই দেশের বাইরের প্রকাশনীর বই। সচেতন অভিভাবকদের ধারণা, স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয়, অপ্রেয়োজনীয় অনেক বইয়ের লিস্ট ধরিয়ে দেন অভিভাবকদের হাতে। ওজনে ভারী স্ইে বইগুলো, ক্লাসের খাতা, সাপ্তাহিক পরীক্ষার খাতা, টিফিন বক্স ইত্যাদি নিয়ে কেজি ওয়ান, টু, থ্রী, স্ট্যান্ডার্ড ওয়ান, টু, থ্রী পড়–য়া পাঁচ, ছয়, সাত বছরের শিশু প্রতিদিন প্রায় ৭-৮ কেজির ব্যাগ পিঠে করে যাওয়া আসা করছে। সিড়ি বেয়ে উঠছে আর নামছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত সামর্থের অতিরিক্ত ওজন ব্যাগে নিয়ে প্রতিদিন বহন করলে শিশুর হাঁড়ের, উচ্চতার সমস্যাসহ নানান শারিরিক সমস্যায় ভুগতে পারে শিশুরা। অতিরিক্ত ওজনের স্কুলের ব্যাগ নিয়ে প্রতিবছর জানুয়ারিতে সংবাদপত্রগুলোতে লেখালেখি কম হয়নি, বিভিন্ন চ্যানেলে টক শো’তে কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু দু:খের বিষয় এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষ থেকেও কোন ধরনের কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছেনা। স্কুল কর্তৃপক্ষও প্রতিবছরের শুরুতে লম্বা বুক লিস্ট হাতে তুলে দিচ্ছে, অভিভাবকরাও নির্বিকার স্কুল নির্ধারিত লাইব্রেরী থেকে বুকলিস্ট অনুযায়ী বই কিনে বাচ্চাদের ব্যাগে দিয়ে দিচ্ছেন। বাচ্চারাও বাধ্য হয়ে পিঠে করে নিয়ে যাচ্ছে বই ভর্তি অতিরিক্ত ওজনের স্কুল ব্যাগ। অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগের এ বিষয়টি নিয়ে জানুয়ারিতে নয় এখনই আলোচনা করা প্রয়োজন। শিশুদের স্কুল ব্যাগ একটু হালকা করতে সফল উদ্যোগ এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারেন স্কুল কর্তৃপক্ষ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, উপজেলা শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ। দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নিলে আমাদের আগামি ভবিষ্যৎ আজকের শিশুদের পিঠ থেকে অতিরিক্ত ওজনের বইয়ের বোঝা কমিয়ে অপেক্ষাকৃত হালকা ওজনের ব্যাগ উপহার দিতে পারি নতুন বছরে।
জীবনমান পরিবর্তনের সাথে সাথে ইংরেজি ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশে চালু হয়েছিল কিন্ডার গার্টেন স্কুল। সাজানো গোছানো, ড্রেস কোড, পরিপাটি এ কিন্ডার গার্টেন স্কুল, সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল সবগুলো স্কুলেরই একই উদ্দেশ্য-শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান। আমাদের সবার উদ্দেশ্য সুন্দর, সৎ, মহৎ হলে প্রতিটি উদ্যোগই শিক্ষার্থীদের জন্য যুগোপযোগী, কল্যাণকর হবে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শিশুর বয়স উপযোগী ওজনের স্কুল ব্যাগ শিশুর পিঠে থাকুক এবং সৃষ্টিশীল আনন্দে বেড়ে উঠুক আমাদের আগামি প্রজন্ম।
লেখক : সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মী।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভিমরুলের চাকে অমিতের খোঁচা
  • মানবপাচার, অর্থপাচার সমাচার
  • আত্মনির্ভরতা
  • খাদ্যে ভেজাল : দরকার কঠোর পদক্ষেপ
  • নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গ
  • এম.সি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চাই
  • টেকনিক্যাল রোডে স্টিলের রেলিংসহ ফুটপাত চাই
  • জৈনপুর এলাকায় ড্রেন সংস্কার হোক
  • বানরের উৎপাত প্রসঙ্গ
  • শাবিতে বিবিএ অনুষদের আসন বৃদ্ধি হোক
  • প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
  • সাক্ষরতা আন্দোলন : একটি পর্যালোচনা
  • অশান্ত বিশ্বে শান্তির সন্ধান
  • আমার পাহাড়, আমার সিলেট
  • যৌবন ফিরে পাক বিবিয়ানা নদী
  • সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?
  • সামাজিক ব্যাধি
  • আবাসিক এলাকায় ব্যবসা
  • এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রসঙ্গে
  • শিশুর উপর এতো চাপ
  • Developed by: Sparkle IT